হামলা, হত্যাকাণ্ড ও উত্তেজনা সৃষ্টি ফ্যাসিবাদেরই অপকৌশল : উদ্বিগ্ন সাধারণ জনগণ : অস্থিরতা নিরসনে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ
২৯ নভেম্বর ২০২৪ ০০:০০
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
হঠাৎ করে পরিবেশটা যেন একটু বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠল। দেশে পরপর বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটল। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে এসব ঘটনা ঘটেছে। সমাজে কিছু কিছু ঘটনা আছে, যেগুলোয় অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও মানসিকভাবে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। আবার কিছু কিছু ঘটনা আছে, যেসব ঘটনায় পুরো দেশই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। যেমন চট্টগামে আদালত চত্বরে কুপিয়ে আইনজীবীকে হত্যা, পুরান ঢাকায় ছাত্রদের তাণ্ডব, কলেজ ভাঙচুর ও কলেজে লুটপাট, কাওরান বাজারে দুটি পত্রিকা অফিসের সামনে জমায়েত, গরু জবাই, তারপর পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে তাদের ছত্রভঙ্গ। লাখ লাখ টাকার ঋণ দেয়ার নামে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষকে ঢাকায় জড়ো করা। ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধে আদালতের একটি রায়ের প্রতিক্রিয়ায় রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ। এসব ঘটনা কিন্তু সংঘটিত হয়েছে দেশের কেন্দ্রস্থল রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করেই। এগুলো গোপনে হয়নি বা গোপন ষড়যন্ত্র, তাও বলা যাবে না। বরং প্রকাশ্যেই এসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। আর কোনো কোনো ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সেসব ঘটনা দীর্ঘসময় ধরে পরিকল্পনা করেই ঘটানো হয়েছে। এসব হামলা, হত্যাকাণ্ড ও উত্তেজনা তৈরি ফ্যাসিবাদেরই নয়া অপকৌশল। সরকারের পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হয়েছে, দেশে বিভিন্ন পক্ষ থেকে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চলছে। অবশ্য সরকারের উপদেষ্টারা সবাইকে কোনোরকম উসকানিতে সাড়া না দিয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, ষড়যন্ত্রকারীদের সকল অপচেষ্টা দমনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার পর গণঅভ্যুত্থানের নেতারা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম, সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া তাদের নিজ নিজ ভেরিফায়েড ফেসবুকে জনগণকে কোনো উসকানিতে সাড়া না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আইনজীবীর হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন।
উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, ‘গণঅভ্যুত্থান ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শান্ত থাকুন। নিরীহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। সরকার দ্রুতই সব রাষ্ট্রদ্রোহী ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।’
আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন ঠেকাতে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় চলমান অস্থিরতা নিরসনের লক্ষ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে ‘জাতীয় ছাত্র সংহতি সপ্তাহ’ পালনের ঘোষণা দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ। গত ২৫ নভেম্বর সোমবার রাতে রাজধানীর বাংলামটরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জরুরি বৈঠক শেষে এ ঘোষণা দেন তিনি।
উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেছেন, ‘রাষ্ট্রদ্রোহ এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। সবাইকে ধৈর্য ধারণ করা এবং কোনো প্রকার উসকানিতে সাড়া না দেওয়ার আহ্বান রইল।’
