ফ্যাসিবাদ মোকাবিলায় ঐক্যই শক্তি


১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:৪৯

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
ফ্যাসিবাদের অস্ত্রের মোকাবিলায় ঐক্যই গণতন্ত্রের শক্তি। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদী অপশক্তির অস্ত্রের মোকাবিলা করতে গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যের বিকল্প নেই- এ আপ্তবাক্য ৩৬ জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ের ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর মতোই বিস্মৃত হতে বসেছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, তাদের বিস্মৃতির এ ঘোর না কাটলে ফ্যাসিস্টদের অস্ত্রের ব্যবহার বাড়বে এতে সন্দেহ নেই। গত ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার রাজধানীর বুকে প্রকাশ্য দিবালোকে ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর জঙ্গিরা যে দুঃসাহস দেখিয়েছে- ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদির মাথা লক্ষ করে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ছুড়েছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি পতিত ফাসিস্টদের পরিকল্পিত নীলনকশার অংশ। এর আগেও দেশবাসী দেখেছে কীভাবে সরকারের মাঝে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররা গণঅধিকার পরিষদের নেতা ভিপি নূরের ওপর হামলা করেছিল। সেদিনও নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিলো। এ প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য সেসব ঘটনার অনুসন্ধান নয়, বরং গণতান্ত্রিক শক্তির অনৈক্য ফ্যাসিস্ট আওয়ামী জঙ্গিদের গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করছে, সেই সত্য জাতির সামনে তুলে ধরা। কারণ রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, পতিত ফ্যাসিস্টরা তাদের যুদ্ধ শেষ করেনি, বরং গণতান্ত্রিক শক্তিকে বিভক্ত করে চূড়ান্তভাবে মরণ কামড়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের এ আশঙ্কা যে অমূলক নয়, সিনিয়র নেতাদের বক্তব্যই তার প্রমাণ।
কী ভাবছেন সিনিয়র নেতারা?
ফ্যাসিস্ট জঙ্গিগোষ্ঠী পতিত আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার মনে করেন, ষড়যন্ত্র এখনো চলছে, ঐক্যভাবে তা প্রতিহত করতে হবে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মত-পথের ভিন্নতা থাকলেও জাতীয় স্বার্থে দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এ সময় অনেক অপশক্তি নানা ষড়যন্ত্র করবে, ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গঠনে অনেক বাধাই আসতে পারে। তবে জাতীয় নির্বাচনের দিকে যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছে, সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে তা এগিয়ে নিতে হবে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘ভারতে পলাতক হাসিনা একের পর এক হুংকার দিচ্ছে। জুলাই-আগস্টের গণহত্যায় অভিযুক্ত শাজাহান খান গং আদালতে এসে সরকারকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। আদালতকে ভেংচি কাটছে, পুলিশকে থোড়াই কেয়ার করছে। হাসিনার দোসররা আসামি হয়েও আদালতে যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করছে, তা মূলত অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘অকার্যকর’ প্রমাণের এক গভীর চক্রান্ত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ প্রশাসনের নীরবতায় তারা এমন আচরণ করছে। মাদার অব মাফিয়া শেখ হাসিনা দেশের যে সম্পদ পাচার করেছে, সেই সম্পদের মুনাফা দিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়।’
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরই ইনকিলাব মঞ্চের শরীফ ওসমান হাদির ওপর কাপুরুষোচিত গুলি এবং পরিকল্পিতভাবে গণপরিবহনে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো কোনো সাধারণ ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি’ নয়। এগুলো সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যা সরাসরি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে সহিংস হুমকি এবং দেশের গণতান্ত্রিক অস্তিত্বের ওপর নির্লজ্জ হামলা। দেশে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রতিহিংসামূলক আচরণ কেবল কোনো ব্যক্তি, দল বা নির্দিষ্ট নির্বাচনের বিরুদ্ধে নয়, এটি সরাসরি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পবিত্রতা, সামাজিক সংহতি এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্রমূলক হুমকি। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, রাজনৈতিক বিভাজন এমন এক বিপজ্জনক সীমায় পৌঁছেছে, যেখানে মতের পার্থক্য আর গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার সুস্থ বাতাবরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা রূপান্তরিত হয়েছে সংঘাত, আক্রমণ, বানচাল ও রাষ্ট্রীয় ভয়ের সংস্কৃতিতে।’
বিদেশে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্টরা তাদের লুটের টাকার সাথে প্রয়োজনে আরো টাকা সংগ্রহ করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে, ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির ওপর হামলা সেই নীলনকশারই অংশ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এর মাধ্যমে তারা দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকে বাধাগ্রস্ত এবং গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে নিজেদের হীন স্বার্থসিদ্ধি করতে চায়। এর প্রেক্ষাপট তৈরি করতে আ’লীগ তাদের সফট পাওয়ারগুলো সক্রিয় করছে এবং ব্যবহার করা শুরু করেছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ’লীগের সফট পাওয়ারগুলো এখনো সক্রিয়
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনীতিতে কেবল বিপুল জনসমর্থন আর আদর্শ থাকলেই হয় না, রাজনীতির খেলায় সফট পাওয়ার বা মেধাভিত্তিক নরম শক্তি খুবই জরুরি। নেতা-কর্মী, জনগণ ও জনসমর্থন হলো হার্ড পাওয়ার। অন্যদিকে মিডিয়া, সাংস্কৃতিক উইং ইত্যাদি হচ্ছে সফট পাওয়ার। মিডিয়া, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক সংগঠন, আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সমস্ত বুদ্ধিজীবীরা এ সফট পাওয়ারের জোগান দেয়। ৩৬ জুলাই বিপ্লবের শক্তিগুলোর মধ্যে ফাটল ধরাতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ তাদের জঙ্গিদের উসকে ও বৈধতা দিতে সফট পাওয়ারগুলোকে মাঠে নামিয়েছে। এর মধ্যে যেমন আছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেল, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, তেমনি আছে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, টকশো, সেমিনারসহ নানা কিসিমের নতুন উদ্ভাবিত কর্মসূচি।
উদাহরণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় সফট পাওয়ারের একটি কার্যক্রম দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে। দেশ অস্থিতিশীল করতে ফ্যাসিস্ট অপশক্তি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী সফট পাওয়ারের নীলনকশার বাস্তবায়ন দেখে জাতি হতবাক।
গত ১৪ ডিসেম্বর রোববার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের চোখে ধুলা দিয়ে একদল দুর্বৃত্ত জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদকে ব্যবহার করে, ‘চিত্র প্রদর্শনী এবং তুলির আঁচড়ে দ্রোহ’ শিরোনামে দাড়ি-টুপিকে অপমানের আয়োজন করেছিল। সরেজমিন দেখা যায়, অঙ্কিত প্রতীকী চিত্রগুলো হল প্রশাসন পানি দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করলেও তা পুরোপুরি মুছে যায়নি; বরং চিত্রগুলো এখনো দৃশ্যমান। ছবিগুলো দেখে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মন্তব্য করেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নত দাড়ি ও টুপির অবমাননা করা হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ দেবাশীষ পাল বলেন, হল সংসদের নেতারা এসব চিত্রাঙ্কন করেছে এবং তা সম্পূর্ণভাবে হল প্রশাসনের অজান্তে করা হয়েছে। যেহেতু বিগত সময়ে কখনোই ১৪ ডিসেম্বর বা শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালনে এ ধরনের কোনো কার্যক্রম হয়নি, তাই কর্তৃপক্ষ প্রতীকী চিত্রগুলো মুছে ফেলেছে।
