নিরাপত্তাহীন মানুষ ॥ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা


২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:০৩

বাড়ছে খুন ছিনতাই ধর্ষণ
পুলিশ ব্যস্ত ঘুষ বাণিজ্যে

॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
রাজধানীসহ দেশজুড়ে অপরাধের লাগামহীন বিস্তারে শহর কিংবা গ্রাম সর্বত্রই যেন এক ভয়ের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। খুন, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং নারী ও শিশুর প্রতি নৃশংসতার ঘটনাগুলো এখন সংবাদমাধ্যমের নিয়মিত শিরোনামে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের যাপিত জীবন এখন চরম নিরাপত্তাহীনতার আবর্তে বন্দি, যেখানে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও বেঁচে থাকার নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও ঘটনাপ্রবাহ এই ভয়াবহ বাস্তবতারই এক নির্মম প্রামাণ্য দলিল, যা সুস্থ ও সভ্য সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চরম নির্লিপ্ততা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অপরাধপ্রবণতার বিস্তার কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর ও দলনিরপেক্ষ অবস্থানই উন্নয়ন করতে পারে। তারা বলছেন, এটি পরিস্থিতির অবনতির লক্ষণ নয়, বরং এটি সামাজিক অবক্ষয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতির এক সম্মিলিত রূপ। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উদ্ধার হওয়া নিখোঁজ শিশুদের মৃতদেহ, প্রকাশ্যে সড়কে বা ঘরের ভেতরে ঘটে চলা লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড এবং ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে সাধারণ মানুষের প্রাণ হারানোর ঘটনা প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা আজ কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। একদিকে যেমন চুরি-ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ সাধারণ মানুষের পথচলাকে বিপজ্জনক করে তুলেছে; অন্যদিকে পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরেও হিংস্রতার মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের মনে ভয়ের পরিবর্তে এক ধরনের বেপরোয়া মনোভাব তৈরি করছে বলে মনে করছেন অপরাধবিজ্ঞানী ও সমাজবিশ্লেষকরা।
পুলিশে ঘুষ বাণিজ্য, ভেঙে পড়েছে চেইন অব কমান্ড
ভেঙে পড়েছে পুলিশের চেইন অব কমান্ড। অভিযোগ রয়েছে পুলিশে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ বদলি বাণিজ্যে আওয়ামী আমলে প্রচলিত ঘুষপ্রথা। সম্প্রতি আইজিপির একজন বডিগার্ডের অডিও রেকর্ড ফাঁসের পর পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে চলতে থাকা গোপন ‘বদলি বাণিজ্য’ ও সিন্ডিকেটের চিত্র জনসমক্ষে চলে আসে। অডিওতে স্পষ্ট ভাষায় উঠে এসেছে যে, পুলিশ বাহিনীর কনস্টেবল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদের সদস্যদের পছন্দমতো লাভজনক বা গুরুত্বপূর্ণ জেলায় বদলি করাতে গেলে একটি নির্দিষ্ট অংকের টাকা লেনদেন করতে হয়। এর আগে নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানার ওসি মো. আবুল হাশেমের বক্তব্যে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও রেকর্ডে তার বক্তব্য ছিল ‘পুলিশের চাকরি ওয়ান কাইন্ড অব বিজনেস’। আমরা কেউ কাউকে ঠকাব না। সবাই মিলেমিশে থাকব। এর পর তাকে বদলি করা করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ আমলে চলে আসা ঘুষের বিনিময়ে পদ বাগিয়ে নেয়ার প্রথা এখনো বহাল রয়েছে। শুধু সিন্ডিকেট বদলিয়েছে। ফলে সৎ, দক্ষ পুলিশ অফিসারগণ আগের মতোই কোণঠাসা। বরং টাকার বিনিময়ে পদ দখল করাই কর্মকর্তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে— যাতে বিনিয়োগ করা টাকা তোলা। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা তাদের কাছে মুখ্য নয়। পুলিশের মতো একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর অভ্যন্তরে এভাবে ক্ষোভ, অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য এবং পদায়ন নিয়ে বিশৃঙ্খলা চলতে থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাক্সিক্ষত উন্নয়ন কখনো সম্ভব হবে না। শীর্ষ কর্মকর্তাদের অর্থলিপ্সা ও অদূরদর্শিতার কারণে মাঠপর্যায়ে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলেন, দিন শেষে কিন্তু সরকারকেই খেসারত দিতে হচ্ছে।
ডিএমপির ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রাকিবুল হাসানের কথোপকথনের অডিও ক্লিপ প্রকাশের পর তাকে দাফতরিকভাবে ডিএমপির সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। তবে এরপরই তাকে ডিবি হেফাজতে নেয়া হয়। যদিও কয়েকদিন ধরে তার সম্পর্কে কোনো তথ্যই প্রকাশ করা হচ্ছে না। তার কথা দ্বারা আবারো প্রমাণ হচ্ছে পুলিশে ঘুষ বাণিজ্য আগের মতোই আছে। তার মানে জুলাই ক্ষমতাসীন মাঝে কোনো পরিবর্তন তৈরি করতে পারেনি। জিজ্ঞাসাবাদে রাকিবুল জানিয়েছেন, পলাতক এডিশনাল আইজিপি মনিরুল ইসলাম, ডিবির হারুন ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ অপর দুই পুলিশ কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার ও ডিআইজি হাবিবুর রহমানের দোসরগণ এখনো সক্রিয় আছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে জমা একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যরা ঘাপটি মেরে আছেন। বাহিনীর অনেক কর্মকর্তার মতে, আওয়ামী ভূত এখনো যায়নি। ফ্যাসিস্ট হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে নিয়োগ পাওয়া আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠন-সহযোগী সংগঠনের সদস্যদের সংখ্যাই বেশি। মূলত তারাই পুলিশ বাহিনীকে শৃঙ্খল হতে দিচ্ছে না। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে বিএনপির সুবিধাবাদী গ্রুপ।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ। যদি বাহিনীর সদস্যদের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায় এবং পুলিশ যদি সত্যিই স্বাধীনভাবে এবং একইসঙ্গে চেইন অব কমান্ড মেনে দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাহলে দেশ থেকে অপরাধ নির্মূল করা সময়ের ব্যাপার। আর পুলিশকে পুরোদমে সক্রিয় করা না গেলে সামনে আরো খারাপ পরিস্থিতি দেখতে হতে পারে।
নিরাপত্তাহীন মানুষ ও পুলিশের নিলিপ্ত ভূমিকা
পুলিশের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যানে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি দেখানো হয়েছে। কিন্তু কাগজে কলমের এসব পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণ মানুষ নিজেদের নিরাপদবোধ করছে না। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ে জনমনে স্বস্তি নেই। সবসময় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটছে তাদের সময়। এমনকি জাতীয় সংসদে বিরোধীদলও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-রংপুর লংমার্চ কর্মসূচিতে অন্যান্য দাবি-দাওয়ার মধ্যে ‘চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন’ গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে।
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই এখন নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিলিপ্ততায় বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাংসহ ছিনতাই চক্র। প্রতিনিয়ত ছিনতাই, চুরি, ধর্ষণ, খুন এবং মাদকের মতো ভয়াবহ ঘটনার বিস্তারে আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্নীতিবাজ একশ্রেণির সদস্যদের প্রশ্রয় এবং ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে আশীর্বাদপুষ্ট টপটেররদের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য অপরাধীচক্র।
বর্তমানে প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও খুন, ধর্ষণসহ ভয়াবহ অপরাধের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষের আতঙ্ক দূর করার জন্য পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে ধরনের দৃশ্যমান তৎপরতা থাকা দরকার, সে ধরনের তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বরং দেখা যাচ্ছে, পুলিশ কেমন যেন আওয়ামী আমলের ধারায় ফিরছে। আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতিতেও তাদের মাঝে নেই বোধোদয়।
কিন্তু পুলিশ বলছে তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি দেখতে পাচ্ছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সময়ের তুলনা করে পুলিশ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে খুন হয়েছে ২৬০৭টি। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত খুন হয়েছে ২৩৩২টি। অর্থাৎ খুনের ঘটনা আগের বছরের তুলনায় ২৭৫টি কম আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নির্দেশ করে।
গত বছরের জানুয়ারি-আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে নারী শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ১১ হাজার ২৬৯টি আর চলতি বছরের একই সময়ে ঘটে ৯৩৪৭টি। আগের বছরের তুলনায় নারী শিশু নির্যাতনের ঘটনা ১৯২২টি কমেছে।
একইভাবে ২০২৫ সালের আট মাসে ধর্ষণ মামলা রেকর্ড হয়েছে ৪৬৬৬টি, আর চলতি বছরে রেকর্ড হয়েছে ৪৪৭২টি। ফলে এ বছরের প্রথম আট মাসে ধর্ষণের ঘটনা ১৯৪টি কম রেকর্ড হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে মবের ঘটনা ছিল ৮৯টি আর ২০২৬ সালে সেটা রেকর্ড হয়েছে ৫৬টি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি সহিংসতার ঘটনা ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে ছিল ৯৯৯টি আর ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে রেকর্ড হয়েছে ১৬৩টি।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ ডাকাতির মামলাকে চুরি, ধর্ষণ মামলাকে শ্লীলতাহানির অভিযোগসহ নানাভাবে রেকর্ড পরিবর্তন করে পরিস্থিতি ঢাকার চেষ্টা করে। পুলিশের প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যানে যাই থাকুক, সাধারণ মানুষ নিজেদের নিরাপদ বোধ করছে না। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ে জনমনে স্বস্তি নেই। সবসময় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটছে তাদের সময়।
আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, উদ্বিগ্ন মানুষ
