বাংলাদেশ কি ভারতে ট্রানজিট সুবিধা পাবে?
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:২৪
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
বাংলাদেশ ও ভারত- দুই প্রতিবেশী দেশ। ভারত একটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ; অপরদিকে বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। ভারতে জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছে হিন্দু, মুসলিমদের সংখ্যা মাত্র ২০ ভাগ। বাংলাদেশে মুসলিম জনসংখ্যা হচ্ছে ৯০ ভাগ আর হিন্দু হচ্ছে আট ভাগ মাত্র। দুটি দেশের ডেমোগ্রাফিক চিত্র সম্পূর্ণ বিপরিত হলেও প্রতিবেশী দেশ তথা বসবাস পাশাপাশি। অপরদিকে দুটি দেশই নিজেদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে দাবি করে। কিন্তু রাষ্ট্র দুটি কতটা গণতান্ত্রিক, তা অবশ্য প্রশ্ন-সাপেক্ষ।
ভারতে বর্তমানে একটি হিন্দুত্ববাদী দল ক্ষমতায় আর বাংলাদেশে ক্ষমতায় একটি জাতীয়তাবাদী দল। ১৯৪৭ সালে দুটি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই সম্পর্কটা খুব বেশি সময় মধুর ছিল না। বরং অধিকাংশ সময়ই ছিল শীতল সম্পর্ক। শীতল সম্পর্কটা হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ নয় তবে সম্পর্কটা আন্তরিক ও শান্তিপূর্ণও নয়। সরাসরি যুদ্ধ না হলেও কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চরম অবিশ্বাস, বৈরিতা এবং টানাপড়েনের অবস্থাকে বোঝায় শীতল সম্পর্ক। এটি বন্ধুত্বের বিপরীত, পারস্পরিক বোঝাপড়া, যোগাযোগ তথা ট্রানজিট সমস্যা, ভিসা জটিলতা, বাণিজ্যে ধীরগতি ও সীমান্ত উত্তেজনা থাকে। বিগত আট দশক ধরে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কটা এমনই একটা পর্যায়ে চলছে। বিশেষ করে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কটা খুবই শীতল ছিল। কূটনৈতিক যোগাযোগটা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সম্পর্কের এমন একটি সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান তার প্রথম সফরটি করলেন ভারতে। বিএনপি সরকারের দেড় মাসের মাথায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ সফর করলেন। দিল্লি সফর শেষে তিনি দিল্লিভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন আয়োজিত একটি কনফারেন্সে যোগ দেন মরিশাসে। দিল্লি থেকে একই বিমানে করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের সাথে মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে যান। উল্লেখ্য, মরিশাস হচ্ছে হিন্দু অধ্যুষিত ভারত মহাসাগরীয় একটি দ্বীপপুঞ্জ।
সফর শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ভারত সফরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
গত ৭ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারত সফরে যান। তার সফরসঙ্গী ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
গত ১৩ এপ্রিল সোমবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ভারত সফর ফলপ্রসূ হয়েছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ক যদি পজিটিভ দিকে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে আমরা কিছুটা ভালো প্রোগ্রেস করতে পারব। ওই দিক থেকে এটি ফলপ্রসূ সফর। ওখানে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে আমাদের মিটিং হয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে। দুটি মিটিংই ইতিবাচক।’
তিনি বলেন, ‘আশা করি, আগামী সপ্তাহে আমরা বৈঠকের কিছু পজিটিভ দিক দেখতে পাব। আমরা গুরুত্ব দিয়েছি, মেডিকেল ভিসাগুলো যেন তাড়াতাড়ি চালু করে দেওয়া হয়। তারাও বিষয়গুলো ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বৈঠকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি সবসময় আলোচনায় থাকবেই। কারণ এটি নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের আগ্রহ রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘একজন স্বৈরাচার ও সন্ত্রাসী ভারতের মাটিতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী হিসেবে অবস্থান করছে। এই সন্ত্রাসী বাংলাদেশের দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করে ভারতে পালিয়ে গেছে। এটা আমরা আলোচনায় বলেছি, তার স্থান বাংলাদেশে আর হবে না।’
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমরা বলেছি, শেখ হাসিনা ভারতের মাটি ব্যবহার করে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করতে না পারে। এমনকি তাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়টি আমরা জোরালোভাবে জানিয়েছি। সবকিছু স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হবে।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে এখনো ফাইনাল কিছু হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তার বিদেশনীতি সার্কভুক্ত দেশগুলোর জন্য পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখার মাধ্যমে প্রজেক্ট করতে চাইছেন বা আমরা চাইছি, যাতে এই ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে আঞ্চলিক সহায়তা জোরদার করা যায়। স্বাভাবিকভাবে এই অঞ্চলের ভেতর ভারত সফর হতেই পারে, কিন্তু এখনো ফাইনাল কিছু না, হতে পারে, এটা বিবেচনাধীন আছে।’
জুলাইযোদ্ধা শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার বিষয়টিও আলোচনা হয়েছে জানিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, সেখানে কিলারদের ধরা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হত্যাকারীদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
দুই দেশের স¤ম্পর্কোন্নয়নের বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমরা আলোচনায় বলেছি, বন্ধুত্বের সম্পর্ক জোরদার করতে হলে দুই পক্ষ থেকে আমাদের সমানভাবে অগ্রসর হতে হবে। এক দিনে সব আলোচনা করা যাবে না। যদি দুই দেশের মাইন্ডসেট ঠিক থাকে, তাহলে ইতিবাচক যেকোনো কিছু করা সম্ভব।’
