কাটেনি গ্যাস সংকট, বিদ্যুতে এখনো ঘাটতি


১ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৪৬

# উৎপাদন বাড়িয়ে কমাতে হবে আমদানিনির্ভরতা
স্টাফ রিপোর্টার : দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতাও আছে— কিন্তু সেই কেন্দ্রগুলো চালানোর মতো জ্বালানি থাকছে না। অন্যদিকে গ্যাসক্ষেত্র আছে, কিন্তু চাহিদার তুলনায় দেশীয় উৎপাদন কমছে; আমদানি করা এলএনজি দিয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ একদিকে কমছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন; অন্যদিকে বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা; আর এর সরাসরি চাপ পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সংকট যে শেষ হয়নি, তার প্রমাণ মিলছে প্রতিদিনের সরবরাহ-চাহিদার হিসাবেই। সরকারের অনুমোদিত নতুন এলএনজি কার্গো স্বস্তির কিছু সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে— দেশের হাতে আসলে কতটা গ্যাস আছে, বর্তমান ব্যবহারের হারে তা কতদিন চলবে এবং আমদানি ও নতুন উৎপাদনের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা কি ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে? সর্বশেষ পরিস্থিতি ও তথ্য বলছে, দেশের জ্বালানি সংকট কোনো একটি দিনের গ্যাস ঘাটতি বা লোডশেডিংয়ের ঘটনা নয়; এটি মজুদ, উৎপাদন, আমদানি সক্ষমতা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, চারটি স্তরে তৈরি হওয়া একটি বাস্তব চাপ।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার মহেশখালীতে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এলএনজি স্থানান্তর ব্যাহত হওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ নেমে গিয়েছিল ২,৩০১ মিলিয়ন ঘনফুটে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর এদিন দুপুর ২টায় সরবরাহ বেড়ে ২,৫২৫ মিলিয়ন ঘনফুটে ওঠে— এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস ১,৬০৭ এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে ৯১৮ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুট অথচ সংকটের আগেও সরবরাহ সাধারণত ২ দশমিক ৬৫ থেকে ২ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ঘনফুটের আশপাশে ছিল। অর্থাৎ সংকট আগেও ছিল এখন আরও বেড়েছে।
গ্যাসের মজুদ আসলে কত?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। গত ১৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি দেশে প্রায় ৭.৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (Trillion Cubic Feet-TCF) উত্তোলনযোগ্য গ্যাস মজুদ ছিল। মোট উত্তোলনযোগ্য মজুদের পরিমাণ ছিল ২৯.৭৪ TCF এবং ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত ২২ দশমিক ১১ TCF উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমান দৈনিক প্রায় ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ঘনফুট ব্যবহারের হার অপরিবর্তিত থাকলে নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলেও এই মজুদ প্রায় ১২ বছর চলতে পারে, এমন হিসাবও সংসদে দেওয়া হয়। তবে আগস্টের সরকারি Energy and Mineral Resources Division-এর গ্যাস ড্যাশবোর্ডে মোট মজুদ ২৯ দশমিক ২৫ TCF এবং অবশিষ্ট মজুদ ৯ দশমিক ০৮ TCF দেখানো হয়েছে। সরকারি দুটি উৎসে অবশিষ্ট মজুদের হিসাব এক নয় ৭.৬৩ TCF বনাম ৯.০৮ TCF । মানে হিসেবেও গড়মিল রয়েছে।
৭-৯ TCF মজুদ কি স্বাভাবিক?
সংখ্যাটি একা দেখলে বড় মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস ব্যবস্থায় এটি আর স্বস্তিদায়ক মজুদ নয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত কয়েক দশকে মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের বড় অংশ ইতোমধ্যে উত্তোলিত হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত ২২.১১ TCF উত্তোলনের হিসাব ধরলে মোট ২৯.৭৪ TCF -এর প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ব্যবহার হয়ে গেছে। তাছাড়া পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশীয় গ্যাস সরবরাহ এখন প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ঘনফুটের পর্যায়ে ঘোরাফেরা করছে। ১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় গ্রিডে ২,৬০৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মধ্যে দেশীয় উৎস ছিল ১,৬১৫ এবং এলএনজি ৯৯১ মিলিয়ন ঘনফুট।
আমদানি ছাড়া উপায় নেই
বর্তমান চাহিদার তুলনায় দেশীয় উৎপাদন কম হওয়ায় এলএনজি এখন জাতীয় গ্যাস ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। কিন্তু বাংলাদেশের আমদানি সক্ষমতারও একটি সীমা আছে। বর্তমানে দুটি FSRU-এর সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় ১.১ বিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক। ফলে বাজারে অর্থ থাকলেও ইচ্ছেমতো এলএনজি এনে জাতীয় গ্রিডে ঢোকানো সম্ভব নয়; টার্মিনাল সক্ষমতাও থাকতে হবে। এই জায়গাটিই বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। বাংলাদেশের গ্যাসের ঘাটতি পূরণ করতে আমদানি বাড়াতে হবে, কিন্তু আমদানি করা গ্যাস গ্রহণ ও রিগ্যাসিফাই করার অবকাঠামোও বাড়াতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন গত ১৪ সেপ্টেম্বর জানিয়েছেন, সরকার একটি অচল FSRU (Floating Storage and Regasification Unit বা ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ টার্মিনাল।) মেরামতের পাশাপাশি তৃতীয় FSRU আনার পরিকল্পনা করছে এবং সেটি ২০২৮ সালের আগেই চালুর লক্ষ্য রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে FSRU-এর সংখ্যা পাঁচে নেওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
অনুমোদিত এলএনজি আসতে কত সময় লাগবে?
গত ৯ সেপ্টেম্বর সরকার Total Energies (ফ্রান্সভিত্তিক একটি বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানি)-এর কাছ থেকে ১৮টি এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত প্রতি মাসে দুটি করে কার্গো আসার কথা। প্রয়োজনে পারস্পরিক সম্মতিতে অতিরিক্ত কার্গোও কেনার সুযোগ রাখা হয়েছে। আর ১৬ সেপ্টেম্বর সরকার কাতার এনার্জি ট্রেডিং থেকে আরও একটি এলএনজি কার্গো অনুমোদন করেছে, যার সরবরাহ নভেম্বর ২০২৬-এ নির্ধারিত।
বিদ্যুৎ সংকট কোথায়?
গ্যাসের ঘাটতি সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে আঘাত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ, কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ এবং জাতীয় গ্রিডের সীমাবদ্ধতা। Power Grid Bangladesh (জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা পরিচালনাকারী রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান)-এর তথ্যানুযায়ী ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৮টায় জাতীয় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫,৮০২ মেগাওয়াট; সরবরাহ ছিল ১৪,৬৯৪ মেগাওয়াট— ঘাটতি ১,১১৮ মেগাওয়াট। ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় চাহিদা ১৩,৯৫১ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩,৭৬৮ মেগাওয়াট এবং লোডশেডিং ১৮৩ মেগাওয়াট। এর অর্থ হলো, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আগস্টের চরম অবস্থার তুলনায় কিছুটা উন্নত হলেও জাতীয় গ্রিড এখনো পুরোপুরি উদ্বৃত্ত বা নির্ভরযোগ্য অতিরিক্ত সক্ষমতার অবস্থায় নেই। আঞ্চলিক চিত্রও একই কথা বলছে। ২৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি স্থানীয় প্রতিবেদনে সিলেটে ২২৫ মেগাওয়াটের কুমারগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্র যান্ত্রিক ত্রুটিতে বন্ধ থাকায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কথা বলা হয়েছে।
রূপপুর কি এখনই সংকটের সমাধান করবে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। তবে এর প্রভাবকে তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। জুনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, প্রথম ইউনিটের ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা থেকে ধীরে ধীরে প্রায় ১,০০০-১,১০০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। অন্যদিকে ২৮ সেপ্টেম্বরের একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনে বাধার কথা উঠে এসেছে। ফলে প্রকল্পের সব ইউনিট একসঙ্গে সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান দেবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। অবশ্য ২৮ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন ‘রোসাটম’ জানিয়েছে, পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) সরবরাহ আগামী অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এই ইউনিটের প্রয়োজনীয় সব জ্বালানি সরবরাহ সম্পন্ন হবে।
সরকারের সামনে মূল সমস্যা তিনটি
বিশেষজ্ঞরা দেশের জ্বালানি সংকটকে তিনটি স্তরে দেখছেন। প্রথমত, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও মজুদের চাপ। অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য মজুদের সরকারি হিসাব ৭.৬৩ থেকে ৯.০৮ TCF-এর মধ্যে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু একই সময়ে দেশীয় উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম। দ্বিতীয়ত, এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা। আমদানি বাড়ানোর অনুমোদন হচ্ছে, কিন্তু FSRU সক্ষমতা সীমিত। ফলে শুধু টাকা থাকলেই প্রয়োজনমতো এলএনজি জাতীয় গ্রিডে দেওয়া সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানিনির্ভরতা। গ্যাস সরবরাহ কমলে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন কমে; কয়লা বা তেলভিত্তিক কেন্দ্র দিয়ে সেই ঘাটতি পুরোপুরি সামাল দেওয়ার সুযোগও সীমিত। একই সময়ে কোনো বড় কেন্দ্র কারিগরি সমস্যায় পড়লে গ্রিডে তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
সরকারের হাতে এখন একাধিক স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা রয়েছে— নতুন এলএনজি কার্গো, দেশীয় কূপ থেকে উৎপাদন বাড়ানো, কয়লা ও তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্র সচল রাখা এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সরবরাহ পুনর্বণ্টন। একইসঙ্গে তৃতীয় FSRU, নতুন গ্যাসকূপ এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি অবকাঠামো তৈরি পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন।