জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন!


২৬ জুন ২০২৫ ১০:৩৩

॥ ফারাহ মাসুম ॥
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওপর একটি বড় দলের প্রভাব এবং পুলিশ ও জনপ্রশাসনে পরবর্তী সরকার গঠনের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে প্রভাব বিস্তারের নানা উদ্যোগে ২০২৬ সালে অনুষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচন মুক্ত ও অবাধ হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। এ সংশয়ের কারণে ছাত্রদের নেতৃত্বে সদ্য গঠিত এনসিপি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছে। আর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক একটি দল জাতিসংঘের তদারকিতে এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব করেছে।
বিএনপি নেতা ইশরাককে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র ঘোষণা করে দেয়া কোর্টের একটি আদেশের বিরুদ্ধে আপিল না করে তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশকে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্নের সংকেত হিসেবে নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি এ কমিশন পুনর্গঠনের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করেছে। এনসিপি মনে করছে, নির্বাচন কমিশন বিএনপির প্রস্তাবিত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠন করার কারণে তাদের নানা সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে দলটির প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারের বিষয় না হলেও কমিশন এ সংক্রান্ত সরকারের সংস্কার কমিশনের সুপারিশের সরাসরি বিরোধিতা করে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিয়েছে।
প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা
এদিকে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই প্রশাসনের ওপর বিএনপির নানাভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ের বিএনপি নেতারা তাদের কথামতো কাজ করার জন্য চাপ দিয়ে বলছেন, নির্বাচনের পরই বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। তাদের কথা শোনা না হলে পরবর্র্তী সরকারের সময় নিয়োগ পদোন্নতি পদায়ন নিয়ে সমস্যায় পড়তে হবে। এ নিয়ে বিএনপির বিভিন্ন নেতার বক্তব্যসংবলিত ভিডিও সামাজিক গণমাধ্যমে ভাইরাল হতে দেখা গেছে।
সেনাপ্রধানের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও উপস্থিতির সাথে বিএনপির সমঅবস্থান তৈরি হওয়ায় ভেতরে ভেতরে ম্যাকানিজম তৈরি করে ২০০৮ সালের মতো নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কাও রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের। এ আশঙ্কা থেকেই সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের একজন প্রথম সারির নেতা।
এ বক্তব্যের পর কূটনৈতিক অংশীদাররাও বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের নির্বাচন জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে হওয়া সম্ভব কিনা- এ প্রশ্নের জবাবে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলছেন, তাত্ত্বিকভাবে এটি সম্ভব, কিন্তু এর জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও প্রক্রিয়া পূরণ হতে হবে।
জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন
এক্ষেত্রে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানের ধরন হতে পারে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন (ইওএম) এর মাধ্যমে। জাতিসংঘের নির্বাচন তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রে এটি হয় সবচেয়ে সাধারণ ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক সংস্থা পর্যবেক্ষক পাঠায়, নির্বাচন তারা পরিচালনা করে না। বিশ্ব সংস্থার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন কেবল স্বচ্ছতা ও অনিয়ম পর্যবেক্ষণ করে রিপোর্ট দেয়।
জাতিসংঘের নির্বাচন তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টি হয় জাতিসংঘের কারিগরী সহায়তা দানের মাধ্যমে। এ ব্যবস্থায় জাতিসংঘ ভোটার তালিকা তৈরি, ইভিএম ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সহায়তা দেয়।
জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচনের তৃতীয় ধরনটি হলো অন্তর্বর্তী নির্বাচনী প্রশাসন পরিচালনা বা প্রত্যক্ষ তদারকিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান। এটি কেবল তখন হয়, যখন একটি দেশ ব্যাপক সংকট, গৃহযুদ্ধ বা শাসনব্যবস্থার ভেঙে পড়ার মুখে থাকে। তখন জাতিসংঘ সরাসরি প্রশাসনিক দায়িত্ব নেয় বা শীর্ষ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ চালায়। পূর্ব তিমুর, কম্বোডিয়া, আফগানিস্তান ইত্যাদি ক্ষেত্রে এ ধরনের দৃষ্টান্ত রয়েছে।
বাংলাদেশে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এ পর্যন্ত কোনো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় পরপর তিনটি নির্বাচন তামাশামূলক হওয়ায় তখন জাতিসংঘের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাপক দাবি উত্থিত হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এর তীব্র বিরোধিতা করে। অন্যদিকে এ প্রস্তাব সমর্থন করে বিএনপি জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার ফ্যাসিবাদ বিরোধী বিপ্লবে আওয়ামী লীগের বিদায় ঘটলে সেই পরিস্থিতি আর থাকেনি। প্রধানত বিএনপির প্রস্তাবিত ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের কার্যক্রমে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরাট প্রভাব লক্ষ করা যায়। এনসিপি নেতাদের ধারণা, বিএনপির প্রতি কমিশনের আনুকূল্যের কারণেই এনসিপির প্রতি বিভিন্ন সময় তাদের বৈরী আচরণের প্রকাশ ঘটেছে।
কীভাবে এটি সম্ভব?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত নির্বাচন জাতিসংঘের সরাসরি তত্ত্বাবধানে না হলেও রাজনৈতিক দলগুলো যদি সম্মত হয় এবং সরকার জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানায়, তবে জাতিসংঘ এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। জাতিসংঘ ২০০৮ সালে সরাসরি নির্বাচন পরিচালনা না করলেও পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছিল।
সাধারণভাবে কোনো দেশ জাতিসংঘকে নির্বাচন তত্ত্বাবধানের অনুমতি দিতে বাধ্য নয়। কারণ এটি জাতিসংঘ সনদের ‘রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব’ নীতির পরিপন্থি। এ অবস্থায় বড় দলগুলোকে তারা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধান চায় বলে একমত হতে হবে। অথবা এ বিষয়ে রেফারেন্ডামে জনসম্মতি প্রয়োজন হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করতে হবে জাতিসংঘকে। এরপর বাস্তবতা যাচাই ও সহায়তার ধরন নির্ধারণ করতে জাতিসংঘ মূল্যায়ন মিশন পাঠাবে।
তত্ত্বাবধানে সম্মত হলে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক বা কারিগরি সহায়তার মিশন আসতে পারে। আর নির্বাচন সম্পাদন বা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করবে জাতিসংঘ। বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে ‘জাতিসংঘ তত্ত্বাবধানে নির্বাচন’ বিষয়ে কোনো কিছু নেই। আর সরকার যদি জাতিসংঘকে অনুরোধ না করে, তবে জাতিসংঘ নিজ থেকে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তবে সম্মত রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে (যেমন পর্যবেক্ষক, কারিগরি সহায়তা) এটা সম্ভব।
বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধান
জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বা প্রত্যক্ষ সহায়তায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নজির রয়েছে। এগুলো মূলত রাজনৈতিক সংকট, গৃহযুদ্ধ বা শাসনব্যবস্থার ভাঙনের সময় হয়েছিল। এখান থেকে বোঝা যায়, জাতিসংঘ কেবল তখনই প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে যায়, যখন দেশটির সার্বভৌম ক্ষমতা কার্যত ভেঙে পড়ে অথবা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনে পরিচালিত হয়। নির্বাচন জোরালোভাবে পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে সেটির প্রয়োজন হয় না।
১৯৯৯ সালে ইন্দোনেশিয়ার দখল থেকে পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে হয়েছিল। সে সময় ‘পূর্ব তিমুর জাতিসংঘ মিশন-আনামেট’ নামে একটি মিশন গঠন করা হয়। জাতিসংঘ এর মাধ্যমে ভোট আয়োজন, পরিচালনা ও নিরাপত্তা তদারক করে।
১৯৮৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার দখল থেকে মুক্তির প্রক্রিয়ায় নামিবিয়ার নির্বাচন জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে হয়। এ সময় ‘জাতিসংঘ ট্রানজিশন সহায়তা গ্রুপ-আনটাগ’ নামে একটি জাতিসংঘ মিশন প্রতিষ্ঠা করে পূর্ণ নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, সেনা পর্যবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণসহ সার্বিক নির্বাচন পরিচালনা করা হয়। এরপর নামিবিয়া স্বাধীনতা লাভ করে এবং দেশটিতে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা হয়।
২০০৫ সালে আফগানিস্তানে তালেবান পতনের পর নতুন সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় জাতিসংঘের সহায়তায়। এ সময় আফগানিস্তানে জাতিসংঘ সহায়তা মিশন-আনামা গঠনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সমন্বয় করা হয়। জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণে থেকে আফগান সংস্থা এ সময় নির্বাচন পরিচালনা করে।
কম্বোডিয়ায় ১৯৯৩ সালে গৃহযুদ্ধ পরবর্তী শান্তিচুক্তির পর নির্বাচন পরিচালনার জন্য কম্বোডিয়ায় জাতিসংঘ ট্রানজিশনাল অথরিটি-আনটাক নামে একটি জাতিসংঘ মিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ সময় জাতিসংঘ সরাসরি প্রশাসন ও নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এরপর নির্বাচন স্বীকৃত হয় এবং নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
সার্বিয়া থেকে যুদ্ধ পরবর্তী সংকটের পটভূমিতে ২০০১ সালে কসোভোয় ‘কসোভো জাতিসংঘ মিশন’- আনমিক নামে একটি জাতিসংঘ মিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর মাধ্যমে জাতিসংঘ প্রশাসন গঠন করে এবং নির্বাচন আয়োজন করা হয়।
এসব নজিরের মূল কথা হলো, দেশটির সার্বভৌম ক্ষমতা হ্রাস, রাজনৈতিক ধস বা আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ থাকলে জাতিসংঘ সরাসরি ঐ দেশের নির্বাচন তত্ত্বাবধানে যায়। বাংলাদেশ এখনো সে ধরনের সংকটে না থাকায় এ ধরনের নজির অনুসরণ রাজনৈতিক ঐকমত্য বা গণভোটে জনসম্মতি ছাড়া এটি কঠিন বলে অনেকে মনে করেন।
তবে বাংলাদেশে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অংশগ্রহণ ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে একটি বিতর্কের বিষয়। রাজনৈতিক দলসমূহ স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের নিশ্চয়তার জন্য আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধান বা জাতিসংঘ পর্যবেক্ষণের দাবি জানিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের ভূমিকা কতটুকু বাস্তবসম্মত বা সম্ভব, তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্রকে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নির্বাচন পরিচালনা করতে বাধ্য করা যায় না। সরকারকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আমন্ত্রণ জানাতে হয়। আর বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব একমাত্র নির্বাচন কমিশনের। জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো বিধান নেই। ফলে সংবিধান সংশোধন বা রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়।
আস্থার সংকটে ইসি
জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে নির্বাচন বাংলাদেশে সম্ভব হলেও তা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তবে জাতিসংঘ পর্যবেক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণমূলক সহায়তা বাস্তবসম্মত এবং ইতিবাচক পথে একটি সমঝোতামূলক নির্বাচন ব্যবস্থার সূচনা করতে পারে।
উল্লেখ করা যেতে পারে যে, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে এরই মধ্যে দেশে বিতর্ক উঠেছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়ে বিভিন্ন দলের আস্থার সংকটও রয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার চাইলেও প্রকৃত অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান তাদের পক্ষে সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে সরকারের মধ্যে সংশয় রয়েছে। প্রশাসনে সাধারণভাবে একটি প্রবণতা রয়েছে যে, যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে তাদের আনুকূল্য লাভ করে নিয়োগ পদোন্নতি পদায়ন সুবিধা লাভ করা। আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক অনুগতদের নিয়োগ পদোন্নতি দেয়া ছাড়াও প্রশাসনকে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ ও অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য এ সুবিধাকে কাজে লাগিয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের একটি সময়রেখা ঘোষণার পর থেকে প্রশাসনের ওপর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতে শুরু করেছে। নির্বাচন নিকটবর্তী হওয়ার সাথে সাথে এ অবস্থার আরো অবনতি ঘটতে পারে। এ কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিপ্রণেতাদের অনেকের মধ্যে মুক্ত ও অবাধ নির্বাচনের ব্যাপারে হতাশা রয়েছে। নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ করার বিষয়ে পশ্চিমা বিশ্বও বার্তা দিয়েছে। তবে তারা অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা বন্ধ করছে না; তাদের সমর্থনে থাকছে নানা শর্ত। এতে বাংলাদেশের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে নির্দিষ্ট মানদণ্ডে নিরীক্ষা ও চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে হলে শুধুমাত্র নিয়মের পরিবর্তন নয়, মানসিকতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন দরকার। সে ধরনের অবস্থা এখনো দৃশ্যমান নেই। কিছুদিন আগ পর্যন্ত বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান প্রফেসর ইউনূসের ওপর চাপ প্রয়োগ করে এসেছিল। এজন্য তার বাসভবন যমুনা ঘেরাও করার কর্মসূচির কথাও ঘোষণা করে একপর্যায়ে। এ সময় সেনাপ্রধান এক দরবারের অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ ও অসন্তাষ প্রকাশ করে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। এ সময় সামরিক অভ্যুত্থানের গুজবও ছড়িয়ে পড়ে।
২০০৮ সালের নির্বাচন জরুরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচনে তখনকার সেনা নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক কিছু প্রভাবশালী পক্ষের যোগসাজশে ব্যাপক সূক্ষ্ম কারচুপির নানা তথ্য-উপাত্ত এখন পাওয়া যাচ্ছে। একটি প্রভাবশালী প্রতিবেশী দেশের পরিকল্পনায় নির্বাচনে ইসলামিক রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব ও তাদের পক্ষে জনরায় ছিনিয়ে নিতে এ ধরনের একটি নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি আবারো হবার বিষয়ে অনেকের আশঙ্কা রয়েছে।
একটি ঐতিহাসিকভাবে মুক্ত, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেয়ার বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার অঙ্গীকার রয়েছে। এর যেকোনো ব্যত্যয় হবার মতো পরিস্থিতিতে ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব ছেড়ে দিতে পারেন বলে ধারণা ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক এ ধরনের এক পরিস্থিতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও জামায়াতে ইসলামীর প্রচেষ্টায় অচলাবস্থার অবসান ঘটে। ড. ইউনূসের লন্ডন সফরের সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দেড় ঘণ্টার ওই বৈঠকে সংস্কার ও বিচার প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় অগ্রগতি সম্পন্ন হলে আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে ঐকমত্য হয়। এরপর নির্বাচন নিয়ে উত্তাপ-উত্তেজনা কমে আসে।
তবে যে ধরনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আন্তর্জাতিক সহায়তার সম্মিলনে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব হয়, সে পরিবেশ নিয়ে সংশয় এখনো রয়ে গেছে। বিএনপির মধ্যে সবকিছুর ওপর একতরফা প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মুক্ত ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সেই প্রবণতাকে কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, সেটিকে এ সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ মনে করা হচ্ছে।