এক দেশনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসছে বাংলাদেশ


২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৫:৩৬

॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
দেড় দশক ধরে এক দুঃস্বপ্নের কাল পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ। হাসিনার শাসনকে স্বৈরতন্ত্রী বলি আর ফ্যাসিবাদী- কোনো অভিধাই যথেষ্ট মনে হয় না। কেবলই কি এক ব্যক্তির শাসন? এমনকি এক-দেশনির্ভরতাও চেপে বসেছিল জাতির কাঁধে। অতঃপর সেই দুঃস্বপ্নের সিঁড়ি উল্লঙ্ঘন করে এসেছে জাতি। সেই একক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসছে বাংলাদেশ- এ আশাবাদ প্রকাশ করাই যায়। অন্তত বলা যায়, সেই পথে যাত্রা শুরু করতে পেরেছে বাংলাদেশ।
১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত একদলীয় শাসনব্যবস্থা তার কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে জেঁকে বসেছিল জাতির কাঁধে। ২০০৯ থেকে ২০২৪-এর মধ্য সময় পর্যন্ত দীর্ঘ দেড় দশক দেশে যে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তা থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠাও হয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া-পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করেই। সংবিধানকে শিখণ্ডি করে দেশের সব সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থাগুলোকে আত্মীয়করণ ও দলীয়করণ করে একদল ও একক নেতৃত্বের আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলা হয় জাতিকে। গণতন্ত্রের বিকল্প হিসেবে ‘উন্নয়নতত্ত্ব’ হাজির করা হয়।
শাসনক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য মূলত নির্বাচনব্যবস্থার কথা আমরা জানি। এর বিকল্প হলো গণআন্দোলন। কিন্তু পলাতক সরকার দীর্ঘসময় টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে প্রশাসনের বিভিন্ন সেক্টরে নিরবচ্ছিন্ন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। অন্যদিকে তারা ক্ষমতায় থাকার জন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের অব্যাহত সমর্থন নিশ্চিত করে। জনগণ আরেক একনায়ক এরশাদের বিরুদ্ধে লড়েছে, তবে তখন দেশের অভ্যন্তরে তার এত ক্ষমতা ছিল না।
আওয়ামী একনায়কতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য এমন পথ নেই, যা অবলম্বন করা হয়নি। ২০০৯ থেকে থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত দুঃশাসনের খতিয়ান দেখলেই পাওয়া যাবে। এটি ছিল প্রধানত বিরোধী রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিপক্ষকে জুলুম-নির্যাতন ও দমন-নিপীড়ন করে। এই জুলুমের মাত্রাও ছাড়িয়ে যায়। তথ্যানুয়ায়ী সেসময় ৩ হাজার ৫০০ লোককে অপহরণ ও গুম করা হয়। ৩ হাজার লোককে ক্রসফায়ার তথা বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়। ৬০ থেকে ৭০ লাখ বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীকে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দিয়ে জীবন ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়া হয়। একেকজন নেতার নামে ৩০০ থেকে ৪০০টি পর্যন্ত মামলা দেয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সেসময় কার্যত ‘ভুয়া গণতন্ত্র’ চালু করা হয়। এটি হচ্ছে এমন ব্যবস্থা, যেখানে গণতন্ত্রের কিছু ছিটেফোঁটা থাকে। যেমন নির্দিষ্ট সময় পরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং বিরোধীদলগুলোর জন্য সীমিত পরিসর থাকে। কিন্তু শাসনব্যবস্থার মূল রূপটি হচ্ছে কর্তৃত্ববাদী। এই ভুয়া গণতন্ত্রকে হাইব্রিড রেজিম বা দো-আঁশলা শাসনব্যবস্থাও বলা হয়। দো-আঁশলা শাসনব্যবস্থায় যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন, তারা সংবিধানকে তাদের সুবিধামতো ব্যবহার করেন। নির্বাচনে এমন কায়দায় কারচুপি হয় যে নির্বাচন আর গণতন্ত্রের অংশ না হয়ে ক্ষমতাসীনদের আইনি বৈধতা দেয়ার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এতে এমন প্রক্রিয়ার সূচনা করা হয়, যা ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের মৃত্যু নিশ্চিত করে। তারা দাবি করে যে, এটি একটি ভিন্ন ধরনের গণতন্ত্র। তারা বাকস্বাধীনতা ও সমাবেশের স্বাধীনতা, সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিনিধি বাছাই এবং জবাবদিহির মতো গণতন্ত্রের মৌলিক উপাদানগুলোকে কাটাছেঁড়া করার জন্য অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে নানা উপলক্ষ্য ও বাহানায়।