এছাড়া শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রাজাকার ঘৃণাস্তম্ভে’ জুতা নিক্ষেপ কর্মসূচি ছিলো কার্যনিষিদ্ধ আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের দোসরদের এমনই একটি বর্ণচোরা কর্মসূচি। গত ১৪ ডিসেম্বর রোববার দুপুর ১২টা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ক্যাফেটেরিয়া ভবনের সামনে, এ কর্মসূচির নামে তারা রাষ্ট্র ও আইন-আদালতকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং জাতীয় ঐক্য সংহতি নষ্ট ও সহিংসতাকে উসকে দিতে চেয়েছে কতিপয় দুর্বৃত্ত। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এসব কিছুই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ’লীগের সফট পাওয়ারগুলোর দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বিনষ্টের নীলনকশার অংশ।
জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের ভিপি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল থেকে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে। জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের ভিপি ছাত্রদল নেতা পল্লব চন্দ্র বর্মণ জানিয়েছে, মহান শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে আয়োজিত ‘চিত্র প্রদর্শনী এবং তুলির আঁচড়ে দ্রোহ’ নামে এ আয়োজন করেছে। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, জাতীয় ঐক্য ও সংহতির স্বার্থে মূল দল বিএনপির উচিত ছিল তাদের ছাত্র শাখাকে এমন কর্মসূচি থেকে বিরত রাখা। কিন্তু রাজনীতি বিশ্লেষকদের একটি অংশ বিএনপির বর্তমান কার্যক্রম পর্যালোচনা করে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, ‘বিএনপির নীতিনির্ধারকদের একটি অংশও ফ্যাসিস্টদের ফাঁদে পড়েছেন।’
সফট পাওয়ারভূত হার্ডকোরের ঘাড়ে
তাদের এমন ভাবনার কারণ পতিত ফ্যাসিস্টদের পতনের কারণ যে বয়ান, সেই ভূত সফট পাওয়ারেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং বিএনপির হার্ডকোরের ঘাড়ে সওয়ার হয়েছে। তারা বিএনপির নেতাদের বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতি ও কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। উদাহরণ এত বেশি যে তা টপ-টু বটম পর্যন্ত বিস্তৃত, তাই লিখতে গেলে মহাকাব্যে পরিণত হবে। অতএব ফুলস্টপ। তবে গত ১৫ ডিসেম্বর সোমবার ‘সর্বদলীয় সমাবেশে’ সংহতি জানালেও বিএনপির কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকার শূন্যতায় জনমনে নানা প্রশ্ন জাগছে।
উল্লেখ্য, ওসমান হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলির প্রতিবাদে ডাকা এ সমাবেশ গত ১৫ ডিসেম্বর সোমবার বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত হয়। এর আয়োজক ছিল ইনকিলাব মঞ্চ। সমাবেশে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বক্তব্য দেন। কিন্তু বিএনপির কেউ সেখানে ছিলেন না। সমাবেশের শেষ দিকে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব সমাবেশের সঞ্চালক আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, বিএনপি এ সমাবেশে সংহতি জানিয়েছে। কথায় আছে মুখের কথায় চিড়ে ভিজে না। ঠিক তেমনি সংহতির ঘোষণায় জনমনের সংশয় কাটেনি। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বিএনপির উচিত সংশয় কাটানো।
তারা আগামী দিনে যেকোনোভাবে ক্ষমতায় যেতে চায়, প্রয়োজনে ২০০৮-এর নীলনকশা অথবা কেন্দ্র দখল করে হলেও, নেতাদের এমন বক্তব্য ও দুঃস্বপ্ন থেকে সরে আসতে হবে। জনগগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার আন্দোলনে শরিক থাকতে ব্যর্থ হলে পরিণতি কী হয়, সদ্যসমাপ্ত ঐতিহাসিক ঘটনা তার তাজা প্রমাণ। অতএব জাতীয় ঐক্য ও সংহতি নষ্টের পথে যারাই হাঁটার চেষ্টা করবে, জনগণ তাদের ক্ষমা করবে না। কারণ ভারতীয় আগ্রাসন ও ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ। গত ১৫ ডিসেম্বর জাতীয় শহীদ মিনারের সমাবেশ এ বার্তাই দেয় বলে মনে করেন অভিজ্ঞমহল। অতএব সাবধান!