দেশে প্রতি লাখে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়
১৯ জুন ২০২৫ ১১:২৪
॥ হামিম উল কবির॥
গর্ভকালীন জটিলতার নাম প্রি-একলাম্পশিয়া। এটি গর্ভাবস্থার খিঁচুনি। খিঁচুনি হলে মা ও শিশু উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশে প্রতি লাখে ৪৬ নারীর মৃত্যু হচ্ছে এ রোগে। এটা কোনো জীবাণুঘটিত রোগ নয়, রোগটা হয়ে থাকে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস থাকলে, উচ্চরক্তচাপ থাকলে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানির কারণে গর্ভবতী নারীদের মধ্যে প্রি-একলাম্পশিয়ার ঝুঁকি বেশি। সেখানে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। শুধু যে উপকূলীয় এলাকার গর্ভবতীরা ভুগছেন তা নয়, ঢাকা শহরের গর্ভবতীরাও এ রোগে ভুগছেন। ঢাকা শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী নিম্নআয়ের এবং আগে উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে প্রি-একলাম্পশিয়ার ঝুঁকি বেশি। এটি গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহ পর দেখা দেয়। রোগটি মা ও অনাগত শিশুর উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নিতে না পারলে মা ও শিশু উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। খিঁচুনি সন্তান প্রসবের সময় এবং প্রসবের পরও হতে পারে। এ রোগে চোখ-মুখ উল্টে যায় এবং হাত-পা শক্ত হয়ে যায়। অজ্ঞান হয়ে পড়েন রোগী। গ্রামে অনেক সময় একে জিন-ভূতের আসর বলা হলেও এটি আসলে মারাত্মক রোগ ‘একলাম্পশিয়া’। এ রোগ মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
কাদের ঝুঁকি বেশি
সাধারণত ২০ বছরের কম বা ৩৫ বছরের বেশি বয়সী গর্ভবতী নারীদের এ ঝুঁকি বেশি হয়। এছাড়া যাদের পরিবারে উচ্চরক্তচাপ বা প্রি-একলাম্পশিয়ার ইতিহাস আছে অথবা গর্ভবতী মায়ের পেটে জমজ বাচ্চা, ডায়াবেটিস রয়েছে, ওজন খুব বেশি, রক্ত জমাটবাঁধাজনিত সমস্যা আছে (যাদের রক্ত সহজে জমাট বাঁধে না) তাদের এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। বিশিষ্ট গাইনকোলজিস্ট ডা. শারমিন সুলতানা বলেন, হঠাৎ করে ওজন বেশি বাড়তে থাকলে, হাতে, পায়ে, মুখে অথবা সব শরীরে পানি জমে থাকলে প্রি-একলাম্পশিয়া হতে পারে। কম বয়সে বিয়ে, কম বয়সে বাচ্চা ধারণ, দারিদ্র্য, অপুষ্টি, ক্যালসিয়ামের অভাব এবং আরো অজানা কারণ থাকতে পারে। এছাড়া মাথাব্যথা, ঘুমের সমস্যা, ওপরের পেটে ব্যথা, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখলে প্রি-একলাম্পশিয়ার লক্ষণ হতে পারে। গর্ভাবস্থার ২০ সপ্তাহ পর যদি কোনো নারীর রক্তচাপ ১৪০/৯০ বা তার বেশি হয় এবং প্রস্রাবের সঙ্গে আমিষ (প্রোটিন) নির্গত হয়, তবে তাকে প্রি-একলাম্পশিয়া বলে। রক্তচাপ যদি ১৪০/৯০’র বেশি কিন্তু ১৬০/১১০’র কম হয়, তবে সমস্যাটি মৃদু হিসেবে ধরে নেন চিকিৎসকরা। রক্তচাপ ১৬০ বা এর বেশি, ডায়াস্টোলিক প্রেশার ১১০’র বেশি হলে সমস্যাটি প্রকট হিসেবে ধরে নেয়া হয়। ডা. শারমিন সুলতানা বলেন, প্রি-একলাম্পশিয়া প্রতিরোধের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। তবে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রক্তচাপ মাপা, প্রস্রাবে প্রোটিন পরীক্ষা করা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি। রোগটি মারাত্মক হলে (অর্গান ফেইলিওর হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে) গর্ভকাল পুরো না হলেও সন্তান প্রসবই একমাত্র সমাধান হতে পারে।
পরিসংখ্যান
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, (পাবমেডে প্রকাশিত) ১৪.৪ শতাংশ গর্ভবতী নারী প্রি-একলাম্পশিয়ায় ভুগছে। এদের ১০ শতাংশ প্রি-একলাম্পশিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন গর্ভের ২০ সপ্তাহের পর। এ গর্ভবতীদের আগে হাইপারটেনশন বা উচ্চরক্তচাপের ইতিহাস নেই। গবেষকরা বলেন, এ রোগের সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী, এটি প্লাসেন্টা (গর্ভফুল) বিকাশে সমস্যা থেকে অথবা রক্তনালীর অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার অসামঞ্জস্যতা থেকে সৃষ্টি হতে পারে।
কী করতে হবে
প্রি-একলাম্পশিয়ার প্রতিরোধে গর্ভাবস্থায় সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রয়োজন। ডা. শারমিন সুলতানা বলেন, যারা ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যাসপিরিন বা ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ উপকারী হতে পারে। সার্বিকভাবে প্রি-একলাম্পশিয়া একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হলেও সময়মতো শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার মাধ্যমে এটি সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রত্যেক গর্ভবতী নারীর উচিত নিয়মিত গর্ভকালীন চেকআপ করা এবং যেকোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। বিশেষজ্ঞরা বলেন, একজন গর্ভবতী নারীর প্রথমবার সন্তান ধারণের সময়ই প্রি-একলাম্পশিয়া হতে পারে। আর যাদের আগের সন্তান ধারণের সময় প্রি-একলাম্পশিয়া হয়েছিল, তাদের ২৫ ভাগ ক্ষেত্রে পুনরায় এটি হতে পারে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে এর জটিলতা হিসেবে কিডনি ও লিভার ফেইলর কিংবা ব্রেইন হেমোরেজও (ব্রেইনে রক্তক্ষরণ) হতে পারে। কিছু রোগীর শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্তক্ষরণসহ অন্যান্য জটিলতা হয়।
প্রি-একলাম্পশিয়া হলে
গর্ভবতী হলে এমনিতেই মায়ের ওজন বেড়ে যায়। একে তো নিজের ওজন, এর সাথে যোগ হয় বাচ্চার ওজন এবং গর্ভাশয়ে থাকা পানির ওজন মায়ের ওজন আরো বেড়ে যায়। এতে বেশি ওজন হওয়ার কারণে ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারায় গর্ভবতী মা পড়ে গিয়ে ইনজুরিতে (শারীরিক আঘাত) ভুগতে পারেন। আঘাত পেলে জিহ্বা কেটে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে গর্ভফুল বিচ্ছিন্ন হয়ে বাচ্চা মরে যেতে পারে। হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, যকৃত (লিভার) কিডনি অকেজো হয়ে যেতে পারে। এমনকি ব্রেইন স্ট্রোক হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
চিকিৎসা
উচ্চরক্তচাপের সঙ্গে প্রস্রাবে অনেক বেশি প্রোটিন (এলবুমিন) যাচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখার মাধ্যমে রোগটি শনাক্ত করা যায়। বাচ্চা যে অবস্থায় থাকুক না কেন, একলাম্পশিয়া হলে ডেলিভারি করিয়ে ফেলাটা উত্তম বলে পরামর্শ দিয়েছেন ডা. শারমিন সুলতানা। তিনি বলেন, এছাড়া মা ও শিশুকে নিরাপদ রাখার খুব বেশি পথ থাকে না। একলাম্পশিয়া হয়ে গেলে যত চিকিৎসাই দেয়া হোক না কেন, ডেলিভারি না করালে রোগী সুস্থ হয় না। তিনি বলেন, রোগটি প্রতিরোধের কিছু উপায় আছে, তবে সব ক্ষেত্রে করা যায় না। ম্যাগনেশিয়াম সালফেট নামক এক ধরনের ওষুধ যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে এসেছে এক্ষেত্রে। তাছাড়া রিস্ক ফ্যাক্টর এড়িয়ে চললে কিছুটা সুফল পাওয়া যায়। গর্ভাবস্থায় নিয়মিত ডাক্তার দেখানো এবং উপরে উল্লেখিত পরীক্ষাগুলো করালে চিকিৎসক আগে থেকেই কিছু ব্যবস্থা নিতে পারে। গর্ভধারণ করলে অবশ্যই গাইনকোলজিস্টকে দেখাতে হবে এবং তার পরামর্শ অনুসারে ওষুধ সেবনসহ অন্যান্য কিছু পরামর্শ মেনে চলতে হবে। গর্ভাবস্থায় উচ্চরক্তচাপ মা ও গর্ভস্থ শিশুর জন্য খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। যাদের আগের সন্তান ধারণের সময় প্রি-একলাম্পশিয়া হয়েছিল, তাদের ২৫ ভাগ ক্ষেত্রে আবার এটি হতে পারে। এছাড়া একাধিক গর্ভধারণ, পলিহাইড্রামনিওস প্রিএকলাম্পসিয়ার কারণ হতে পারে।
কী কী খাবার খেলে রোগটি প্রতিরোধ করা যায়?
ক্যালসিয়াম, আয়রন, আয়োডিন, কোলিন, ভিটামিন ‘এ’, ভিটামিন ‘সি’, ভিটামিন ‘ডি’, ভিটামিন ‘বি৬’, ভিটামিন ‘বি১২’, ফলিক এসিড গর্ভবতীর উপকারে লাগে। ফলমূল, শাকসবজি, গ্রেইনস বা শস্য, আমিষ, দুধ ও দুধ জাতীয় খাবার (ডেইরি), তেল ও চর্বি জাতীয় খাবার উপকারী হয়।
গর্ভাবস্থায় কোন কোন খাবার এড়ানো যায়?
গর্ভবতী মায়েদের নির্দিষ্ট কিছু খাবার থেকে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর তা গর্ভধারণ সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি করতে পারে। গর্ভধারণকালে কাঁচা দুধ খাওয়া ঠিক হবে না। এগুলোয় লিসটেরিয়া নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে এবং লিসটেরিওসিস নামের এক ধরনের রোগ তৈরি করতে পারে।
মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার খাওয়া যাবে না। কারণ সেগুলোয় ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। কাঁচা মাছ ও সিফুড না খাওয়াই ভালো। কারণ এগুলোয় উচ্চমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী থাকতে পারে। কাঁচা মুলা, শিম ও এগুলোয় লিসটেরিয়া, সালমোনিলা ও ই.কোলির মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। কাঁচা বা কম সিদ্ধ ডিম খাওয়া যাবে না। এতে সালমোনিলা ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। যকৃতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকলেও এটা গর্ভধারিণী নারীদের খেতে বলা হয় না। কারণ এতে উচ্চমাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ থাকে এবং এ মাংসে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে।