রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সমতার নীতির চরম লঙ্ঘন
৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৫২

লেখক ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
ভেনেজুয়েলা লাতিন আমেরিকার দেশ। ভেনেজুয়েলা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারই দেশটি শাসন করে আসছে। ভেনেজুয়েলা ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি স্পেনীয় উপনিবেশ ছিল। ১৯ শতকের শুরুতে দক্ষিণ আমেরিকার যেসব স্পেনীয় উপনিবেশ প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করে, তাদের মধ্যে ভেনেজুয়েলা ছিল অন্যতম। পূর্বে এটি ভেনেজুয়েলা প্রজাতন্ত্র নামে পরিচিত ছিল। ১৯৯৯ সালে এর নাম সরকারিভাবে বদলে ভেনেজুয়েলা বলিভারীয় প্রজাতন্ত্র রাখা হয়। নামটি ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতাতে অবদান রাখা সামরিক নেতা সিমন বলিভারের নামে রাখা। স্বাধীনতা লাভের পর ভেনেজুয়েলা অন্তর্সংঘাত ও স্বৈরশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে পার হয়েছে। ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী প্রভাব আছে। ১৯৫০-এর দশকের শেষ থেকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার দেশটি শাসন করে আসছে।
ভেনেজুয়েলা হলো দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূলে ক্যারিবীয় সাগরের তীরে অবস্থিত রাষ্ট্র। ভেনেজুয়েলার ভূপ্রকৃতি উত্তরে আন্দেস পর্বতমালার সুউচ্চ পর্বতচূড়াগুলো থেকে দক্ষিণের ক্রান্তীয় অরণ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যভাগে আছে তৃণময় সমভূমি ও রুক্ষ উচ্চভূমি এবং উপকূলজুড়ে রয়েছে নয়নাভিরাম বেলাভূমি। দেশটির তীর থেকে অদূরে অবস্থিত অনেকগুলো দ্বীপের সীমানার অন্তর্গত। ভেনেজুয়েলার রাজধানী ও বৃহত্তম শহরের নাম কারাকাস।
সংখ্যাগরিষ্ঠ ভেনেজুয়েলাবাসী মেস্তিসো, অর্থাৎ ইউরোপীয় ও আদিবাসী আমেরিকানদের শংকর জাতি। এটি আদিতে একটি কৃষিপ্রধান দেশ ছিল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এখানে পেট্রোলিয়ামের বিশাল মজুদ আবিষ্কৃত হওয়ার পর অর্থনীতির গতি পাল্টে যায়। ১৯৭০-এর দশক থেকে সরকার নিয়ন্ত্রিত সংস্থা তেলের উৎপাদন দেখাশোনা করছে। যদিও তেল শিল্প প্রচুর সম্পদের সৃষ্টি করেছে, তা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলায় ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে রয়েছে সুস্পষ্ট বিভাজন। ব্যবসায়ী, তেল কোম্পানির কারিগর এবং বিরাট জমিদাররাই দেশের অধিকাংশ সম্পদের মালিক। অন্যদিকে শহরের অদক্ষ শ্রমিক ও গ্রামের খামারকর্মীরা তুলনামূলকভাবে দরিদ্র অবস্থায় জীবনযাপন করে।
ক্যারিবীয় অঞ্চলের গণতান্ত্রিক দেশ ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হামলায় দেশটির জনগণ এখন দিশেহারা। দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আটক করে কারাগারে বন্দী করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের তথাকথিত মনরো ডকট্রিন পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োগ করে ভেনেজুয়েলায় সামরিক কায়দায় হামলা করে মাদুরোকে আটক করে নিয়ে যায়। যার প্রতিক্রিয়ায় সারা বিশ্বে নিন্দার ঝড় ওঠে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই সাধারণ জনগণ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। মনরো ডকট্রিনের নামে বিগত সময়ে যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে সামরিক হস্তক্ষেপ, সরকার উৎখাত, রক্তাক্ত অভ্যুত্থান ও স্বৈরশাসকদের প্রতিষ্ঠা করেছে।
কী সেই মনরো ডকট্রিন?
