রহমানের বান্দার পরিচয়- শেষ পর্ব : পবিত্রতা রক্ষাকারী মুমিনরাই নিশ্চিত সফলকাম
২২ নভেম্বর ২০২৪ ১২:০০
ড. মুফতি খলিলুর রহমান মাদানী : সফল মুমিনের ধারাবাহিক আলোচনায় এ পর্বে সূরা আল-মুমিনুনের ৫ থেকে ৭নং আয়াতের আলোকে ‘লজ্জাস্থানের হেফাজত করার মাধ্যমে শারীরিক পবিত্রতা রক্ষাকারী মুমিনরাই নিশ্চিত সফলকাম’ মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। লজ্জাস্থানের হেফাজত করা, সতীত্ব রক্ষা করা, নিজের ইজ্জতকে সংরক্ষণ করা মানুষের মৌলিক মানবীয় গুণাবলির অন্যতম গুণ। সাচ্চা ঈমানদার তো বটেই বরং অমুসলিম সম্প্রদায়ের নিকটও এটা মৌলিক মানবীয় ও নৈতিক গুণাবলির অন্যতম। লজ্জাস্থানের হেফাজত রেখে সতীত্ব বজায় রাখার মাধ্যমেই মানবসভ্যতার কৃতিত্ব প্রকাশ পায়। অপরদিকে মানুষ ও পশুর মাঝে মানবিকতা ও পাশবিকতার সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্মিত হয় এর হেফাজতের মাধ্যমে। অবাধ-খোলামেলা যৌনাচার পশুর স্বভাব। অপরদিকে সাধারণভাবে মানুষ এবং বিশেষভাবে সাচ্চা দীনদার-ঈমানদার সফল মুমিন নিজের সতীত্ব বজায় রাখে। যৌনাঙ্গকে আল্লাহ নির্ধারিত পন্থা ব্যতিরেকে পরিপূর্ণভাবে হেফাজত করে থাকে।
‘ফারজ’ হেফাজতের ব্যাখ্যা: পবিত্র কুরআন মজিদে সূরা মুমিনুলের ৫ থেকে ৭নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘নিশ্চিত সফলকাম ঈমানদার তারাই, যারা নিজের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তবে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী কিংবা (পুরুষদের বেলায়) নিজেদের অধিকারভুক্ত দাসীদের ওপর (এ বিধান প্রযোজ্য) নয়, কখনো তারা তিরস্কৃত হবে না। অতঃপর এ (বিধিবদ্ধ উপায়) ছাড়া কেউ যদি অন্য কোনো (পন্থায় কামনা চরিতার্থ করতে চায়, তাহলে তারা হবে সীমালঙ্ঘনকারী।’ আলোচ্য আয়াতের বিভিন্ন তাফসির ও ব্যাখ্যা প্রাচীনকালে ও আধুনিককালে বিভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এক তাফসিরে উল্লেখ করা হয়েছে, “সফলকাম ঈমানদারগণ নিজেদের লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে। তারা তাদের লজ্জাস্থানসমূহকে নিজেদের স্ত্রী ও অধীনস্থ দাসি ব্যতীত অন্যকোনো পন্থায় যৌনাচার করে না। অতএব কেউ যদি তার স্বামী অথবা স্ত্রীর অথবা পুরুষরা অধীনস্থ দাসীর সাথে যৌনাঙ্গের হেফাজত না করে, তাহলে তিনি তিরস্কৃত ও গুনাহগার হবেন না”। (তাফসিরে তবারি ৯/৫৮৬)।
ইমাম ইবনে কাসির বলেন, ‘সাচ্চা মুমিনগণ তাদের লজ্জাস্থানকে সকল ধরনের হারাম যৌনাচার থেকে হেফাজত করে। অতএব কোনো ঈমানদার আল্লাহ তায়ালার নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী ব্যভিচারে লিপ্ত হবে না সমকামিতায় লিপ্ত হবে না, স্বামী-স্ত্রী ব্যতিরেকে অন্য কোনো পন্থায় যৌনাচারের ধারে কাছেও যাবে না।” (তাফসিরে ইবন কাসির ৩/১০৫) ।
ইমাম শাফেয়ী র. বলেন, “আলোচ্য আয়াত দ্বারা কন্ট্রাক্ট বিবাহ বা নিকাহ মুতআ, সমকামিতা, (নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য) ট্রান্সজেন্ডার, হস্তমৈথুন ইত্যাদি সবই হারাম ঘোষিত হয়েছে।” (তাফসির ফি জিলালিল কুরআন)।
মূলত মানবসভ্যতার বিকাশ সাধন ও মনুষ্যত্ব্যের প্রকাশ, পরিচ্ছন্ন-নিষ্কলুষ পন্থায় বংশবিস্তারের বৈধ সুযোগ স্বামী-স্ত্রীর স্বভাবজাত মেলামেশার মাধ্যমে। যাতে প্রত্যেক শিশু তার পিতৃ পরিচয় পেয়ে যায়। এটা পাশবিকতা ও পশুস্বভাবের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণ স্ত্রীপশুর সাথে পুরুষপশুর মিলনের কারণে যে বংশ সৃষ্টি হয় তার বংশপরিচয়, কোথা থেকে এলো, কীভাবে হলো, কোনো কিছুই নির্দিষ্ট থাকে না। এ কারণেই পবিত্র কুরআন মজিদে যৌনসম্ভোগের জন্য পরিচ্ছন্ন পন্থা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ দিয়েছেন এই বলে ‘স্বামী-স্ত্রী পরস্পর পরস্পরের সাথে লজ্জাস্থান হেফাজতকারী।’ (সূরা আল-মুমিনুন : ৫)। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মধুর সম্পর্ক ও মিলনের ব্যাপারে ইসলামী শরিয়তে অনুমোদন দেয়া হয়েছে এবং ভালো কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বৈবাহিক সম্পর্ককে উৎসাহিত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। বরং এটা ভালো কাজ, প্রচলিত ও শুদ্ধ, প্রশংসিত একটি সামাজিক, সুন্দর, শরিয়ত সমর্থিত বন্ধন। নারী মহান আল্লাহ তায়ালার এক অপরূপ সৃষ্টি। যাকে সৃষ্টি না করলে পুরুষ পূর্ণতাই পেত না। কুরআন মজিদে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং উক্ত নফস থেকে তার জোড়া তথা স্ত্রী সৃষ্টি করা হয়েছে। এবং স্বামী-স্ত্রী উভয় থেকে অসংখ্য পুরুষ এবং নারী সৃষ্টি হয়েছে।’ -সূরা নিসা : ১।
বৈবাহিক বন্ধনের সুফল এবং এর মাধ্যমে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আল্লাহ তায়ালা সফল ঈমানদারদের গুণাবলি ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করার একপর্যায়ে প্রাসঙ্গিকভাবে ‘লজ্জাস্থানের হেফাজতের’ কথা উল্লেখ করেছেন, এটা দ্বারা প্রচলিত বিভ্রান্তি দূর করা হয়েছে। কারণ সারা দুনিয়ায় পূর্বেও মনে করা হতো এবং বর্তমান যুগেও বহু লোক এ বিভ্রান্তিতে ভুগছে যে, কামশক্তি, যৌনমিলন মূলত একটি খারাপ জিনিস। বৈধ পথে হলেও তার চাহিদা পূরণ করা আল্লাহওয়ালা লোকদের জন্য মানানসই নয় এবং এ ভুল চিন্তাও অনেকের মনে বদ্ধমূল রয়েছে আল্লাহওয়ালারা, সন্ন্যাসী, যোগী এবং বিয়েশাদী ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকবে। এসব অবাস্তব উদ্ভট, কুচিন্তামুক্ত করার জন্য মানুষকে প্রাসঙ্গিক বাক্য বাড়িয়ে আল্লাহ তায়ালা এ সত্যটি সুস্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, “বৈধ স্থানে নিজের প্রবৃত্তি, কামনা পূর্ণ করা কোনোভাবেই নিন্দনীয় নয়। তবে কাম প্রবৃত্তির লালসা চরিতার্থ করার জন্য বৈধপথ এড়িয়ে অন্যপথে চলা অবশ্যই গুনাহের কাজ।”
আল্লাহ তায়ালা স্বীকৃত নারী-পুরুষের বৈধ সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠিত করা, মানবসভ্যতায় বৈবাহিক জীবনকে উৎসাহিত করা আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের জন্য খুবই জরুরি। অন্যথায় ট্রান্সজেন্ডার, এলজিবিটিসহ নানামুখী গোপন পদ্ধতি, কুসংস্কার ও কুপ্রবৃত্তির ব্যাপক প্রসার ঘটবে, যা একটি সুশীল, শান্ত, পরিশোধিত, পরিমার্জিত সমাজকে রসাতলে দেবে। বিভিন্ন পদ্ধতি ও পন্থায় অবৈধ যৌনাচার মহামারি আকার ধারণ করবে। এভাবে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা নারীকে মাতা-কন্যা-বধূ বানিয়ে মহাসম্মানিত করেছেন। এ মূল্যবান জিনিস অযত্ন করতে নেই।
ফেমিনিস্ট কী যারা আসল অর্থ না বুঝেই নারী অধিকার, অধিকার বলে চিৎকার করে, তাদের জায়গাটা ঠিক কোথায়, সেটাও গভীরভাবে পর্যালোচনা ও গবেষণার দাবিদার।
আবার বিভিন্ন মজলিসে নারীদের স্বাভাবিক কিছু প্রসেস নিয়ে যখন আরেকজন নারী ঠাট্টা করে, কটাক্ষ করে বক্তব্য রাখে, তখন তার জন্য ও আফসোস লাগে! কারণ তাদের এসব নেগেটিভ প্রচারণার কারণেই ভিন্ন পন্থায় বিকৃত যৌনাচারের পরিবেশ তৈরি হয় এবং পর্যায়ক্রমে এটা মহামারি আকার ধারণ করে। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে তো বটেই, বরং কদিন আগেও আমাদের দেশে বিকৃত যৌনাচার এবং ধর্ষণ মহামারি আকার ধারণ করেছিল। অনেকে আবার শৃঙ্খলা বিনষ্ট করতে পুরুষের বেশ-ভূষা ধারণ করে সমাজে অনাচার ও সুড়সুড়ি ছড়ায়। তারা যে নারী, নারীর মতো থাকলেই সে নিরাপদে থাকবে, সমাজ পরিবেশ সঠিক অর্থে রক্ষা পাবে। পুরুষ হতে যাওয়ায় কি সার্থকতা। পুরুষের পোশাক পরে নারীর কি মজা? জেন্ডার নারী কিন্তু বাকি চলন সব পুরুষের। তাহলে একে ঠিক কী বলা যায়? মহানবী সা. এ ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবেই হুঁশিয়ারি করে দিয়েছেন যে, ‘আল্লাহ তায়ালা এবং রাসূলুল্লাহ সা. অভিশপ্ত করেছেন ওইসব পুরুষকে, যারা নারীদের বেশ-ভূষায় সজ্জিত হয়, অভিশপ্ত করেছেন ওইসব নারীকে, যারা পুরুষের বেশ-ভূষায় সজ্জিত হয়। (তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, মুসনাদ ৪/২৩০)।
বুখারী মুসলিম শরীফের অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, ‘শেষ জামানায় এমন একশ্রেণির নারীর প্রকাশ ঘটবে, যারা উলঙ্গ বাহার পোশাক পরবেন, অর্থাৎ পোশাক পরলেও উলঙ্গপনা-সতর দেখা যাবে। তাদের উদ্দেশ্য হলো পরপুরুষকে তার প্রতি আকৃষ্ট করা অথবা নিজে পরপুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া। তাদের মাথায় থাকবে উটের ঝুঁটির মতো। এসব নারীরা কখনোই জান্নাতের যেতে পারবে না জান্নাতের সুঘ্রাণও তারা পাবে না।’ সিলসিলা সাহিহাহ ২/৩৬০)।
সবসময় সর্বদা আমরা সেই নারীদের শ্রদ্ধা জানাই, যারা নারী হওয়ার প্রকৃত উদাহরণ। যাদের সকাল হয় আল্লাহকে স্মরণের মধ্য দিয়ে। যাদের দায়িত্বে একটা সুখী-সমৃদ্ধ পবিত্র পরিবার নির্মাণ হয়। যাদের পারফেক্ট নার্সিংয়ে একটা আগামী ভবিষ্যৎ তৈরি হয়। যারা স্বামী-সন্তানের জন্য উত্তম বন্ধু। যাদের পোশাকে থাকে শালীনতা, কথায় থাকে বিনয়ী মনোভাব, চোখে থাকে এক আকাশ স্বপ্ন, যারা তাদের প্রতি সংযত। যারা মমতাময়ী, চেহারায় থাকে অজস্র মায়া। ক্লান্তি যেন তাদের অধরা। এ সুশীল সমাজ যাদের কাছে ঋণী। প্রকৃত মাতৃত্ব যারা লালন করে। আদর্শ নারীরা বধূ রূপের মধুর প্রেমের বন্ধু। আল্লাহর রহমতে সন্তান সংসার সামলে পৃথিবীতে নিজের মর্যাদার আসন করে নেয়।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সফলকাম মুমিন হিসেবে কবুল করুন আমীন।
লেখক : প্রবন্ধকার, কলামিস্ট, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। ‘ওয়ার্ল্ড মুসলিম স্কলার্স ফোরাম’-কাতারের নির্বাহী সদস্য।