রাজনীতিবিদদের শহর-গ্রামের দেয়াললিখন স্মরণ রাখা দরকার


২০ মার্চ ২০২৫ ১৪:২৩

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দান সুস্থভাবে চলছে না। ইতোমধ্যেই আমরা ভুলে গেছি জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের কথা। লেডি হিটলার হাসিনার ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত ১৮ কোটি মানুষ দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল। খুন, গুম, জেল আর আয়নাঘরের নির্যাতনে মানুষ জর্জরিত হয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার পথ খুঁজছিল।
কোটা আন্দোলনের সুবাদে দেশের তরুণ ছাত্র-জনতা মাঠে নেমে যাওয়ার ফলে আল্লাহর সাহায্য এসে যাওয়ার কারণে নব্য হিটলার হাসিনা দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। দেশ রাহুমুক্ত হয়েছে। স্বাধীনভাবে ছাত্র-জনতা নিশ্বাস ফেলতে পারছে। শহর-বন্দর-গ্রামের লোকদেরও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ভয়ে চলতে হচ্ছে না। আবার তাদের দোসর হাসিনার পুলিশ বাহিনী চাঁদাবাজি ও সাধারণ জনগণকে বিরক্ত করছে না।
আমি নিজে বাজার করি। বাজারে ছোট দোকান থেকে পাইকারি দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি, তবে কমেছে। কিছু জায়গায় হাতবদল হয়েছে আবার ঘুরে-ফিরে চাঁদার পরিমাণ আগের মতোই চলছে। ছাত্র-জনতার প্রতিরোধে কিছু জায়গায় চাঁদাবাজি কিছুটা কমেছে। আমার পরামর্শ ছিল- প্রতি উপজেলায় ইউএনও, ওসি এবং ছাত্র-জনতাকে নিয়ে সংগ্রাম কমিটি করে বাজারে বাজারে চাঁদাবাজ খুঁজলে তারা পালাতে বাধ্য হবে। আমি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকেও অনুরোধ করব, জনতার কথা চিন্তা করে দেশব্যাপী এ উদ্যোগ নিলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। আমরা ভালো ফলের প্রত্যাশায় রইলাম।
আমি দেয়ালেলিখনের কথা এতদিন পর উল্লেখ করলাম এজন্য যে, রাজনীতিবিদদের কথাবার্তায় মনে হয় যেন শুধুমাত্র তাদের ক্ষমতায় বসানোর জন্যই ছাত্র-জনতা আন্দোলন করে শত শত তাজা-তরুণ শহীদ হলো আর হাজার হাজার ছাত্র-জনতা আহত, পঙ্গুত্ববরণ করে বাড়িতে এবং হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে শহীদ ও আহতদের জন্য। আরো উদ্যোগ বাড়াতে হবে। কারণ এদের রক্ত দেয়ার জন্যই আজ এ সরকার গঠন ত্বরান্বিত হয়েছে আবার আমরাও রাজনীতিবিদরা স্বাধীনভাবে কথা বলার নিশ্চয়তা পেয়েছি। আমাদের তাই শহীদ ও আহতদের কথা সবসময় স্মরণ রাখতে হবে।
জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের সময় শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে সব জায়গায় দেয়ালে তরুণ ছাত্রদের আশা-আকাক্সক্ষার কথা লেখা হয়েছিল, যা আজো দৃশ্যমান। বিপ্লবের পর আমার উত্তরবঙ্গ সফরের সময় ৭ জেলার দেয়ালগুলো দেখার সুযোগ হয়েছে। আবার ঢাকায় অবস্থানের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে অলিগলিতে দেয়াললিখনের দৃশ্য চোখ এড়ায়নি।
সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার মানসিকতা নিয়েই এ আন্দোলন বেগবান হয়েছিল। সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা যার যার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে এ আন্দোলন হাসিনা খেদানোর আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। হাসিনা এবং তার দল ও দোসরদের অত্যাচারে মানুষ দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল। মহান আল্লাহ তায়ালা এদের অত্যাচারের মাত্রা অতিক্রম করার কারণে পূর্ব যুগের মতো গোটা বাহিনীর অপসারণের পদক্ষেপ নেন। হাসিনা তার প্রিয় মোদির দেশে পালিয়ে জীবন বাঁচায় আর অন্যরা কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছে কেউবা পাশের দেশে পালিয়ে গেছে আবার কেউবা