যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকট

সমাধানে প্রয়োজন বহুমাত্রিক কৌশল


১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৫১

চাপ প্রণোদনা আস্থা ও আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি চুক্তি

॥ ফারাহ মাসুম ॥
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা এমন এক জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কূটনীতি, সামরিক কৌশল, অর্থনীতি এবং মনস্তাত্ত্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা সবকিছু একসঙ্গে কাজ করছে। ফরেন অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষক ফেডেরিকা মোগেরিনি ও সাহিল ভি. শাহ তাদের আলোচিত বিশ্লেষণ- কীভাবে ইরান সংকটের অবসান ঘটানো যায় (How to End the Iran Crisis)-এ যে ধারণা তুলে ধরেছেন, ‘শুধু চাপ নয়, ইতিবাচক প্রণোদনাই সমাধানের চাবিকাঠি’, তা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। একই সঙ্গে রবার্ট ডি. কাপলান, নেট সোয়ানস্টন এবং অন্যান্য বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি এই সংকটকে বোঝার জন্য একটি বিস্তৃত ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করে।
এই প্রতিবেদনটি সেই সব বিশ্লেষণ, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে একত্র করে একটি বড় প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে- যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকট কি কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানযোগ্য, নাকি এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘নিয়ন্ত্রিত সংঘাতে’ রূপ নিতে যাচ্ছে?
প্রণোদনা বনাম চাপ : কূটনীতির দ্বৈত বাস্তবতা
ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান কৌশল মূলত সর্বোচ্চ চাপ, অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা, সামরিক উপস্থিতি এবং কঠোর শর্তের সমন্বয়। কিন্তু মোগেরিনি ও শাহ যুক্তি দেন, এই কৌশল একা কখনোই টেকসই সমাধান আনতে পারে না।
তাদের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা সরাসরি যৌথ ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তারা দেখিয়েছেন- ইরানকে শুধু চাপ দিয়ে নয়, বরং ‘লাভের বাস্তবতা’ দেখিয়ে আলোচনায় আনা সম্ভব। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ, জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ এবং আর্থিক ব্যবস্থায় পুনঃঅন্তর্ভুক্তি- এই প্রণোদনাগুলো ইরানের কাছে বাস্তব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করে, যা তাকে সমঝোতায় আগ্রহী করে তোলে।
অন্যদিকে শুধু চাপ প্রয়োগ করলে একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়- রাষ্ট্রটি নিজেকে রক্ষার জন্য আরও কঠোর অবস্থান নেয়। ইরানের ক্ষেত্রে এটি আরও স্পষ্ট, কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা ও বহিরাগত চাপের মধ্যে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
বিশ্বাসের সংকট : ভেঙে পড়া আস্থার পুনর্গঠন
এই সংকটের অন্যতম বড় অন্তরায় হলো গভীর আস্থাহীনতা, যা সৃষ্টি হয় যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প যৌথ ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন তখন। এই সিদ্ধান্ত ইরানের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়, ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সহজেই বদলে যেতে পারে। ফলে কূটনৈতিক আলোচনায় ইরানের অবস্থান এখন অনেক বেশি সতর্ক ও কঠোর।