মনরো ডকট্রিন বা মনরো নীতি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কালো নীতি। ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো এ নীতি ঘোষণা করেন। তার নাম অনুসারেই মনরো ডকট্রিন পরিচিতি লাভ করে। মনরোর ঘোষিত ‘আমেরিকানদের জন্য আমেরিকা’ নীতি, যা পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় মার্কিন-সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানের বৈধতা দিতে ব্যবহৃত হয়।
এ নীতির মূল উদ্দেশ্য এবং বৈশিষ্ট্যগুলো হলো : ইউরোপীয় হস্তক্ষেপের বিরোধিতা : আমেরিকা মহাদেশের (উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা) কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা নতুন করে উপনিবেশ স্থাপনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি শত্রুতামূলক কাজ হিসেবে গণ্য করা হবে।
পৃথক প্রভাব-বলয় : এ নীতি অনুসারে ইউরোপ এবং আমেরিকা দুটি আলাদা প্রভাব-বলয়ে বিভক্ত হবে। ইউরোপীয় শক্তিগুলো পশ্চিম গোলার্ধে তাদের প্রভাব বিস্তার করবে না এবং বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বা যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করবে না।
আমেরিকান আধিপত্য : এটি লাতিন আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বা ‘হেজিমনি’ (ঐবমবসড়হু) প্রতিষ্ঠার একটি প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
এ নীতির আলোকেই যুক্তরাষ্ট্র মনে করে লাতিন আমেরিকা তাদের ব্যাকইয়ার্ড অর্থাৎ পেছনের উঠোন, সেখানে কী হবে, তা নির্ধারণের একমাত্র অধিকার ওয়াশিংটনের।
রাষ্ট্রগুলোর কাগুজে ও বৈঠকী প্রতিবাদ ও নিন্দা
মার্কিন হামলা ও মাদুরোকে আটকের প্রতিবাদে সারা বিশ্বে মানুষ ফুঁসে উঠেছে। চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, ইরান, কলম্বিয়া ও কিউবাসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা কড়া প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন।
চীন বলেছে, সার্বভৌম একটি দেশ ও তার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তির প্রয়োগে বেইজিং ‘হতবাক ও কড়া নিন্দা’ জ্ঞাপন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ চালানোর অভিযোগ এনেছে রাশিয়া। ইরান এ হামলাকে ‘দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
লাতিন আমেরিকার অনেক নেতা যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এক্সে লিখেছেন, এ পদক্ষেপ ‘অগ্রহণযোগ্য সীমা লংঘন করেছে’। তিনি আরো যোগ করেন যে ‘আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে অন্য দেশগুলোয় আক্রমণ করা সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতার পথে প্রথম পদক্ষেপ’।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এ হামলাকে লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বোরিক ‘উদ্বেগ ও নিন্দা’ জ্ঞাপন করে ‘দেশটির গভীর সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে’র জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াছ-কানে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ফৌজদারি হামলা’য় অভিযুক্ত করেছেন। সরকারি এক বিবৃতিতে উরুগুয়ে বলেছে, ‘মনোযোগ ও গভীর উদ্বেগের সঙ্গে’ তারা ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ‘সবসময় যেমন করে এসেছে, তেমন এবারও সামরিক হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করছে’।
জাতিসংঘের বৈঠকে তীব্র নিন্দা
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নেওয়ার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। গত ৫ জানুয়ারি সোমবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে দেশ দুটির কূটনীতিকরা এ নিন্দা জানান। যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে তারা মাদুরো দম্পতির মুক্তি দাবি করেন।
বৈঠকে জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া বলেন, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র যেসব ‘অপরাধ’ করেছে, সেগুলোর বৈধতা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে চীনের উপরাষ্ট্রদূত গেং শুয়াং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ ‘অবৈধ’ ও ‘গুণ্ডামির’ পদক্ষেপে বেইজিং গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
হামলা ও মাদুরো দম্পতিকে তুলে নেওয়ার ঘটনায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানায় ভেনেজুয়েলা। এ আহ্বান নিরাপত্তা পরিষদের কাছে উপস্থাপন করে কলম্বিয়া। ভেনেজুয়েলার প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়া ১ জানুয়ারি থেকে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বৈঠকের শুরুতে মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্য পড়ে শোনান সংস্থাটির আন্ডার সেক্রেটারি রোজমেরি ডিকার্লো। এতে গুতেরেস রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
গুতেরেস বলেন, ‘ভেনেজুয়েলায় ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা, এর সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রভাব এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি যে নজির স্থাপন করতে পারে, তা নিয়ে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’
বৈঠকে জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা কিংবা দেশটির জনগণের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায়নি। বরং ‘বৈধ’ অভিযোগের ভিত্তিতে করা আইনসম্মত অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। বৈঠকে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রদূত স্যামুয়েল মনকাদা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় বোমা হামলা চালিয়ে বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করেছে এবং এতে বহু প্রাণহানি ঘটেছে। এটি বেআইনি সশস্ত্র আক্রমণ ও অপহরণ। ভেনেজুয়েলায় হামলার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে।
মনকাদা বলেন, এ আক্রমণের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। এটি জাতিসংঘের সনদে উল্লেখিত শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা এবং রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের সমতা নীতিকে লঙ্ঘন করেছে।
এ ধরনের হামলা ভালো ফল আনে না : অধ্যাপক সুলতান
হামলা চালিয়ে ভেনেজুয়েলার মতো কোনো সার্বভৌম দেশের শীর্ষনেতা এবং তার স্ত্রীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের যতটুকু বজায় ছিল, তা-ও শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
কাতারের রাজধানী দোহার হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি নীতি বিভাগের অধ্যাপক সুলতান বারাকাত আল-জাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র জোর করে শাসনব্যবস্থাকে (রেজিম) পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। এ ধরনের চেষ্টা সাধারণত ভালো ফল বয়ে আনে না।’
বারাকাত বলেন, ‘এর আগেও ইরাকসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকবার শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা করতে দেখেছি। যেসব দেশে এমন চেষ্টা হয়েছে, সেখানে বছরের পর বছর ধরে বিশৃঙ্খলা চলেছে। আজও চলছে।’
এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘ইরান নিয়েও আমরা এমন কিছু চেষ্টা দেখছি। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে গত দুদিনে ইরান ও ভেনেজুয়েলাকে জড়িয়ে বক্তৃতা দিতে দেখা গেছে। এ দুই দেশের মধ্যে কিছু মিল অবশ্য আছে। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে ভেনেজুয়েলা ইরানের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে। আর এ কারণে দেশটির প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করাকে ন্যায্যতা দেওয়া যাবে।’ বারাকাত সতর্ক করে বলেন, ভেনেজুয়েলার হামলা নিয়ে ‘সার্বিকভাবে আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। আশা করি, ভেনেজুয়েলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে। তা না হলে আমরা সেই অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা দেখব।’
আন্তর্জাতিক আইনের কফিনে শেষ পেরেক
আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি যতটুকু সম্মান বজায় ছিল, মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তা-ও শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করেন সুলতান বারাকাত। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এ ঘটনা থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশও একই ধরনের কাজ করতে উৎসাহিত হতে পারে।
বারাকাতের ভাষায়, এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তির কফিনে সম্ভবত সর্বশেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মূল নীতি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
কাতারের সরকারি নীতি বিভাগের এ অধ্যাপক আরও বলেন, লেবানন ও ইরানে সম্প্রতি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চালানো যৌথ হামলার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার ঘটনার মিল রয়েছে। এসব হামলা প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
বারাকাতের আশঙ্কা, এখন চীনও যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ অনুসরণ করতে পারে। তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের ন্যায্যতা দাবি করতে পারবে।
সামরিক হামলার বিপক্ষে মার্কিন জনগণ
সিএনএনের এক খবরে প্রকাশ করা এক জরিপে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলা মার্কিন জনগণের অধিকাংশই সমর্থন করছে না। কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে ৬৩ শতাংশ বনাম ২৫ শতাংশ এবং সিবিএস নিউজ-ইউগভ জরিপে ৭০ শতাংশ বনাম ৩০ শতাংশ মানুষ সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান করছে।
ভিন দেশের প্রেসিডেন্টকে তুলে নেয়া কি সমর্থনযোগ্য?
একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে একটি সরকার থাকে। সেটি হতে পারে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার, রাজতান্ত্রিক সরকার, স্বৈরতান্ত্রিক সরকার বা অগণতান্ত্রিক সরকার। ভেনেজুয়েলায়ও একটি সরকার ছিল। ভেনেজুয়েলা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি হচ্ছে নিকোলাস মাদুরো। তার নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। নির্বাচনে কারচুপি হতে পারে। তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা যেতে পারে যে তিনি সুষ্ঠুভাবে ভোট করেননি এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হননি। যদি এমনটা হয়ে থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলার জনগণ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করতে পারে। তাকে পদত্যাগের আহ্বান জানাতে পারে। তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে তার পতনের জন্য কঠোর আন্দোলন সংগ্রাম হতে পারে। আন্দোলন সংগ্রাম করে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা যেতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশেই এ ধরনের আন্দোলন-সংগ্রাম করে অগণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। তার বহু নজির বিশ্বে আছে। যেমন ইরানের রেজা শাহ পাহলভি, ফিলিপাইনের মার্কোস, বাংলাদেশে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাসহ অনেককেই পদত্যাগ করতে হয়েছে এবং কেহ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু কথিত অভিযোগে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্টকে সামরিক হামলা করে আটক করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে তো কোনোভাবেই গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার মতো একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সামরিক হামলা করে আটক করে নিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ কর্মকাণ্ডে খোদ মার্কিন মুলুকসহ সারা বিশ্বে নিন্দার ঝড় উঠেছে। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো দেশ অন্য কোনো দেশের সার্বভৌম অঞ্চলে অনুমতি ছাড়া বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি ছাড়া শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। চীন রাশিয়া ইরানসহ বিশ্বের অনেক দেশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের সামরিক হামলা ও মাদুরোকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার তীব্র নিন্দা করলেও কিন্তু কোনো রাষ্ট্রই তার জোরালো ভূমিকা পালন করেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ হামলা করে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে উঠিয়ে নেয়ার মাধ্যমে আর্ন্তজাতিক আইন লঙ্ঘন করে জাতি রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের সমতা নীতিকে ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে।
ইমেইল : [email protected]