দেশে অবৈধভাবে কর্মরত ২৬ লাখ ভারতীয়
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:১৫
নিয়ে যাচ্ছে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা
সরকারের কাছে নেই হালনাগাদ তথ্য
॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
বাংলাদেশে কর্মরত লাখ লাখ অবৈধ ভারতীয় নাগরিকের চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি অনুমোদন কিংবা ট্যাক্স প্রদান ছাড়াই বছরের পর বছর অবস্থান করে হুন্ডিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বাংলাদেশের কষ্টার্জিত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যাচ্ছে এসব অবৈধ ভারতীয়। বিগত আওয়ামী লীগ সময়ে এসব ভারতীয় নাগরিক বিনা চ্যালেঞ্জে অবৈধ কর্মকাণ্ড করে এলেও এখনো নেই তাদের কোনো হালনাগাদ হিসাব। সার্বিক বিষয়টি বর্তমানে বাংলাদেশের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখা দিলেও নেই কোনো কার্যকর ব্যবস্থা।
বাংলাদেশে ২৬ লাখ ভারতীয় অবৈধভাবে উচ্চ বেতনে : বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কাজ শুরু করার পর আইন এবং প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বাংলাদেশে ২৬ লাখ ভারতীয় অবৈধভাবে উচ্চবেতনে কাজ করছে। যেখানে বাংলাদেশের মেধাবী ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষার পাঠ চুকিয়ে চাকরির জন্য হাহাকার করে এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে পায়ের জুতা ক্ষয় করেও চাকরি পায় না, সেখানে দেশের মেধাবীদের চাকরি হয় না, কিন্তু ভারতীয়দের ঠিকই জোর করে ‘প্রভাব খাটিয়ে’ বিভিন্ন সেক্টরে বিগত আওয়ামী লীগের পনেরো বছর চাকরিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো।
আর আমাদের মেধাবীরা চাকরির জন্য বার বার বিভিন্ন দরজায় ঘুরতে ঘুরতে সব দরজা যখন বন্ধ হয়ে যেত, তখন তাদের ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত রিকশা চালাতে হতো কিংবা পথেঘাটে পান-চা-সিগারেট বিক্রি করতে হতো। এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। আমাদের মেধাবীদের কৌশলে ব্যর্থ করে দিয়ে ঠিকই সেসব জায়গায় ভারতীয়দের ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর বলা হতো, এদের তো ‘যোগ্যতা’ নেই। তাহলে যোগ্যতার মাপকাঠি কী? ভিনদেশি হয়েও দেশের ভেতরে ভারতীয়রা কীভাবে কোন শক্তিবলে দেশের চাকরির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে?
ব্রিটিশদের মতো ভারত বাংলাদেশে আরেক সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে গেছে, যেটাকে ‘নিউ-ইম্পেরিয়ালিজম’ বলে বিশ্লেষকরা বলছেন। বাংলাদেশের সব সেক্টরে ভারতীয়দের ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে সুকৌশলে।
রেমিট্যান্স আয়ে ভারতের চতুর্থ বড় উৎস বাংলাদেশ : প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন তথা ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স ভারতে চলে গেছে। যার কারণে এ হিসেবে দেখা গেছে, রেমিট্যান্স আয়ে ভারতের চতুর্থ বড় উৎস হচ্ছে বাংলাদেশ।
তৈরি পোশাক কারখানার বেশ কয়েকজন মালিক নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানান, বাংলাদেশে অনেকগুলো বায়িং হাউস ভারতীয়রা নিয়ন্ত্রণ করে। সেই সুবাদে পোশাক খাতে ভারতীয়দের অবস্থান শক্ত। এর মধ্যে ডিজাইনসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে দক্ষ জনশক্তির অভাব আছে। আর পোশাকের বায়িং হাউসগুলো যেহেতু নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয়রা। ফলে পোশাক কারখানাগুলো বায়ার পেতে তাদের কারখানায় মার্কেটিং এবং হিসাব বিভাগেও ভারতীয়দের নিয়োগ করে। তাদের মতে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোয় এক লাখেরও বেশি ভারতীয় কাজ করে।
পোশাকের পরে আইটি খাতে দাপট রয়েছে ভারতীয়দের। এছাড়া আরও অনেক সেবা খাত আছে, যেখানে ভারতীয়রা কাজ করেন। এমনকি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম, বিজ্ঞাপন, কনসালটেন্সিÑ এসব খাতেও ভারতীয়রা রয়েছে।
আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে এসব ভারতীয়ের অধিকাংশেরই কোনো ওয়ার্ক পারমিট নেই। তারা ট্যুরিস্ট ভিসায় আসে আর তাদের বেতন অনেক বেশি। ট্যুরিস্ট ভিসায় যারা কাজ করে তাদের আয় করা পুরো অর্থই অবৈধ পথে বাংলাদেশের বাইরে চলে যায়।
বাংলাদেশের আইটি খাতের একজন উদ্যোক্তা জানান, ‘সফটওয়্যার ও ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে ভারতীয় কৌশল ব্যবহারের কারণে ওই দেশের জনশক্তিকেও কাজ দিতে হয়। শুধু তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তাদের লোক রাখার শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। আবার ট্রাভেল এজেন্টদের বড় একটি অংশ ভারতীয়দের নিয়ন্ত্রণে। তাই তাদের সফটওয়্যার ও তাদের লোকবলে কাজ হয়। এটা সরকারের পলিসির বিষয়। কিন্তু সরকারিভাবে এসব পলিসি ঠিক করা হয়নি।
এছাড়া দেশে অবৈধভাবে অবস্থানরত ভারতীয় অনেকেই মাদক ব্যবসা, বিভিন্ন দেশের জাল মুদ্রার কারবার, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা, সোনা চোরাচালান, অনলাইনে ক্যাসিনো, মানব পাচারসহ সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িত।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ভারত সবচেয়ে বেশি আয় করে সংয্ক্তু আরব আমিরাত থেকে, দ্বিতীয় ইউএসএ, তৃতীয় সৌদি আরব, চতুর্থ ইউকে এবং পঞ্চম বাংলাদেশ থেকে। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় নাগরিকরা যে টাকা আয় করে, তা ইতালি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জার্মানিসহ বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্র থেকেও ঐ টাকা উপার্জন করতে পারে না।
আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভারতীয় ২২ কোটি মুসলমান অবহেলিত-নিগৃহীত হলেও তাদের শীর্ষ ৫ রেমিট্যান্স জোগানদাতা দেশের ৩টি মুসলিমপ্রধান দেশ এবং শীর্ষ ১০ রেমিট্যান্স জোগানদাতা দেশের মধ্যে ৭টি দেশ মুসলিমপ্রধান।
বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ
বাংলাদেশের চাকরির বাজার নিয়ে কাজ করা সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হলো বিডিজবস ডটকম। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর জানান, ‘কর্মরত বিদেশিদের মধ্যে ভারতীয়রাই শীর্ষে। তারপরে শ্রীলঙ্কা, চীন ও থাইল্যান্ড। এদের মধ্যে শতকরা ১০ ভাগেরও ওয়ার্ক পারমিট নেই। অধিকাংশই অবৈধভাবে কাজ করে। তাদের পেমেন্টও এখানে করা হয় না। ভারতীয় হলে তার পেমেন্ট ভারতেই দেয়া হয়। যারা নিয়োগ করে তারা এরকম একটা সিস্টেম গড়ে তুলেছে।’
বাংলাদেশ থেকে কত রেমিট্যান্স দেশের বাইরে যায়, সেই হিসাবটি দেখলে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিদের সংখ্যা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। আর বাংলাদেশ থেকে ভারতেই বেশি রেমিট্যান্স যায়। পোশাক খাতের আয়েরও বড় একটি অংশ তাদের টেকনিশিয়ান ও ডিজাইনারদের পাশাপাশি অ্যাকাউন্টেন্ট, প্রশাসনিক কাজেও বাইরে থেকে লোক আনা হয় বলে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ। তিনি জানান, ‘প্রতি বছর আমাদের দেশ থেকে চার-পাঁচ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর এবার আমাদের রেমিট্যান্সের আয়ের বিরাট একটি অংশ। দেশে লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার থাকা সত্ত্বেও লাখ লাখ ভারতীয় জনবল বাংলাদেশে কাজ করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী সভাপতি এবং বেসরকারি সেবা সংস্থা ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘শিক্ষায় আমরা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পেরেছি। কিন্তু শিক্ষার মান নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন। আর এটিই হচ্ছে চ্যালেঞ্জ। লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার। এত বেকার থাকার পরও বাংলাদেশের মতো ছোট্ট একটি দেশে কাজ করছে ভারতের কয়েক লাখ মানুষ। তারা এ দেশের শ্রমবাজার দখল করে রেখেছে। নিয়োগদাতারা বাংলাদেশের শিক্ষিতদের সার্টিফিকেট গ্রহণ করছে না। দেশে এত শিক্ষিত বেকার! ভারতের লাখ লাখ জনবল এসে কাজ করছে কীভাবে? এটি তো রীতিমতো ভাবনার বিষয়।’
সরকারের কাছে নেই হালনাগাদ তথ্য
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর ডিসেম্বরে অবৈধ বিদেশিদের বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য-উপাত্তের কাজ শুরু করে। কিন্তু এ বিষয়ে তেমন অগ্রগতি নেই।
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিসংখ্যান এলেও সর্বশেষ সরকারের কাছে কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই। বিশেষ করে বিভিন্ন সেক্টরে বিপুল পরিমাণ ভারতীয়দের কাজের কোনো সঠিক হিসাব নেই।
পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৯৭টি দেশের ১৩ হাজার ৫৭১ জন নাগরিক অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করেন। তাদের পাসপোর্ট বা ভিসার মেয়াদ অনেক আগে ফুরিয়ে গেছে। আত্মগোপনে থেকে তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে কাজও করেন। কাগজে-কলমে তাদের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যা ৭ হাজার ৪৭২ জন। তবে কাগজপত্রের বাইরে অবৈধভাবে লাখ লাখ বিদেশি বাংলাদেশে অবস্থান করছেন বলে তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। যাদের সিংহভাগই ভারতীয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশে কোনো অবৈধ বিদেশি নাগরিককে থাকতে দেওয়া হবে না। অবৈধ বিদেশিদের বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে। তবে কতজন অবৈধ নাগরিক আছেন, সেই পরিসংখ্যান নেই বলে জানান তিনি।
এসবি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে বৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশিদের মধ্যে শীর্ষে ভারতীয়রা। তথ্যানুযায়ী, দেশে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বৈধভাবে অবস্থান করা বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ১ লাখ ১০ হাজার ৫৪৭ জন। তাদের মধ্যে ভারতীয় ৩৫ হাজার ৩২৭ জন, চীনের ১৩ হাজার ৪০৪, দক্ষিণ কোরিয়ার ৫ হাজার ৫৫, শ্রীলঙ্কার ৩ হাজার ৭৮৫ জন নাগরিক রয়েছেন।
অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা জানান, বৈধভাবে কাজ করা বিদেশি নাগরিকদের সঠিক ভিসা রয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। বৈধ ও অবৈধÑ উভয় ধরনের বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রেই ফারাক স্পষ্ট হওয়া দরকার। বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে ৩৩ ধরনের ভিসা দেওয়া হয়। তবে অনেকে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করছেন। বিশেষ করে ‘ভিসা অন অ্যারাইভাল’ এবং ব্যবসায়িক ভিসা ব্যবহারকারীদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি। চীনা নাগরিকরা চীনের বিনিয়োগ করা প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। ভারতীয় নাগরিকদের অনেকে ভ্রমণ ভিসায় এসে বিভিন্ন চাকরি বা ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন।
জানা যায়, অন্তত কয়েক লাখ ভারতীয় নাগরিক নিয়মিত আসা-যাওয়া করে গার্মেন্ট, চামড়াশিল্প, তথ্য), ট্যুরিস্ট ভিসা (টি-ভিসা) নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। এদের অধিকাংশেরই ওয়ার্ক পারমিট বা কাজ করার অনুমোদন (এ-থ্রি ভিসা) নেই। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বছরে মাত্র ৩০ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ আছে; তাই ট্যুরিস্ট ভিসা, বিজনেস ভিসায় এসেই বছরের পর বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে কাজ করছেন। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা হিসেব নেই কর্তৃপক্ষের কাছে। ফলে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা গার্মেন্ট, চামড়াশিল্প থেকে নিয়ে যাচ্ছে ভারতীয়রা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) হিসাবে, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিদের সংখ্যা অন্তত আড়াই লাখ। এদের মধ্যে অধিকাংশই পর্যটন ভিসা নিয়ে দেশে এসে অনুমতি না নিয়েই অবৈধভাবে কাজ করছে। এদের অর্ধেকের বেশি ভারতীয় নাগরিক। তাদের হাত ধরে দেশ থেকে প্রতি বছর পাচার হয়ে যাচ্ছে ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশে বৈধ ও অবৈধভাবে কর্মরত আড়াই লাখ বিদেশি বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।
কর অঞ্চল-১১ এ কর দেয়া বিদেশি কর্মীদের সংখ্যা মাত্র ৯ হাজার ৫শ’ জন। বাকিদের আয়ের কোনো হিসাব নেই সরকারের হাতে। যে ৯ হাজার ৫শ’ জন কর দিচ্ছে তাদের আয়েরও সঠিক তথ্য গোপন করেছে বলে টিআইবি জানিয়েছে।
এর বাইরেও অন্তত দেড় লাখ ভারতীয় নাগরিক ট্যুরিস্ট ভিসায় এসে তৈরি পোশাক, চামড়াশিল্প ও নির্মাণশিল্পে কর্মরত রয়েছেন। ট্যানারিশিল্পে এ্যাপেক্স ও বে এই দুই কারখানার উচ্চপদস্থ অধিকাংশ কর্মীই ভারতীয়।
বসুন্ধরা গ্রুপে কর্মরতদের একটি বড় অংশ ভারতীয়। গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত স্টাফদের বৃহৎ অংশই ভারতীয় নাগরিক।
বন্ধ হওয়া বেক্সিমকো গ্রুপের বেশ কয়েকটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠানেও বহু ভারতীয় কর্মী ছিল। বিশেষ করে বেক্সিমকো এলপিজি, টেক্সটাইল, নিটেক্সসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসে আছে ভারতীয় নাগরিকরা। এদের অধিকাংশই ট্যুরিস্ট ভিসায় এসে বছরের পর বছর চাকরি করছেন।
হামীম গ্রুপের গার্মেন্ট কারখানাগুলোয়ও বহু ভারতীয় কর্মী রয়েছেন। বিশেষ করে গার্মেন্টের ম্যানেজমেন্ট লেভেল সামলাচ্ছেন ভারতীয় নাগরিকরা। এ তথ্য হা-মীম গ্রুপ সূত্র নিশ্চিত করেছে।
পক্ষান্তরে বাংলাদেশে বহু দক্ষ এবং বিশ্বমানের কর্মী রয়েছে। কিন্তু শুধু ইআরপি (এন্টারপ্রাইস রিসোর্স প্ল্যানিং) সফটওয়ারটি ভারতীয়দের দখলে থাকায় উচ্চপদে কর্মী খোঁজার জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সাথে সাথেই ভারতীয় নাগরিকরা সিন্ডিকেট করে তাদের লোক নিয়ে আসে।
