ইরান-যুক্তরাষ্ট্র

সামরিক হামলার বদলে চলছে কূটনৈতিক লড়াই


১২ আগস্ট ২০২৬ ১৯:৪৮

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত সামরিক যুদ্ধ থেকে এখন কূটনৈতিক দরকষাকষির পর্যায়ে রয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি বা স্থায়ী শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে গত কয়েকদিনে যেমন আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তেমনি নতুন করে ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ ও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে সেই সম্ভাবনা আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বড় আকারের সামরিক অভিযান থেকে কূটনীতির দিকে ফিরতে আগ্রহী হলেও, কোন শর্তে যুদ্ধের অবসান হবে এবং হরমুজ প্রণালী কীভাবে খুলবেÑ এ প্রশ্নে এখনো মৌলিক বিরোধ বিদ্যমান।
হরমুজই এখন মুখ্য বিষয়
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালী। ইরান ও ওমানের মধ্যে প্রণালীতে নিরাপদ জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে গেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কাছাকাছি পৌঁছেছে। দুই পক্ষ থেকেই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে বলেও দোহা জানিয়েছে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ইরান-ওমানের মধ্যে নিরাপদ নৌপথ নির্ধারণের আলোচনা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হরমুজ পুরোপুরি খুলে দেওয়ার সমঝোতা এক বিষয় নয়। তেহরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য চাপ অব্যাহত থাকলে হরমুজকে পুরোপুরি স্বাভাবিক নৌপথে ফিরিয়ে আনা হবে না। ফলে এ বিষয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা এখনো অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ থেকে মাইন সরিয়ে ফেলেছে এবং প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তব জাহাজ চলাচলের পরিসংখ্যান সেই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। লন্ডনভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্যানুযায়ী, ১০ আগস্ট মাত্র ছয়টি জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে; আগের ১০ দিনের গড় ছিল প্রায় ১১টি এবং যুদ্ধের আগে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ১৩০-১৪০টি জাহাজ চলাচল করত। অর্থাৎ হরমুজ প্রণালী সামরিকভাবে আংশিক উন্মুক্ত বা নিয়ন্ত্রিত হলেও বাণিজ্যিকভাবে এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
ক্ষতিপূরণের পাল্টাপাল্টি দাবি নতুন বাধা
কূটনৈতিক অচলাবস্থাকে আরও জটিল করেছে ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক হামলায় সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে এবং হরমুজ খুলে দেওয়ার সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ছাড়ের বিষয়টি যুক্ত করেছে। এর জবাবে ট্রাম্প ইরানের কাছে পাল্টা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। ট্রাম্পের দাবির মধ্যে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর হামলায় নিহত বা আহত মার্কিন সেনাদের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং অতীতের বিভিন্ন সংঘাতের ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও রয়েছে। এমনকি ২০০০ সালের টঝঝ ঈড়ষব হামলার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেছেন, যদিও ওই হামলার জন্য মার্কিন তদন্তকারীরা আল-কায়েদাকে দায়ী করেছিলেন। এই অবস্থান কূটনীতির জন্য বড় সমস্যা তৈরি করেছে। কারণ ক্ষতিপূরণের প্রশ্নটি এখন শুধু অর্থনৈতিক দাবি নয়; এটি দুই দেশের রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতা গুরুত্বপূর্ণ
এ অবস্থায় পাকিস্তান আবারও গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সামনে এসেছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির তেহরান সফরকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এপি জানিয়েছে, পাকিস্তান-সমর্থিত একটি শান্তি কাঠামোর আওতায় নাকভির এই সফরের লক্ষ্য ছিল আলোচনাকে পুনরুজ্জীবিত করা। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে গত ১১ আগস্ট মঙ্গলবার বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কোনো না কোনো ধরনের সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে পাকিস্তানের এমন বক্তব্য উঠে এসেছে। একইসঙ্গে কাতারও জানিয়েছে, হরমুজ নিয়ে ইরান-ওমান আলোচনা অগ্রসর হয়েছে। অর্থাৎ, পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং প্রকাশ্য কঠোর বক্তব্যের পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সম্ভাব্য সমঝোতার কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে।
নতুন সামরিক নেতৃত্ব তেহরানে
ইরানের সামরিক নেতৃত্বে সাম্প্রতিক পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। আইআরজিসির নতুন কমান্ডার হিসেবে আহমাদ ওয়াহিদির দায়িত্ব গ্রহণ এবং অন্যান্য শীর্ষ সামরিক পদে পরিবর্তন দেখাচ্ছে যে তেহরান একই সঙ্গে সামরিক প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ সক্ষমতা ধরে রাখতে চাইছে। এটি কূটনীতির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নাকচ করে না। বরং ইরানের কৌশল হচ্ছেÑ আলোচনার টেবিলে যাওয়ার আগে সামরিক সক্ষমতার জানান দেওয়া যাতে হরমুজের ওপর প্রভাব ও অন্যান্য বিষয়ে দরকষাকষিতে সুবিধা হয়।
তাহলে চুক্তির সম্ভাবনা কতটা?
পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বিশ্লেষকরা মেনে করছেন, তাৎক্ষণিক পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা কম, কিন্তু সীমিত ও ধাপে ধাপে সমঝোতার সম্ভাবনা যথেষ্ট বাস্তব। সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট হতে পারে- প্রথমে হরমুজে নিরাপদ ও সীমিত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, এরপর সামরিক অবরোধ ও হামলা কমানো, তারপর নিষেধাজ্ঞা ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে আলাদা আলোচনা। অর্থাৎ এক ধাক্কায় ‘চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি’র বদলে একটি ধাপে ধাপে অন্তর্বর্তী সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, একদিকে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির আশায় আশাবাদ তৈরি হচ্ছে; অন্যদিকে ক্ষতিপূরণ ইস্যুতে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেওয়ায় উপসাগরীয় বাজারগুলোয় চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে।
এখন বিশ্লেষকরা তিনটি বিষয় নজরে রাখছেন। প্রথমত, হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে কি না; দ্বিতীয়ত, ইরান-ওমান আলোচনায় বাস্তব কোনো নৌ-চুক্তি হচ্ছে কি না এবং তৃতীয়ত, পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনা আবার শুরু হচ্ছে কি না। যুদ্ধের উভয় পক্ষই এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের অর্থনৈতিক ও সামরিক মূল্য ক্রমেই বাড়ছে। তাই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতা খুঁজে বের করার প্রণোদনা উভয়েরই আছে। কিন্তু সেই সমঝোতা যাতে কোনো পক্ষের প্রকাশ্য পরাজয় হিসেবে না দেখায়, সেটিই এখন মূল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।