জুলাই সনদ কার্যকরের মাধ্যমেই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন জনগণের প্রত্যাশা

একেএম রফিকুন্নবী
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৫৮

একেএম রফিকুন্নবী

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
গত বছর জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ থেকে পালিয়েছে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার অনুগত দলের নেতা-কর্মী, আমলা, সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা; এমনকি দেশের প্রধান মসজিদ বায়তুল মোকাররমের ইমামও। যুগে যুগে মহান আল্লাহ তাঁর অবাধ্য বান্দাদের এভাবেই অপমানিত-অপদস্থ করেন। সম্প্রতি আফগানিস্তান থেকে এক নম্বর পরাশক্তির পলায়ন, শ্রীলঙ্কার স্বৈরশাসকের পলায়ন, সিরিয়ার ফ্যাসিস্ট শাসকের পলায়ন একই সূত্রে গাঁথা।
আরো খবর হলো- আমাদের প্রতিবেশী ভারতের জনগণও ক্ষেপে উঠছে। ইসরাইলের সচেতন নাগরিকরাও মাঠে নেমেছে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে। আমরা আল্লাহর দুনিয়ায় সব দেশের জনগণের সাথে আছি স্বৈরাচার শাসকদের বিরুদ্ধে।
তাই ফ্যাসিস্ট হাসিনা তার প্রিয় দেশে পালিয়ে যাওয়ার পর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ২৪ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ দেশের হাল ধরেছেন। উপদেষ্টারা যেহেতু বেশিরভাগ এনজিও ঘরানার লোক, তাই জনগণের ইচ্ছা জানা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তবুও মন্দের ভালো দুর্নীতির বাইরে থেকে দেশের ভঙ্গুর ব্যবস্থার অনুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।
হাসিনার আমলে দেশের সর্বক্ষেত্রে যেহেতু দলীয় ও আত্মীয়করণের ফলে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল প্রশাসন। তাদের লাইনে আনতে সময় লাগছে। তাছাড়া সব জায়গায় এখনো হাসিনার দোসররা বসে আছে। দীর্ঘদিনের জঞ্জাল সরাতে ড. ইউনূস সরকার হিমশিম খাচ্ছে।
তাই প্রয়োজন স্বচ্ছ রাজনৈতিক ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে স্বৈরাচার হাসিনাসহ তার দোসরদের বিচার, প্রশাসনে সংস্কার এবং নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। সংস্কার কমিটি ইতোমধ্যেই সব দলের সাথে দীর্ঘদিন আলোচনা করে প্রশাসনের সব দিকের সংস্কারের একটি রূপরেখা দাঁড় করিয়েছে। কিছু বিষয় বিএনপি তাদের ভিন্নমত দিয়েছে। তবে আশার বিষয় জামায়াতসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের রোডম্যাপ তৈরিতে একমত হয়েছে। আমরা আশা করব, সংস্কার কমিটি দেশের ভালো দিক বিবেচনা করে অতিসত্বর জুলাই সনদসহ দেশের জন্য অনুকূল দিকগুলোয় জনমত যাচাইয়ের জন্য গণভোটে চলে যাওয়া।
যেহেতু বর্তমান সরকারের আইনগত ভিত্তি দুর্বল। কিন্তু অভ্যুত্থানের গণরায়ে শক্তিমান ঐকমত্য কমিশনে এডভোকেট শিশির মনির দীর্ঘ আলোচনায় এ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছেন। তাই জুলাই সনদ ও নির্বাচনের জন্য আইনগত ভিত্তি দেয়ার জন্য গণভোট অতি জরুরি এবং বাস্তবসম্মত দীর্ঘস্থায়ী। গণভোটের রেওয়াজ বাংলাদেশে আছে, তাই কালবিলম্ব না করে জুলাই সনদের বিষয়গুলো চূড়ান্ত করে আগামী সংসদ সদস্য নির্বাচনের দিকে পা বাড়ানোই দরকার। এখানেই দুটি বিষয় আলোচনায় আছে, তা হলো জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং তার প্রয়োগ নিয়ে কথা উঠেছে আমরা আগের মতোই স্বৈরাচার হওয়ার ব্যবস্থা থাকবো, নাকি পিআর পদ্ধতি নির্বাচনে যাবো? পিআর পদ্ধতির নির্বাচন হলো জনগণের অংশগ্রহণের প্রকৃত মূল্যায়ন হয়। আমরা পিআর পদ্ধতিতেই নির্বাচনের পক্ষে। দুনিয়ার প্রায় ১০০টি দেশে পিআর পদ্ধতির নির্বাচন চালু আছে।
