প্রসঙ্গ : গণভোট, জনগণ ও সংসদের সার্বভৌমত্ব
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫১
॥ ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম ॥
হাজার হাজার শহীদের রক্ত আর কোটি কোটি বিপ্লবী ছাত্র-জনতার ত্যাগের ফসল ৩৬ জুলাই বিপ্লব। এ বিপ্লবের ফসল ছিলো ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ সরকারের সফলতা-বিফলতার মূল্যায়ন এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। এ কথা কারো অজানা নয়, অন্তর্বর্তী সরকার একটি কঠিন সময়ে দায়িত্ব নিয়েছিলো। ফ্যাসিস্টবিরোধী প্রতিটি মানুষ, নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক দল সরকারের কাজে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কাজগুলো বাস্তবায়নের ওয়াদা করে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে অবস্থান ঘোষণা করে প্রচার চালিয়েছে। কিন্তু ফলাফল কারচুপি করে বিজয়ী হওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত বিএনপি সরকার গঠনের পরই আশি ডিগ্রি ঘুরে গেছে। তারা জনগণকে দেয়া ওয়াদা বেমালুম ভুলে গিয়ে পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পদাঙ্ক অনুসরণ করা শুরু করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ গত ১২ এপ্রিল থেকে কার্যকারিতা হারিয়েছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর বৈধতা থাকছে না। এর মধ্যে সাতটি অধ্যাদেশ চারটি বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে। বাকি ১৩টি অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার পর সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে সেগুলো অনুমোদিত না হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে আছে গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং রেফারেন্স ও পুলিশ কমিশন গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো।
সবগুলো অধ্যাদেশ পাস করতে না পারায় সরকারের বিরুদ্ধে ঐকমত্য কমিশনে দেয়া ওয়াদা ভঙ্গের অভিযোগ করেছে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটসহ ফ্যাসিস্টবিরোধী সকল শক্তি। গত ১০ এপ্রিল শুক্রবারের অধিবেশন থেকে তারা ওয়াকআউট করে।
অধ্যাদেশগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, এটি ‘ফ্যাসিবাদকে পুনর্জন্ম দেবে’ এবং এর দায় কোনোভাবে বিরোধীদল নেবে না। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদকে জানান যে, অধ্যাদেশের বিষয়ে তিনটি পথ খোলা থাকে।
ওয়াকআউটের আগে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদীয় বিশেষ কমিটি এবং উপদেষ্টা কমিটিÑ উভয়ই ১৩৩টি অধ্যাদেশ অনুমোদনের বিষয়ে একমত হয়েছিল। কিন্তু আমরা অনেক বিল দেখতে পাচ্ছি না। গুম, পুলিশ কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো নিয়ে আমাদের উদ্বেগ রয়েছে। আমরা বাকি অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাই। সব অধ্যাদেশ অনুমোদন না করা ঐকমত্যের বরখেলাপ। ডা. শফিকুর রহমান তখন অভিযোগ করেন যে, বিরোধীদলকে ‘ব্ল্যাকআউট’ করা হচ্ছে। আজ আমরা আপনার কাছ থেকে ন্যায়বিচার পাচ্ছি না। বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং সংসদের কার্যপ্রণালীগত অনিয়মের প্রতিবাদে এই ওয়াকআউট করা হয়েছে। বিরোধী জনগণের অধিকারের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গণভোটের রায়, সংসদ ও সংবিধানেরও ওপরে। সংবিধানই তার স্বীকার করছে, আল্লাহর দেয়া সীমানা রক্ষা করে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে জনগণই সমস্ত ক্ষমতার উৎস। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অভিমত, জুলাই সনদের মাধ্যমে গণভোটে জনগণের রায় (৭০ শতাংশের বেশি) বাতিল করার ক্ষমতা কোনো সংসদের নেই। ফ্যাসিস্ট অপশক্তি যারা জনগণের রায়ের তোয়াক্কা করেন না, একমাত্র তারাই জনগণের বিপক্ষে দাঁড়ানোর দুঃসাহস দেখায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশ থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করতে হয়।
