নব্যরূপে ফ্যাসিবাদ ফিরতে চাচ্ছে

হারুন ইবনে শাহাদাত
১ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:১৭

দেশের রাজনীতিতে উত্তাল হাওয়া বইছে। সেই হাওয়ায় বাজছে ফ্যাসিবাদের ডঙ্কা। না, এটা কোনো শঙ্কা নয়- রাজনীতি বিশ্লেষকরা এমন পূর্বাভাস দিয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটাররা শক্ত পায়ে মাঠে দাঁড়িয়ে ফ্যাসিস্টদের দোসর এবং যারা নব্যফ্যাসিস্ট রূপে ফিরতে চাচ্ছে, তাদের প্রতিহত করতে ব্যর্থ হলে ফ্যাসিস্টবিজয় এর ডঙ্কা বাজার আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকরা।
প্রকাশ্যে এবং পর্দার আড়ালে অনেক ঘটনাই ঘটছে। প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। কিন্তু সেই প্রতিক্রিয়া কখনো সাথে সাথে প্রত্যক্ষ করা যায়, আবার কোনো কোনো ঘটনার প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এখন যা ঘটছে, তা আগের কোনো ঘটনার প্রতিক্রিয়া; বর্তমানে যা ঘটছে, তার প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে কয়েকদিন কিংবা বছর পর। রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, আগুন কখনো ছাইচাপা থাকে না। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে তা প্রমাণ হওয়ার পরও দেশের অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও দল তা বুঝতে চাইছে না। তারা ফ্যাসিস্ট হাসিনার মতো একই পথে হেঁটে বিপদ ডেকে আনছেন।
৩৬ জুলাই বিপ্লবের চেতনা পদদলিত করে পুরোনো বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখার জন্য মরিয়া দুর্বৃত্ত গোষ্ঠী। তারা ভুলে গেছেন, তারুণ্যের এ জাগরণ আবেগের নয়, বিবেকের। তাই পুরোনো আবেগের মোড়কে তাদের বন্দি রেখে কলুর বলদের মতো একই চক্করে ঘোরানোর দিন শেষ। তারা ‘রাজা-প্রজার’ সম্পর্ক ভেঙে দেশটাকে নিজের ভাবতে শিখেছে। তাই কারো নিরাপত্তার নামে রাস্তা বন্ধের মতো অমানবিক নিয়মসহ সব বৈষম্যের অবসান চায়। নতুন বাংলাদেশ গড়ার শপথে তারা আজও অতন্দ্র। এ প্রমাণ তরুণরা দিয়েছেন শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির শাহাদাতের ঘটনাপ্রবাহে। এ কথা ভারতের বিশ্লেষকরাও স্বীকার করছেন।
ভারতের আশা-ভরসা
ভারতের বিশ্লেষকরাও বুঝতে পারছেন, আওয়ামী লীগকে নিয়ে বেশি টানাটানি করলে তাদের লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে। তাই নতুন মিত্রের খুঁজে আশায় বুক বেঁধে আছে। এ প্রসঙ্গে ভারতের ওপি জিন্দাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত। তিনি উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মোদি সরকার সেগুলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলেছিল। এখন সেটাই ভারতের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী বাংলাদেশ যে সিদ্ধান্ত নেবে, ভারত সেটাই মেনে নেবে। একইসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের আলোচনাগুলোও পর্যালোচনা করা জরুরি। তার মতে, সব রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে যদি আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে দিল্লি সেটি মেনে নেবে।
ভারতের সাবেক শীর্ষ আমলা এবং প্রসারভারতী বোর্ডের সাবেক সিইও জহর সরকারও মনে করেন, এ মুহূর্তে কোনো প্ররোচনায় না গিয়ে ভারতের উচিত হবে বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা। শেখ হাসিনার পতনের পর ভারত সরকার কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে ভারতের এ আলোচনা ইঙ্গিত করছে, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনের বাস্তবতা দিল্লিকেও মানিয়ে নিতে হচ্ছে।’
