পরিশূদ্ধতা অর্জনের জন্য রমাদান
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৫
॥ আবু জায়েদ আনসারী ॥
মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো সুশৃঙ্খলিত জীবনযাপন। যে জীবনে মিথ্যা, পরনিন্দা, ধোঁকাবাজি, প্রতারণা, হিংসা-বিদ্বেষ, অশ্লীল কথা ও কাজের কোনো লেশমাত্র থাকতে পারে না। পবিত্র রমাদান মাসে সাধনার মাধ্যমে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করে এসব খারাপ অভ্যাস থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার সর্বোত্তম সময়। রমাদান মাসটিকে বলা হয় সংযমের, আত্মনিয়ন্ত্রণের ও ধৈর্যের মাস। এ মাসে যারা ধৈর্যধারণ করে নিজেকে গঠন করতে পারবেন তাদের বিনিময় হিসেবে আল্লাহ জান্নাত দান করবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমাদান মাসে রোযা রাখবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৯১০)
আরেকটি হাদীসে রোজাদারদের মর্যাদার কথা উল্লেখ করে রাসূল (সা.) এরশাদ করেছেন, “জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে যাকে বলা হয় ‘রাইয়ান’। কিয়ামতের দিন এ দরজা দিয়ে রোজাদারগণ প্রবেশ করবেন। অন্য কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। রোজাদারগণ প্রবেশ করলে এ দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে আর কেউ সেখান দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।” (সহীহ বুখারী)।
সামাজিক জীবনে রমাদান
রমাদানের সিয়াম সাধনা শুধু আখিরাতের জীবনকে সমৃদ্ধ করে না, বরং দুনিয়ায় সামাজিক ব্যবস্থপনার শিক্ষা দেয়। সামাজিক কাঠামো, সংস্কৃতি, অনাচার, শ্রেণি-বৈষম্যকে মানুষের উপলব্ধিতে এনে তা সমাধানে মানবজাতিকে পথনির্দেশ করে-বিবেককে জাগ্রত করে। পবিত্র রমাদান মাসে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত একই নিয়মে সকল রোজাদারকে পানাহার ও যৌনকর্ম থেকে বিরত থাকতে হয়। এতে করে সমাজের দরিদ্র শ্রেণির মানুষেরা অনাহারে থেকে যে কষ্ট পায়, অনাহারীর সে ক্ষুধার জ্বালা রোজার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারে অভিজাত বা ধনিকশ্রেণি ও সচ্ছল মানুষেরা। এতে করে ক্ষুধার্ত ব্যক্তিদের প্রতি অনুকম্পা ও সহমর্মিতার অনুভূতি জাগ্রত করে দেয়া হয় তাদের অন্তরে। যাতে করে সমব্যথিত হয়ে তাদের প্রতি অনেকের সাহায্যের হাত প্রসারিত হয়। ধনীদের মধ্যে সমাজের দরিদ্রতা বিমোচনে ভূমিকা পালন করার অনুভূতি জাগ্রত হয়। জাকাত, ফিতরা ও দানের মাধ্যমে সম্পদের নৈতিক পুনর্বণ্টনের প্রেরণা দেয় পবিত্র মাহে রমাদান। ইসলামী অর্থনীতির ভাষায়, এটি বৈষম্য কমানোর একটি কার্যকর নৈতিক কাঠামো। সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক অর্থনীতির যে নীতিগুলো আমরা তাত্ত্বিকভাবে আলোচনা করে থাকি রমাদান সেগুলোকে বাস্তব জীবনে অনুশীলনের সুযোগ করে দেয়।
মাহে রমাদানের সিয়াম সাধনা একজন ব্যক্তির ওপর অনেকগুলো আচরণগত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। আর যদি সিয়াম সাধনার পরও কারো মনে ন্যূনতম অনুভূতির উদ্রেক না হয়, তাহলে সিয়াম সাধনা বা রোজা রাখা কেবল দুনিয়ার আচার হিসেবে পালন হবে-আত্মিক উন্নতি সাধনে কোনো কাজে আসবে না। ক্ষমাশীলতা ও সহানুভূতি রমাদানের রহমতের শিক্ষা। কোনো ব্যক্তি যখন নিজের ভুল স্বীকার করে মহান রবের দিকে ফিরে আসে, তখন তার আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন হয়, যা তার কর্মে ফুটে ওঠে। পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে তিনি হয়ে ওঠেন সহনশীল ও মানবিক এক সত্তা হিসেবে। অসহিষ্ণুতা, বিদ্বেষ এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি আজ যখন আমাদের সমাজকে বিভক্ত করছে, তখন পবিত্র রমাদানের রহমতের এই শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্র ও বিশ্বের স্থিতিশীল উন্নয়ন ও সামাজিক শান্তির ভিত্তি গড়তে পারে কেবল একটি দয়াপূর্ণ সমাজব্যবস্থা।
তবে রোজার শিক্ষা শুধু মাহে রমাদানের খণ্ডকালীন সময়ের জন্য নয়, বরং বাকি ১১টি মাসের জন্য একটি পথনির্দেশিকা। যেসব বর্জনের চর্চা ও অর্জন হয় পবিত্র রমাদানে, তা পরবর্তী এগারোটি মাস পালন করা হলে সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন সমাজ গড়ে তোলা সহজেই সম্ভব। এ কাজটি সম্ভব হলে মুমিনের আকাক্সিক্ষত জান্নাত আল্লাহ দেবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আবু হুরায়রা (রা.) বলেছিলেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাকে অতি উত্তম কোনো নেক আমলের নির্দেশ দিন।’ রাসূলুল্লাহ সা. বলেছিলেন, ‘তুমি রোজা রাখো। কারণ এর সমমর্যাদার আর কোনো আমল নেই।’ (নাসাঈ)
পরিশুদ্ধ হওয়ার মাস রমাদান
রমাদান ব্যক্তি ও সমাজজীবনকে পরিশুদ্ধ করার মাস। মানব জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে মাহে রমাদানের প্রভাব রয়েছে; বিশেষ করে সামাজিক জীবনে। পবিত্র কুরআনুল কারীমের সূরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, রোজার মাধ্যমে একজন মুমিন মুত্তাকি তথা আল্লাহভীরু হতে পারে। আর যিনি আল্লাহর ভয়ে সকল পাপাচার থেকে বিরত থাকেন, তিনিই মুত্তাকি। সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে আরও বলা হয়েছে, রমাদান মাস, এ মাসেই নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য সৎপথের নিদর্শন এবং হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী।
নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজন খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা করতে গিয়ে মানুষের দৈহিক কামনা-বাসনা অনেক সময় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এতে অনেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শৃঙ্খলাকে উপেক্ষা করে বসেন। মৌলিক চাহিদাগুলোর লাগামহীন অপব্যবহারের ফলে সমাজে অন্যায়, ব্যভিচার এবং অসৎ কার্যকলাপে লিপ্ত হন তারা। এ মৌলিক চাহিদাগুলোর অপব্যবহারের ফলে লাগামহীন ঘোড়ার মতো পানাহার ছাড়া মানুষ যেহেতু বাঁচতে পারে না। তাই রমাদানে কঠিন ক্ষুধার সময় তার যে কষ্ট অনুভব হয় তা সহ্য করার মাধ্যমে সে ধৈর্যশীল ব্যক্তিতে পরিণত হয়। এর ফলে অন্য যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি ধৈর্যের সাথে সে মোকাবিলা করতে পারে। আর এ প্রশিক্ষণ পায় সে রমাদান মাসে। এজন্য পবিত্র কুরআনুল কারীমের নির্দেশনা অনুযায়ী মানব জীবনের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রত্যেকটি পদক্ষেপে আল্লাহর হুকুম মেনে চলার ব্যবস্থাপনা করতে হবে। এর জন্য উত্তম সময় হলো মাহে রমাদান।
সুস্বাস্থ্যের জন্য রমাদান
মাহে রমাদান শুধু আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য নয়, বরং সুস্বাস্থ্য গঠনেও ভূমিকা রাখে এবং সুন্দর ও সুশৃঙ্খল জীবন পদ্ধতির অনুশীলনে সহায়তা করে। এটি সামাজিক ঐক্য ও মানবদেহের নানা জটিল রোগের নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। জার্মানির চিকিৎসক ফেডারিক হরমেন বলেছেন, ‘সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মৃগী রোগ, গ্যাস্ট্রিক ও আলসারের নিরাময় হয়ে থাকে।’
ডা. বেন কিম Fasting for Health গ্রন্থে বেশকিছু রোগের ক্ষেত্রে উপবাসকে চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ, অনেক দিনের মাথা ব্যথা, অন্ত্রনালির প্রদাহ, বয়সজনিত ডায়েবেটিস ইত্যাদি। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সিয়াম পালনকে একবাক্যে উপকারী হিসেবে বলা হয়েছে। ‘Allah clearly declares that fasting in Ramadan is good for mankind. We do not yet know all the physical and spiritual benefits of Ramadan fasting.’
বাতিলের বিরুদ্ধে প্রস্তুতির মাস
মুমিনের জীবন যেমন শৃঙ্খলিত ও সাজানো হয় তেমনি এর মাঝে বাতিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছাপও ফুটে ওঠে। হক ও বাতিল এক সাথে চলতে পারে না। জাতীয় চরিত্র গঠনে রমাদান ভূমিকা রাখতে না পারলে তা ইসলামের বিকাশে কাজে আসে না। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন না আসার কারণ হলো রমাদানে যে আত্মশুদ্ধি করার কথা তা মুসলিম সমাজের অনেক বড় একটি অংশ ধারণ করেন না বলে মনে হয়। কারণ রমাদানকে অনেকে একটি খণ্ডকালীন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নির্দিষ্ট সময় পর এর শিক্ষা বা অনুশীলনকে আর ধরে রাখা হয় না এমনকি ফরজ নামাজও ছেড়ে দেন মুসলিমদের বড় একটি অংশ। এর মানে হলো বাতিল ব্যবস্থার কাছে তাদের আত্মসমর্পণ। ফলে অসাধু ব্যবসায়ী ক্রেতাকে ওজনে কম দেয়া বন্ধ করেন না, সমাজে বন্ধ হয় না চুরি-ডাকাতি, ব্যভিচার ও নানারকম অন্যায় অনাচার। বাতিল ব্যবস্থাপনার মূলোৎপাটন করতে রমাদানকে প্রতি বছর আল্লাহ আমাদের নিয়ামত হিসেবে দান করেন। মনে রাখতে হবে- আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী একজন মুমিনকে সর্বদা বাতিলকে পরাস্ত করার প্রস্তুতি রাখতে হয়। এজন্য রমাদান তাদের জন্য নতুন করে প্রশিক্ষণ গ্রহণের একটি মাসও বটে। কিন্তু বর্তমান মুসলিম সমাজের অনেকেই ‘রমাদান’কে কেবল নিজের আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য গ্রহণ করছেন, যা মোটেও ঠিক নয়। বরং বিপদগ্রস্ত মুসলিম উম্মাহর লাঞ্ছনা, বঞ্চনা এবং নিস্তেজ অস্তিত্বের গ্লানি দূর করতে রমাদানের সাধনা থেকে শক্তি সংগ্রহ করতে হবে। খোদাদ্রোহী তাগুতি শক্তির সকল অপকৌশল, কূটজাল আর চক্রান্তের বেড়াজাল ছিন্ন করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ী সিদ্ধান্তও নিতে হবে পবিত্র রমাদানে। তবেই হেরার রশ্মিতে আলোকিত হবে সমাজ, মুমিন গঠন করতে পারবে তার আকাক্সিক্ষত জীবন।