এই ‘উপলক্ষে’র মধ্যে শীর্ষে ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র অপব্যবহার। এ অপব্যবহার ছিল একটা খেল-তামাশার মতো বিষয়। সরকারের কোনো বিষয়ের বিরোধিতা করলেই নানা তকমা প্রদান করা ছিল সাধারণ বিষয়। যেমন- স্বাধীনতাবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি, রাজাকার, পাকিস্তানপন্থী, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ইত্যাদি। এর সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের একক ভাবমূর্তিকে পুঁজি করে শেখ হাসিনার নামে একটি অপরিবর্তনীয় ‘মিথ’ তৈরি করা হয়। শেখ পরিবারই ছিল রাজনীতির শেষ কথা, শেখ হাসিনা ছিলেন একমাত্র ও একচ্ছত্র নীতিনির্ধারক। শেখ পরিবারের যেকোনো সদস্যকে নিয়ে কোনো বিরুদ্ধ উক্তি ছিল অকল্পনীয় বিষয়। আর এভাবেই দেড় দশকের একটি একপেশে ও একচ্ছত্র ‘ধারণা’ জাতিকে গলধঃকরণের সকল প্রকার উপায়-পন্থা অবলম্বন করা হয়। অতঃপর ৫ আগস্টের জনতার এক মহাঘূর্ণি এর সবকিছু তছনছ করে দেয়। এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে মৌলিক ক্ষেত্রগুলোয় সংস্কার সাধন করতে যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, তাতে অবস্থার যথেষ্ট পরিবর্তন ঘটবে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষত সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচনব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করতে গৃহীত উদ্যোগসমূহ দেশকে একনায়কতন্ত্র ও স্বেচ্ছাচারিতা থেকে মুক্ত রাখতে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়। এর পক্ষে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার।
ভারতনির্ভরতা
দেশের অভ্যন্তরে যেমন একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়, তেমনি এক দেশনির্ভরতাও ছিল বিগত দেড় দশকের বহুল আলোচিত বিষয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের একটি পাতাও যেন নড়তো না প্রতিবেশী ভারতের অঙ্গুলি নির্দেশ ছাড়া। প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতিও গড়ে তোলা হয় ভারতকেন্দ্রিক। যে কারণে ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর ভারত যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে।
বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থায় ভারতের হস্তক্ষেপ একটা প্রকাশ্য ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। ভারতীয় রাষ্ট্রপতি থাকাকালে প্রণব মুখার্জি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার বন্দোবস্ত করেন। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের ক্ষমতায় কে থাকবে আর কে বিরোধীদলে থাকবে, তাও নির্ধারণ করে দিতো ভারতের শাসকরা। ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং এরকম একটি বন্দোবস্ত করতে ঢাকায় আসার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছিল প্রকাশ্যে আলোচনার বিষয়।
এভাবে প্রায় প্রতিটি ইস্যুতেই ভারতের হস্তক্ষেপ এবং তাদের ওপর নির্ভরতা কোনো রাখঢাকের ব্যাপার ছিল না। দূর অতীতে সাধারণভাবে দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে সহযোগিতার জন্য দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ করতো ঢাকা। কিন্তু হাসিনা রেজিমে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, কিন্তু অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়েও দিল্লির কাছে সাহায্য চাইতে থাকে বাংলাদেশ। যেমন র‌্যাবের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হলে সেটি প্রত্যাহারের জন্য সাহায্য চায় আ’লীগ সরকার। এছাড়া রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস ক্রয়ের জন্য ভারতের পরামর্শ চায় বাংলাদেশ। অথচ এগুলো নেহাতই দ্বিপাক্ষিক বিষয়। তাছাড়া ভারতকে এর সঙ্গে জড়ালে সেটি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছেও অবমাননাকর ঠেকতে পারে। তারা অস্বস্তিবোধ করতে পারে।
বাংলাদেশের আওয়ামী শাসকগোষ্ঠী এতটাই ভারতকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে যে, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গর্ব করে বলতে থাকেন, “ভারতকে যা দিয়েছি, তা তারা চিরদিন মনে রাখবে।” বিশ্লেষকদের মতে, এর অর্থ হলো ভারতকে এমন সব কিছু এবং এমন পরিমাণ দেয়া হয়েছে যে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তারা চিরদিনের জন্য আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

ভারতনির্ভরতা এড়াতে
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতনির্ভরতা এড়াতে বাংলাদেশ নানা বিকল্পের সন্ধান করে চলেছে বলে দেখা যাচ্ছে। আধুনিক বিশ্বে কোনো দেশই যেমন স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, তেমনি একটি দেশের ওপর নির্ভরতাও কূটনৈতিক সার্বভৌমত্বের জন্য যুক্তিপূর্ণ নয়। টিকে থাকার প্রয়োজনে এক দেশ অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল। নিজেদের স্বার্থে দেশগুলো জোটও গঠন করে। এর পেছনে থাকে বাণিজ্য ও রাজনীতি এবং নিরাপত্তা। সে কারণে বৈদেশিক বিভিন্ন ঋণ, বিনিয়োগ ও সহযোগিতা আসে।
ভাষ্যকারদের মতে, ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশ এখন বড় ফ্যাক্টর। একদিকে চীন-রাশিয়া; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বাংলাদেশ নিয়ে কঠিন হিসাব-নিকাশে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের প্রধান শক্তিধর দেশগুলোর নজর এখন ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে। এ অঞ্চলে বাংলাদেশের যথেষ্ট কদর রয়েছে। শুরু থেকেই ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর কৌশল (আইপিএস) নিয়ে অনেক দেশ বাংলাদেশকে কাছে টানতে চাইছে। যদিও চীনকে ঠেকাতে আইপিএস গঠন করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, চীনকে ঠেকাতে ২০০৭ সালে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতকে নিয়ে অনানুষ্ঠানিক কৌশলগত সামরিক জোট ‘কোয়াড’ গঠন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কোয়াডের পর যুক্তরাষ্ট্র গঠন করে ‘অকাস’ নামের আরেকটি জোট। চীনবিরোধী এসব জোটে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায় তারা। এজন্য বাংলাদেশকে কিছু চাপের মধ্যে পড়তে হয়।
নিজস্ব বাণিজ্য ও কূটনৈতিক এলাকা সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ডানা সম্প্রসারিত করেছে বলে প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে এত দিন সরাসরি কোনো কনটেইনার জাহাজসেবা ছিল না। দুই দেশের বাণিজ্যও ছিল বিলিয়ন ডলারের কম। তবে সরকারের পটপরিবর্তনের পর পাকিস্তানের করাচি বন্দরের সঙ্গে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার জাহাজ পরিষেবা চালু হয়। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরাসরি জাহাজ পরিষেবা পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক বাড়ানোর একটি বড় পদক্ষেপ। গত অর্থবছরে পাকিস্তান থেকে মোট আমদানি পণ্যের পরিমাণ ছিল ১৬ লাখ টন, এর মধ্যে কনটেইনারে আনা হয়- এমন পণ্যের পরিমাণ ছিল তিন লাখ টনের কম। ব্যবসায়ীরা জানান, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি শিথিল করা হয়েছে। আগে দেশটির পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করা হতো। গত ২৯ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনে এনবিআর তা তুলে নিয়েছে। তাতে সামনে আমদানি বাড়তে পারে, এমন আশায় নতুন এ সেবা চালু হয়েছে।এদিকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করেছে নিকট প্রতিবেশী নেপাল। এর মাধ্যমে ভারতের পর দ্বিতীয় কোনো দেশে প্রথমবারের মতো বিদ্যুৎ রপ্তানি করল হিমালয়ের দেশটি। ১৫ নভেম্বর ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী ভারত হয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠায় নেপাল। এদিন দেশটির রাজধানী কাঠমান্ডুতে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের পর বিদ্যুৎ রপ্তানি শুরু হয়। এছাড়া ভারতনির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশের আসিয়ানের সদস্য হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, তাও যাচাই করে দেখা হচ্ছে। ভারতের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পররাষ্ট্রনীতিকে বৈচিত্র্যময় করতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক জোট আসিয়ানে যোগ দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ বরাবরই আগ্রহী। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও সম্প্রতি আসিয়ানের সদস্য হতে মালয়েশিয়ার সমর্থন চেয়েছেন। একই সঙ্গে সার্ককে সচল করার বিষয়টিও সামনে এসেছে। কবে ভারত এতে কতটা আগ্রহী হবে, সেটিও ভাবনার বিষয়।