স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি

বরিশালে বিভক্তি ও অভিযোগে জর্জরিত বিএনপি, মাঠে জামায়াত


৬ আগস্ট ২০২৬ ১৩:৫৪

বায়জীদ বোস্তামী, বরিশাল : স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন আসন্ন। সরকার ঘোষিত রোডম্যাপে সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রথমে হওয়ার ব্যাপারে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। যদিও বিএনপি সরকার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতা গ্রহণের পর বেশিরভাগ সিটি করপোরেশনে দলীয় নেতাদের প্রশাসক পদে পদায়ন করেছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ছাড়া দেশের সবকটি সিটি করপোরেশনে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে, যা থেকে বাদ পড়েনি দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী বরিশাল সিটি করপোরেশন।
কীর্তনখোলা নদীর কোলে অবস্থিত দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ গুরুত্বপূর্ণ এই শহরে সিটি করপোরেশনে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। ২০২৬ সালের ১৪ মার্চ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তাকে প্রশাসক পদে নিয়োগ দেন এবং অদ্যাবধি তিনি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে নির্বাচন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রশাসক হওয়ার পর নির্বাচন সামনে রেখে সিটি করপোরেশনের সুবিধা গ্রহণ করে বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
সিটি নির্বাচনের আলোচনা শুরু হওয়ার পরই বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ অবস্থানে থেকে তাদের কর্মতৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং নির্বাচনে প্রার্থী হবেন বলে জানান দিচ্ছেন। সিটি প্রশাসক এডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন ছাড়াও আলোচনায় আছেন বিএনপির হাফ ডজন নেতা। তারা প্রত্যেকেই নির্বাচনের ব্যাপারে আগ্রহী। আলোচনায় আছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাছের মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক, সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন শিকদার, সাবেক সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবির জাহিদ ও যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিন নির্বাচনের জন্য কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ ও নিজস্ব বলয়ের কর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রোগ্রাম করে যাচ্ছেন।
মনোনয়নপ্রত্যাশী এসব নেতা কর্মীদের নিয়ে আলাদা আলাদা প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করে যার ফলে একক নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হওয়া বর্তমান বাস্তবতায় সম্ভব নয় এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বরিশাল সফরের সময়ও এসব নেতারা আনন্দ মিছিলসহ সকল কর্মসূচি আলাদাভাবে পালন করেন। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ কোনো কর্মসূচি চোখে পড়ছে না এখনো। অদূর ভবিষ্যতে এ সকল গ্রুপ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে মনে হচ্ছে তাদের সামগ্রিক কার্যক্রমে। বিএনপিতে গ্রুপভিত্তিক রাজনৈতিক কালচার থাকার কারণে একই দলে কর্মীদের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক বিদ্যমান, যেটা এখনই কেন্দ্রীয় সংগঠনের পক্ষেও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
বিএনপিতে শুধু দলীয় কোন্দলই নয়, বরং অপরাধমূলক নানা কর্মকাণ্ড তাদের ভোগাবে। চব্বিশের ৫ আগস্ট বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের সাথে যুক্ত হওয়ায় জনগণের পক্ষ থেকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে চাঁদাবাজি দখল ও মামলা দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় যুক্ত হয়ে যায় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বেশিরভাগ নেতাকর্মী। এমনকি সরকারি পুকুর ভরাটের ঘটনায় দলীয় পদ থেকে বহিষ্কৃত হন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান আক্তার শিরিন। পরবর্তীতে তাকে দলীয় পদে ফিরিয়ে আনা হয় এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়া উদ্দিন শিকদার রূপাতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল দখল করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বিভিন্ন সময় সাংবাদিক সম্মেলন করে এর প্রতিবাদ জানান। এছাড়া মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক ও সাবেক সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবীর জাহিদের বিরুদ্ধে দলীয় প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন অপকর্ম করার অভিযোগ রয়েছে।
বিএনপির এমন নৈরাজ্য চললেও তা ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে জাতীয় সংসদের বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। জামায়াতে ইসলামী মনোনীত মেয়র প্রার্থী দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল। এডভোকেট হেলাল বরিশাল মহানগর জামায়াতের সাবেক আমীর ও বরিশাল বারের সিনিয়র সদস্য হওয়ার কারণে বরিশালের সকল মহলে তিনি পূর্বপরিচিত।
এর আগে তিনি ১৯৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল সদর আসনে নির্বাচন করেছেন, ত্রয়োদশ সংসদেও তিনি জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন। তবে জোট সমঝোতায় বরিশাল-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামী কোনো প্রার্থী না দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যার ফলে এডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। দলের সিদ্ধান্ত নির্দ্বিধায় মেনে নেয়ার এই ঘটনায় বরিশালে রাজনৈতিক মহলে তার একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, যেটা আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করছে বরিশালের সচেতন রাজনৈতিক মহল। প্রার্থীর বয়স, যোগ্যতা পরিচিতি ও দলের মধ্যে শৃঙ্খলার কথা বিবেচনা করলে এডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল এগিয়ে আছেন।
গত কয়েক নির্বাচনের মতো আগামী সিটি নির্বাচনে প্রার্থী দেয়ার কথা ভাবছে ইসলামী আন্দোলন। যেহেতু ইসলামী আন্দোলনের মূল কেন্দ্র বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাইতে। যার ফলে বরিশালের যেকোনো নির্বাচনকে গুরুত্ব সহকারে নেয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করিম প্রার্থী হয়েছিলেন এবং বেশকিছু ভোট সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। আগামী নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হবেন না বলে বেশ আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছেন। তারপরও দলের পক্ষ থেকে যাকে প্রার্থী করা হবে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা তাকে ভোট দিবে। যদিও মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করিম প্রার্থী না হওয়াতে তাদের ভোটব্যাঙ্কে বেশ ভাটা পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া ফ্যাসিস্ট আমলের কথিত গৃহপালিত বিরোধীদল জাতীয় পার্টির ইঞ্জিনিয়ার ইকবাল হোসেন তাপস, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এর প্রার্থী ডাক্তার মনিষা চক্রবর্তী গত বেশ করেকটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। যদিও উল্লেখ করার মতো ভোট পেতে পায়নি এই বামধারার রাজনীতিক। তারপরেও আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বরিশাল সিটি করপোরেশন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। এই শহরের রাস্তাঘাট অত্যন্ত সরু, পয়ঃপ্রণালি সমস্যা বিশেষ করে নগরীর বর্ধিত অংশ ধারাবাহিকভাবে উন্নয়নবঞ্চিত।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিদ্যমান নানা সমস্যা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, বিশুদ্ধ খাবার পানির সমস্যা এসব এলাকায় প্রকট, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠাম ও জনবল নেই। যার ফলে সিটি করপোরেশন এলাকার লোকজন অনেক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এরপরে নতুন সরকার আসার পরে দলীয় প্রভাবের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের কাজ করার কারণে সেবার মান বিঘ্নিত হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের প্রতি মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল, সেটি পূরণ হয়নি। সুতরাং এই শহরের জনগণ পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে ভোট দিয়ে মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করবে।