পাঠ্যক্রমে নৈতিকতা না শেখালে সুনাগরিক পাওয়া যাবে না


৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:৩৯

॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোয় ধর্ম ও নৈতিকতা শেখার সুযোগ খুবই কম। ধর্ম বিষয় থাকলেও পড়ানোর জন্য বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষক নেই। সাধারণ বিষয়গুলোয় ধর্ম ও নৈতিকতার আলোকে গল্প-প্রবন্ধ, কবিতা বা উপন্যাসও নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থাও একই। শেখ হাসিনার শাসনামলে শিক্ষা কারিকুলামের একাধিকবার পরিবর্তন এনে শিক্ষার্থীদের ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এখানেই থেমে যায়নি সরকার। উল্টো ধর্ম ও নৈতিকতাবিরোধী গল্প-প্রবন্ধ সংযোজন করা হয় পাঠ্যবইয়ে। ফলে শিশুরা পড়াশোনা করছে, শিক্ষিত হচ্ছে, একইসঙ্গে খুন-মাদক, সন্ত্রাসসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষিত লোকেরা; বাবা-মা এমনকি সন্তানের হত্যাকারী হচ্ছে। বয়স্ক বাবা-মাকে নিজ ঘর থেকে বের করে রেখে আসছে বৃদ্ধাশ্রমে। এসব হচ্ছে পাঠ্যবইয়ে ধর্ম ও নৈতিকতাসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ না থাকার কারণে।
স্বৈরাচার হাসিনার শাসনামলে ২০২৩ সালের নতুন বছরে বাংলাদেশের পাঠ্যবইয়ে শেখ মুজিব ও হাসিনার সব কৃতিত্ব লিখে দেওয়া হয়েছে, ইতিহাস বিকৃতি করে তথ্য দেওয়া হয়েছে। মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্য বাদ দিয়ে হিন্দুত্ববাদকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে বই প্রকাশ করা হয়েছে। বিতর্কিত তত্ত্ব, ইসলামবিরোধী ছবি-লেখা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পাশাপাশি অনুসন্ধানী পাঠবইয়ে হুবহু অনুবাদ ও চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। প্রশ্ন ওঠেÑ বইয়ের ছাপার মান, সম্পাদনা করার মান এবং বইয়ের লেখকদের লেখার মান নিয়েও, যা ইতিহাসে নজিরবিহীন। অনলাইন ওয়েবসাইট থেকে লাইন টু লাইন অনুলিপি করে বাংলায় অনুবাদ করে কৃতিত্ব ছাড়া পাঠ্যক্রমে যোগ করায় চৌর্যবৃত্তি ও যান্ত্রিক অনুবাদের অভিযোগ ওঠে ও তীব্র আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরে ওই বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ভুল ও অসংগতি নিয়ে বিতর্কের মুখে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির দুটি বইয়ের পাঠদান প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার।
হাসিনার আমলে দুর্নীত আর লুটপাটের ব্যবস্থা ছিলেন সরকারের সবাই। তারা নির্ভুল একটি পাঠ্যবই উপহার দিতে পারেনি। বইয়ে যেভাবে ইসলামী ও নৈতিকতাবিবর্জিত বিষয় সংযোজন করা হয়েছিল, সেভাবে ক্ষমতার অযোগ্য শত শত ভুল করা হয়েছে বইয়ে। অথচ সরকার এ খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। যার অধিকাংশই গেছে সংশ্লিষ্টদের পেটে। হাসিনার সময় সর্বশেষ প্রকাশ হওয়া ষষ্ঠ শ্রেণির ইংরেজি বইয়ের ৪৮টি ভুল-ক্রটি খুঁজে বের করেন একজন শিক্ষক। তার ভাষ্যমতে, “এই বইয়ের ১৫ পৃষ্ঠায় ‘লিটল থিংস’ কবিতাটি দেয়া হলেও এতে কবির নাম দেয়া হয়নি। অথচ বহুল প্রচলিত এই কবিতাটি লিখেছেন আমেরিকান কবি জুলিয়া অ্যাবিগেল ফ্লেচার কার্নি। একইভাবে ১০১ পৃষ্ঠায় ‘মাই বুকস’ কবিতাতেও কবির নাম নেই। এছাড়া একই শ্রেণির একাধিক বইয়ের অনেক জায়গায় একই শব্দের ভিন্ন ব্যবহার দেখা যায়। যেমন- কেন/কেনো, পড়/পড়ো, নিচে/নীচে, যে কোনো যেকোনো ইত্যাদি। এছাড়া বইটির বিভিন্ন পৃষ্ঠায় বানান, বাক্য গঠন ও ব্যাকরণ ব্যবহারে অসংখ্য ভুল করা হয়েছে।”
বাংলাদেশে পাঠ্যবইয়ে ট্রান্সজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় ২০২২-২৩ সালে, যেখানে সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে একটি ট্রান্সজেন্ডার গল্পের (শরীফ থেকে শরীফা হওয়ার গল্প) অন্তর্ভুক্তির কারণে অভিভাবক ও বিভিন্ন মহলের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এটি শিক্ষার্থীদের ‘মগজধোলাই’ করে ট্রান্সজেন্ডার বানানোর একটি অপচেষ্টা এবং এটি প্রচলিত নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। পরবর্তীতে জাতীয় শিক্ষক ফোরাম আয়োজিত রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে ‘বর্তমান কারিকুলামে নতুন পাঠ্যপুস্তক : বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক সেমিনারে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলোসফির খণ্ডকালীন শিক্ষক আসিফ মাহতাব বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে ট্রান্সজেন্ডারের গল্প ঢুকিয়ে তাদের মগজধোলাই করা হচ্ছে বলে বক্তব্য রাখেন। এরপর এ বিষয়ে দেশজুড়ে প্রতিবাদ আরও জোরালো হয়। ওই শিক্ষক প্রতিবাদ স্বরূপ পাঠ্যবই থেকে ‘শরীফ’ থেকে ‘শরীফা’ হওয়ার গল্পের পাতা ছিঁড়ে প্রতিবাদ করেন। এভাবে নানা বিতর্কিত কার্মকাণ্ড চালানো হয় বইয়ের ওপর।
সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার নতুন বাজার বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ অধ্যক্ষ বরুন কান্তি দাস গুপ্ত মনে করেন, পাঠ্যবইয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে ধর্ম ও নৈতিকতা শেখার সুযোগ না থাকায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষিত হচ্ছে, কিন্তু ভালো মানুষ হচ্ছে না। শিক্ষা অর্জনের পরই শেষে দুর্নীতি করছে, লুটপাট করছে। মোবাইল ফোনে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, শিক্ষিত হওয়ার পরও সাধারণ মানুষদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে লোভ ও অসৎ মানসিকতা কাজ করছে। শিক্ষিত সৎ কর্মকর্তা ও অল্প আয়ের মানুষের কাছে মেয়ে বিয়ে দিতে চায় না অনেক অভিভাবক। তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জানতে চায় বেতনের বাইরে পাত্রের বাড়তি বা ‘উপরি কামাই’ (অবৈধভাবে বা অনৈতিক উপায়ে অর্জিত অতিরিক্ত আয়) কত আছে। আমাদের শিক্ষা কারিকুলাম এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, পাঠ্যবইয়ে সৎ মানুষ হওয়ার ধারণ পাওয়া যায় না। একজন শিক্ষিত নাগরিককে দুর্নীতি ও লুটপাট থেকে বিরত রাখতে হলে শ্রেণিকক্ষে তাদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। যাতে একজন শিশু বড় হবে, শিক্ষিত হবে, পাশাপাশি নৈতিকভাবে সমাজে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিনারায়ণপুল মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. একরামুল হোসেন মনে করেন, ৯০ শতাংশ মুসালমানের দেশে পাঠ্যবইয়ে ইসলাম ধর্মীয় অনুশাসন শেখার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অন্য ধর্মাবলম্বীরা যাতে স্ব স্ব ধর্ম শিখতে পারে, সেই ব্যবস্থাও পাঠ্যবইয়ে থাকা জরুরি। বিদ্যমান কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের ধর্ম ও নৈতিকতা শেখার ব্যবস্থা নেই। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এই শিক্ষক বলেন, আমরা যখন শিক্ষার্থী ছিলাম, তখন পাঠ্যবইয়ে কুরআন ও হাদীসের আলোকে গল্প-প্রবন্ধ শেখানো হতো। নৈতিকতা শেখা যায় এমন গল্প থাকতো বইয়ে, কিন্তু সেই কারিকুলাম এখন আর নেই। পরিবর্তন করতে করতে এখন আগের কিছুই নেই। পাঠ্যবইয়ে যেমন নৈতিকতা শেখানো হয় না, তেমনি আমরা শিক্ষকরাও নৈতিকতা শেখাই না, শেখাতে পারি না। শিক্ষার্থীরা যে নৈতিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তার জন্য শুধু কারিকুলামি একা দায়ী নয়, শিক্ষক হিসেবে আমাদেরও অনেক দায় আছে। মো. একরামুল হোসেন আরও বলেন, শিক্ষায় নৈতিকতা শেখানোর জন্য উদ্যোগী হতে হবে সরকারকে। যখন যে সরকারই থাকবে তারা চিন্তা করতে হবে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে অবশ্যই ধর্মশিক্ষার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। পাঠ্যবইয়ে ধর্ম ও নৈতিকতা শেখানো গেলে একজন শিক্ষার্থী সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। এরা কর্মক্ষেত্রে, ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে তা কাজে লাগাবে। এই শিক্ষক মনে করেন মাদরাসা শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষায় পবিত্র কুরআন শিক্ষা দরকার। শিক্ষিত লোকদের সৎ ও নৈতিকতাসম্পন্ন হিসেবে দেখতে চাইলে পাঠ্যবইয়ে অবশ্যই ধর্ম ও নৈতিকতা শেখানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
পঞ্চগড় জেলা ৩নং গুয়াগ্রাম নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জসিম উদ্দীন খান মনে করেন নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি করতে হলে পাঠ্যবইয়ে ইসলামী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, পাঠ্যপুস্তকে নৈতিকতা শেখানোর সুযোগ খুবই কম। বইয়ে গল্প উপন্যাস ও প্রবন্ধে নৈতিক শিক্ষার বলাই নেই। একইভাবে শিক্ষার্থীদের শাসন করার সুযোগও নেই শিক্ষকদের। শিক্ষার্থী ইভটিজার হলে বা মাদকাসক্ত হলেও তাকে কিছু বলা যায় না, এতে হিতেবিপরীত হচ্ছে। ভবিষ্যতে দেশে সুনাগরিক পেতে চাইলে প্রতিটি পাঠ্যবইয়ে ইসলামী (অন্য ধর্মে বিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে স্ব স্ব ধর্ম শিক্ষা) মতাদর্শের আলোকে শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। তা না হলে শিক্ষিত হলেও সুনাগরিক তৈরি হবে না।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ বাংলাদেশ আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এম কুরবান আলী মনে করেন, পাঠ্যবইয়ে ইসলামী ও নৈতিকতা শেখা যায় এমন বিষয় সংযোজন করতে হবে। এরসঙ্গে গত জুলাই বিপ্লবে যাদের অবদান রয়েছে তাও পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করতে হবে। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে এমন বিষয় বইয়ে রাখা যাবে না। নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ পেতে হলে পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আনতে হবে। সরকার পরিবর্তনের পর (হাসিনা সরকার) আমরা চেষ্টা করেছি বিতর্কিত বই এড়িয়ে যাওয়া, সেক্ষেত্রে ২০১২ সালের বই সংযোজন-বিয়োজন করে শিক্ষার্থীদের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এখনো এসব বইয়ে সংযোজন-বিয়োজন করতে হবে। ধর্মের আলোকে নতুন গল্প-প্রবন্ধ সংযোজন করতে হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্কুলগুলোয় ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছিল। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে ধর্মীয় শিক্ষকের কোটা পূরণ করতে হবে। তিনি বলেন এই সরকারের সময় এসেও ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে গানের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ শোনা গেছে!