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, তাই বলে ভারত বসে নেই। বসে নেই ভারতের প্রিয় পতিত ফ্যাসিস্টরাও। প্রতিদিন নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে।
ফ্যাসিস্টরা নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের নীলনকশার জাল বুনছে
অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, পতিত ফ্যাসিস্টরা নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের নীলনকশার বাস্তবায়নে ততই তৎপর হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক সোনার বাংলার এ প্রতিনিধির সাথে আলাপকালে দৈনিক সংগ্রামের সাবেক সম্পাদক আবুল আসাদ বলেন, জুলাইয়ের চেতনা গ্রাস করে নতুন করে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা এবং পুরোনো বন্দোবস্ত আরো শক্ত করে কায়েম করতে একটি গোষ্ঠী তৎপর। তারা ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে তাদের উদ্দেশ হাসিলে ব্যবহারের জন্য ষড়যন্ত্র করছে। পতিত স্বৈরাচারের দোসররা এ নব্যফ্যাসিস্টদের সাথে যোগ দিয়েছে। ওরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়, কিন্তু সংগঠিত। কিন্তু ফ্যাসিস্টবিরোধী শক্তির মধ্যে ঐ শক্তি ফাটল ধরাতে অর্থ খরচের সাথে সাথে ক্ষমতার লোভ দেখাচ্ছে। ভয় দেখাচ্ছে। দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে সন্ত্রাসীদের অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে মাঠে নামাচ্ছে।
তিনি মনে করেন, জুলাই বিপ্লবের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন এবং তা টিকিয়ে রাখতে শত্রু-মিত্র চিনতে হবে। মিত্রদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সতর্ক দৃষ্টি ও কর্মকৌশলে তাদের প্রতিহত করতে হবে।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিতেই পরিবর্তন আনেনি। গোটা উপমহাদেশে নতুন একটি রাজনৈতিক ধারার সৃষ্টি করেছে। যার প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার স্বঘোষিত মোড়ল ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদি সরকারের মসনদ কেঁপে উঠেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ নিয়ে অর্ধশতাব্দী ধরে চলা ভারতের আধিপত্যবাদ চরম সঙ্কটে পড়েছে। বাংলাদেশের মানুষ; বিশেষ করে তরুণরা ভারতীয় হেজিমিনির শিকল ছেঁড়ার শক্তি ও সাহস ফিরে পেয়েছে। তাই তাদের নতুন করে বন্দি করতে নতুন দোসর খুঁজছে, পুরোনোদের সক্রিয় করছে এবং তারা ষড়যন্ত্রের জাল ফেলছে।
ভারতীয় মিডিয়ার বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, ‘রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য ভারত ইতোমধ্যেই একটি রাজনৈতিক দলকে তাদের পাশে পেয়েছে। তাদের ক্ষমতায় বসাতে পারলেই তারা আবার বাংলাদেশকে করদরাজ্য হিসেবে পাবে। হাসিনার সাথে করা কোনো চুক্তি বাতিল হবে না।’
আরো যা যা ঘটবে
তবে ভারতীয় মিডিয়া যা বলেনি অথচ ভারেতর নতুন মিত্র বাংলাদেশের ক্ষমতায় এলে ঘটবে, তা হলো-
১. নিরাপত্তার নামে বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা অফিস খোলার অনুমতি পাবে। বাংলাদেশের পক্ষের দেশপ্রেমিক নাগরিকদের গুম, খুন করার অথবা আটক করে তাদের দেশের জেলখানায় রাখার লাইসেন্স পাবে।
২. পিলখানার মতো অন্য কোনো ট্রাজেডি ঘটিয়ে সেনাবাহিনীর দেশপ্রেমিক অংশকে হত্যা করে নিরাপদে ভারতে ফিরতে কোনো বাধা থাকবে না।
৩. পাড়ায় পাড়ায় মাদকের লাইসেন্স দিয়ে তরুণদের ধ্বংস করতে পাড়ার নেতাকে বখরা দিলে তিনি বিড়াল থেকে বাঘে পরিণত হয়ে নিরীহ নাগরিকদের মুখ বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করবেন।
৪. দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় আদর্শের বিকাশ রোধ করতে জামাতুল মুজাহিদিনের মতো ইসলামী নাম ব্যবহার করে বর্ণচোরা আওয়ামী জঙ্গিগোষ্ঠী তৈরি করে আলেমদের হত্যা নির্যাতন এবং বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করতে তখন কোনো মিডিয়া, সরকার ও প্রশাসনের বাধা থাকবে না, বরং সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
৫. পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের বদলে কথিত সুশীলদের অন্ষ্ঠুান শুরু হবে মঙ্গলপ্রদীপের মতো অগ্নিপূজায়।
৬. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে সংখ্যালঘু কার্ড খেলতে কোনো বাধা থাকবে না।
৭. সবচেয়ে মারাত্মক যা ঘটবে, তা হলো ৩৬ জুলাই চেতনার কবর রচনা করতে শহীদ হাদির মতো জুলাইযোদ্ধাদের একে একে দুনিয়া থেকে বিদায় করা হবে।
এটি শুধু শঙ্কা নয়, পূর্বাভাস বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। কিন্তু তারা এমনটা মনে করছেন?
কেন শঙ্কা নয় পূর্বাভাস
আওয়ামী লীগ ত্রয়োদশ নির্বাচনের মাঠে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে নেই। কিন্তু তারপরও বিভিন্ন সূত্র বলছে, তাদের দোসর জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী শরিক ১৪ দলীয় জোটের ব্যাপারে সরকার নীরব। আওয়ামী লীগ তাদের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীও হয়েছে। ভয়াবহ বিষয় হলো বিএনপি থেকেও তাদের কয়েকজন মনোনয়ন পেয়েছেন বলে কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানের জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ পশ্চিমা বিশ্বের ব্যাপক চাপ রয়েছে। আমার ধারণা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই চাপ উপেক্ষা করতে পারছে না। বরং সরকারের নমনীয় নীতির কারণে গণতন্ত্র ধ্বংসকারী ফ্যাসিবাদের দোসররা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেÑ এটা কখনোই কাম্য ছিল না। বিশেষ করে জাতীয় পার্টির ওপর ভর করে ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হবে বলে আমি মনে করি।
তিনি মনে করেন, ‘ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ বিতাড়িত হওয়ার পরপরই তাদের দীর্ঘদিনের সহযোগীদের বিচার করা উচিত ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকার সেটা করতে পারেনি। এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে। সেই নির্বাচনেও ফ্যাসিবাদের দোসররা অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাচ্ছে। এটা জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিটের সাথে কোনোভাবেই মানানসই নয়।’
এখন প্রশ্ন হলো- তাহলে উপায় কী? কথায় আছে বারো মুশকিল তেরো আসান। অতএব ভয় নেই।
কী সেই আসান
এ সঙ্কট উত্তরণে ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির সীসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্য অপরিহার্য বলে মনে করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, পতিত ফ্যাসিস্টরা ভোটারবিহীন প্রহসনের মাধ্যমে নির্বাচিত ক্ষমতাসীন দল দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংস করেছিল। ৩৬ জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্টরা পালিয়েছে, কিন্তু তাদের দোসরা এখনো সক্রিয়। তারাও ভারতে বসে কলকাঠি নাড়ছে। তাদের ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে হ্যাঁ ভোট ও ফ্যাসিস্টবিরোধী শক্তির বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। তবেই আমরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে পারব। এ সংগ্রামে তিনি সকলকে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান।
রাজনীতি বিশ্লেষকরাও মনে করেন, জুলাই চেতনা বাঁচাতে শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির এ শপথ মনে রেখে পথচলার বিকল্প নেই, ‘জীবন দেবো জুলাই দেবো না।’