এই বাস্তবতায় নতুন কোনো চুক্তির ক্ষেত্রে ইরান আর কেবল মৌখিক বা রাজনৈতিক আশ্বাসে সন্তুষ্ট হবে না। তারা চায় এমন কাঠামোগত গ্যারান্টি, যা বাস্তবে কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার মতো শক্তিশালী। উদাহরণস্বরূপ একটি আন্তর্জাতিকভাবে বাধ্যতামূলক চুক্তি, যা একতরফাভাবে বাতিল করা কঠিন, অর্থনৈতিক সুবিধার ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন- যাতে প্রতিটি অগ্রগতির সঙ্গে বাস্তব লাভ নিশ্চিত হয় এবং এমন নিশ্চয়তা- যাতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও চুক্তি অটুট থাকে।
এই আস্থাহীনতার প্রভাব শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। কারণ কোনো পক্ষ যদি বিশ্বাসই না করে যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হবে, তাহলে সমঝোতার প্রণোদনা দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য প্রথম শর্তই হলো- এই ভাঙা বিশ্বাস পুনর্গঠন করা। অন্যথায় যেকোনো চুক্তিই হবে অস্থায়ী এবং সংঘাত পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
‘মাঝারি যুদ্ধের অভিশাপ’ : কৌশলগত ফাঁদ
রবার্ট ডি ক্যাপলিন তার বিখ্যাত তত্ত্ব ‘The Curse of Middle-Sized Wars’-এ দেখিয়েছেন, মাঝারি আকারের যুদ্ধ আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক ও অস্থিতিশীল ধরনের সংঘাতগুলোর একটি। এই ধারণার বৌদ্ধিক ভিত্তি মূলত এসেছে জ্যামস স্টকবারির ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ থেকে। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে, যুদ্ধের প্রকৃতি কেবল শক্তির পরিমাণে নয়, বরং অংশগ্রহণ, লক্ষ্য এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের ওপরও নির্ভর করে।
এই ধরনের যুদ্ধের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এটি পূর্ণাঙ্গ সর্বাত্মক যুদ্ধও নয়, আবার সীমিত বা ছোট আকারের সংঘাতও নয়। বরং এখানে আংশিক সামরিক সম্পৃক্ততা, সীমিত কৌশলগত লক্ষ্য এবং রাজনৈতিক দ্বিধা একসঙ্গে কাজ করে। ফলে যুদ্ধের প্রকৃতি অস্পষ্ট থেকে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এই ‘মাঝারি যুদ্ধ’-এর ক্লাসিক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন হরমুজ প্রণালী ঘিরে অবরোধ ও সামরিক চাপ প্রয়োগ করছে; অন্যদিকে পুরো মার্কিন সমাজ বা অর্থনীতিকে যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত করা হয়নি। একইসঙ্গে কৌশলগত লক্ষ্যও স্পষ্ট নয়- এটি কি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা, নাকি শাসন পরিবর্তনের দিকে অগ্রসর হওয়া?
এই অস্পষ্টতার ফলে তিনটি বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। প্রথমত, লক্ষ্য অস্পষ্টতা কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করে। কারণ পরিষ্কার উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো সামরিক বা কূটনৈতিক পরিকল্পনা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, সময়ের সঙ্গে জনসমর্থনের ক্ষয় ঘটে; সীমিত কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সাধারণ জনগণের কাছে ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায় এবং রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পায়। তৃতীয়ত, প্রতিপক্ষকে অবমূল্যায়নের ঝুঁকি তৈরি হয়। কার্ল ভন ক্লজউইট যেমন বলেছেন, যুদ্ধে ‘ইচ্ছাশক্তি’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ইরান দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মধ্যে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, যা তাকে কৌশলগতভাবে সহনশীল করে তুলেছে।
ফলে এই ধরনের ‘মাঝারি যুদ্ধ’ দ্রুত সমাধানযোগ্য নয়, আবার কোনো পক্ষের জন্য সুস্পষ্ট বিজয়ের পথও তৈরি করে না। বরং এটি ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী, জটিল ও অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়, যেখানে যুদ্ধ ও কূটনীতির সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যায়।
ইচ্ছাশক্তির লড়াই : কে কতদিন টিকে থাকবে?
নেট ওসায়ানস্টন তার বিশ্লেষণে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতকে একটি ইচ্ছাশক্তির লড়াই হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন- দুই পক্ষের মধ্যে কে দীর্ঘসময় ধরে অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ সহ্য করতে সক্ষম হবে। এখানে যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করছে না কেবল অস্ত্র বা কৌশল, বরং সহনশীলতা, স্থিতিস্থাপকতা এবং রাজনৈতিক সংকল্প।
এই সংঘাতে দুই পক্ষের অবস্থান কার্যত বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সীমিত করতে এবং হিজবুল্লাহর প্রতি ইরানের সমর্থন হ্রাস করতে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হরমুজ প্রণালী খোলা রাখা। কারণ এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান করিডোর।
অন্যদিকে ইরানের অবস্থানও সমানভাবে কঠোর এবং আত্মরক্ষামূলক। তারা চায় সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা হোক, বিদেশে জব্দকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া হোক এবং ভবিষ্যতে নিরাপত্তার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি ইরান তার আঞ্চলিক প্রভাব; বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রক্সি নেটওয়ার্কে তার অবস্থান বজায় রাখতে চায়।
এই দুই বিপরীত লক্ষ্য একত্রে একটি গভীর কাঠামোগত অচলাবস্থা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ চায়, ইরান চায় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার। ফলে কোনো পক্ষই সহজে ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।
এই দ্বন্দ্বই স্পষ্ট করে দেয় যে, সমঝোতার পথ কতটা জটিল এবং অনিশ্চিত। কারণ এখানে কেবল নীতিগত পার্থক্য নয়, বরং অস্তিত্ব, আস্থা এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রশ্নও জড়িত। ফলস্বরূপ এই সংঘাত একটি দীর্ঘমেয়াদি চাপের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে, যেখানে কূটনৈতিক সমাধান নির্ভর করছে কে কতটা সময় ধরে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারে তার ওপর।
হরমুজ প্রণালী : বৈশ্বিক অর্থনীতির নাড়ি
হরমুজ প্রণালী এই সংকটের কেন্দ্রে অবস্থান করছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক করিডর। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে কোনো ধরনের উত্তেজনা বা বিঘ্ন ঘটলেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি, তেলের বাজার এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রণালী ঘিরে কৌশলগত প্রতিযোগিতা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে কার্যত নৌ অবরোধের মতো চাপ সৃষ্টি করেছে, যার লক্ষ্য ইরানের সামুদ্রিক সক্ষমতা ও বাণিজ্যিক প্রবাহ সীমিত করা। অন্যদিকে ইরান এই ভৌগোলিক অবস্থানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে- যাতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক আলোচনায় চাপ তৈরি করা যায়।
এই পরিস্থিতিতে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নয়, বরং অন্যান্য বড় অর্থনীতিও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে চীন, যেটি তার জ্বালানি আমদানির একটি বড় অংশ এই রুটের ওপর নির্ভরশীল, সরাসরি অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ফলে এই সংকট এখন একটি আঞ্চলিক ইস্যু থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
এই উত্তেজনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো চীনা ট্যাঙ্কার আটকে দেওয়া, যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে এই সংকটে টেনে এনেছে। এটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ এখন সংঘাত কেবল দ্বিপাক্ষিক সীমায় নেই; বরং এটি একটি বহুপাক্ষিক শক্তির প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালী এখন আর শুধু একটি কৌশলগত জলপথ নয়, বরং একটি ভূরাজনৈতিক চাপবিন্দু, যেখানে সামরিক উপস্থিতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং বৈশ্বিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা একসঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে।
আঞ্চলিক সমীকরণ : ইসরাইল-লেবানন-ইরান অক্ষ
এই সংকটে ইসরাইল এবং লেবানন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছে। কারণ এই দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু হওয়া একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা দীর্ঘদিনের উত্তেজনার মধ্যে একটি নতুন যোগাযোগের পথ খুলে দিয়েছে।
এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হিজবুল্লাহ ইস্যু। লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিজবুল্লাহর প্রভাব এবং ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগ- এই দুই বিপরীত বাস্তবতা নতুন একটি সমীকরণ তৈরি করছে। একদিকে লেবানন রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে চায়; অন্যদিকে ইসরাইল সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হিজবুল্লাহকে একটি প্রধান হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।
একই সঙ্গে ইসরাইলের কৌশলগত লক্ষ্য আরও বিস্তৃত হয়ে উঠেছে। তারা শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকেও সরাসরি তাদের নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে। ইরানের ইউরেনিয়াম কর্মসূচি বন্ধ করার দাবি এই অবস্থানেরই প্রতিফলন।
ইসরাইল কার্টজ এবং ডেভিড বার্নিয়ার বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসরাইলের কৌশল শুধুমাত্র প্রতিরক্ষামূলক নয়, বরং আক্রমণাত্মক প্রতিরোধ ভিত্তিক। অর্থাৎ তারা ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করতে চায়- যাতে ভবিষ্যতে তাদের মানচিত্র সম্প্রসারণ ও প্রভাব বিস্তারে কোনো কৌশলগত হুমকি তৈরি না হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ইসরাইল-লেবানন সম্পর্ক এবং ইরান ইস্যু একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করছে, যেখানে সামরিক, কূটনৈতিক এবং গোয়েন্দা কৌশল একসঙ্গে কাজ করছে।
কূটনীতির নতুন মঞ্চ : পাকিস্তান ফ্যাক্টর
ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে, পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা আবারো অনুষ্ঠিত হতে পারে- এই সম্ভাবনা বর্তমান সংকটে একটি নতুন কূটনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে। এটি শুধু একটি স্থান পরিবর্তন নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরের সরাসরি উত্তেজনা থেকে বের হয়ে একটি তুলনামূলক ‘নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম’ তৈরির কৌশলগত চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ায় জেডি ভ্যান্স-এর সক্রিয় অংশগ্রহণ যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনার গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করছে। তাঁর সম্পৃক্ততা ইঙ্গিত দেয় যে, ওয়াশিংটন এখন কেবল চাপ প্রয়োগ নয়, বরং বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে চাইছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সামনে আনা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপ। কারণ এটি মধ্যপ্রাচ্য সংকটে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ভূমিকা সম্প্রসারিত করছে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো আসিম মুনিরের ভূমিকা। তিনি সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে আসায় বোঝা যায়, পাকিস্তান এই সংকটে একটি ‘ব্রিজ-পাওয়ার’ হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী। এটি ইসলামাবাদের জন্যও একটি কৌশলগত সুযোগ, কারণ তারা নিজেদের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবে।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- এটি আলোচনাকে সরাসরি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরে থাকা উত্তেজনা আলোচনাকে প্রভাবিত করে, কিন্তু পাকিস্তানে একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলে তুলনামূলকভাবে কম রাজনৈতিক চাপের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
সব মিলিয়ে এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটে একটি সম্ভাব্য ‘ডিপ্লোম্যাটিক উইন্ডো’ খুলে দিচ্ছে, যেখানে সামরিক চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
অর্থনৈতিক চাপ : বৈশ্বিক ঝুঁকি
আইএমএফ ইতোমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে যে, বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে একটি নতুন মন্দার ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই সতর্কবার্তার মূল ভিত্তি হলো জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর সম্ভাব্য চাপ।
এই সংকটের প্রধান ঝুঁকিগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে তেলের দাম বৃদ্ধি। হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে। দ্বিতীয়ত, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে; বিশেষ করে শিপিং, বীমা এবং লজিস্টিক খাতে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেলে বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, বাণিজ্য অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কারণ বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়লে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে যায়।
এই বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় উন্নয়নশীল দেশগুলোয়। যেমন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর প্রভাব সরাসরি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর পড়ে। প্রথমত, জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ায় তেলের দাম বৃদ্ধি মানেই আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ জ্বালানিনির্ভর হওয়ায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়, যা শিল্প ও গৃহস্থালি উভয় খাতে চাপ সৃষ্টি করে। তৃতীয়ত, সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। কারণ পরিবহন, উৎপাদন এবং খাদ্য সরবরাহ- সব খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
ফলে এই সংঘাত শুধু ভূরাজনৈতিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
এটি কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাভাস?