অন্তর্র্বর্তী সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম বলেছেন, দেশে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। সেটি না হলে একদিনে এতগুলো ঘটনা কোনোভাবেই কাকতালীয় নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। গত ২৫ নভেম্বর সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে নাহিদ এসব কথা বলেন। ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের দুর্বলতা স্বীকার করে সকলকে সভা-সমাবেশে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি বর্জন করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ঐক্যের আহ্বান জানান নাহিদ। তিনি বলেন, অনেকগুলো ঘটনা আজ ঘটেছে। এর মধ্যে দেখা গেছে, ভোররাত থেকে ঢাকায় বাস, মাইক্রোবাসে করে কিছু সাধারণ মানুষকে নিয়ে আসা হয়েছে ঋণ দেয়ার নাম করে। অহিংস গণঅভ্যুত্থানের নামে একটি প্ল্যাটফরম পুরো মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে মানুষকে নিয়ে এসেছে। ওই প্ল্যাটফরমের আহ্বায়ককে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা চলছে। বড় কোনো পরিকল্পনা না থাকলে একদিনে এতগুলো ঘটনা কাকতালীয় নয়। আমরা মনে করছি, এখানে নানা পক্ষের পরিকল্পনা আছে। সরকার সফলভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম করুকÑ এটা হয়তো অনেকেই চাইছে না। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার নানাভাবে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
দেশের জাতীয় গণমাধ্যমসহ সামাজিকমাধ্যমগুলোর খবরে জানা গেছে যে, সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ ও মাহবুবুর রহমান কলেজের ছাত্রদের ঘটনাও কিন্তু কয়েকদিন ধরে চলেছে। ঘটনার সূচনা হয়েছে ভুল চিকিৎসায় পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে অভিজিৎ হাওলাদার নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। গত ২৪ নভেম্বর রোববার পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালান ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীরা। এরপর গত ২৫ নভেম্বর সোমবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে হামলা ও ভাঙচুর চালানোর ঘটনা ঘটে। এ সময় কলেজটির বিভিন্ন সামগ্রী ও সরঞ্জাম নিয়ে যান হামলাকারী শিক্ষার্থীরা। এদিন দুপুর ১২টার দিকে সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল সরকারি কলেজের শত শত শিক্ষার্থী গিয়ে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে হামলা চালান। এ সময় ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনতা এবং সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ চলে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগের দিনের হামলার জেরে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে হামলা চালানো হয়। অভিজিৎ মারা যায় ১৮ নভেম্বর, তারপর থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত বেশ কয়েকটি কলেজের ছাত্রদের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা সংঘর্ষ ও ভাঙচুর চলে। এক সপ্তাহের অধিক সময় ধরে চলা এ সংঘর্ষ থামাতে পুলিশ প্রশাসন ও সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কার্যকর কোনো উদ্যোগ ছিল বলে মনে হয় না। এ ঘটনার সাথে সরকারের তিনটি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট, সেগুলো হচ্ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র। একজন শিক্ষার্থী মারা যাওয়ার পর যখন তার সহপাঠিরা বিক্ষুব্ধ হয়ে মেডিকেল কলেজে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করতে গেছে, তখনই উচিত ছিল পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এটা করতে পারলে কয়েকদিন ধরে এ তুলকালাম কাণ্ড ঘটতে পারতো। আটদিন পর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী একটা বাণী দিয়েছেন যে, সরকার কঠোর হতে চায় না, শান্তিপ্রিয় সমাধান চায়। গত ২৬ নভেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে জেলার তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরের বাঁধ পরিদর্শন শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি নিয়ে রাস্তা অবরোধ না করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসেও ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারে। কিংবা আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারে। আমরা চাই শান্তিপ্রিয় সমাধান। আমরা কোনোভাবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে কঠোর হতে চাই না। কিন্তু উনি কি পুরান ঢাকার কলেজ ছাত্রদের যে সংঘাত চলল বেশ কয়েকদিন ধরে তার কি শান্তিপ্রিয় সমাধান করতে পেরেছেন। উনার এবং উনার নেতৃত্বে একটি বড় বাহিনীর প্রায় নিষ্ক্রিয় ভূমিকার কারণে রাজধানীর একটি বড় এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সংখ্যা এখন ২৪। এ উপদেষ্টা পরিষদ গত ৮ আগস্ট রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। প্রথমে এ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র ১৬, পরে আরো চারজন, সর্বশেষ আরো তিনজনকে নিয়ে প্রধান উপদেষ্টাসহ ২৪ জনে পৌঁছেছে। ১৭ কোটি জনসংখ্যার এত বড় একটি দেশে ২৪ উপদেষ্টার পক্ষে রাষ্ট্র পরিচালনা করা কঠিনই বটে। যারা দেশ ও জাতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন তাদেরও মতামত হচ্ছে এত বড় জনসংখ্যার দেশে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সংখ্যা আরো বাড়ানো দরকার। প্রধান উপদেষ্টা তার অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সংখ্যা কেন বাড়াচ্ছেন না, তার কোনো ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না। তাদের মধ্যে কোনো হীনম্মন্যতা কাজ করছে কিনা, জানা যায়নি। দেশে একটি আবহ তৈরির চেষ্টা চলছে যে এ অন্তর্বর্তী সরকারের তো কোনো ম্যান্ডেট নেই। এটার কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে একটি দুর্বলতা কাজ করতে পারে। কিন্তু তাদের এ নিয়ে কোনো দুর্বলতা বা হীনম্মন্যতায় ভোগার দরকার নেই। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেই এ অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। ৫ আগস্ট দেশের লাখকোটি মানুষ গ্রাম থেকে শুরু করে রাজপথে নেমে দুটি ম্যান্ডেট দিয়েছে। তারা প্রথমত চেয়েছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার সরকারের পদত্যাগ আর পদত্যাগ পরবর্তীতে একটি জনগণের সরকার গঠন। বাংলাদেশের জনগণ ঐদিনই অন্তর্বর্তী সরকারকে ম্যান্ডেট দিয়ে দিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানই এ সরকারের জন্য বড় ম্যান্ডেট ও বৈধতা।
একটি সরকারকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যেমন গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ম্যান্ডেট দেয়া যায়, তেমনি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেও জনগণ একটি সরকারকে ম্যান্ডেট দিতে পারে। ম্যান্ডেট মানেই তো জনগণের সমর্থন অর্থাৎ জনগণ আগামীতে কী ধরনের এবং কাদেরকে সরকারে দেখতে চায়। নির্বাচনে গোপন ভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের আগামী দিনের সরকারের কারা থাকবে, তাদেরই বেছে নেয়। তেমনিভাবে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেও বাংলাদেশের আপামর জনগণ আগামী দিনের জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকেই বেছে নিয়েছে। তাই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের ম্যান্ডেট রয়েছে এবং এটা এদেশের জনগণেরই সরকার।
সরকারের প্রতি জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে, এটা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের কোনোরকম দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই। তবে সরকারের উপদেষ্টাদের দায়িত্ব কর্তব্য পালনের বিষয়ে সাধারণ জনগণ সন্তুষ্ট নয় বলেই জনশ্রুতি রয়েছে। উপদেষ্টারা কিন্তু তাদের শপথে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছেন যে, সরকারের উপদেষ্টা পদের কর্তব্য বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করবেন। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
রাষ্ট্র ও সরকারকে যারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, তাদের অভিমত হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার ভালোভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারছে না। তাদের সফলতার মাত্রা কাক্সিক্ষত পর্যায়ে না। সরকারের একজন উপদেষ্টা সাংবাদিক সম্মেলনেই স্বীকার করছেন সরকার সফলভাবে প্রশাসন পরিচালনা করুক এটা অনেকেই চায়না। আর এ না চাওয়াটা স্বাভাবিক কারণ এ অন্তর্বর্তী সরকারেরও বিরোধী শক্তি আছে যারা চায় না সরকার সফল হোক।
অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে যারা বেশ সক্রিয়, তাদের মধ্যে আসিফ নজরুল একজন। বলা যায় অগ্রগণ্য। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক। তাকে যেসব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের কাজের ধরনের সঙ্গে তিনি আগেই কিছুটা পরিচিত। গত ১২ নভেম্বর মঙ্গলবার ‘অন্তর্র্বর্তী সরকারের ১০০ দিন: আইন মন্ত্রণালয়ের কৈফিয়ত’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে আইন মন্ত্রণালয়ের বিগত ১০০ দিনের কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন আইন উপদেষ্টা।
আইন উপদেষ্টার কাছে প্রশ্ন ছিল আপনি আপনার কাজের জন্য ১০-এর মধ্যে কত নম্বর দেবেন? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন ৪ নম্বর। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার অভিজ্ঞতার হয়তো ঘাটতি আছে বা যোগ্যতারও হয়তো ঘাটতি আছে। কিন্তু বার বার একটা কথা বলেন, সেটা হলো, তার প্রচেষ্টার ঘাটতি নেই।
এ ব্যাপারে প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক কবি সোহরাব হাসান লিখেছেন, উপদেষ্টা হিসেবে আসিফ নজরুলের কাজ বেশ দৃশ্যমান। আরও কয়েকজন উপদেষ্টার কাজও দৃশ্যমান। তাদের নম্বরও চারের নিচে হবে না। কেউ কেউ পাঁচ-ছয়ও পেতে পারেন। কিন্তু যাদের কাজ একেবারেই দৃশ্যমান নয়, যাদের মন্ত্রণালয়ে কোনো সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না, তারা কত পাবেন? কয়েক দিন আগে খবরে পড়েছিলাম প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস সব উপদেষ্টার কাজের হিসাব চেয়েছেন। তিনি সবার কাজের হিসাব পেয়েছেন কি না, জানি না। পেলে তিনি কাকে কত নম্বর দিয়েছেন?
যারা উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তাদের অধিকাংশই সাবেক আমলা, সামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষক ও এনজিও প্রতিনিধি। রাজনৈতিক কোনো নেতা নেই। রাজনৈতিক নেতাদের জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ থাকে এবং তারা জনগণের মতটাও ধারন করেন। আর এ যোগাযোগ থাকার কারণে তারা সাধারণ জনগণের নার্ভ যেমন বুঝেন এবং সে অনুযায়ী মতামত গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু এখানে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সাথে সাধারণ জনগণের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ না থাকার কারণে তারা সরাসরি জনগণের মতামত যেমন পাচ্ছেনণ না, তেমনিভাবে নার্ভও বুঝতে পারছেন না। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হলে জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগের একটি মাধ্যম খুঁজতে হবে এবং জনগণের বর্তমান মতামতকে জানতে হবে।
তবে সব শেষে খুবই জরুরি হচ্ছে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের জাতির এ ক্রান্তিলগ্নে রাষ্ট্র পরিচালনায় আরো বেশি সময় ও শ্রম মেধাকে নিয়োগ করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সততা ও মেধা নিয়ে সাধারণ জনগণের তেমন প্রশ্ন নেই। কিন্তু তাদের সরকারের কাজে তাদের আত্মনিয়োগ; বিশেষ করে তাদের নিজস্ব মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর কাজের তদারকি ও গতি নিয়ে জনগণ সন্তুষ্ট নয় বলে জনমতে প্রতিফলিত হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি রাষ্ট্রের কর্ণধার তথা উপদেষ্টাদের শুধুমাত্র সচিবালয়ের অফিস কক্ষে বসে মন্ত্রণালয় চালানো সম্ভব হবে না। তাদের সময়ে সময়ে ময়দানে প্রত্যক্ষভাবে যেতে হবে এবং কোনো কোনো সমস্যার তাৎক্ষণিক সমধানে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু অতি সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেসব সংকট সমাধানে উপদেষ্টাদের কাউকেই ঘটনাস্থলে উপস্থিতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। মুসলিম আমলে খলিফাদের থেকে শুরু করে ইউরোপ আমেরিকার অনেক রাষ্ট্রনেতাদের জনগণের কাছে পৌঁছে সমস্যা অবহিত হওয়ার পাশাপাশি সমাধানের অনেক নজীর রয়েছে। পনেরো বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানের ফসল আজকের উপদেষ্টা পরিষদ। তারা দেশ ও জাতির স্বার্থে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে- এটাই সকলের প্রত্যাশা।