রাজনৈতিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি থামছে না


২০ মার্চ ২০২৫ ১৩:৫৮

স্টাফ রিপোর্টার : ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতন হলেও দেশজুড়ে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমের পাতায় চোখ রাখলেই চাঁদাবাজির খবর দেখি। পেশাদার চাঁদাবাজির পাশাপাশি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়ও চলছে চাঁদাবাজি। চাঁদাবাজি ঠেকাতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যখনই দলের বা অঙ্গ সংগঠনের কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে, তখনই তদন্তসাপেক্ষে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে দলটি। বিএনপি স্থানীয় সরকার বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে দাবি করেন, এ পর্যন্ত তার দল তিন হাজারের অধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।
গত ১৬ মার্চ রোববার রাজধানীর শান্তিনগর এলাকায় চাঁদাবাজি করার সময় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদল নেতার চার সমর্থককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা দক্ষিণ যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়নের সমর্থক বলে জানা গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায় করতে গেলে গণধোলাই দিয়ে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় পল্টন থানায় একটি মামলা হয়েছে। তাদের ২ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্টন থানার এসআই সাইফুর রহমান বলেন, গ্রেফতাররা হলেনÑ আল মাহমুদ রাজ, মাহিদুর জামান ওরফে মোহন হোসেন, নুর আলম ও মাসুদ। প্রাথমিক তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হলে ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন বিচারক। সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ মার্চ রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শান্তিনগর বাজারে রূপায়ন এঞ্জেলের সামনে চাঁদা তুলতে গেলে তাদের বেঁধে রেখে মারধর করা হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাদের আটক করে থানায় নেয়। গ্রেফতারদের মধ্যে রাজ যুবদল নেতা নয়ন ও যুবদল সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্নার ঘনিষ্ঠ সহযোগী। এছাড়া গ্রেফতার মোহন ঢাকা কলেজ ছাত্রদল সদস্য ও নয়নের শ্যালক। নুর আলম ১৯নং ওয়ার্ড রমনা থানা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং মাসুদ রমনা থানা ১৯নং ওয়ার্ড যুবদল সদস্য ও নয়নের গাড়িচালক। তদন্ত সূত্রে জানা যায়, রবিউল ইসলাম নয়নের ঘনিষ্ঠ ও চাঁদাবাজিতে আরও অনেকের নাম পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে তপন, সজল, রনি শিকদার, মাসুদ রানাসহ আরও কয়েকজন রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
চাঁদাবাজির অভিযোগে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের ৬ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ১৭ মার্চ সোমবার জাতীয়তাবাদী যুবদল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. শাহজাহান চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বহিষ্কৃতরা হচ্ছেÑ যুবদল নেতা আল ফাহাদ অমিত, মাসুদ রানা ছবি, মো. রাসেল সিকদার, আল মাহমুদ রাজ, নুরুল আলম ও মাসুদ রানা। তাদের মধ্যে আল ফাহাদ অমিত খিলগাঁও থানাধীন ১নং ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক, মাসুদ রানা ছবি শাহবাগ থানাধীন ২০নং ওয়ার্ড যুবদল নেতা, মো. রাসেল সিকদার শাহবাগ থানাধীন ২০নং ওয়ার্ড যুবদল নেতা, আল মাহমুদ রাজ মতিঝিল থানা যুবদল নেতা, নুরুল আলম রমনা থানাধীন ১৯নং ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক, মাসুদ রানা ১৯নং ওয়ার্ড যুবদল নেতা।
এদিকে রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় রাজনৈতিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি-দখলদারির অভিযোগ আবুল হাসনাত অনু নামে এক যুবদল নেতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃত অনু ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সাবেক সদস্য, খিলগাঁও থানা যুবদলের সাবেক সভাপতি ও একই এলাকার যুবদলের সভাপতি পদপ্রার্থী। গত ৭ মার্চ শুক্রবার দুপুরে খিলগাঁওয়ের সি-ব্লক থেকে খিলগাঁও থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।
রাজধানীর মিরপুরে চাঁদাবাজির অভিযোগে জামাল হোসেন রানা নামে এক যুবদল নেতাকে গ্রেফতার করেছে যৌথবাহিনী। গত ১০ মার্চ সোমবার দুপুরে মিরপুর ৬ নম্বর কাঁচাবাজারে চাঁদাবাজি করার সময় রানাকে আটক করে সেনাবাহিনীকে খবর দেয় জনতা। জামাল হোসেন রানা মিরপুরের ৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক।
লক্ষ্মীপুরে বেড়িবাঁধ সংস্কার কাজের ঠিকাদার থেকে চাঁদা না পেয়ে ৬ শ্রমিককে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ উঠেছে সাবেক যুবদল নেতা আনোয়ার সম্রাটের বিরুদ্ধে। প্রথমে সম্রাটের পাঠানোর ২০ থেকে ৩০ জন লোক এসে কাজে বাধা দেয়। এরপরও কাজ চলমান থাকায় সম্রাট এসে লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি শ্রমিকদের পিটিয়ে আহত করে বলে জানান ভুক্তভোগীরা। গত ১৫ মার্চ দুপুরের দিকে সদর উপজেলার চররমনী মোহন ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহত শ্রমিকরা হলেন- কাসেম সর্দার, ইসলাম সর্দার, জাহের সর্দার ও ৩ জন ভেক্যুচালক।
গত ৫ আগস্ট গণঅভুত্থ্যানের পরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে গণমাধ্যমে আসা কিছু খবরে শিরোনাম এ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো, এগুলো হচ্ছেÑ ‘যুবদল নেতা নয়নের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংকে হামলার অভিযোগ’, ‘সুনামগঞ্জে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ২০, নিহত ১’, ‘পুরান ঢাকায় যুবদলের দুই পক্ষের মধ্যে মার্কেট দখল নিয়ে গোলাগুলি, আহত ১০’, ‘নারী কনস্টেবলকে রড দিয়ে পেটালেন বিএনপি নেতার গাড়িচালক’, ‘ডিলারশিপ না পাওয়ায় খাদ্য কর্মকর্তাকে হাত কেটে নেওয়ার হুমকি বিএনপি নেতার’, ‘ঠাকুরগাঁওয়ে এলজিইডি কর্মকর্তাদের ওপর বিএনপি নেতাদের হামলায় আহত ৫’, ‘মনপুরায় বিএনপির আলম-নয়ন গ্রুপের দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আহত ১৩’, ‘জামায়াত নেত্রীর ওপর হামলা, বিএনপি নেতার ছেলে গ্রেফতার’, ‘ডাকাতি করতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের দুই নেতা গ্রেফতার’, ‘নোয়াখালীতে বাজার ইজারা নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১২, ‘রাজশাহীতে ইফতারে নেতাকে বরণ নিয়ে সংঘর্ষ, আহত বিএনপিকর্মীর মৃত্যু’, ‘কুমিল্লায় বালু ব্যবসা নিয়ে যুবদল-বিএনপি সংঘর্ষ, টেঁটাবিদ্ধ ৩০’, ‘শ্যামনগরে বিএনপির দু’পক্ষের সংঘর্ষে জামায়াতকর্মীসহ আহত ১২’, ‘মেহেরপুরে বিএনপির দুই গ্রুপে সংঘর্ষে আহত ২০’, ‘সাইনবোর্ড লাগিয়ে বিএনপি নেতার জমি দখল’- এমন আরও অসংখ্য শিরোনাম খুঁজলে পাওয়া যাবে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে। গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে দলটির নেতাকর্মীরা যেসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছিল, বিএনপি নেতাকর্মীরা ক্ষমতায় না থেকেও সেসব কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন।