ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত

সমঝোতা নাকি যুদ্ধবিরতি ভেঙে পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের ঝুঁকি


২০ আগস্ট ২০২৬ ০৯:৪৯

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে, যেখানে যুদ্ধবিরতি আর শান্তির পথ তৈরি করছে না। গত জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা কার্যত থমকে গেছে। ইরান বলছে, তারা আর সাময়িক যুদ্ধবিরতি চায় না, চায় যুদ্ধের স্থায়ী অবসান। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমানে কোনো আলোচনা চলছে না এবং নতুন কোনো বৈঠকও নির্ধারিত নেই। একই সময়ে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ, ওমানকে মার্কিন হামলার হুমকি, সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তাহীনতা এবং বিশ্ববাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির বদলে ‘যুদ্ধের স্থায়ী অবসান’ চায় ইরান
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করে বলেছেন, তেহরান আর এমন কোনো যুদ্ধবিরতি চায় না, যার ফলে কয়েক মাস পর আবার সংঘাত শুরু হবে। তাঁর ভাষায়, ইরানের লক্ষ্য যুদ্ধের অবসান। তেহরানের এই অবস্থান মূলত জুনের অন্তর্বর্তী সমঝোতার অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে। দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলেও পরবর্তী সময়ে সেটি বাস্তবায়ন নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগ তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা ভেঙে পড়ে। বর্তমানে ইরান চাইছে যেকোনো নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ যেন সাময়িক বিরতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে যায়। ইরানের বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিবেশী-কেন্দ্রিক কূটনীতি। তেহরান দাবি করছে, যুদ্ধের সময় প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে তারা পণ্য ও ওষুধ পেয়েছে এবং কিছু দেশ আটকে পড়া ইরানিদের দেশে ফেরার সুযোগ দিয়েছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পরিবর্তে ইরান এখন আঞ্চলিক দেশগুলোর মাধ্যমে নিজের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিসর ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
তেহরান-ওয়াশিংটন : আলোচনার দরজা কার্যত বন্ধ
ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করেছে। তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না এবং ভবিষ্যতেও কোনো বৈঠক নির্ধারিত নেই। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বহাল থাকার কথা জানিয়েছেন। এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে শুধু মতপার্থক্য নয়, বাস্তব পরিস্থিতি নিয়েও বড় ধরনের বিরোধ দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প দাবি করছেন, হরমুজ প্রণালী ‘উন্মুক্ত ও সচল’। অন্যদিকে ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা পর্যন্ত প্রণালী পুরোপুরি খুলবে না। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান দেখাচ্ছে যে, বর্তমান পর্যায়ে কূটনৈতিক সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম আস্থাটুকুও দুই দেশের মধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এখন সংঘাতের মূল কেন্দ্র হরমুজ প্রণালী
বর্তমান যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটিকে ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি কৌশলগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। ইরানের জন্য হরমুজ একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার। তেহরান মনে করছে, এই জলপথে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো সম্ভব। বিপরীতে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে হরমুজ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত থাকা জরুরি এবং সেখানে ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া যায় না। এই দ্বন্দ্ব এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ট্রাম্প হরমুজকে ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখানো একটি মানচিত্রও প্রকাশ করেছেন। ইরান এর কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
ওমান : মধ্যস্থতাকারী থেকে সংঘাতের সম্ভাব্য পক্ষ?
এই সংকটে ওমানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে আসছে। বর্তমানে ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নতুন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে। কিন্তু এই উদ্যোগই ওয়াশিংটনের সঙ্গে মাসকাটের দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ওমান যদি ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতার মাধ্যমে শান্তি প্রচেষ্টার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর হামলা চালাতে পারে। ওমান এতদিন ছিল আলোচনার সেতু। সেই দেশটিই যদি মার্কিন চাপের কারণে মধ্যস্থতা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথও সংকুচিত হবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোও এখন সরাসরি ঝুঁকিতে
সংঘাতের বিস্তার ইতোমধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, ইরান থেকে দুটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের দিকে ছোড়া হয়েছিল; একটি তাদের জলসীমায় পড়ে এবং অন্যটি জলসীমার বাইরে পড়ে। ইরান অবশ্য এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। এরপর টহরঃবফ অৎধন ঊসরৎধঃবং (টঅঊ) ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক কার্যক্রম স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব এখন কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, আঞ্চলিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যেও সরাসরি পড়ছে।
তেলের বাজারে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
হরমুজ সংকটের সবচেয়ে দ্রুত দৃশ্যমান প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজারে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া এবং জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯১ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। এখানে মূল উদ্বেগ শুধু বর্তমান দামের নয়। হরমুজ দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়। ফলে জলপথটি দীর্ঘসময় অকার্যকর থাকলে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়বে পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের কাঁচামাল এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচে। অর্থাৎ যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে গিয়ে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতেও নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কূটনৈতিকভাবে তুরস্ক ও অন্য দেশগুলো সক্রিয়
এই অবস্থায় তুরস্কসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আঙ্কারা একইসঙ্গে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছে। পাকিস্তান ও কাতারও বিভিন্ন পর্যায়ে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। কিন্তু বড় সমস্যা হলো, মধ্যস্থতাকারীদের হাতে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই যে ওয়াশিংটন ও তেহরান তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করবে। বিশেষ করে ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অনাগ্রহী এবং ওয়াশিংটনও এখন নতুন কোনো আলোচনা নির্ধারিত নেই বলে জানাচ্ছে। ফলে মধ্যস্থতাকারীদের জন্য জায়গাটি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
এখন যা হতে পারে
প্রথমত, সীমিত কূটনৈতিক প্রত্যাবর্তন : ওমান, তুরস্ক, কাতার বা পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনা আবার শুরু হতে পারে। হরমুজকে কেন্দ্র করে কোনো অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা তৈরি হলে সেখান থেকেই বৃহত্তর শান্তি আলোচনার দরজা খুলতে পারে।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘস্থায়ী ‘নিয়ন্ত্রিত সংঘাত’ : যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখবে, আর ইরান হরমুজ ও আঞ্চলিক সামরিক সক্ষমতাকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। এই পরিস্থিতিতে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ না হলেও নিয়মিত হামলা, জাহাজে আক্রমণ ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ চলতে পারে।
তৃতীয়ত, বড় ধরনের সামরিক বিস্ফোরণ : উপসাগরীয় কোনো দেশ, মার্কিন সামরিক স্থাপনা বা বাণিজ্যিক জাহাজে বড় হামলা হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে ওমানের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশের ওপর হামলা হলে সংঘাতের ভৌগোলিক পরিসর আরও বাড়ার ঝুঁকি থাকবে।
যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
গত ১৮ আগস্ট পর্যন্ত সর্বশেষ পরিস্থিতি থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে, তা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখনো যুদ্ধ শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। বরং দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে। ইরান চাইছে সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে স্থায়ী যুদ্ধের অবসান এবং এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ কমানোর নিশ্চয়তা। ওয়াশিংটন চাইছে ইরানের ওপর চাপ বজায় রেখে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ও ইরানের সামরিক সক্ষমতা সীমিত করতে। এই দুই লক্ষ্য এখনো পরস্পরের বিপরীত। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংঘাতের কেন্দ্র এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার সবকিছুই এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। তাই বর্তমান যুদ্ধের পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে একটি প্রশ্নের ওপর, তা হচ্ছে- ওয়াশিংটন ও তেহরান কি শেষ পর্যন্ত মুখোমুখি সংঘর্ষের বদলে এমন একটি সমঝোতায় ফিরতে পারবে, যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের মূল স্বার্থের কিছুটা রক্ষা করতে পারে?