তরুণ গার্মেন্ট ব্যবসায়ী ইরফান হায়াত জানান, গার্মেন্টে উচ্চপদে কর্মী খোঁজা হয় মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম লিংকড-ইন’এর মাধ্যমে। একটি কারখানায় উচ্চপদে একজন যোগ দেওয়ার সাথে সাথেই তিনি উচ্চপদে নিয়োগের জন্য ভারতীয় নাগরিকদের প্রাধান্য দেন। আর নিয়োগ নিশ্চিতের পর ট্যুরিস্ট বা ভিজিট ভিসায় চলে আসেন ভারতীয় নাগরিকরা। আর বছরের পর বছর কোনো প্রকার ট্যাক্স ছাড়াই চাকরি করছেন এরা। বাংলাদেশ থেকে অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে চলে যাচ্ছে হাজার কোটির বেশি টাকা।
আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে অবস্থান করে কাজ করলে আয়কর প্রদান ও কাজের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। এ-থ্রি ভিসায় বহু বিদেশি বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করলেও ২০০৬ সালে প্রণীত ভিসা নীতিমালায় কাজের অনুমতি গ্রহণের শর্ত না থাকায় এ-থ্রি ভিসাধারীরা কাজের অনুমতি নেন না। এতে তাদের জন্য আয়কর ফাঁকি দেওয়া সহজ হয়।
কাজের অনুমতিবিহীন বিদেশিরা দীর্ঘদিন বাংলাদেশে অবস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন। পুরনো পাসপোর্টের স্থলে নিজ নিজ দেশের ঢাকাস্থ দূতাবাস থেকে নতুন পাসপোর্ট নিয়ে দেশ ছাড়তে পারছেন এবং পুনরায় আসার সুযোগ পাচ্ছেন। কালো তালিকাভুক্ত বিদেশিরাও নতুন পাসপোর্ট ব্যবহার করে নতুনভাবে ভিসা নিয়ে প্রবেশ করছেন। অনুমতি ছাড়া অবস্থানের অন্যতম কারণ হিসেবে বাংলাদেশে অবস্থান করে বিদেশিদের ভিসার শ্রেণি পরিবর্তনের সুযোগ পাচ্ছেন।
বিডা, ইমিগ্রেশন এবং টিআইবির কাছে যে তথ্য আছে, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন বেপজার কাছে সেই তথ্যও নেই। বেপজা সূত্র বাংলা আউটলুককে জানায়, তাদের কাছে ৯টি ইপিজেডের গার্মেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের কারখানায় মোট ১ হাজার ৮৩০ জন বিদেশি কর্মী রয়েছে। এর মধ্যে ৮৭৫ জন তাইওয়ান, হংকং ও চীনা নাগরিক। এদের মধ্যে টেকনিশিয়ানই বেশি। ১৮৩ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। এদের সবাই কারখানাগুলোর উচ্চপদস্থ সিইও, সিওও, সিএফও, জিএম পদের কর্মকর্তা। আর শ্রীলঙ্কান নাগরিক রয়েছেন ৪৭০ জন। এরা মূলত কারখানাগুলোর ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরে কর্মরত।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) রিফিউজি এন্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (আরএমএমআরইউআই) নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ড. সি আর আবরার বলেন, আমাদের দেশের কেউ কোনো দেশে অবস্থান করলে সেই দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে হিসেব থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের কাছে এ হিসেব নেই; এটি খুবই অগ্রত্যাশিত। তিনি বলেন, বিদেশি শ্রমিক বা কর্মী আসা কোনো দোষের কিছু না। কিন্তু তারা কীভাবে পারিশ্রমিক নিচ্ছে, কীভাবে সেই টাকা তাদের দেশে যাচ্ছে এর একটা সঠিক হিসেব থাকা জরুরি। এ হিসাব না থাকলে বাংলাদেশ থেকে কী পরিমাণ রেমিট্যান্স বিদেশিরা নিচ্ছে তারও হিসেব থাকছে না বলে জানান সি আর আবরার। আর ভিজিট ভিসায় এসে ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া যদি কেউ কাজ করেন, সে বিষয়েও পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি মনে করনে, বিদেশি কর্মীদের কেন আনা হচ্ছে, কোন কোন সেক্টরের জন্য আনা হচ্ছে, সেই সকল সেক্টরে আমাদের দক্ষ জনবল আছে কি না, তাও ভেবে দেখতে হবে। না থাকলে জনবল তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার জন্য হলেও এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাজ করা জরুরি বলে মনে করেন এ বিশেষজ্ঞ।