সৎ লোকের সন্ধানে
২৬ জুন ২০২৫ ১০:৩৫
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
একটি অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। যারা বর্তমানে রাষ্ট্রটা পরিচালনা করছেন, তারা কেউই রাজনীতিবিদ নন। একটি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্টদের পতনের পর একটি বিশেষ মুহূর্তে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশা থেকে আহ্বান করে তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা নিজেরাও বলছেন যে, আমরা বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ বিশেষ কারণে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে এসেছি। তারা বলছেন না, আমরা ক্ষমতাসীন লোক এবং ক্ষমতা গ্রহণ করেছি। এটা তাদের নৈতিক অবস্থানের একটা ভালো দিক। রাজনীতিবিদরাও যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জনগণের কাছে ভোট চেয়ে দায়িত্ব পালনের আকাক্সক্ষা করেন। জনগণের কাছে ভোট ভিক্ষা করে নির্বাচিত হওয়ার পরপরই নিজেদের আর দায়িত্বশীল না ভেবে ক্ষমতাসীন ভাবা শুরু করেন। আর সংবাদপত্র থেকে শুরু করে জনগণও তাদের ক্ষমতাসীন দল বলা শুরু করেন। কিন্তু ভোটে নির্বাচিত হয়ে হোক আর জনগণের ম্যান্ডেটে যারাই রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে আসবেন তারা নিজেদের ক্ষমতাসীন ভাবতে পারেন না। এটা ক্ষমতা নয়, অবশ্যই জনগণের খেদমতের দায়িত্ব পালন। আশা করি, আগামী দিনে ভোটে নির্বাচিত হয়ে যারা আসবেন, তারা ক্ষমতা নয় দায়িত্বশীল হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
আজকের আমার এ কলামের প্রধান আলোচ্য বিষয় অবশ্য ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনÑ এ পদবাচ্য নিয়ে নয়, তা হচ্ছে সৎ ও নৈতিকতাসম্পন্ন লোক বিষয় সম্পর্কিত। কারণ রাষ্ট্র ও সরকার যারাই বা যে দল ও গোষ্ঠী চালাক না কেন দুর্নীতিমুক্ত করে ভালোভাবে চালাতে হলে দরকার একদল সৎ, দক্ষ ও নীতিবান লোক। সৎ ও নৈতিকতাসম্পন্ন লোক ছাড়া রাষ্ট্র ও সরকার সঠিকভাবে পরিচালনা করা যে সম্ভব না, তা বাংলাদেশ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় সৎ লোকের অভাবে বাংলাদেশ বার বার দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। অপরদিকে লাখকোটি টাকার বাজেট দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন করা সম্ভব হয়নি। বরং প্রতি বছর দুর্নীতির মাধ্যমে লাখকোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। আজকের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা যেমন রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সৎ লোকের সন্ধান করছেন, তেমনি আজ থেকে ৫০ বছর আগেও বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সৎ লোক খুঁজেছিলেন। সৎ লোক চাই এ বিষয়ে এ কলামে ৫০ বছরের আগের ও পরের দুটি ভিন্ন ঘটনার আলোচনা করবো।
‘সৎ লোকের তালিকা দাও’
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘আমার একজন বন্ধু এবং শিক্ষাজীবনে আমার রুমমেট ছিল মির্জা ফখরুল (বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর)। তাকে বলেছিলাম, তুমি দলীয় বিবেচনা বাদ দিয়ে বন্ধু হিসেবে তোমার পরিচিতদের কাছ থেকে শিক্ষা খাত ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োগের জন্য কিছু সৎ লোকের তালিকা দাও। তোমরা আগে সরকার চালিয়েছ, তোমাদের দল আছে, দলীয় এত লোক আছে। আমাকে কিছু সৎ মানুষের তালিকা দিতে পারো।’
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরও বলেন, ‘আমার বলার পরে তার (ফখরুল) উত্তর ছিল, আমাদের (বিএনপি) কেউ গত ১৫ বছরে তো উঠতেই পারেনি। কাজেই সে দুর্নীতিবাজ হবে, কী দক্ষ হবে, আমি বুঝব কী করে। মির্জা ফখরুল আমার বন্ধু হিসেবে বন্ধুর মতোই বলেছে। যে সমস্যাটা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু তার দলের (বিএনপি) থেকে আমাকে তালিকা দেওয়া হয়েছে।’
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরও বলেন, ‘যখন আমরা বিদায় নেব, তখন আমরা কী কী করে যাচ্ছি, আমি একটা লিস্ট করে যেতে চাই। যাতে করে সবাই জানুক। আমাদের প্রচারণার জন্য না পরবর্তী সরকারের জন্য যেহেতু উদাহরণ হিসেবে থাকে এবং তার থেকে বিচ্যুতি হলে অন্তত সবারই চোখে যেন পড়ে।’
গত ২১ জুন শনিবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতাকালে এ কথাগুলো বলেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)। প্রথম আলো পত্রিকা এ খবরটি প্রকাশ করেছে।
ঐ অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তো একটা ট্যাগ (রাজনৈতিক পরিচয়) থাকেই; হয় সাদা দল, না হয় নীল বা অন্য কিছু। তবে আমি উপাচার্য নিয়োগের জন্য যাদের কাছ থেকে তালিকা সংগ্রহ করেছিলাম, তাদের কিছু মানদণ্ডের কথা বলে দিয়েছিলাম।’
শিক্ষকের সাইটেশন সংখ্যা, সততা, দক্ষতা প্রভৃতি বিষয় দেখার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও মানদণ্ড ঠিক করে দিয়েছিলেন বলে অনুষ্ঠানে জানান পরিকল্পনা উপদেষ্টা। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, আওয়ামী লীগ তো হওয়া যাবে না, কাজেই মৃদু বিএনপি হওয়া যাবে অথবা নিষ্ক্রিয় বিএনপি হওয়া যাবে।
বিষয়টি নিয়ে বিএনপির মধ্যেও হাসাহাসি হয় বলে জানান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘বিএনপির লোকজন বলে যে উনি (উপদেষ্টা) তো আমাদের (বিএনপি) লোক নেন না। এতদিন ধরে বঞ্চিত লোকজন রয়েছে, তাদের কাউকেই নেন না; উনি (উপদেষ্টা) শুধু নিষ্ক্রিয় বা মৃদু বিএনপি নেন। এই কথাটা কিন্তু খুব প্রচলিত আছে।’
উপাচার্য নিয়োগ দিতে গিয়ে যোগ্য লোক খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়েছিল বলে অনুষ্ঠানে জানান পরিকল্পনা উপদেষ্টা। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘নির্দলীয় সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, সবচেয়ে অসুবিধা হচ্ছে এতগুলো পদ খালি রয়েছে, কিন্তু এ পদে আমি কাকে নিয়োগ দেব, তা খুঁজে পাই না। কারণ রাজনৈতিক দল না হওয়ায় আমরা লোকজন বেশি চিনি না।’
তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের বন্ধু ও পরিচিতদের মাধ্যমে উপাচার্য নিয়োগের জন্য যোগ্য প্রার্থী খুঁজেছিলেন বলে জানান ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকেও তাঁর কাছে উপাচার্য নিয়োগের জন্য তালিকা দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
‘একশ ভালো মানুষের একটা তালিকা করে দেবেন’
এ প্রসঙ্গে ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ১০০ ভালো মানুষের তালিকার একটি ঐতিহাসিক ঘটনার গল্পটা উল্লেখ করতে চাই। তখন শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট। এই ঘটনাটা জগন্নাথ কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান তার রচিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘শতাব্দীর স্মৃতি’ নামক বইয়ে উল্লেখ করেছেন।
সাইদুর রহমান তার ‘শতাব্দীর স্মৃতি’ বইয়ের ৩৮-৩৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখিত ঘটনাটা এভাবে বর্ণনা করেন। তিনি লিখেছেন, ‘১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সে সময় তাকে দর্শন পত্রিকার একটি সৌজন্য কপি দেয়ার জন্য একদিন গিয়েছিলাম গণভবনে। তার হাতে পত্রিকাটি তুলে দিতেই পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে জিজ্ঞাসা করলো, আমাকে স্যার লজিকে কত নম্বর দিয়েছিলেন?
