ঈদযাত্রা হোক আনন্দময়
১২ মার্চ ২০২৬ ১০:২৮
ঈদ আমাদের দেশের অন্যতম একটি বড় উৎসব। এ উৎসব উদযাপনের জন্য কর্মক্ষেত্র ছেড়ে মানুষ গ্রামের দিকে ছুটে যান। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা স্বজনরা একত্রিত হন শিকড়ের টানে। পরস্পরের মাঝে সম্প্রীতি ও ভাবের আদান-প্রদান হয়। আমরা জানি, পৃথিবীর খ্রিস্ট ধর্মপ্রধান দেশগুলোয় সবচেয়ে বড় উৎসব ও ছুটি উদযাপিত হয় ডিসেম্বর মাসে ‘বড়দিন’ উপলক্ষে। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলমান। তাই স্বাভাবিকভাবেই ঈদ উৎসব ঘিরে আমাদের আয়োজন অন্য যেকোনো উৎসবের চেয়ে বেশি হয়। অন্য ধর্মের বিশ্বাসীরাও এ ছুটি নিজস্ব আয়োজনে উদযাপন করেন। তাদের অনেকে স্বজনের সাথে দেখা করতে গ্রামের বাড়িতে যান। সামর্থ্যবানরা দেশের পর্যটন কেন্দ্র; এমনকি বিদেশেও বেড়াতে যান। তাই পরিবহন সেক্টরের সড়ক, রেল, পানি ও আকাশÑ চার পথেই চাপ বাড়ে। এ চাপ সামাল দিতে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল বিভাগের নজরদারির অভাবে বাড়ে জনদুর্ভোগ। এবার ‘গোদের ওপর বিষফোড়া’ হয়েছে ইরানে আমেরিকার হামলার কারণে জ্বালানি সঙ্কট। তেল ও গ্যাস সঙ্কটে পরিবহন সেক্টর সচল রাখা নতুন সরকারের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন, নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে সরকার ২৬টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত বছরের সফল ঈদযাত্রার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার নতুন কিছু কার্যকর পদক্ষেপ যুক্ত করা হয়েছে। ঈদুল ফিতরের পাঁচ দিন আগে এবং পরের পাঁচ দিন পর্যন্ত বিশেষ তদারকি ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে। নৌপথে; বিশেষ করে সদরঘাট টার্মিনালে যাত্রী হয়রানি বা যেকোনো ধরনের দৌরাত্ম্য কঠোরভাবে বন্ধ করা হবে। রাস্তার ওপর অবৈধ পার্কিং এবং অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করা হবে। নদীপথে স্পিডবোটের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং যত্রতত্র নৌযান পার্কিং বন্ধে কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশ সার্বক্ষণিক তদারকি করবে। ঈদযাত্রায় কোনো অবস্থাতেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা যাবে না। মোবাইলকোর্ট সার্বক্ষণিক মাঠে থাকবে এবং মালিক-শ্রমিক পক্ষ ভাড়া না বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছে। যেসব গার্মেন্টসে জরুরি রফতানি আদেশ নেই, তাদের আগে-ভাগে শ্রমিকদের ছুটির ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পথে পথে যারা অবৈধভাবে গাড়ি থামিয়ে টাকা আদায় করবে, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ামাত্রই অবৈধ চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাত্রীদের যাতায়াত সুবিধা বাড়াতে দুটি বড় জাহাজ রোজার ঈদের আগেই উদ্বোধন করার কথাও মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
আমরা জানি, প্রায় প্রত্যেক ঈদের আগেই এমন ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কথা সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। কিন্তু ‘কাজীর গরু’ কিতাবেই থাকে, গোয়ালে গিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা আশা করি, এবার এর ব্যত্যয় ঘটবে। সরকারের নেয়া ইতিবাচক উদ্যোগগুলো কোন অদৃশ্য কালো হাতের কায়েমি স্বার্থের শিকার হয়ে নস্যাৎ হবে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনের শাসন নিশ্চিত করতে তৎপর থাকে। সচেতনতা বাড়াতে এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করবেন।
আনন্দযাত্রা যেন বিষাদে পরিণত না হয়। এজন্য যাত্রীদের ভূমিকাও কম নয়। সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি- এ আপ্তবাক্য ভুলে গিয়ে বাস, ট্রেন, লঞ্চের ছাদে কিংবা অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকবে হবে। মাল পরিবহনের যানবাহন ট্রাকে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে হবে। পরিবহন মালিকদের দায়িত্ব চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ দেয়া। আমরা আশা করি, অর্থের লোভে ঘুম, বিশ্রাম বাদ দিয়ে চালকদের হাতে গাড়ির স্টেয়ারিং তুলে দিয়ে ড্রাইভার, শ্রমিক ও যাত্রীদের জীবন বিপন্ন করার মতো আত্মঘাতী কাজ থেকে বিরত থাকবেন মালিকরা। টিকিটের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করার অভিযোগের খারাপ বৃত্তও এবার তারা ভাঙবেন। সরকার, প্রশাসন, চালক-শ্রমিক-মালিক ও জনগণের আন্তরিক সচেতন প্রচেষ্টায় এবারের ঈদযাত্রা হবে বিড়ম্বনাহীন ও আনন্দময়।