জেলে বিচারের আওতায় দিন গুনছে। আমরা এ অত্যাচারী শাসক ও তার অনুসারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের প্রত্যাশায় আছি। আপনারা দেখেছেন, বিচারপতি মানিককে কীভাবে পাশের দেশে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে সব হারিয়ে কলাপাতার ওপর ঘুমাতে হয়েছে। সম্মানিত লোক নিজের সম্মান না রাখলে তাকে কেউ সম্মান দিতে পারে না। যেমন হাসিনা পালিয়েছে, তাদের দোসররা পালিয়েছে আবার কেউ কেউ জেলে আটক আছে। তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে।
আমরা বিনা বিচারে কারো সাজা চাই না। সঠিক বিচারের আওতায় এনেই তাদের উপযুক্ত সাজা কার্যকরী করতে হবে। তাদের কোনো তল্পিবাহকও যেন এ সাজা থেকে পার না পায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে সব লোকের বাস করার অধিকার আছে। আবার কেউ জনগণের টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করে, ব্যাংক লুট করে, কারো রক্ষা নেই। দুনিয়ায়ই তাদের সঠিক বিচার করে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হবে। আবার আখিরাতে আল্লাহর বিচারেও তাদের চিরদিন জাহান্নামের সাজা ভোগ করতে হবে, কোনো সন্দেহ নেই।
বলছিলাম দেয়ালে লিখনের কথা। সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার আহ্বান আছে দেয়ালের লিখনে। ঘর থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে সর্বক্ষেত্রেই বিরাজমান বৈষম্য দূর করার আহ্বান দেয়ালের লিখন থেকে নিয়ে আমাদের বৈষম্য দূর করার কাজ করতে হবে সবাইকে। মতের পার্থক্য আমাদের থাকতে পারে, কিন্তু দেশ গড়ার কাজে সবাইকেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব অনেক বেশি। মত-পথের পার্থক্য ভুলে দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে এগিয়ে আসতে হবে।
বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। জনগণের সেবার জন্য তাকে আন্তর্জাতিকভাবে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে। দলীয় দায়বদ্ধতা তার নেই। অন্য উপদেষ্টারাও দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে। প্রশাসনের অভিজ্ঞতা কম থাকলেও গত সাত মাসে বেশকিছু ভালো পদক্ষেপ তারা নিয়েছে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন হয়েছে। দুদক পুনর্গঠন হয়েছে। পুলিশপ্রধান ভালো মানুষ। তারা ইতোমধ্যেই পুরনো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পাপ কামাইকারীদের অপসারণ করেছে। আরো বাকি আছে, তাদেরও সরাতে হবে। নতুন লোক নিয়োগ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দ্রুততম সময়ে লোক নিয়োগ দিয়ে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে মাঠে নামাতে হবে। লোক নেয়ার ক্ষেত্রে সততা, যোগ্যতার প্রাধান্য দিতে হবে। দেশে-বিদেশে পতিত সরকারের দোসরদের চিহ্নিত করে তাদের দ্রুত সরাতে হবে। সৎ, যোগ্য লোক সর্বক্ষেত্রে নিয়োগ দিতে হবে।
বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ইতোমধ্যেই এ বিভাগের সংস্কারের কাজ কিছু হয়েছে। আরো সংস্কার করে বিচার বিভাগকে প্রশাসন থেকে পৃথক করে সুষ্ঠু বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে বিচারের বিষয়টি আরেকটু বলতে চাই। পতিত আ’লীগ সরকার বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করেছে। সেই সরকারের নির্দেশে জামায়াতের ৫ নেতাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ৩টি মন্ত্রণালয় ৫ বছর দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশে চালিয়ে দেশে-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছিলেন। শুধুমাত্র স্বৈরাচার হাসিনার নির্দেশে নিরপরাধ নেতাদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকেও ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে হাসিনার নির্দেশে। আমরা এর জোর প্রতিবাদ জানাই। পুনর্বিচারের আবেদন করি। নির্দেশদাতাদের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসি দাবি করছি।
দেয়ালের লিখনে ন্যায়বিচারের তথ্য ফুটে উঠেছিল। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থেই গত ১৬ বছরের হত্যা, গুম, খুন, আয়নাঘরের নির্যাতনের সব বিচার এ সরকারের সময়ই করতে হবে। কারণ এ দেশের রাজনৈতিক সরকার মামু, খালু, টাকার ঝুলি ন্যায়বিচারকে প্রভাবিত করে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফসল হিসেবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতেই হবে মানবিক কারণে।
জাতিসংঘের মানবিক সংস্থার রিপোর্ট হাসিনা ও তার দোসরদের বিচারের সহজ পথ খুলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবেই প্রমাণ হয়েছে হাসিনা ও তার প্রশাসন ন্যায়বিচার করেনি। অন্যায়ভাবে খুন, গুম, ফাঁসি ও আয়নাঘরের মতো নির্যাতনের পথ করে দিয়েছিল। তাই আমরা এ সরকারের কাছে আবেদন করতে চাই- সব কাজের চেয়ে প্রাধান্য দিয়ে বিচারকাজ দ্রুততম সময়ে করতে হবে। এক্ষেত্রে মুসলিম দেশ সিরিয়ার উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। সেখানেও ৫৪ বছরের স্বৈরশাসক আসাদকে হটিয়ে বিপ্লবী সরকার গঠন করে দ্রুততম সময়ে দোষীদের বিচার করে ফাঁসি কার্যকর করছে। আজকের তুরস্কেও এরদোগানবিরোধী বিদ্রোহীদের বিচার করে রায় কার্যকরী করার কারণে তুরস্ক এখন দুনিয়ার মধ্যে একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তুরস্ক বাংলাদেশের জন্য একটি উদাহরণ হতে পারে। আবার তুরস্ক আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় অবদান রাখার প্রস্তাব ইতোমধ্যেই দিয়েছে ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ হিসেবে।
আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা আমাদের ইতিহাস জানি না বা জানার চেষ্টাও করি না। জুলাই-আগস্টের শহীদদের তালিকা জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যেই ১০ খণ্ডে প্রকাশ করেছে আবার প্রকাশনা উৎসব করে তা সবার সামনে তুলে ধরেছে। জাতি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। তালিকা প্রকাশ চলমান। কারো কাছে শহীদ বা আহতদের তথ্য জানা থাকলে সরকার বা জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় শাখাকে দিলে তার মূল্যায়ন হবে।
আগস্ট বিপ্লবের অন্যতম দাবি ছিল সংস্কার। সংস্কার চলছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংস্কারের কাজ শেষ করে তা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই আগামী নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। অবশ্যই স্থানীয় নির্বাচন আগে করতে হবে। কারণ ছোট ছোট জায়গায় মেম্বার, চেয়ারম্যান, কমিশনার, মেয়র পদে নির্বাচন হলে নির্বাচন কমিশনও তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবে। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভালো রাখা যাবে। আমি আগেই প্রস্তাব করেছি- প্রতিদিন দুটি জেলায় এ নির্বাচন করা যেতে পারে। তাহলে ৩২ দিনে সব স্থানীয় নির্বাচন হয়ে যাবে। আমরা সৎ, যোগ্য, চাঁদাবাজহীন লোকদের নির্বাচিত করতে সক্ষম হব।
দেশ আমাদের সবার। সব দল তাদের লোকদের এলাকায় চাঁদাবাজ, দখলবাজদের তালিকা করতে বলুন। নিজেদের সৎ, যোগ্য প্রার্থী বাছাই করে এলাকার লোকদের কাছে পরিচিত হন। জনগণ আপনাদের যাচাই-বাছাই করে ভালো মানুষ নির্বাচিত করবেন। আপনারা যে দলের লোকই হন না কেন। আসুন, আমরা দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে জনগণের উন্নতির জন্য কাজ করি। দেশ ভালো হবে, আমরাও ভালোভাবে চলতে পারব, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।