পাতানো নির্বাচনের পথে বাংলাদেশ?
৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:০২
॥ ফারাহ মাসুম ॥
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে- এটি এখন আর শুধু একটি তারিখ নয়, বরং একটি রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ। প্রশ্নটি আর ‘নির্বাচন হবে কি না’- এ সরলতায় আটকে নেই; বরং বড় প্রশ্ন হলো- এ নির্বাচন কি হবে প্রকৃত অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, নাকি এটি ধীরে ধীরে একটি ‘ম্যানেজড’ বা পাতানো নির্বাচনের দিকে গড়িয়ে যাবে?
এ প্রশ্নের উত্তর এক লাইনে দেওয়া যায় না। কারণ বাংলাদেশ এখন এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, যেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তি, রাষ্ট্রযন্ত্রের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব- এ তিনটি স্তর একে অপরকে প্রভাবিত করছে। ফলে নির্বাচন আর কেবল দল বনাম দলের লড়াই নয়; এটি হয়ে উঠেছে ক্ষমতার কাঠামো পুনর্বিন্যাসের একটি প্রক্রিয়া।
পাতানো নির্বাচন : পুরনো সংজ্ঞা, নতুন রূপ
বাংলাদেশে ‘পাতানো নির্বাচন’ বলতে ঐতিহাসিকভাবে বোঝানো হয়েছে- ভোটের দিন কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ভরা, আগের রাতেই ফল লেখা। কিন্তু আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পাতানো নির্বাচনের রূপ অনেক সূক্ষ্ম।
এখন পাতানো নির্বাচন মানে তিনটি ধাপের সমন্বয়- প্রথমত, প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ : কে প্রার্থী হবে, কে মামলা-মোকদ্দমায় আটকে যাবে, কার মনোনয়ন বাতিল হবে।
দ্বিতীয়ত, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ : প্রশাসন, পুলিশ, স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো ও মিডিয়া ব্যবস্থাপনা। তৃতীয়ত, ফল নিয়ন্ত্রণ : ভোটগণনা ও ঘোষণার পর্যায়ে হস্তক্ষেপ।
২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে লক্ষণীয় বিষয় হলো- বাংলাদেশ এখনো তৃতীয় ধাপে প্রবেশ করেনি, কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
কেন কীভাবে পাতানো নির্বাচন
এ কথা বলা ভুল হবে যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একটি পাতানো নির্বাচনের সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছে। তবে সে পথে যাবার কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যদিও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা এখনো সেই পথে সম্পূর্ণভাবে যেতে বাধা দিচ্ছে।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক নজর ও চাপ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা। গত এক দশকে বাংলাদেশ দেখেছে, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বৈদেশিক ঋণ, রপ্তানি বাজার, ডলার প্রবাহ ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্রের পক্ষে সেই ঝুঁকি নেওয়া সহজ নয়।
দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকাঠামোর অবস্থান। এখন পর্যন্ত সেনাবাহিনী প্রকাশ্যভাবে কোনো দলের পক্ষে অবস্থান নেয়নি। বরং তাদের মূল বক্তব্য- স্থিতিশীলতা, শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা। এ অবস্থানই পুরোপুরি পাতানো নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক।
তৃতীয়ত, বড় বিরোধীদল মাঠে থাকলে নির্বাচন সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে যায় না। এখন বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে দুটি বড় দল ও জোট সমান্তরালভাবে অগ্রসর হচ্ছে। তবে আমলাতন্ত্রের ক্ষেত্রে পতিত স্বৈরাচারের সমর্থকদের সাথে বিএনপির এক ধরনের বোঝাপড়া তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে যা ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে।
ঝুঁকি কোথায়?
