সেবা ও উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে

অবিলম্বে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দরকার


২৭ মার্চ ২০২৫ ১৬:১২

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
রাষ্ট্রের পরিধি বাড়ার সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সেবা প্রদান ও সমস্যা সমাধান থেকে শুরু করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যথাযথ ভূমিকা পালন করা সম্ভব হয় না। তাই কালের পরিক্রমায় ও সাধারণ জনগণের প্রয়োজনের লক্ষ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারে তিনটি স্তর করা হয়েছে। গ্রাম পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা পরিষদ ও জেলা পর্যায়ে জেলা পরিষদ আর শহরগুলোয় পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন।
বর্তমানে বাংলাদেশে ৬৪টি জেলা, ১২টি সিটি করপোরেশন, তিন শতাধিক পৌরসভা ও ৪৯টি উপজেলা রয়েছে। দেশের সবকটি জেলা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ রয়েছে। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়ার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে সব জেলা ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং সিটি ও পৌরসভার সব মেয়রদের অপসারণ করে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে বিরোধীদলবিহীন ও ভোটারবিহীন কথিত নির্বাচনের মাধ্যমে এসব পরিষদ তারা দখল করে। তাই অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের আগস্ট মাসেই স্থানীয় সরকারের কথিত জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে সরকার প্রশাসক নিয়োগ করে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর ও সাধারণ জনগণের মতামতের ভিত্তিতে জানা গেছে যে, প্রশাসকদের দিয়ে স্থানীয় সরকারের সেবা ও উন্নয়নের কাজটা হচ্ছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাহত হচ্ছে।
১৮ কোটি জনসংখ্যার একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর সেবা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পুরোটাই চলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে। দারিদ্র্যবিমোচন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে স্থানীয় সরকার খাতের ভূমিকা অপরিহার্য। মূলত স্থানীয় সমস্যার সমাধান ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো এত বড় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাটা শুধু প্রশাসক দিয়ে চলতে পারে না।
বিগত আট মাস ধরে দেশে স্থানীয় সরকারের ওপরের দুই স্তরে কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। স্থানীয় পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় যেমন স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থমকে আছে, তেমনিভাবে সাধারণ জনগণ ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অনেক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে শহর ও মহানগরীগুলোয় মেয়র যেমন নেই, তেমনিভাবে কাউন্সিলরাও নেই। তাই শহরের নাগরিকরা তাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সিটি ও পৌরসভার বিভিন্ন সনদপত্র পাচ্ছে না। উল্লেখ্য, জনগণের নাগরিকত্ব সনদ, জন্মসনদ থেকে বিভিন্ন সনদ দেয়া হয়ে থাকে শহরে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন থেকে।
অপরদিকে উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-কে উপজেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। জানা গেছে, ইউএনও অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রশাসক হিসেবে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও নজর দিতে পারছেন না। ইউএনওরা যে সময় ও নজর দিতে পারছেন না, তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বেশকিছু খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের ব্যাপারে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তার দল মনে করে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে হওয়া দরকার। কিন্তু কেন- এ প্রশ্নে জামায়াত নেতা মিয়া পরওয়ার বলেন, ‘এখানে দুটি কারণ আছে। প্রথমটা হচ্ছে, এখন কোনো সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই, পৌরসভায় নেই, উপজেলায় নেই। নিচের স্তরগুলোও নির্বাচনের অপেক্ষায় আছে। উন্নয়ন হচ্ছে না, মানুষ জনদুর্ভোগের প্রতিকারে তো জনপ্রতিনিধিকে পাচ্ছে না। ফলে স্থানীয় নির্বাচনটি দ্রুত দরকার।’
‘আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, এ অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেই যদি স্থানীয় সরকার নির্বাচনটা হয়ে যায়, তাহলে সেটা নিরপেক্ষ হবে বলেই আমরা আশা করি। তা না হলে যে কোনো রাজনৈতিক দলের অধীনেই নির্বাচন হোক না কেন, তারা সেটা কব্জা করে নিতে চাইবে। যে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য পনেরো/ষোলো বছর আমরা অপেক্ষা করেছি, এখন দুই মাস আগে হলো না পরে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, ইলেকশনটা সুষ্ঠু হচ্ছে কিনা। এ কারণেই আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনটা আগে চাই,’ বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ইউসুফ সোহেল স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচন নিয়ে সোনার বাংলার সাথে কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, প্রশাসক দিয়ে স্থানীয় সরকার চলছে না। কারণ হিসেবে বলেছেন, সরকার যাদের উপজেলায় প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন, তারা খুবই অল্প সময়ের জন্য উপজেলায় আসেন। এ অল্প সময়ে উপজেলার স্থানীয় সমস্যাগুলো বুঝতে না পারার কারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। কোথায় কত টাকা বরাদ্দ করতে হবে প্রশাসক যথাযথভাবে জানেন না, তাই যেখানে প্রয়োজন কম সেখানে বেশি বরাদ্দ হচ্ছে আবার যেখানে বেশি প্রয়োজন সেখানে কম হচ্ছে। তাই জনাব সোহেলের অভিমত, পল্লী এলাকার উন্নয়ন করতে হলে দ্রুত স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দিতে হবে।
এদিকে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় সরকারের; বিশেষ করে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর পদেও প্রশাসক দেয়ার চিন্তা করছে। তবে কাউন্সিলর পদে প্রশাসক এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্য থেকে দেয়ার চিন্তা করছে। জেলা পরিষদেও স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্য থেকে দেয়া হবে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও জনগণের সেবা প্রদানের জন্য অপরিহার্য অঙ্গ। স্থানীয় সরকারের কাজ ও সেবা বন্ধ রাখার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে স্থানীয় সরকার নিয়ে কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই সাত মাস হয়ে গেল। শীর্ষ পদে প্রশাসক বসানো হয়েছে, তবে নিচের স্তরে কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নেই। আবার উপজেলা পরিষদে ইউএনওদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে। সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় হ-য-ব-র-ল অবস্থা। সাধারণ জনগণ প্রয়োজনীয় ও জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত এবং অবকাঠামোর কাজ সংস্কারসহ সার্বিক উন্নয়ন থেমে আছে।
অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও নেতৃবৃন্দসহ স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে দেশের উন্নয়ন ও সাধারণ জনগণের জরুরি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত অনুষ্ঠান করা দরকার। গত ২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, আগামী ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাহলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে এখনো এক বছর সময় আছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকার ইচ্ছা করলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচনটা করা যেতে পারে। ইউপি নির্বাচন না করলেও চলবে, কারণ ইউনিয়ন পরিষদ আগেরটাই চালু আছে। আমরাও মনে করি, তৃণমূল মানুষের সেবা ও উন্নয়নের স্বার্থে স্থানীয় সরকারের ওপরের স্তরের নির্বাচনগুলো করা উচিত।