দেশজুড়ে একের পর খুন, ছিনতাই, ধর্ষণের ঘটনায় চরম উদ্বিগ্নে কাটছে সাধারণ মানুষের জীবন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার কোটবাড়ীতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে (১৩) হত্যা করা হয়। সামান্য বিষয়ে কিশোর এই ছেলেকে খুনের ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ঘটনাটি দেশের মানুষকে নাড়া দেয় এবং শিশুদের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তার আগে গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা (৭) হত্যাকাণ্ড এবং ২১ মে চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় শিশু ফারিয়া (৪) ধর্ষণের ঘটনা দেশের মানুষকে নাড়া দেয়। এছাড়া রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের হত্যাকাণ্ড নাগরিকদের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করে।
এছাড়া গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা, ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের আনোয়ারায় স্বপন দাশগুপ্ত ও তার স্ত্রী কল্পনা দাশগুপ্ত হত্যার ঘটনাও নাড়া দেয় মানুষকে। আর গত ১২ আগস্ট সিলেটের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার, স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা খুন হন। গত ৮ মে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় এক পরিবারের পাঁচজন খুনের ঘটনায়ও তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়।
গত ২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আদাবরে হাত ও গলাকাটা অবস্থায় এক ব্যক্তির ১০ টুকরো লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ১২ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের মধুখালীর বোয়ালিয়ায় এক ব্যক্তির ছয় টুকরা লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ১৮ সেপ্টেম্বর মেসে ‘ভাত চুরি করে খাওয়া’র মতো ঠুনকো অভিযোগ এনে খুলনায় নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি প্রথম বর্ষের ছাত্র আজমুল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
এছাড়া গত ২৯ আগস্ট ঢাকায় চিকিৎসা নিতে আসা বগুড়ার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিন জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে মারা যান। গত ৫ সেপ্টেম্বর সাভারে খোদ পুলিশের বিশেষ শাখার এসআই আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিন রাজধানীর শনিরআখড়ায় আসমান খান নামে এক ব্যবসায়ীকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
প্রতিদিনই একের পর এক ভয়াবহ ঘটনায় সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কিন্তু এ বিষয়গুলো নিয়ে ক্ষমতাসীন দল বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো পরিকল্পনা বা দুশ্চিন্তা দেখছে না মানুষ। এমনকি ভয়াবহ এ পরিস্থিতিকে গতানুগতিক ভাবে সামলাচ্ছে বলে অভিযোগ আসছে।
পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নির্লিপ্ততার সুযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগও নানামুখী অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। তারা কখনো ঝটিকা মিছিল, বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো, বাস ও ট্রেনে আগুন দেওয়াসহ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল করার চেষ্টা করছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসীদের অধিকাংশই এখন ঢাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসী এবং তাদের সহযোগীদের তালিকা করা হয়েছে। খুব শিগগির তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মুক্তি পাওয়া সন্ত্রাসীরা আবার অপরাধে জড়াচ্ছেন কি না, তা নজরদারিতে রাখা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে মনে হয়, তাদের কার্যকর নজরদারির মধ্যে রাখা যায়নি। অপরাধীরা যাতে কোনোভাবেই রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, আর পুলিশ তার স্বাভাবিক মনোবল ফিরে পেতে ব্যর্থ হয়েছে। অপরাধীরা শাস্তি না পাওয়ায় অপরাধপ্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বেকারত্ব ও মাদকাসক্তি যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অপরদিকে সামাজিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য এবং শিক্ষার ব্যাপক অভাব এই সংকটের মূল কারণ।
পুলিশের মুখপাত্র এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, তুলনামূলক পরিসংখ্যান বলছে বাস্তবেই আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। কিন্তু যখনই দেশে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটে, তখন সেটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ব্যাপকহারে প্রচার হচ্ছে। এর থেকে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও ভয় ছড়াচ্ছে। আমরা পরিষ্কারভাবেই বলতে পারি, আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, শুধু পুলিশ দিয়ে আইনশৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। জনসাধারণকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আইন মেনে চলার সংস্কৃতি মানতে হবে। এতে ধীরে ধীরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। যেসব লোমহর্ষক অপরাধ ঘটছে, সেগুলোর সঠিক ও দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা গেলেই মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে। এতে লোমহর্ষক অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে জনমনে স্বস্তি ফিরবে।