ঝুঁকি মূলত লুকিয়ে আছে সেই জায়গায়, যেখানে নির্বাচন হবে, কিন্তু প্রতিযোগিতা হবে অসম। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো প্রশাসনিক মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট। ওসি, ইউএনও, ডিসি পর্যায়ে বদলি ও নিয়োগ, মামলা ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রার্থীকে দুর্বল করা- এ প্রক্রিয়াগুলো নির্বাচনের ফল নয়, বরং নির্বাচনের কাঠামোকেই প্রভাবিত করে। এরপর আছে ‘ম্যানেজড কম্পিটিশন’ মডেল। এতে বিরোধীদল থাকবে, ভোটও হবে, কিন্তু কিছু আসন থাকবে ‘খোলা’, আর কিছু আসন থাকবে কার্যত ‘নিরাপদ’। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটি দেখানো যায় প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হিসেবে অথচ ভেতরে ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রিত থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো মিডিয়া ও বর্ণনার নিয়ন্ত্রণ। নির্বাচন নিয়ে কী বলা যাবে, কী বলা যাবে না- এ ন্যারেটিভ যদি আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে, তবে ফল ঘোষণার আগেই বৈধতার গল্প তৈরি হয়ে যায়।
রাষ্ট্র এখন কোন পথে হাঁটছে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ এখানে- রাষ্ট্র এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেনি। বরং তিনটি পথ খোলা আছে। এক. প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন, যেখানে ফল অনিশ্চিত থাকবে। দুই. ম্যানেজড নির্বাচন, যেখানে অংশগ্রহণ থাকবে কিন্তু প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রিত হবে।
তিন. পুরোপুরি পাতানো নির্বাচন, যা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শংকা।
বর্তমান লক্ষণগুলো বলছে, রাষ্ট্র দ্বিতীয় পথের দিকেই বেশি ঝুঁকছে। এটি এমন একটি মধ্যপন্থা, যেখানে একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ সামাল দেওয়া যায়। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে না। কিন্তু একটি প্রভাবশালী প্রতিবেশী দেশ এবং একটি বড় দল এটিকে ২০০৮ সালের নির্বাচন মডেলের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে।
২০০৮ নির্বাচন : প্রতিযোগিতা কি সত্যিই ছিল?
২০০৮ সালের নির্বাচন বহুল আলোচিত। ভোটার উপস্থিতি ছিল নজিরবিহীন, প্রকাশ্য সহিংসতা তুলনামূলক কম এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও এসেছিল। সে সময় এটিকে অনেকেই ‘সেরা নির্বাচন’ হিসেবে প্রচার করেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক ও একাডেমিক বিশ্লেষণে উঠে আসে ভিন্নচিত্র। প্রকাশ্য ব্যালট কারচুপির অভিযোগ না থাকলেও নির্বাচনের অনেক আগেই প্রশাসনিক ভারসাম্য নির্ধারণ করা হয়, শক্ত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কাঠামোগতভাবে দুর্বল করা হয় এবং নির্দিষ্ট ফলাফলের জন্য পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়।
এটিই ছিল ‘সূক্ষ্ম নির্বাচনী কারচুপি’ যেখানে ব্যালট বাক্সের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল নির্বাচনের পরিবেশ, প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক বয়ান। ভোটের দিনটি শান্তিপূর্ণ ছিল; কিন্তু ভোটের আগেই রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং শক্তির ভারসাম্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ ২০০৮ সালের নির্বাচন ‘প্রকাশ্য স্বচ্ছ’ ছিল, কিন্তু কাঠামোগতভাবে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা সীমিত করা হয়েছিল। এ প্রক্রিয়াটি পরবর্তীতে শুধু বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে দেখা গেছে, যেখানে নির্বাচন হয়েছে; কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত বিকল্প সীমিত ছিল।
১২ ফেব্রুয়ারি : কেন সেই স্মৃতি প্রাসঙ্গিক
আজকের বাংলাদেশ ২০০৮ সালের বাংলাদেশ নয়। সমাজ বদলেছে, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রবাহ দ্রুততর হয়েছে, রাজনৈতিক সচেতনতা বেড়েছে। তবুও, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে যখন একই ধরনের আশঙ্কা ফিরে আসে, তা নিছক অতীতভীতি বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না। এ আশঙ্কার পেছনে অন্তত চারটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে সরাসরি স্পর্শ করছে।
এক. রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অপরিবর্তিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি : নির্বাচন কেবল নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয় না। এটি নির্ভর করে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারব্যবস্থা ও স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোর ওপর। বাংলাদেশে এসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত। ফলে সরাসরি ভোট জালিয়াতি না হলেও, মামলা-মোকদ্দমা, অনুমতি-নিষেধ, নিরাপত্তাব্যবস্থার অসম প্রয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পক্ষপাত- এসবের মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠ একপেশে করে তোলার সুযোগ থেকে যায়। প্রক্রিয়াটি দৃশ্যমান নয়, কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে গভীর প্রভাব ফেলে।
দুই. ‘অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচন দেখানোর কৌশল : ২০০৮ সালের নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল। প্রতিযোগিতা প্রদর্শনের জন্য একটি দৃশ্যমান আবরণ তৈরি করা। এতে দেখা যেত, নির্বাচনে অংশগ্রহণ আছে; কিন্তু কার্যকর বিরোধিতা নেই। একাধিক দল থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতার বিকল্প তৈরি হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিকে বলেন, ম্যানেজড ডেমোক্র্যাসি, যেখানে নির্বাচন কাঠামোগতভাবে অক্ষুণ্ন থাকে; কিন্তু রাজনৈতিক আত্মা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
তিন. আন্তর্জাতিক বাস্তবতা-স্থিতিশীলতার বয়ান : ২০০৮ সালের নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল মূলত একটি কারণে- তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতা। গণতন্ত্রের গুণগতমান নয়, বরং স্থিতিশীল সরকার তখন প্রধান বিবেচ্য ছিল। আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বাংলাদেশকে কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের দেশ হিসেবে দেখে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের সাথে যুক্ত। এ পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক গভীরতার চেয়ে ‘ম্যানেজেবল আউটকাম’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে আপত্তিহীন হলেও অভ্যন্তরীণভাবে বৈধতার সঙ্কটে পড়ে।
চার. প্রযুক্তি ও আইনি নিয়ন্ত্রণ-আধুনিক কারচুপির রূপ : ২০০৮ সালের নির্বাচনকার্য ছিল তুলনামূলকভাবে সরল। রাষ্ট্রের হাতে সীমিত নিয়ন্ত্রণের উপকরণ ছিল, ভোটের দিন কেন্দ্র দখলের প্রয়োজন থাকত এবং প্রকাশ্য কারচুপির চ্যালেঞ্জও তুলনামূলকভাবে সহজে নজরে আসত। তবে ২০২৬ সালের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আধুনিক প্রযুক্তি, আইনি কাঠামো এবং সামাজিক ভয়ের সংস্কৃতি একত্র হয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ‘নীরব কারচুপির’ নতুন রূপ তৈরি করেছে।
প্রথমত, ডিজিটাল নজরদারি ভোট ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা বাড়িয়েছে। অনলাইন প্রচার, সোশ্যাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ ও তথ্যপ্রবাহের ম্যানিপুলেশন ক্ষমতাসীন পক্ষকে ভোটারদের প্রভাবিত করার সুযোগ দেয়। একইসাথে আইনি কাঠামোর ব্যবহার বিরোধীদল ও সমালোচকদের কার্যক্রম সীমিত করে। নির্বাচন-সংক্রান্ত মামলা, অনুমতি-নিষেধ ও আইনি চাপের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মাঠ অসম করে তোলা যায়।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক ভয়ের পরিবেশ নির্বাচনী আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তি, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে শঙ্কা সৃষ্টি হয়। ফলে ভোটার এবং প্রার্থীরা মুক্তভাবে অংশ নিতে ভয় পায়। ফলাফল ভোটের দিন শান্তিপূর্ণ হলেও ভোটের আগেই রাজনৈতিক বাস্তবতা নির্ধারিত হয়ে যায়। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, জাল ভোট বা প্রকাশ্য কারচুপির চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে এ নীরব ও কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ, যা আধুনিক নির্বাচনকে শুধু প্রক্রিয়াগতভাবে বৈধ রাখে; কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অপ্রতিনিধিত্বশীল করে তোলে।
সংক্ষেপে প্রযুক্তি এবং আইনি নিয়ন্ত্রণের সমন্বয় নির্বাচনী কারচুপির একটি নীরব; কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর রূপ সৃষ্টি করেছে।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মাঝখানে বাংলাদেশের নির্বাচন
২০২৬ সালের নির্বাচনকে আলাদা করে বোঝা যাবে না আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ছাড়া। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নির্বাচন মানে বৈধতা, মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক শর্ত। ভারতের কাছে নির্বাচন মানে স্থিতিশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও তাদের অনুকূল ভূরাজনৈতিক ধারাবাহিকতা। এ দুই শক্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র চেষ্টা করছেÑ এমন একটি নির্বাচন আয়োজন করতে, যা একদিকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে না; আবার অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার হঠাৎ পুনর্বিন্যাসও ঘটাবে না। এ কারণেই ২০২৬ সালের রাজনীতি কোনো একক পক্ষের ইচ্ছায় নির্ধারিত হচ্ছে না; তবে এটিকে একদিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে জুলাই বিপ্লব ও সংস্কারের পক্ষের জোটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- শুধু অংশগ্রহণ নয়, সমতা আদায়ের সক্ষমতা। অংশগ্রহণ করে যদি তারা প্রশাসনিক বৈষম্য, মামলা-হয়রানি ও মাঠের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়, তাহলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সেটি তাদের জন্য কাঠামোগত পরাজয় হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে নির্বাচন বর্জন করলে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তারা আবারও দায় চাপানোর রাজনীতির শিকার হতে পারে। ফলে জুলাইয়ের পক্ষের শক্তি একটি কঠিন দ্বন্দ্বে আছে- মাঠে থেকে লড়াই, না মাঠ ছেড়ে নৈতিক অবস্থান।
তাদের পক্ষের কোনো প্রশাসনিক বিন্যাস প্রয়োজন নেই প্রয়োজন হলো প্রশাসনের নিরপেক্ষ আচরণ। জনপ্রশাসন এখন কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব আবদুস সাত্তার। বিপ্লবের পর তিনি অফিসার্স ক্লাবের সম্পাদকের পদ দখল করে নিজের ইচ্ছেমতো অফিসারদের সেখানে বসিয়েছেন। একইসাথে তিনি বেশ সুপরিকল্পিতভাবে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় নিজের ব্যাচের রাজনৈতিক অনুসারীদের বসিয়েছেন। এখন যিনি মুখ্য সচিব, তিনি বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও সাবেক মহাসচিবের একান্ত সচিব ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টার যিনি সচিব, তিনিও বিএনপির এক সাবেক মন্ত্রী ও মহাসচিবের সাবেক একান্ত সচিব। নির্বাচন কমিশন সচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিবও তাদের ঘনিষ্ঠ সার্কেল ও ৮২ ব্যাচের আমলা। এসব কর্মকর্তা নিঃসন্দেহে মেধাবী কিন্তু তারা আবদুস সাত্তার ও বিএনপির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারছেন কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। আবদুস সাত্তারের মনোনীত ব্যক্তিরাই এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করছেন।
কেস স্টাডি : মহেশখালী-কুতুবদিয়া
মহেশখালী ও কুতুবদিয়া মিলিয়ে গঠিত কক্সবাজার-২ আসনটি নির্বাচনী দিক থেকে সবসময়ই সেনসিটিভ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিএনপি এতে প্রার্থী ঘোষণা করেনি; মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, প্রার্থীর নাম পরে ঘোষণা করা হবে। পরে অবশ্য প্রার্থির নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হলেন সাবেক এমপি ও দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। ২ জানুয়ারি শুক্রবার এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বাতিল ঘোষণা করা হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, তার আইনি ও কাগজপত্র তদারকিতে ত্রুটি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ট্রাইবুনালের একটি মামলার তথ্য গোপন থাকার কারণে প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। এতে ফ্যাসিবাদী আমলের ক্যাঙ্গারু টাইব্যুনাল তাকে একটি বিবৃতির জন্য তিন মাসের আদালত আবমাননার দণ্ড দেয়ার কথা জানান, যেটি এখন আপিল বিভাগের বিবেচনাধীন রয়েছে। অথচ ট্রাইবুনাল থেকে স্পষ্ট বলা হয়েছে, মূল ফৌজদারি অভিযোগে দণ্ড ছাড়া আদালত অবমাননার দণ্ডে ট্রাইব্যুনালের সাজায় মনোনয়ন বাতিল হবে না। এ কারণে একই ধরনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত দুজনের প্রার্থিতা সিরাজগঞ্জ ও সিলেটে বাতিল করা হয়নি।
কক্সবাজারের ডিসি উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিএনপি প্রভাবিত হয়ে এটি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে ফেনীতে বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়ন বাতিল হয়নি। অথচ চট্টগ্রাম-৯ আসনে জামায়াতের ডা. ফজলুল হকের এবং কুড়িগ্রাম-৩ মাহবুবুল আলম (সালেহী) প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। অনেক আসনে খোঁড়া অজুহাতে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে অথচ কুমিল্লা-১১ আসনে গ্যাসের বিল খেলাপি হবার বিষয়টি প্রমাণ হবার পরও বিএনপি প্রার্থীর প্রার্থিতা বহাল রয়েছে।
মনোনয়ন বাতিল শুধু কক্সবাজার-২-এ নয়, সারা দেশে ২৩ হাজারের বেশি মনোনয়নপত্রের মধ্যে ৭২৩টি বাতিল হয়েছে বিচারাধীন মামলা, তথ্য অসম্পূর্ণ বা আইনগত ভুলের অপরাধে। এ বাতিলগুলোর মধ্যে ছিল বিএনপি, জামায়াত, কমিউনিস্ট পার্টি, স্বতন্ত্র ও অন্যদের প্রার্থীর মনোনয়নও। এতে একটি প্যাটার্ন দেখা যায়, স্বাধীন বা স্বাধীনভাবে দখলকৃত ভোট সার্টিফিকেশন, হলফনামায় তথ্য গোপন, আইনি তথ্যাদি পরিবেশন না করা ইত্যাদি একই আইনি কারণ হিসেবে দেখালেও রাজনৈতিক দলের প্রেক্ষাপটে তার প্রভাব ভিন্নভাবে পড়েছে। একই অপরাধে একজনের মনোনয়ন বাতিল হলেও আরেকজনের বৈধ রয়ে গেছে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য মূলক কি না?
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, প্রার্থীর উচিত সমস্ত আইনি তথ্য প্রকাশ করা, মামলা সংক্রান্ত সত্যসম্মত তথ্য দেওয়া, সমর্থক ভোটারের তালিকায় সঠিক স্বাক্ষর প্রদান করা। এ নিয়মগুলোর লঙ্ঘন হলে বাতিল হওয়া সহজ। তবে বাস্তব রাজনীতিতে; বিশেষ করে এ মুহূর্তে যখন বিরোধী শক্তির প্রার্থীতালিকা ক্ষীণ, সেই আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োগ উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রতিযোগিতা সংকোচনেও ব্যবহৃত হতে পারে। দেখা গেছে, ‘একই ধরনের ভুল বা তথ্য অসম্পূর্ণতা অনেক জায়গায় দেখা গেলেও কিছু নির্বাচনী আসনে বিশেষভাবে তা কঠোরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে।’ কারণ যেসব আসনে বিএনপির বিপরীতে শক্ত বিরোধী প্রার্থী থাকতে পারতেন, সেসবের কেসে বেশি বাতিলের অবস্থান তৈরি হয়েছে। বিএনপির বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সাধারণ ক্ষেত্রে কড়া ব্যাখ্যার ব্যবহার বেশি দেখা যাচ্ছে।
এতে একটি প্রশ্ন জাগে- আইনের সমান প্রয়োগ হচ্ছে কি, নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রয়োগ? এ বৈষম্য বা পার্থক্যভিত্তিক প্রভাব নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে সংকুচিত করে।
সমালোচকরা বলছেন, এ বাতিলের সিদ্ধান্তগুলো সমানভাবে প্রয়োগ হয়নি; বড় দলগুলো এমন ভুল সহজেই সংশোধন করে চলেছে। শক্তিশালী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে যেমন তথ্যাদি যাচাই করা হয় না, একই আদর্শ এখানে প্রয়োগ হচ্ছে না। তাদের মতে, আইনি নিয়ম কঠোর করেও নির্বাচনী পরিবেশ থেকে প্রতিযোগিতামূলক শক্তিকে সংকুচিত করার একটি কৌশল চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে নির্বাচনে নিয়োজিত রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বক্তব্য হলো, ‘সব সিদ্ধান্ত আইন অনুযায়ী করা হয়েছে; কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই।’ প্রার্থী যারা আইনি তথ্যাদি ঠিকভাবে জমা দেয়নি, তাদের মনোনয়ন বাতিল হওয়া স্বাভাবিক ও নিয়মগত। কিন্তু বৈষম্যের কিছু নজির এতটাই স্পষ্ট যে, সেগুলো অস্বীকার করা কঠিন।
এ প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ‘যদিও অনেক ক্ষেত্রে আইনি ভুলের ভিত্তিতে বাতিল করা হচ্ছে, কিন্তু একই আইনের প্রয়োগে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্যাটার্ন লক্ষ করা যাচ্ছে।’
নির্বাচনী পরিবেশে এর সম্ভাব্য প্রভাব
কেন্দ্রীয়ভাবে এ ধরনের ঘটনা কম প্রভাবশালী প্রার্থীর খেলার মাঠ সংকুচিত করছে; নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে কম সক্রিয় করতে পারে; রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অভিযোগ জাগাতে পারে; আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের চোখে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতায় প্রশ্ন তুলতে পারে। এসব মিলিয়ে এ ধরনের ঘটনা কেবল এক ব্যক্তি বা আসনের ঘটনা নয়, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার গতিপথে এক নতুন সংকেত ফেলেছে।
মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনে প্রার্থিতা বাতিল হওয়া একটি ‘আইনি ব্যাখ্যার ঘটনা’ বলা হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি মনোনয়ন প্রক্রিয়ার কঠোর প্রয়োগ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা সংকোচনের একটি নমুনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও একে সরাসরি ‘উদ্দেশ্যমূলক রাজনৈতিক প্রার্থিতা বাতিল’ বলা কঠিন, এ ধরনের ঘটনা নির্বাচনী পরিবেশের ওপর বিরূপ মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ফেলছে; বিশেষত যেখানে একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম ঘোষণা হওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল হয়ে যায়। ফলে কেবল আইনি ভুল দেখেই নয়, এ ধরনের বাতিল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার শক্তির ভারসাম্য কমিয়ে দিতে সাহায্য করছে বলে অনেক সমালোচক মনে করেন।
শেষ কথা হলোÑ বাংলাদেশ এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাতানো নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে না। কিন্তু এটাও সত্য যে, সচেতনভাবে থামানো না গেলে দেশ সেই পথেই ঢুকে পড়তে পারে। ২০২৬ সালের নির্বাচন তাই শুধু সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়; এটি নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও জনগণের সম্পর্ক কোন পথে যাবে। এ নির্বাচন হতে পারে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পুনর্বিন্যাসের সুযোগ। আবার হতে পারে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী বৈধতা সংকটের সূচনা। কোনটি হবে- তার উত্তর এখনো লেখা হয়নি। কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।