সেখানে শুধু আমরা দুজনেই ছিলাম না। বেলা এগারোটার দিকে আশপাশে তার অনেক দর্শনার্থী। আমার জবাব দিতে দেরি হচ্ছে দেখে সে সবার সামনে অকুণ্ঠ চিত্তেই বলল, আমাকে আপনি লজিকে সাতাশ নম্বর দিয়েছিলেন।
তখন বললাম, তুমি এখন নম্বরের অনেক উপরে।
শেখ মুজিব আবার বলল, দেশের অবস্থা তো দেখছেন। লজিকে সাতাশ নম্বর পেলে দেশ এর চেয়ে ভালো পরিচালনা করার ক্ষমতা থাকে না। তবে স্যার, আপনি তো অনেক মানুষকে চেনেন। দয়া করে আপনি আমাকে একশ ভালো মানুষের একটা তালিকা করে দেবেন।
একশ ভালো মানুষের তালিকা দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। কিন্তু প্রতি মাসেই মুজিব একবার গাড়ি পাঠিয়ে তার কাছে আমাকে নিয়ে যেত। সেখানে তার সম্পর্কে আমার অকুণ্ঠ ও মুক্ত ধারণা ব্যক্ত করার অনুরোধ করত। থাক এ প্রসঙ্গ। পরে তার সম্পর্কে বলা যাবে। বেকার হোস্টেলের কথাতেই ফিরে আসা যাক।
বেকার হোস্টেলে শেখ মুজিবকে জড়িয়ে অনেক ঘটনাই আমার স্মৃতিতে এখনো স্পষ্ট হয়ে আছে। এখানে শুধু একটি ঘটনাই বলবো এখন।
হোস্টেলের ছাত্ররা যাতে সুষ্ঠুভাবে খেতে পারে, সেজন্য ডাইনিং হল সিসটেম চালু করা হয়। প্রতিটি ছেলের জন্য তরকারির আলাদা পেয়ালা। কোনোদিন মাংস, কোনোদিন মাছ। কারো পেয়ালার টান পড়লে ডিম দিয়ে তাকে বুঝ দেয়া হত। একেকজনের জন্য একেকটা পেয়ালা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু একদিন রিপোর্ট পাওয়া গেল শেখ মুজিব দুই পেয়ালাই অর্থাৎ দুজনের তরকারি একাই খেয়ে ফেলেছিল বলে কারো না কারো পেয়ালার মাছ কি মাংসের টান পড়ে। ছাত্রদের কাছ থেকে এ অভিযোগ কয়েকবার শোনার পর একদিন পিওনকে দিয়ে আমার রুমে মুজিবকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি নাকি দুজনের তরকারি একাই খেয়ে ফেলো?
সে স্বীকার করলো, জি।
বললাম, তুমি কি জানো না এটা একটা অপরাধ? এটা তোমার করা ঠিক না। মুজিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল, স্যার, আমি জানি কাজটা ঠিক না। কিন্তু কি করব? আমার যে এক পেয়ালাতে পোষায় না।’
অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান হচ্ছেন যায়যায়দিন পত্রিকার সম্পাদক শফিক রেহমানের পিতা। তিনি রাজশাহী কলেজ, কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ, ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। সর্বশেষ তিনি জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। উল্লেখ্য, কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্রদের হোস্টেলই ছিল বেকার হোস্টেল।
উপরের দুটি ঘটনা ও আলোচনার মধ্যে ব্যবধান হচ্ছে ৫০ বছরেরও বেশি। দুটি ঘটনারই নায়করা হচ্ছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। একজন হলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান। আরেকজন হচ্ছেন মন্ত্রী মর্যাদার উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, তিনি ইতোপূর্বেও বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আর উনারা যাদের কাছে সৎ লোকের চাহিদা ও আকাক্সক্ষা পেশ করেছেন দুজনের একজন শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান ও আরেকজন শিক্ষক থেকে রাজনীতিক মির্জা ফখরুল ইসলাম। আর কাকতালীয়ভাবে এ দুজনই হচ্ছে বামপন্থি ও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী। তাদের একজন তথা সাইদুর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় সৎ লোক দিতে পারেননি বলেই তার বইয়ে লিখেছেন। বর্তমান উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন সাহেবের রুমমেট ফখরুল সাহেব সৎ লোক দিতে পেরেছেন কি না, জানা যায়নি।
ধর্মনিরপেক্ষতা বামপন্থা ও সৎ লোক
বিগত ৫০ বছরের অধিককাল ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোকে জানা ও কোনো কোনো সময় কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা; বিশেষ করে রাজনৈতিক সাংবাদিকতা বিভাগে জড়িত থাকার কারণে অনেক কিছু জানতে পেরেছি। বাংলাদেশে বর্তমানে আদর্শিকভাবে মোটামুটি বড় দাগে ধরলে চার ধরনের রাজনৈতিক দল আছে। এক. জাতীয়তাবাদী আদর্শিক রাজনৈতিক দল, দুই. ইসলামী ধারার রাজনৈতিক দল, তিন. কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক ধারার বামপন্থি রাজনৈতিক দল ও চার. মধ্যমপন্থি রাজনৈতিক ধারার দল। আজকের এ কলামে দুটি ধারার রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে সামান্য আলোচনা করা যেতে পারে। দুটি হচ্ছে ইসলামী ধারা ও কমিউনিস্ট ধারার রাজনৈতিক দল।
বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী একটি ধারার সাথে আর মাত্র একটি ভিন্নধারা ছিল কমিউনিস্ট তথা বামপন্থার রাজনৈতিক ধারা। ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবের আওয়ামী সরকার ইসলামী ধারার রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামী পার্টির রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। তখন ছিল মাত্র দুটি ধারা, একটি বাঙালি জাতীয়তবাদী ধারার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ আর ভিন্নধারা তথা বামধারার কয়েকটি রাজনৈতিক দল কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও জাসদ যারা সবাই সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে ধারণ করেই রাজনীতি করত। তাদের এ সমাজতন্ত্র ও কমিউনিস্ট আদর্শের রাজনীতি বাংলাদেশের জনগণ গ্রহণ করেনি। বরং ৫০ বছরের মধ্যেই কমিউনিস্ট তথা বামধারার রাজনীতি বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় কমিউনিস্ট চিন্তাধারার অনেক সাংবাদিককে সিনিয়র ও সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি, যাদের অধিকাংশই নৈতিক মানে উত্তীর্ণ নয়। অপরদিকে কমিউনিস্টরা সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার জন্য কোনো আদর্শিক ও নৈতিকতাসম্পন্ন রাজনীতিক, সৎ ও দক্ষ আমলা, শিক্ষক, সাংবাদিক ও আইনজীবী উপহার দিতে পারেনি। বিশেষ করে উল্লেখিত ঘটনা দুটির আলোচনায় যারা সৎ লোক চাইছেন এবং যাদের কাছে চাইছেন, তারা এদেশে সৎ লোক তৈরির প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি। উনাদের প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন সৎ ও নৈতিকতাসম্পন্ন নাগরিক তৈরি করেতে পারেনি। কারণ উনারা রোপণ করেছিলেন মাকাল গাছ, মাকাল গাছে তো মাকাল ফলই দেবে। বরং এদেশের রাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রশাসন ও আইন অঙ্গনে একটি ছাত্র সংগঠন কিছু সৎ ও দেশপ্রেমিক জনশক্তি ও নেতৃত্ব উপহার দিয়েছে। আর সে ছাত্র সংগঠনটি হচ্ছে ইসলামী ছাত্রশিবির। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিগত তিন দশক ধরে এদেশের কথিত বাম ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে কলেজগুলোতে ছাত্রশিবিরকে শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করতে দেয়নি। সৎ যোগ্য ও দেশপ্রেমিক জনশক্তি ও নেতৃত্ব তৈরির একটি কারখানা হচ্ছে ইসলামী ছাত্রশিবির। দেশ যদি সৎ ও দেশপ্রেমিক জনশক্তি ও নেতৃত্ব পেতে চায়, তাহলে জাতীয় নেতৃত্বের উচিত হবে শিক্ষাঙ্গনে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে মুক্ত পরিবেশে কাজ করতে দেয়া।
ইসলামী আদর্শই সৎ লোক তৈরি করতে পারে
অপরদিকে ইসলামী রাজনীতির ধারক-বাহকরাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু আদর্শিক ও নৈতিকতাসম্পন্ন রাজনীতিক, আমলা শিক্ষক সরবরাহ করতে পেরেছে। বিগত ৫০ বছরে প্রমাণিত হয়েছে ডান ও ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে, যারা ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী ও ধারণ করেছে তারাই সৎ ও নৈতিকতাসম্পন্ন হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন। তবে বাংলাদেশের শুরুতেই যেহেতু ইসলামী রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তাই ইসলামী আদর্শকে বিশ্বাস ও ধারণ করে এমন রাজনীতিক তেমন বেশি তৈরি হতে পারেনি। তাই বাংলাদেশের শুরুতে যেমন সৎ লোকের অভাব ছিল ৫০ বছর পরও সৎ লোকের অভাব রয়েই গেছে। তাই রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার জন্য যদি সৎ ও নৈতিকতাসম্পন্ন রাজনীতিক, আমলা শিক্ষক সাংবাদিক ও আইনজীবী তৈরি করতে চান, তাহলে দেশে ইসলামী আদর্শের রাজনীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থাকেই চালু করতে হবে। ইসলামী আদর্শ ও বিশ্বাসের মাধ্যমেই নেতা থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে নৈতিকতার বিকাশ হতে পারে এবং একটি নৈতিকতাসম্পন্ন জাতি তৈরি হতে পারে। সর্বোপরি রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার জন্য যদি সৎ লোক চান তাহলে ইসলামী আদর্শকে গ্রহণ করুন; বিশেষ করে ইসলামী আদর্শের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলুন। ইসলামে দাখিল হোন, ইসলামকে বাস্তব জীবনে গ্রহণ করুন, তাহলেই সৎ লোক তৈরি হবে, প্রাকৃতিকভাবেই সৎ লোক পেয়ে যাবেন।