স্বৈরাচার হাসিনা পালানোর পর তার দোসর গ্রামের মেম্বার, চেয়ারম্যান, মেয়র, কমিশনার সবাই পালিয়ে গেছে। গ্রাম-গঞ্জে নাগরিকরা সুযোগ-সুবিধার ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত হওয়া জরুরি। সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত ব্যক্তির এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে এলে জনগণের সেবা প্রাপ্তি সহজ হবে। তাই অতিসত্বর স্থানীয় নির্বাচন দেয়া জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নির্বাচন সঠিকভাবে হওয়ায় স্থানীয় নির্বাচনের গুরুত্ব আরো বেড়ে গেছে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্থানীয় পর্যায়ে ভালো রোল প্লে করতে পারবে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচন প্রতিদিন দুই জেলায় করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে। ১ মাসের মধ্যে সব জেলায় নির্বাচন হয়ে যাবে। যেহেতু ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে, তাই অতিসত্বর স্থানীয় নির্বাচন করার জন্য সরকারের কাছে জোরদাবি জানাচ্ছি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ায় জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। সৎ, যোগ্য, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত ব্যক্তিরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে জনগণ তাদের ভোট নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাবে। দুর্নীতিবাজরা পরিত্যক্ত হবে।
আমাদের বিএনপির বন্ধুরা কেন যেন পরাজয়ের ভয়ে আবোল-তাবোল কথা বলছেন। কেউ বলছেন, পিআর পানি না তেল। খায় না মাথায় দেয়। মাথায় যেহেতু আপনার চুল কম, তাই আপনি মাথায় দিলে হয়তো চুল গজাতেও পারে। এ ভাইয়ের সাথে আমার একাধিকবার হাসিনার জেলে থাকার সুযোগ হয়েছে। তাকে আমি বুদ্ধিমান বলেই জানি। কিন্তু তেল আর পানির কথা শুনে ধারণাটা প্রশ্নবোধক হয়ে গেল। আরেক ভাই তো পরাজয়ের ভয়ে বিরোধীদলে যাওয়ার কল্পনা করছেন। আমরাও নির্বাচন চাই। তবে যেনতেন নয়। ডাকসু-জাকসুর মতো নির্বাচন চাই। জনগণ যাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন, তারাই সরকার গঠন করবে। ইসলামী দলের মিটিংয়ে টুপি পরলেই হবে না। ঈমান-আমল ঠিক করে ভারতের বুলি ত্যাগ করলেই দেশের মানুষ আপনাদের পছন্দ করতে পারে। আর আপনাদের স্মরণ করাতে চাই শহীদ জিয়াউর রহমান, বেগম জিয়ার রাজনীতিতে আসেন। এ দেশের মানুষ কোনো বিদেশি তাঁবেদারদের আর ক্ষমতায় আনবে না। যেমন ৫ আগস্ট হাসিনাকে পালাতে হয়েছে। তাই সাবধানে চললেই আপনার-আমার কল্যাণ।
বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যেই জামায়াতে ইসলামী ৩০০ প্রার্থী বাছাই করেছে। তারা জনগণের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, জনগণের ভালো-মন্দের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। আপনাদের লোকদের চাঁদাবাজি বাদ দিয়ে জনগণের কল্যাণে কাজ করার নির্দেশ দেন। দেশের মানুষ অনেক সচেতন। আর ঠকতে চায় না। সৎ, দুর্নীতিমুক্ত লোকদেরই তারা তাদের নেতা বানাবে। কোনো ভোট চুরি, দিনের ভোট রাতে হবে না। ভোটকেন্দ্রও দখল করা যাবে না। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ স্থানীয় লোকরাও সচেতনভাবে ভোট চোরদের মোকাবিলা করবে।
ইসলামী দলগুলোকে অনুরোধ করব। সচেতনভাবেই একতাবদ্ধ হন। মাওলানা মামুনুল হক সাহেবের বাবার সাথে আমার যোগাযোগ ছিল। তাকে আমাদের ওষুধ ফ্যাক্টরিতে নিয়ে গিয়েছিলাম। ভালো মানুষ। তাই যারা শরিয়াহ আইন মানে না, মৌলবাদের গন্ধ পায়, তাদের বাদ দিয়ে যারা আল্লাহ ও রাসূলকে বিশ্বাস করে এবং বাস্তবজীবনে মানে, তাদের নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য করেন। দুনিয়ায় আমাদের জবাবদিহি আছে, আবার আখিরাতেও জবাবদিহি করতে হবে। আমাদের সাথে তো দুজন ফেরেশতা বিরামহীনভাবে আমাদের চলা, বলা সবই লিখে রাখছেন। তাই আমরা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণে কাজ করতে চাই।
বিএনপির ভাইদের বলতে চাই, জামায়াতের সমর্থনেই আপনারা সরকার গঠন করেছিলেন। তখন কিন্তু কোনো ট্যাগ লাগানোর প্রয়োজন হয়নি। জামায়াতে ইসলামী এ দেশের কল্যাণেই কাজ করছে। শহীদ জিয়াউর রহমান সাহেবও দেশের ডান-বাম দেশদরদিদের নিয়েই কাজ করে গেছেন। তাও আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।
এরশাদ সাহেব শহীদ জিয়ার মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ক্ষমতায় এসে দীর্ঘ ৯ বছর দেশ চালিয়েছেন। তিনি যেমন মসজিদে গিয়ে স্বপ্নের কথা বলেছেন, আবার কুকর্মও কম করেননি। এ দেশের মানুষ আবেগী হলেও কাউকেই কিন্তু ছাড় দেননি। বাকশালের জন্য শেখ মুজিবকে অপমৃত্যুর সম্মুখীন হতে হয়েছে। এরশাদকে জনগণের রোষে পড়ে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। বিএনপিকেও কেয়ারটেকার মেনেই ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল।
