নির্বাচনের কলঙ্কিত ইতিহাস : ১৯৭৩-২০২৪

‘আমি ডামি’র নির্বাচন ও ‘রাতের ভোট’ আর নয়


৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:৩৬

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
১৯৭২ সালের পর এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচনের অধিকাংশই অনুষ্ঠিত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে গঠিত কথিত গণতান্ত্রিক সরকারের নামে অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারদের নিয়ন্ত্রণে, তবে ব্যতিক্রম আছে। যেমন কয়েকটি নির্বাচন হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বে। এ ১২টির মধ্যে অধিকাংশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। তাই দেশ-বিদেশে এ নির্বাচনগুলো গ্রহণযোগ্য হয়নি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিগত পাঁচ দশকে হাতেগোনা কয়েকটি নির্বাচনই অবাধ ও গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়েছে। তন্মধ্যে শুধুমাত্র ১৯৯১ ও ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত ৫ম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দুটিই অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।
বাংলাদেশে নির্বাচন ও ভোটের কলঙ্ক তৈরি করেছে আওয়ামী লীগ। যার দীর্ঘ ইতিহাস হচ্ছে প্রায় পাঁচ দশক। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ ভোট কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনী জোচ্চুরি শুরু করে আর ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদী শাসনের কলঙ্ক মাথায় নিয়ে দেশ থেকে বিদায় নেয়। জনগণের প্রত্যাশা, আগামী দিনে বাংলাদেশে আর কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচন ও ভোট নিয়ে এমন প্রতারণা ও জোচ্চুরি করে দেশ থেকে বিতাড়িত হবে না। আগামী দিনে নির্বাচন ও ভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। জনগণ নিশ্চিন্তে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে।
বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের পর যে ১২টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তন্মধ্যে প্রথম নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৭৩ সালে। বাংলাদেশের প্রথম এ জাতীয় নির্বাচনটি সবচেয়ে বেশি কলঙ্কিত। ১৯৭৩ সালে ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয়লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনে এগারোটি আসনে প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। সবচেয়ে বিতর্কিত এ নির্বাচনটি নিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রচুর সমালোচনা রয়েছে।
প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩ কোটি ৫২ লাখ ৫ হাজার ৬৪২ জন। সরকারি হিসাবে এই নির্বাচনে ভোট দেন ১ কোটি ৮৮ লাখ ৫১ হাজার ৮০৮ জন মানুষ। ভোটের প্রাপ্ত হার ৫৫.৬১ শতাংশ। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ১টি, বাংলাদেশ জাতীয় লীগ (বিডিজেএল) ১টি এবং পাঁচটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হন। বাকি ২৯৩টি আসন পায় আওয়ামী লীগ। সংসদ নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরে মুনসুর আলী। কেউ বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন না।
১৯৭৩ সালের ওই নির্বাচন নিয়ে বিশিষ্ট রাজনীতিক ও সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, ‘পার্লামেন্টারি পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন মানে বিরোধীদলের যথেষ্টসংখ্যক ভালো মানুষ নির্বাচিত হবেন, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা। কাজেই নির্বাচনে (১৯৭৩) সরকারি দল আওয়ামী লীগের বিরোধীদলের প্রতি উদার হওয়া উচিত ছিল। উদার হইতে তারা রাজিও ছিলেন। রেডিও টেলিভিশনে বিরোধীদলসমূহের নেতাদের বক্তৃতার ব্যবস্থা করতেও তাদের আপত্তি ছিল না। আমি আওয়ামী নেতৃত্বকে পরামর্শ দিয়াছিলাম বিরোধীপক্ষের অন্তত জনপঞ্চাশেক নেতৃস্থানীয় প্রার্থীকে নির্বাচনে জয়লাভ করতে দেওয়া উচিত। তাতে পার্লামেন্টে একটি সুবিবেচক গণতন্ত্রমনা গঠনমুখী অপজিশন দল গড়িয়া উঠিবে। আমার পরামর্শে কেউ কান দিলেন না।’ (আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, খোশরোজ কিতাব মহল/১৯৯৫, পৃ. ৬২৬)।
কথিত আছে যে, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যালট বাক্স হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় এনে ভোটগণনা করে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ এলাকায় গণনা করলে বিরোধীদলের প্রার্থীদের ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হয়ে যাবে। তাই বিরোধীদলের প্রার্থীদের প্রতিরোধের মুখে এলাকায় ভোট গণনা না করে ঢাকায় এনে এ অপকর্মটি করা হয়েছে।
দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। এই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৩৭ হাজার ৬৬৪ জন। নির্বাচনে ৪৯.৬৭ ভাগ ভোট পড়ে। ২৯টি দল ভোটে অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পায় ২০৭টি আসন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (মিজান) ২, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ৮, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ১৪টি ও ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ ৬, অন্যান্য দল ৮ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হন ১৬টি আসনে। স্বতন্ত্র বিজয়ীরা পরে বিএনপিতে যোগদান করেন। দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসন সংখ্যা ১৫টি থেকে ৩০টিতে উন্নীত করা হয়। এতে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৩০ জনে। এই সংসদের সংসদ নেতা ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান। বিরোধীদলীয় নেতা আসাদুজ্জামান খান।
১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নিয়ন্ত্রণে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ৪ কোটি ৭৮ লাখ ৭৬ হাজার ৯৭৯। ২৮টি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিলেও বিএনপি বয়কট করে। জাতীয় পার্টি পায় ১৫৩টি আসন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৭৬, জামায়াতে ইসলামী ১০, অন্যান্য দল ২৯, স্বতন্ত্র ৩২। সংসদ নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী এবং বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন শেখ হাসিনা।
১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল চতুর্থ জাতীয় সংসদ নিবাচন। এ নির্বাচনও স্বৈরাচার এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটার ৪ কোটি ৯৮ লাখ ৬৩ হাজার ৮২৯ জন। অংশগ্রহণ করে ৯টি দল। এরশাদের জাতীয় পার্টি পায় ২৫১টি আসন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই এই নির্বাচন বয়কট করে। নামমাত্র একটি সম্মিলিত বিরোধীদল পায় ১৯টি। অন্যান্য দল ৫ এবং স্বতন্ত্র ২৫টি আসন। চতুর্থ সংসদের সংসদ নেতা ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, পরে কাজী জাফর আহমেদ। বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন জাসদের আ স ম আব্দুর রব।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৬ কোটি ২১ লাখ ৮১ হাজার ৭৪৩ জন। অংশগ্রহণ করে ৭৫টি দল। এ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পায় ১৪০টি আসন, আওয়ামী লীগ ৮৮টি, জাতীয় পার্টি ৩৫, জামায়াতে ইসলামী ১৮, সিপিবি ৫, বাকশাল ৫, জাসদ (সিরাজ) ১, ইসলামী ঐক্যজোট ১, ওয়ার্কার্স পার্টি ১, এনডিপি ১, গণতন্ত্রী পার্টি ১, ন্যাপ (মোজাফফর) ১ ও অন্যান্য দল ৩টি আসন পায়। নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে।
ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। এ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে বিএনপি সরকারের নেতৃতে¦। নির্বাচনে বিএনপিসহ মাত্র কয়েকটি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী এ নির্বাচন বর্জন করে।
সাংবিধানিকভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৯৬ সালের ১২ জুন। সপ্তম জাতীয় সংসদের এই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৫ কোটি ৬৭ লাখ ১৬ হাজার ৯৩৫ জন। ৮১টি দল অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৪৬টি, বিএনপি ১১৬টি, জাতীয় পার্টি ৩২টি, জামায়াতে ইসলামী ৩টি আসন পায়। সংসদ নেতা হন শেখ হাসিনা। বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন খালেদা জিয়া।
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০১ সালের ১ অক্টোবর। মোট ভোটার ৭ কোটি ৪৯ লাখ ৪৬ হাজার ৩৬৪ জন। অংশগ্রহণ করে ৫৪টি দল, তবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পায় ১৯৩টি আসন, আওয়ামী লীগ ৬২টি, জামায়াতে ইসলামী ১৭টি, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যফ্রন্ট ১৪টি আসন। সংসদ নেতা হন খালেদা জিয়া। বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার গঠন করা হয়।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্ধারিত সময় ছিল ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে। কিন্তু আওয়ামী অপশক্তি দেশে এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যাতে নির্বাচন স্থগিত করে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করতে বাধ্য হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তৎপরবর্তীতে সামরিক বাহিনী সমর্থিত একটি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে, যাকে এক-এগারোর সরকার বলা হয়ে থাকে। এ এক-এগারোর সরকার প্রায় দুই বছর ক্ষমতা থাকে। ফলে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পিছিয়ে যায়। ভোট হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। এ নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৩ জন। নির্বাচনে ৩৮টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে এবং ভোট প্রদানের হার ছিল ৮৭.১৬ শতাংশ। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। এ নির্বাচন নিয়েও রাজনৈতিক মহলে একটি কথা চাউর আছে যে, সূক্ষ্ম কারচুপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করা হয়েছিল।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়ন্ত্রণে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বর্জন করে। অংশগ্রহণ করে মাত্র ১২টি দল। ১৫৩টি আসনের প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন, যা দেশের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পায় ২৩৪টি আসন। জাতীয় পার্টি ৩৪টি। সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। বিরোধীদলীয় নেতা হন রওশন এরশাদ।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ জন। অংশগ্রহণ করে ৩৯টি দল। বিজয়ী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পায় ২৫৮টি, জাতীয় পার্টি ২২টি এবং বিএনপি পায় মাত্র ৬ আসন। বিএনপি সংসদে থাকলেও যেহেতু তাদের আসন ছিল খুবই কম এবং আসন প্রাপ্তির দিক দিয়ে জাতীয় পার্টি ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ফলে তারা হয় বিরোধীদল। এই সংসদেও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। বিএনপির সংসদ সদস্যরা পরবর্তীতে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন।
বিরোধীদলের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ এসেছে যে, এ নির্বাচনটি হয়েছে ‘আগের রাতে’। পরবর্তীতে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় দেশের পুলিশ বাহিনী আগের রাতেই অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রেই প্রিসাইডিং অফিসার থেকে জোর করে ব্যালট পেপার নিয়ে নৌকায় সিল মেরে ব্যালট বাক্সে ঢুকিয়ে দেয়। তাই এ নির্বাচনকে রাতের ভোট বা নাইট ভোট বলা হয়ে থাকে।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও ছিল একতরফা। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ২০১৪ সালের মতো ২০২৪ সালের ভোটও বর্জন করে। অনেক আসনে আওয়ামী লীগের নেতারাই নৌকার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। যে কারণে অনেকে এটিকে ‘আমি-ডামি’র নির্বাচন বলে অভিহিত করেন। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি ও জামায়াত এই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক দেখাতে আওয়ামী লীগ এ কৌশল নিয়েছিল বলে মনে করা হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে সরকার গঠন করে।
বাংলাদেশের নির্বাচন ও ভোটের ইতিহাসটা শুধুই কলঙ্কের। নির্বাচন নিয়ে ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল করে ভোট দেয়া, ভোট জালিয়াতি ও দিনের ভোট রাতে করার মতো এহেন কোনো অপকর্ম নেই আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি করেনি। তবে নির্বাচন ও ভোটে জালিয়াতির এ অভিযোগ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে নেই।
নির্বাচন ও ভোট নিয়ে রাজনৈতিক মহলে যেমন কঠিন সমালোচনা রয়েছে, তেমনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বিএনএম ও ‘তৃণমূল বিএনপির প্রতিক্রিয়া, নির্বাচনে ভোট কারচুপির উৎসব হয়েছে’ এ শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম ও ‘তৃণমূল বিএনপি’। ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া দল দুটির নেতারা বলেন, নির্বাচনে ভোট কারচুপির উৎসব হয়েছে।’
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ‘নিষেধাজ্ঞা ও বর্জন : বাংলাদেশের নির্বাচনের অস্থিরতাপূর্ণ ইতিহাস’ এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে দেশের হাতেগোনা কয়েকটি নির্বাচন ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ বলে বিবেচিত হয়েছে। রবিবার ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ তার ১২তম সাধারণ নির্বাচন করছে। কিন্তু সন্দেহপূর্ণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা এবং প্রতিবাদের একটি দীর্ঘ ইতিহাস সহ একটি দেশে এ নির্বাচনটিও ইতোমধ্যেই বিতর্কের মুখে পড়েছে।
১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশের ১২টি নির্বাচনের মধ্যে মাত্র ৪টি ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ বলে বিবেচিত হয়েছে। বাকিগুলো সহিংসতা, বিক্ষোভ এবং ভোট কারচুপির অভিযোগে নিমজ্জিত হয়েছে।’
এভাবে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোর ভোট কারচুপি ও ভোট জালিয়াতি নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কলঙ্কিত নির্বাচনগুলোর অন্ধকার চিত্রই ফুটে উঠেছে।
জাতীয় নির্বাচনগুলো যথাযথ ও সুষ্ঠু না হওয়ায় রাষ্ট্র ও সরকারে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি যেমন নির্বাচিত হয়নি, তেমনি জনগণের সরকারও গঠিত হয়নি। নির্বাচনে জনগণের সরকার গঠিত না হওয়ায় রাষ্ট্র ও সরকারের যেমন জবাবদিহি নেই, তেমনি সুশাসনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ কারণে দেশটিতে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি তথা অপশাসন চলছে।
দেশ অপশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে উন্নয়ন করতে হলে প্রয়োজন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। দেশের আপামর জনগণ আর ভোট ডাকাতি, ভোট কারচুপি ও আমি ডামির নির্বাচন ও রাতের ভোট তথা প্রহসনের নির্বাচন চায় না। তারা চায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং নিরাপদে নিজের ভোট নিজের পছন্দনীয় প্রার্থীকে দিতে। এককথায় আর নয় ‘আমি ডামির নির্বাচন’ ও ‘দিনের ভোট রাতে’। দেশের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক এবং সাধারণ জনগণ নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারুকÑ এটাই সবার প্রত্যাশা।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা
মেইল : ferdous.ab@gmail.com