সংক্ষেপে- না, অন্তত এখনই নয়। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটকে একটি ‘হাইব্রিড ও নিয়ন্ত্রিত সংঘাত’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা বেশি যুক্তিসঙ্গত, যেখানে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের চেয়ে চাপ, সীমিত সংঘর্ষ এবং কূটনৈতিক তৎপরতা একসঙ্গে চলছে।
এই কাঠামোয় কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, এটি সরাসরি রাষ্ট্র-রাষ্ট্র যুদ্ধ নয়, বরং বিভিন্ন স্তরে চলমান একটি জটিল সংঘাত। দ্বিতীয়ত, প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠী ও মিত্র শক্তি পরোক্ষভাবে এই উত্তেজনায় যুক্ত রয়েছে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক চাপ; বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বাণিজ্যিক বাধা একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; বরং বিভিন্ন ফরম্যাটে তা অব্যাহত রয়েছে।
এই বাস্তবতায় বড় শক্তিগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। চীন মূলত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়, তাই তারা সংঘাতকে বড় পরিসরে বিস্তৃত হতে দিতে আগ্রহী নয়। একইভাবে রাশিয়া সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সংঘর্ষে জড়াতে চায় না এবং তারা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখতে আগ্রহী।
এই কারণে বর্তমান সংকট একটি ‘নিয়ন্ত্রিত অস্থিতিশীলতা’ হিসেবে টিকে আছে, যেখানে কোনো পক্ষই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চায় না, কিন্তু সবাই নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতে চাপ বজায় রাখছে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখানে ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ নয়, বরং ভুল হিসাব বা মিসক্যালকুলেশন। সামান্য ভুল সিদ্ধান্ত, অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া বা ভুল গোয়েন্দা তথ্য দ্রুত এই নিয়ন্ত্রিত সংঘাতকে বড় আকারের আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ : তিনটি দৃশ্যপট
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটের ভবিষ্যৎ মূলত তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপটে বিভক্ত করা যায়, যেখানে প্রতিটি পথই ভিন্ন মাত্রার ঝুঁকি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নির্দেশ করে।
১. দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রিত সংঘাত (সবচেয়ে সম্ভাব্য) : এই দৃশ্যপটে সংঘাত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয় না, বরং একটি স্থায়ী চাপের কাঠামো হিসেবে টিকে থাকে। ছোট পরিসরের হামলা, প্রক্সি গোষ্ঠীর কার্যক্রম, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক টানাপড়েন একসঙ্গে চলতে থাকে। এতে কোনো পক্ষই চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারে না, বরং ‘ম্যানেজড ইনস্ট্যাবিলিটি’ বা নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতার মধ্যেই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়।
২. স্বল্পমেয়াদি বড় সংঘর্ষ : এই পরিস্থিতিতে কোনো একটি বড় ঘটনা; যেমন সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত, জাহাজে হামলা বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। ফলস্বরূপ সীমিত কিন্তু তীব্র সামরিক সংঘর্ষ দেখা দিতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক চাপ, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে এই সংঘর্ষ দ্রুতই নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং আবার আগের মতো ‘লো-ইনটেনসিটি কনফ্লিক্ট’-এ ফিরে যায়।
৩. পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ (কম সম্ভাবনা) : এই দৃশ্যপটে একাধিক দেশ সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তবে এটি বর্তমানে সবচেয়ে কম সম্ভাব্য। কারণ প্রতিটি প্রধান শক্তির জন্যই এর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তাজনিত ব্যয় অত্যন্ত বেশি। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো কেউই এই ধরনের সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়।
সব মিলিয়ে বর্তমান বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয় যে প্রথম দৃশ্যপটই সবচেয়ে সম্ভাব্য অর্থাৎ দীর্ঘস্থায়ী, নিয়ন্ত্রিত কিন্তু অনির্দিষ্ট একটি সংঘাত, যেখানে যুদ্ধ ও কূটনীতি পাশাপাশি চলতে থাকবে।
সমাধানের পথ কোথায়?
এই সংকটের সমাধান কোনো একক কৌশল দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়; বরং এটি একটি বহুমাত্রিক কৌশলগত সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করে, যেখানে তিনটি মৌলিক উপাদান একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রথমত, চাপ : এটি কূটনীতির সূচনা বিন্দু হিসেবে কাজ করে। সীমিত নিষেধাজ্ঞা, কৌশলগত সামরিক উপস্থিতি বা রাজনৈতিক চাপ ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করতে পারে। তবে এই চাপ অতিরিক্ত হলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করে এবং সমঝোতার পথ আরও কঠিন করে তোলে।
দ্বিতীয়ত, প্রণোদনা : যা আলোচনাকে বাস্তব ও কার্যকর করে তোলে। অর্থনৈতিক সুবিধা, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, আন্তর্জাতিক বাজারে পুনঃঅন্তর্ভুক্তি এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ইরানের জন্য বাস্তব লাভ তৈরি করতে পারে। এই প্রণোদনা ছাড়া কোনো চুক্তি কেবল রাজনৈতিক ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
তৃতীয়ত, বিশ্বাস নির্মাণ : যা যেকোনো সমঝোতাকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখে। অতীত অভিজ্ঞতা; বিশেষ করে জেসিপিএ থেকে সরে আসার ঘটনা, ইরানের আস্থাহীনতা গভীর করেছে। ফলে ভবিষ্যৎ চুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরেও চুক্তি অটুট থাকার নিশ্চয়তা অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্লেষক ফেডেরিকা মোগেরিনি ও সাহিল ভি. শাহ -এর মূল বার্তাও এখানেই নিহিত- শুধু চাপ প্রয়োগ করে নয়, বরং ‘লাভজনক শান্তি’ তৈরি করেই একটি টেকসই সমাধান সম্ভব। অন্যদিকে রবার্ট ডি. কাপলান সতর্ক করে দেন যে, যদি লক্ষ্য অস্পষ্ট থাকে এবং কৌশল সীমিত বা দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তবে এই সংঘাত সহজে সমাধান না হয়ে বরং দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সংকটে পরিণত হবে।
শেষ কথা
সব শেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক এখন এমন এক সূক্ষ্ম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করতে পারে। একদিকে সম্ভাব্য যুদ্ধের বিস্তার; অন্যদিকে টেকসই শান্তির একটি নতুন কাঠামো। এই ভারসাম্যই আজকের বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় অনিশ্চয়তা।
তবে শান্তি ও সহাবস্থানের পথে মূলবাধা ইসরাইলের উচ্চাকাক্সক্ষা। দেশটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর পরিসরে মানচিত্র সম্প্রসারণ করতে চায়। এজন্য তাদের যুদ্ধ হলো প্রধান হাতিয়ার। মধ্যপ্রাচ্যে সব শক্তিধর দেশকে দুর্বল ও পদানত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা অনেক দূর এগিয়েছে। এখন তাদের সামনে রয়েছে ইরান। ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বাকি থাকবে তুরস্ক ও পাকিস্তান। সৌদি আরবকে তারা বড় বাধা মনে করে না। চাপ দিয়েই সৌদি আরবকে আব্রাহাম চুক্তির মধ্যে নিয়ে আসতে পারবে বলে ইসরাইল বিশ্বাস করে।
ইসরাইলের এই উচ্চাকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র তেলআবিবের হয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসা ও থাকা অনেকখানি আইপ্যাক বা জায়নবাদ লবির ওপর নির্ভর করে। এখনকার বাস্তবতা হলো ইসরাইল না চাইলে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবে না। কেনেডি ভাইদের মতো আমেরিকান নেতারা অকালে ঝরে পড়তে চান না। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের এই মূল কারণকে দূরে রেখে সেখানকার পরিস্থিতি উপলব্ধি করা সহজ কোনো বিষয় হবে না।