ফ্যাসিস্ট হাসিনা জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় দেশে এসে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। আলেমদের হত্যা করে শাপলা চত্বরে, আবার নামকাওয়াস্তে বার বার নির্বাচনের প্রহসন করে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকে, দেশের সম্পদ সেনাবাহিনীর চৌকস ৫৭ জন অফিসারকে দিনে-দুপুরে ভারতের চক্রান্তে অস্ত্রহীন অবস্থায় ঠাণ্ডামাথায় হত্যা করে। শহীদ জিয়ার কৃপায় শেখ হাসিনা দেশে এসেছিল, সেই হাসিনা বেগম জিয়াকে এক কাপড়ে তার বাসা থেকে উচ্ছেদ করেছিল। হাসিনা এক কাপড়ে না হলেও দুপুরের ভাত না খেয়েই তার প্রিয় মোদির দরবারে পরাধীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। সবই মহান আল্লাহর সঠিক বিচারের অংশ। বাকি বিচার তো আখিরাতে রয়েই গেছে।
জামায়াতের সাবেক আমীর শহীদ মতিউর রহমান নিজামী এদেশে দুটি মন্ত্রণালয় ৫ বছর সততা ও যোগ্যতার সাথে চালিয়েছেন। তার মন্ত্রণালয়ে কোনো দুর্নীতি আবিষ্কার করতে পারেনি। তাকেও এই লেডি হিটলার হাসিনা ভিত্তিহীন অভিযোগে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। তিনি শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছেন। আল্লাহর কৃপায় শহীদ নিজামীর বড় ছেলে ড. নকীবুর রহমান ড. ইউনূসের সাথে জাতিসংঘের ৮০তম অধিবেশনে যোগদানে আমেরিকায় তার সফরসঙ্গী হয়েছেন।
যে হাসিনা জেনেবুঝেই ১ আগস্ট জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করেছিল। সেই হাসিনা ৫ আগস্ট বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়ে গেল। মহান আল্লাহ এভাবেই বিচার করেন।
বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী গত ৪৫ বছর ধরে বৈধভাবে রাজনীতি করছে। শুধু তাই না, আগামী দিনে জনগণের সমর্থন নিয়ে দেশ পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ইনশাআল্লাহ। ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে শিবিরের বিজয়ে ছাত্র-জনতার মধ্যে জামায়াত-শিবিরের গ্রহণযোগ্যতা বাস্তবে প্রমাণ হয়েছে। পুরুষ-মহিলা, ছাত্র-ছাত্রী; এমনকি হিন্দু, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর সদস্যরাও জামায়াতকে ভোট দেয়ার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। কারণ মানুষ নিরাপত্তা চায়। গত ৫৪ বছরে জামায়াত ও শিবিরের কাছে সবাই নিরাপদ। এ সময়ে কোনো হিন্দু পরিবারের জমিজমা; এমনকি কোনো মহিলা জবরদস্তিতে পড়েনি। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০০ ছাত্রীকে ধর্ষণ করে ছাত্রলীগের কর্মী সেঞ্চুরি পালন করে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে সব দল-মত, নারী-পুরুষ ভেদে সবাই স্বাধীনভাবে চলতে পারবে, নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি থাকবে না।
গত ৫৪ বছর আমরা অনেক দল-মত দেখেছি। সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। সব দলেরই দলীয় ও স্বজনদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও শিবিরের সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত লোক তৈরি করে দেশে-বিদেশে লোক নিয়োগ করে দেশে ও বিদেশে সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
দেশে স্কুল-কলেজ, মসজিদ ও মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, মিডিয়া এতিমখানাসহ হাজারো প্রতিষ্ঠান করে দেশের মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। টাকা মেরে খাওয়ার কোনো দুরভিসন্ধি জামায়াতের লোকদের নেই। ছোট-বড় সব জায়গায় তারা সুনামের সাথে পরিচালনা করে দেশ ও জাতিকে কল্যাণের পথে নিয়ে যাচ্ছে।
তাই জুলাই বিপ্লবের অনিবার্য প্রাপ্য জুলাই সনদের আশু বাস্তবায়ন চাই গণভোটের মাধ্যমে। তার আলোকেই আগামী জাতীয় নির্বাচন কার্যকরী করতে হবে। জনগণ যাদেরই তাদের প্রতিনিধি বানাবে, তারাই সরকার গঠন করে দেশ সেবার নমুনা পেশ করবে- এটাই ৫৪ বছর পর সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।