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। পালিয়ে যাওয়া সন্ত্রাসী শেখ হাসিনা যখন সেখানে আছেন, চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই। এই চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে কীভাবে আমরা দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করে অন্য কাজগুলো এগিয়ে নেব, সে বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে।’
জ্বালানি সংকট নিরসনে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘জ্বালানি খাতে তাদের কিছু সহযোগিতা আমরা পেয়েছি, পাইপলাইনে আছে, এটার জন্য ভারতকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। যেখানে সহযোগিতা আরও লাগবে, ওখানে আমরা সহযোগিতা পাব এই বিষয়ে তারা আশ্বস্ত করেছে। এ বিষয়ে তেমন জোরালো কোনো আলোচনা সেখানে হয়নি।’
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি জনগণের ম্যান্ডেট ছিল না উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি জনগণের ম্যান্ডেট ছিল না। দেশের জন্য জনগণের মানুষের ম্যান্ডেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের ভোটের ওপর ভিত্তি করেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা নতুন সরকার গঠন করেছি। সুতরাং আমাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি। আমরা বড় গলায় কথা বলতে পারি, এটাই গুরুত্বপূর্ণ।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরকালে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েবসাইটে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের সাথে গঠনমূলক সংলাপ ও দুই দেশের সম্পর্ককে আরো জোরদার করার আশা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। দুই পক্ষকেই পারস্পরিক স্বার্থে আঞ্চলিক ও গ্লোবাল ইস্যুতে মতবিনিময় করতে হবে।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো হচ্ছে আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানি বণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি, ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ, ভিসা ইস্যু ইত্যাদি। কিন্তু পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যে এ জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা, তা জানা যায়নি। সাংবাদিকরাও তাকে উল্লেখিত বিষয়গুলো নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর শেষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ককে আরো জোরদার করবেন। এ আশাবাদ কি বাংলাদেশ করতে পারে? ভারত কি আগামী দিনগুলোয় এমন ভূমিকা নেবে- যাতে বাংলাদেশ ভারতের ওপর আস্থা রাখতে পারে। তারা কি বন্ধুত্বপূর্ণ ও সমমর্যাদা দিয়ে সম্পর্ক করবে, নাকি বাংলাদেশ থেকে স্বার্থ নেবে, কিন্তু ভারত কিছুই দেবে না। এমন হলে তো প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে কোনো সময়ই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হতে পারে না।
বিগত বছরগুলোয় ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিটের নামে করিডোর নিয়েছে, বাংলাদেশের সাথে একতরফা বাণিজ্যিক সুবিধা নিয়েছে। যার কারণে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে প্রতিনিয়ত বাণিজ্যিক ঘাটতি বেড়েছে। বাংলাদেশ ভারত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার আমদানি করে, কিন্তু বাংলাদেশ ভারতে কোনো পণ্য রপ্তানি শুরু করলেই ভারত ট্যারিফ ও নন ট্যারিফ শুল্কারোপ করে বিভিন্ন বাধা সৃষ্টি করে। তাই বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে প্রতিনিয়ত বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছেই। ভারত তার নিজের দেশের সুবিধার জন্য বেশ কয়েক বছর আগেই বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর নিয়েছে। কিন্তু মাত্র কয়েক কিলোমিটার একটি রাস্তা দিয়ে নেপালের সাথে যোগাযোগ করতে বাংলাদেশ ট্রানজিট চাচ্ছে কিন্তু ভারত এটা দিচ্ছে না।
ভারত নিজের দেশের সুবিধার জন্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর নিয়েছে স্থলপথে, জলপথে ও রেলপথে। অথচ বাংলাদেশ ভারতের কাছে নিকটতম প্রতিবেশী নেপাল ও ভুটান এ দুটি দেশে যাওয়ার জন্য ট্রানজিট চেয়েছিল। এখন পর্যন্ত ভারত এ ট্রানজিট না দিয়ে বিভিন্ন টালবাহানা করছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য নেপাল ও ভুটানসহ পাকিস্তানের সাথে ট্রানজিট দরকার। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অতি প্রয়োজনীয় বিষয় হচ্ছে নেপাল ভুটান ও পাকিস্তানের সাথে ট্রানজিট। ট্রানজিট না দিলেও ট্রান্সশিপমেন্ট দিলেও বাংলাদেশ তার আমদানি-রপ্তানি করতে পারে। এ তিন দেশের সাথে বাংলাদেশ ভারতের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট পাইলে বাংলাদেশের রপ্তানি ও আমদানি দুটিই বাড়তো। বিশেষ করে ভারতের মধ্য দিয়ে রেল টান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ তুলা আমদানি করতে পারতো। তাই বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্বার্থে ভারত কি তিন দেশ থেকে মালামাল আমদানি ও রপ্তানি করতে বাংলাদেশকে এ ট্রানজিট দেবে? ভারত বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইলে নেপাল, ভুটান ও পাকিস্তানের সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করতে এ ট্রানজিট দেবে এটাই সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা। এভাবে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আদান-প্রদানের মাধ্যমেই সম্পর্কের বরফ গলতে পারে এবং গড়ে উঠতে পারে আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।