আল্লাহর দিকে আহ্বান মুসলিমদের অবশ্য করণীয় দায়িত্ব
৯ এপ্রিল ২০২৬ ১১:১২
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি জনপদেই মুসলিমদের অবস্থান রয়েছে। মুসলিম বিশ্বে যেমন ৫০ ভাগ থেকে ৯৯ ভাগ মুসলিম রয়েছে, তেমনি অমুসলিম বিশ্বেও শতকরা ১ ভাগ থেকে ২০ ভাগও মুসলিম রয়েছে। বিশ্বে বর্তমানে ৫৭টি দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। এ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মুসলিম জনসংখ্যা শতকরা ৫০ ভাগ থেকে শুরু করে ৯৯ ভাগ পর্যন্ত। অপরদিকে বিশ্বের অমুসলিম দেশ তথা এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকা মহাদেশের প্রতিটি দেশেই ১ থেকে ২০ শতাংশ কমবেশি মুসলিম আছে। যেমন ভারতে ২০ ভাগ, তেমনিভাবে রাশিয়ায় ১৫ ভাগ মুসলিম। বর্তমান বিশ্বে সংখ্যার দিক থেকে মুসলিম প্রায় ২০০ কোটি, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ। ইসলাম বর্তমান বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম এবং দ্রুত বর্ধনশীল। ইসলাম ও মুসলিমদের এ প্রসার কিন্তু এমনি এমনি হয়নি। শত শত বছর ধরে মুসলিমদের একটি অংশের দাওয়াতি কাজ তথা দাওয়াতে ইলাল্লাহর মাধ্যমেই সারা বিশ্বে কালেমার বাণী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছেছে। আজকের দিনেও মুসলিমরা কালেমার বাণী পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে এবং নওমুসলিমদের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
দাওয়াতে ইলাল্লাহ তথা কালেমার দাওয়াতের এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অবশ্য করণীয়। দাওয়াতে ইলাল্লাহর এ কাজটি করতে আল্লাহ আল কুরআনে যেমন নির্দেশ দিয়েছেন তেমনি হযরত মুহাম্মদ সা. বলেছেন, নিজে করেছেন এবং মুসলিমদের করতে বলেছেন। আল্লাহর রাসূল সা. মক্কায় ঈমান ও ইসলামের যে দাওয়াত শুরু করেছিলেন, তা সারা বিশ্বে ছড়িয়েছে শুধুমাত্র আমলি দাওয়াত ও মৌখিক দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে। হযরত মুহাম্মদ সা. থেকে শুরু করে সাহাবীদের মাধ্যমে যে দাওয়াতি কাজ, তা আজও অব্যাহত রয়েছে। তবে এ দাওয়াতি কাজটাকে গুরুত্ব দিয়ে আরো বেশি মাত্রায় বাড়ানো দরকার ছিল।
দাওয়াত ইলাল্লাহ একটি আরবি বাক্যাংশ, যার অর্থ ‘আল্লাহর দিকে আহ্বান করা’। এটি ইসলামের অন্যতম মৌলিক কাজ, যার মাধ্যমে মানুষকে দুনিয়ায় শান্তি ও আখিরাতে মুক্তির লক্ষ্যে আল্লাহর নির্দেশিত পথে তথা ইসলামের দিকে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। দাওয়াত (আহ্বান) + ইলাল্লাহ (আল্লাহর দিকে) = আল্লাহর দিকে আহ্বান। মানুষকে ঈমান, সৎকর্ম, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের মাধ্যমে আল্লাহর পথে আনা। ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া, যা নবী-রাসূলদের মূল দায়িত্ব ছিল। আর যিনি এই দাওয়াত দেন, তাকে ‘দাঈ’ বলা হয়। এটি মূলত ইসলামের প্রচার-প্রসারের একটি শান্তিপূর্ণ ও জ্ঞানভিত্তিক প্রক্রিয়া, যা মানুষকে অন্ধকারের বদলে আলোর পথ দেখায়।
রাসূল (সা.)-এর প্রথম দাওয়াত
আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে অহির মাধ্যমে ইসলামের বাণী পৌঁছার পর প্রথম দাওয়াত দেন তার স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.)-কে। তার দাওয়াতে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী হলেন তাঁর স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.)। এরপর দ্বিতীয় বা অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলাম গ্রহণকারী প্রধান সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম হলেন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.), তিনি হচ্ছেন কিশোর ও পুরুষদের মধ্যে প্রথম। তারপর দাসদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন হযরত জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.)।
ইসলাম গ্রহণের ধারাবাহিকতায় ১ম হচ্ছেন হযরত খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.) নারী ও সামগ্রিকভাবে প্রথম । দ্বিতীয় হচ্ছেন আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) এবং জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) এবং পরবর্তী প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে প্রথম হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। ইসলাম গ্রহণ করার পর আলী (রা.) রাসূল (সা.)-এর সাথে নামাজ আদায় করেন।
কুরআন হাদীসের নির্দেশ
আল্লাহর রাসূল নিজে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার প্রতিটি মুসলিমকেও এ দাওয়াত দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আল্লাহ নিজেও কালেমা তথা ইসলামের দাওয়াত দেয়ার ব্যাপারে আল কুরআনে অনেক নির্দেশ দিয়েছেন।
সূরা নহলে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে নবী, হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আপনি মানুষকে আপনার রবের পথে ডাকুন। আর তাদের সাথে তর্ক-বিতর্ক করতে হলে সুন্দরভাবে করুন। আপনার রবই বেশি জানেন যে, কে তার পথ থেকে সরে আছে, আর কে সঠিক পথে আছে।’ আয়াত-১২৫।
‘আর তার চেয়ে আর কে উত্তম কথার অধিকারী হতে পারে যে (মানুষকে) ডাকে আল্লাহর পথে, সৎকর্ম করে এবং বলে নিশ্চয়ই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।’ সূরা হা-মীম আস সাজদাহ : ৩৩।
সূরা আলে ইমরানের ১০৪নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান করবে, ভালো কাজের আদেশ দিবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই হবে সফলকাম।’
আল কুরআনের পর হাদীসেও দাওয়াতে ইলাল্লাহর বিষয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) অনেক গুরুত্ব দিয়ে কথা বলেছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) এরশাদ করেন, ‘একটি আয়াত হলেও তা আমার পক্ষ থেকে প্রচার করো। আর বনি ইসরাইলের ঘটনাবলি বর্ণনা করো, তাতে কোনো দোষ নেই। যে ব্যাক্তি আমার প্রতি ইচ্ছাপূর্বক মিথ্যা আরোপ করে, তার নিজ ঠিকানা জাহান্নাম সন্ধান করা উচিত।’ বুখারী।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে হেদায়েতের (সত্য ও সঠিক পথ) দিকে ডাকে,তার জন্য প্রতিদান রয়েছে তাদের সমপরিমাণ, যারা তার অনুসরণ করেছে। এতে তাদের সাওয়াবের একটুও কমবে না। আর যে ভ্রষ্টতার (গোমরাহি) দিকে ডাকে তার ওপর গুনাহ বর্তাবে তাদের সমপরিমাণ, যারা তার অনুসরণ করছে। এতে তাদের গুনাহ একটুও হ্রাস হবে না। মুসলিম।
দাওয়াতের বিভিন্ন পদ্ধতি
আল্লাহর দিকে আহ্বান তথা এ দাওয়াত যেমন ব্যাক্তিগতভাবে হতে পারে, তেমনিভাবে সামষ্ঠিকভাবে হতে পারে। এ দাওয়াত লেখনী তথা পত্রপত্রিকায় নিবন্ধ ও প্রবন্ধ প্রকাশ, বই প্রকাশ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, গ্রুপভিত্তিক দাওয়াত, দিবসভিত্তিক র্যালি, পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, ইসলামী সাহিত্য বিতরণ, দাওয়াতি সভা, জুমার খুতবা, ঈদগাহ মাঠে আলোচনা, আদর্শিক লিফলেট তৈরি ও বিতরণ, ক্যাসেট তৈরি ও বিতরণ, কুরআন হাদীসের বাণী সংবলিত পোস্টার তৈরি ও বিতরণ, আল কুরআনের দারস, তাফসির মাহফিল ও ওয়াজ-মাহফিল প্রভৃতি উপায় ও উপকরণের মাধ্যমে করা যায়।
ব্যক্তিগত দাওয়াত
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যক্তিগত দাওয়াত দিয়ে বেশ সফলতা পেয়েছিলেন। যেমন সর্বপ্রথম দাওয়াত দিলেন খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহা-কে, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে, ওয়ারাকা বিন নওফেলকে দাওয়াত দিলেন এবং সে দাওয়াত তারা গ্রহণও করেছিলেন।
প্রথম দিকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি ইসলামের ছায়াতলে আসার পর বসে না থেকে ইসলামের বাণী মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছানোর কাজ শুরু করেন। যা ব্যক্তিগত দাওয়াতি কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত। এজন্য দেখা যায় যে, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দাওয়াতে ‘আশারা মুবাশ্শারা তথা জান্নাতের সনদপ্রাপ্ত ১০জন সাহাবীর অধিকাংশই ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ওসমান ইবনু আফফান, সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস, ত্বালহা ইবনু ওবাইদুল্লাহ, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আব্দুর রহমান বিন আওফ রাযিয়াল্লাহু আনহুম। যদিও তারা সবাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করেছেন কিন্তু দাওয়াত দিয়েছেন আবু বকর। সুতরাং দাওয়াতের কৌশল হিসেবে ব্যক্তিগত দাওয়াতের প্রভাব অনেক সুদূরপ্রসারী।
সাহাবায়ে কেরামের যুগে ব্যক্তিগতভাবেই দাওয়াতের কাজটি বেশি হয়েছে। প্রত্যেক সাহাবী তাদের নিজস্ব পরিমণ্ডলে ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াত দিয়েছেন। যুগ যুগ ধরে ঈমাম, ফকিহ ও আলেমরাও ব্যাক্তিগতভাবে ইসলামী আদর্শের এ দাওয়াতের কাজটি করেছেন।
দাওয়াতি কাজ ও জামায়াতে ইসলামী
ব্যক্তিগতভাবে এ দাওয়াতের কাজটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে করছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইসলামী সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর নেতা, সদস্য ও কর্মীরা। জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রতিটি সদস্য ও কর্মীকে ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াতি কাজ করতে উদ্বুদ্ধই শুধু করেনি, বরং সদস্যদের বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সদস্য ও কর্মীদের দাওয়াতি কাজের জন্য প্রতি মাসে রিপোর্ট করতে হয়। দাওয়াতের কাজটিকে এতো গুরুত্ব দেয়া হয়েছে যে, জামায়াতে ইসলামী তার গঠনতন্ত্র ও সংগঠন পদ্ধতিতে অন্তর্ভুক্ত করে নেতাকর্মীদের গাইডলাইন দেয়া হয়েছে। দাওয়াতের কাজটার গুরুত্ব তুলে ধরে যথাযথ নির্দেশ করা হয়েছে।
জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ধারা ৫-এ বলা হয়েছে, যে জামায়াতের দাওয়াত নিম্নরূপ হইবে ১. সাধারণভাবে সকল মানুষ ও বিশেষভাবে মুসলিমদের প্রতি জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তা’য়ালার দাসত্ব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করিবার আহ্বান।
২. ইসলাম গ্রহণকারী ও ঈমানের দাবিদার সকল মানুষের প্রতি বাস্তব জীবনে কথা ও কাজের গরমিল পরিহার করিয়া খাঁটি ও পূর্ণ মুসলিম হওয়ার আহ্বান।
গঠনতন্ত্রের এ ধারার আলোকে জামায়াতে ইসলামী তার সংগঠন পদ্ধতি বইয়ে প্রথম দফা কর্মসূচি দাওয়াত ও তাবলিগের প্রথম দফার ৩টি দিকে বলা হয়েছে ১. সকল নাগরিকের নিকট ইসলামের সঠিক ধারণা তুলে ধরা। ২. ব্যক্তি ও সমাজের ভেতর ইসলামবিরোধী ধ্যান-ধারণার অবসান। ৩. ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার জন্য উৎসাহ প্রদান। প্রথম দফার কাজের এক ও দুই নম্বর কাজটি হচ্ছে টার্গেটভিত্তিক ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও গ্রুপভিত্তিক যোগাযোগ।
সামষ্টিক দাওয়াত
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আক্বাবার শপথসহ যে দাওয়াতি কাজ করেছিলেন, তা ছিল সামষ্টিক দাওয়াতের অন্তর্ভুক্ত। প্রথমে ছিলেন মাত্র ৬ জন, অতঃপর ১২ জন পরে ছিলেন ৭৫ জন। একাকী দাওয়াতি কাজ করে গেলেও যখন ‘আপনি নিকটতম আত্মীয়দের সতর্ক করুন’ (সূরা আশ-শু‘আরা : ২১৪) আয়াত নাজিল হলো, তখন তিনি প্রকাশ্যে দাওয়াত দেবেন বলে মনস্থির করলেন। মক্কাবাসীকে জমা করলেন এবং তাদের সামনে প্রকাশ্যে ঐতিহাসিক দাওয়াত দিয়ে তিনি বলেন, হে মানব সকল! তোমরা বল, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মাবুদ নেই, তাহলে অবশ্যই তোমরা সফলকাম হবে’। আমরা জানি সংঘবদ্ধভাবে যেকোনো কাজ করলে তাতে বরকত হয়। আল্লাহ তায়ালাও সংঘবদ্ধ দাওয়াতি কাজকে পসন্দ করেন। ঐক্যবদ্ধ মানুষের ওপর আল্লাহর হাত রয়েছে মর্মে সহীহ হাদীস রয়েছে। নাসাই, হাদীস ৪০৩৭, সনদ সহীহ।
লেখালেখির মাধ্যমে দাওয়াত
দাওয়াতের আরো অন্যতম মাধ্যম হলো লেখনী। মাদ’ঊ বা দাওয়াত গ্রহণকারীরা বিভিন্নজন বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাদের স্বাদ ও চাহিদাও ভিন্ন ভিন্ন। সমাজে অনেকে আছে যারা পড়তে ভালোবাসে। তাই এ সকল পাঠকের চাহিদা পূরণের জন্য লেখা উচিত। সাপ্তাহিক, মাসিক বা পাক্ষিক পত্রিকায় বিষয়ভিত্তিক লিখে তাদের কাছে পৌঁছালে ফল পাওয়া যেতে পারে। ইসলামের পরিপূর্ণ ছায়া যখন করায়ত্ত হলো তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানের নিকট লেখনীর মাধ্যমে চিঠিপত্রের সাহায্যে দাওয়াত প্রেরণ করেছিলেন। ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নাস্তিক বা ইসলামবিরোধী ব্যক্তির লেখনীর জবাবও দেয়া যায় এই কলমের মাধ্যমে।
এ দাওয়াতি কাজ প্রতিটি মুসলিমের জন্য ফরয। এ দাওয়াতের কাজটি যেমন জবানের মাধ্যমে করা যায়, লিখনীর মাধ্যমে করা যায়, তেমিন আমলের মাধ্যমেও করা যায়। তবে আমলের মাধ্যমে দাওয়াতি কাজটি হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর। ইসলামের প্রাথমিক যুগে সাহাবায়ে কেরাম ও তৎপরবর্তী মুসলিমদের আমল দেখেই হাজার হাজার মানুষ ঈমান এনেছেন ও ইসলামকে গ্রহণ করেছেন।
হযরত আলী (রা.) বর্ম ও ইহুদির ইসলাম গ্রহণ
এমন দুটি ঘটনা তুলে ধরছি, যা চৌদ্দশত বছর আগের বাস্তব ও অনুপ্রেরণাময় । একটি হচ্ছে চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর বর্ম হারানো সম্পর্কিত। হযরত আলী (রা.)-এর বর্ম চুরির ঘটনাটি ইসলামী বিচার ব্যবস্থার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং এ ন্যায়বিচারের মাধ্যমে ইসলাম যে ন্যায় ও ইনসাফের জীবন ব্যবস্থা তা ফুটে ওঠে এবং একজন ইহুদি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
হযরত আলী (রা.) খলিফা থাকাকালীন তাঁর বর্মটি এক ইহুদির কাছে পান এবং কাজী শুরাইহের আদালতে মামলা করেন। উপযুক্ত সাক্ষী না থাকায়, খলিফা হয়েও তিনি সাধারণ নাগরিকের মতোই বিচারকের রায় মেনে নেন।
ঘটনাটি হচ্ছে হযরত আলী (রা.)-এর বর্মটি উটের যুদ্ধের (জঙ্গে জামাল) সময় হারিয়ে গিয়েছিল, যা পরে এক ইহুদি ব্যক্তি বিক্রি করার চেষ্টা করে। তা জানতে পেরে হযরত আলী (রা.) ইহুদিকে নিয়ে কাজি শুরাইহের আদালতে যান।
খলিফা আলী (রা.) তাঁর ছেলে হাসান (রা.) এবং গোলাম কানবারকে সাক্ষী হিসেবে পেশ করেন। কিন্তু ইসলামী আইন অনুযায়ী, ছেলের সাক্ষ্য পিতার পক্ষে অগ্রহণযোগ্য হওয়ায় কাজি শুরাইহ ইহুদির পক্ষে রায় দেন। খলিফার বিরুদ্ধে সাধারণ ইহুদির জয় দেখে, ওই ইহুদি সত্য বুঝতে পেরে বর্মটি ফেরত দেয় এবং ইসলাম গ্রহণ করে।
মদীনায় মুসলিম ও ইহুদির পণ্য বিক্রি
আর একটি ঘটনা হচ্ছে ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক তথা লাভকে ত্যাগ করে অপর এক ইহুদিকে সহযোগিতা প্রদান সর্ম্পকিত। একদিন পড়ন্ত বিকেলে মদীনার বাজারে একজন ইহুদি ক্রেতা এসে দাঁড়ালেন এক সাহাবীর দোকানের সামনে। নির্দিষ্ট পণ্যটির দামদরও ঠিক করা হলো। পণ্যও কিনতে সম্মত হলেন ঐ ক্রেতা। কিন্তু বিক্রেতা সাহাবী দূরের আরেকটি দোকান দেখিয়ে দিয়ে বললেন, আপনি পণ্যটি ঐ দোকান থেকে কিনুন। দাম একই, জিনিসও একই। ক্রেতাটি সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে গেলেন অন্য দোকানটায়। সে দোকানটি ছিল এক ইহুদির।
পণ্য কিনে ইহুদি ক্রেতাটি আবার আসলেন সাহাবীর দোকানে। সাহাবীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার জিনিস কি পাওনি সেখানে?’ ইহুদি ক্রেতা বললেন হা পেয়েছি, কিন্তু আমি অন্য একটা কথা জানতে এসেছি। সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন কী?
ইহুদি ক্রেতা বললেন, তুমি যার কাছে আমাকে পাঠিয়েছিলে সে তো হচ্ছে আমার ধর্মের মানুষ মানে ইহুদি। আমরা তো তোমাদের শত্রু মনে করি। কিন্তু তুমি একজন ব্যবসায়ী হয়ে ইহুদি প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে আমাকে পাঠালে কেন! মুসলিম হয়ে একজন ইহুদিকে ব্যবসার সুযোগ করে দিলে কেন?
সাহাবী বললেন, আল্লাহ রহমতে আজকে আমার যথেষ্ট বিক্রি হয়েছে কিন্তু ঐ বেচারা সকাল থেকে বসে আছে, আজ তার কোনো বেচাকেনা হয়নি। তারও তো পরিবার আছে। একজন ক্রেতা পেলে তার চাহিদাটুকুও হয়ত মিটবে।
ক্রেতা হতবাক হয়ে ভাবলেন, যে ধর্ম এভাবে আরেকজন মানুষের কল্যাণের কথা ভাবতে শেখায়, সেটা সত্য ছাড়া মিথ্যা হতেই পারে না। একথা শুনেই ইহুদি ঈমান এনে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করলো। পণ্য কিনতে এসে ইহুদি লোকটি জান্নাত কিনে নিয়ে চলে গেল।
সাহাবাদের মতো একদল মর্দে মুমিনদের দাওয়াত ও বাস্তব আমলের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়েই ইসলাম পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়েছে। সাহাবায়ে কেরামদের চরিত্র এরকমই ছিল। বিধর্মীরা মুসলমানদের আচরণ ও চরিত্র দেখে আবির্ভূত হয়ে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিল।
এই ব্যতিক্রমী দাওয়াতের পেছনের মূল বিষয়গুলো হলো সততা ও নিঃস্বার্থতা। সাহাবী নিজের লাভের কথা না ভেবে প্রতিবেশী দোকানদারের লাভের কথা চিন্তা করেছিলেন। তিনি জানতেন পাশের দোকানদারটি অভাবী, তাই তার প্রয়োজন মেটাতে ক্রেতাকে সেখানে পাঠান। সাহাবীর এই অভাবনীয় সততা ও উন্নত আখলাক দেখে ইহুদি ক্রেতা ইসলাম সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পান।
ইসলাম কিন্তু এভাবেই পৃথিবীতে ছড়িয়েছে। শুধু তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে না, বাস্তব জীবনে ত্যাগ-তিতিক্ষার প্রতিফলনের মাধ্যমেই ইসলামের দাওয়াত বেশি হয়েছে।
সাহাবারা হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের ছাত্র ছিলেন না, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাসজিদে নববীর ছাত্র ছিলেন। তাদের অভিধানে মনোপলি, কম্পিটিটর, গ্রোথ কার্ভের মতো কঠিন সব ধারণা ছিলো না। তারা এই পৃথিবীতে আল্লাহর দেওয়া রিজিক তারা বান্দাদের সাথে ভাগ করে নিতেন। তারা দু’হাত উপুড় করে মানুষকে দিতেন, কারো কাছে ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটাতে হাত পেতে ভিক্ষে মাঙতেন না। শোষণ-লুণ্ঠন-প্রবঞ্চনা তো দূরের কথা।
তবে কালেমা ও ইসলাম সর্ম্পকে মৌখিক দাওয়াতও যেমন দিতে হবে, তেমনিভাবে ব্যক্তিগতভাবে ঘরে ঘরে আল্লাহর দীনের দাওয়াতকে পৌঁছে দিতে হবে। কালেমার দাওয়াত দেয়ার সাথে ইসলামী আদর্শ যে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জীবনবিধান, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুনিয়ার কল্যাণ ও আখিরাতের মুক্তি নিহিত, তা যেমন বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে, তেমনিভাবে মুসলিমদের তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, ব্যবসায়িক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনকেও ইসলামী আদর্শের আলোকে গড়ে তুলতে হবে। এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে পারলেই সারা বিশ্বের প্রতিটি মানুষের কাছে যেমন ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে যাবে এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠালাভ করবে, ইনশাআল্লাহ।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com