হুতি-সৌদি সংঘাত, বাড়ছে মধ্যপ্রাচ্যের ঝুঁকি


২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৫৮

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইয়েমেনে কয়েক বছরের তুলনামূলক স্থবিরতার পর চলতি সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে আবার বড় আকারের সামরিক সংঘাত শুরু হয়েছে। হুতিদের পশ্চিম উপকূলের দ্রুত অগ্রযাত্রা, কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা ও আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর পাল্টা অভিযান এবং সৌদি ভূখণ্ডে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, সব মিলিয়ে সংঘাত এখন ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। একই সময়ে বাব আল-মান্দাব ও হরমুজ এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ঘিরে উত্তেজনা থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি ও নৌ-বাণিজ্যেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ইয়েমেনে ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
মোখা থেকে বাব আল-মান্দাবের দিকে হুতিদের অগ্রযাত্রা
নতুন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু পশ্চিম ইয়েমেনের উপকূল। সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধে হুতিরা মোখা বন্দরনগরী দখল করে এবং এরপর মায়ুনসহ লোহিত সাগরের কয়েকটি কৌশলগত দ্বীপের দিকে অগ্রসর হয়। জাতিসংঘও পশ্চিম উপকূলে হুতিদের অগ্রযাত্রা এবং বাব আল-মান্দাবের দিকে তাদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে। বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। ইউরোপ-এশিয়া বাণিজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহনের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ফলে এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সামরিক প্রতিযোগিতা শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক নৌনিরাপত্তাও সরাসরি যুক্ত। জাতিসংঘ বলছে, ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বড় ধরনের ব্যাহত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বাব আল-মান্দাবের কাছে সামরিক উত্তেজনা এবং একই সময়ে হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা বাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সৌদির পাল্টা আঘাত ও রিয়াদে হামলার দাবি
হুতিদের অগ্রযাত্রার জবাবে সৌদি আরব ইয়েমেনে বিমান হামলা বাড়িয়েছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর হুতি-নিয়ন্ত্রিত মোখায় সৌদি বিমান হামলায় ছয়জন নিহত ও আটজন আহত হয়েছে বলে হুতি-নিয়ন্ত্রিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশন দাবি করেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ওই দাবির বিষয়ে মন্তব্য করেনি। এর আগে ১৯ সেপ্টেম্বর হুতিরা রিয়াদসহ সৌদি আরবের কয়েকটি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, রিয়াদের দিকে আসা একটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এই পাল্টাপাল্টি হামলা কার্যত সংঘাতটি এখন শুধু ইয়েমেনের ভেতরের যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন মধ্যপ্রাচ্যের নতুন শঙ্কায় পরিণত হয়েছে।
সৌদির প্রতিরক্ষায় মিত্রদের ভূমিকা
সৌদি আরবের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা। একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদ মিত্র দেশগুলোর কাছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চেয়েছে। যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে সৌদি আরবকে সীমিত আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্রিটিশ সরকার একটি রয়্যাল এয়ারফোর্স ভয়েজার বিমান দিয়ে সৌদি যুদ্ধবিমানকে আকাশে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সরাসরি নতুন করে ইয়েমেন যুদ্ধে সামরিকভাবে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে সতর্ক রয়েছে। এ অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওয়াশিংটনের সরাসরি অংশগ্রহণ সংঘাতের পরিধি বাড়াতে পারে; আবার মার্কিন সামরিক সহায়তা না থাকলে সৌদি আরবকে নিজস্ব সক্ষমতা ও অন্যান্য মিত্রের ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ থেকে দূরে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
ইরানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক এই সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক দিক। সৌদি আরব ও পশ্চিমা দেশগুলো হুতিদের ইরানের সহযোগী হিসেবে দেখে এবং তাদের সামরিক সক্ষমতায় তেহরানের সহায়তার অভিযোগ করে আসছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর জি-৭ পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও ইরানকে হুতিদের অস্ত্র ও সহায়তা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে হুতিদের সব সিদ্ধান্তকে সরাসরি ইরানের নির্দেশ হিসেবে দেখার বিষয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হুতিরা নিজেদের ইয়েমেনের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। ফলে বর্তমান সংঘাতকে একই সঙ্গে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মানবিক সংকটই সবচেয়ে বড়
সামরিক অগ্রযাত্রা ও পাল্টা হামলার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি মানুষ ইয়েমেনে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৩০০ মানুষ লোহিত সাগর পেরিয়ে জিবুতিতে পৌঁছেছিল। জাতিসংঘ আরও জানিয়েছে, ইয়েমেনে ২ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। নতুন করে সংঘাত বাড়ায় খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয়ের ওপর চাপ আরও বাড়ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর সেপ্টেম্বরের প্রথম ভাগে ৪০ জন বেসামরিক হতাহতের তথ্য যাচাই করেছিল, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
তেল ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ঝুঁকি
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের লড়াইয়ের আন্তর্জাতিক গুরুত্বের বড় কারণ বাব আল-মান্দাব। এই নৌপথে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে জাহাজগুলোকে বিকল্প রুটে যেতে হতে পারে। এতে সময়, জ্বালানি ও বিমা ব্যয় বাড়তে পারে। সৌদি আরবের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহনে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরব এই পাইপলাইনের কার্যক্রম পুনরায় চালু করেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। জুলাইয়ে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি দৈনিক ৪১ লাখ ২৫ হাজার ব্যারেলে উঠেছিল; তবে নতুন সংঘাত আগস্ট ও পরবর্তী সময়ের সরবরাহে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
সংঘাত কি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে সংঘাত কি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে? ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রযাত্রা, সৌদি বিমান হামলা, রিয়াদে হামলার চেষ্টা, ইরানের সঙ্গে হুতিদের সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সীমিত সম্পৃক্ততা, সবকিছু একসঙ্গে সংঘাতকে আরও জটিল করছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এখনই এটিকে পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার অনিবার্য পথ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ একই সময়ে কূটনৈতিক যোগাযোগও চলছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ফোনে ইয়েমেনের পরিস্থিতি এবং হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবে নিরাপদ নৌচলাচলের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা সংঘাত বন্ধ করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।
সামনে তিনটি বড় ঝুঁকি
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, হুতিরা পশ্চিম উপকূলে আরও অগ্রসর হয়ে বাব আল-মান্দাবের আশপাশে তাদের সামরিক অবস্থান কতটা শক্তিশালী করতে পারে। দ্বিতীয়ত, সৌদি আরব এই অগ্রযাত্রার জবাবে স্থল ও আকাশ অভিযান কতটা বাড়ায়। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ মিত্র দেশগুলোর সামরিক সম্পৃক্ততা কোন পর্যায়ে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাব আল-মান্দাব ও হরমুজ একই সময়ে অস্থিতিশীল থাকলে তার প্রভাব ইয়েমেন বা সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও পণ্যের পরিবহন ব্যয়েও চাপ তৈরি হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সামরিক বিজয়ের চেয়ে রাজনৈতিক সমঝোতাই ইয়েমেন সংকটের স্থায়ী সমাধানের প্রধান পথ বলে জাতিসংঘ জোর দিয়ে আসছে। বর্তমান বাস্তবতায় যুদ্ধের বিস্তার ঠেকানো, বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া, মানবিক সহায়তার পথ খোলা রাখা এবং আলোচনায় ফেরাই সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ। কারণ, ইয়েমেনের চলমান সংকট যত দীর্ঘ হবে, তার মানবিক ও আঞ্চলিক মূল্যও তত বাড়বে।