তাই সরকারের উচিত বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সার্বভৌম হলো জনগণ, সংসদ নয়- এ কথা মেনে নিয়ে অক্ষরে অক্ষরে তা মেনে নেয়া। কারণ সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান, কিন্তু এক্ষেত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতার উৎস জনগণই। জনগণই সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক। Parliament exercises power on behalf of the sovereign people. সংসদ সার্বভৌম জনগণের পক্ষে ক্ষমতা প্রয়োগ করে। Sovereign = সার্বভৌম বা সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। অর্থাৎ In a republic, the sovereign is the people, not the parliament. একটি প্রজাতন্ত্রে সার্বভৌম হলো জনগণ, সংসদ নয়।
আরো পরিষ্কার করে বললে বলা যায়, সংসদের মালিক জনগণ, সংসদ, সরকার কিংবা রাষ্ট্রের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান জনগণের মালিক নয়। যখন এ ধারণা উল্টে যায়, তখনই রাষ্ট্র সর্বাত্মকবাদী ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠে। এ কথা কারো অজানা নয়, সর্বাত্মকবাদী (Totalitarian) হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা বা মতাদর্শ, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে। জনগণ তখন আর রাষ্ট্রের মালিক থাকে না। রাষ্ট্রই জনগণের মালিক হয় যায়। এমন ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা ভেঙে বৈষম্যমুক্ত জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যই ৩৬ জুলাই বিপ্লব হয়েছে। বিপ্লব সংবিধান মেনে হয় না সত্য। কিন্তু জনগণের কর্তৃত্ব সংবিধানও অস্বীকার করেনি। সংবিধানের বলা হয়েছে, ৭ (১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে। (২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।
(7. (1) All powers in the Republic belong to the people, and their exercise on behalf of the people shall be effected only under, and by the authority of, this Constitution.
Supremacy of the Constitution.
(2) This Constitution is, as the solemn expression of the will of the people, the supreme law of the Republic, and if any other law is inconsistent with this Constitution that other law shall, to the extent of the inconsistency, be void.
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(১)-এ খুব স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।’
অর্থাৎ জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস। সংসদ জনগণের দেওয়া ক্ষমতার সাংবিধানিক প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান।
আর অনুচ্ছেদ ৭(২) বলছে, জনগণের সেই ক্ষমতা সংবিধানের মাধ্যমে কার্যকর হবে। তাই সংসদও সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়; বরং সংবিধান ও জনগণের ইচ্ছার অধীন। সহজভাবে বললে জনগণ মালিক, সংসদ প্রতিনিধি।
সংসদ আইন বানায়, কিন্তু সেই বৈধতা আসে জনগণের ভোট ও সংবিধান থেকে। এক লাইনে বলতে গেলে ‘সার্বভৌমত্বের আসল উৎস জনগণ; সংসদ সেই সার্বভৌম ইচ্ছার সাংবিধানিক রূপমাত্র।’
তাহলে বর্তমান সরকার কোন ক্ষমতাবলে ৭০% জনগণের রায়কে সংসদে বসে বাদ করে দিতে চায়? কোন শক্তির বলে সরকার এটি করছে? মূলত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবিধানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জনগণকে বোকা বানিয়ে এ কাজটি করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করছেন। কোনো একসময়ে এটি মিথ্যা প্রমাণিত হবে যে বর্তমান সরকার যে ক্ষমতাবলে ৭০% জনগণের রায়কে উপেক্ষা করছে, এর জন্য তাদের একদিন আদালতে দাঁড়াতে হবে।
সুতরাং সংসদ সার্বভৌম এ কথা বলে জনগণের রায়কে যারা এ সংসদে বাতিল করছেন, তারা সংবিধানের দোহাই দিয়ে একটি অবৈধ ও অসাংবিধানিক অপকর্ম করছেন। জনগণের রায়ই গণতন্ত্রের শেষ কথা। সেজন্য ক্ষমতাসীনদের একদিন জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু মানুষের অধিকার, প্রত্যাশা ও জবাবদিহি চিরন্তন। যে শাসন জনগণের আশা পূরণে ব্যর্থ হয়, ইতিহাস তাকে ছাড় দেয় না। কারণ জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় প্রতিটি শাসককেই।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।