রক্তাক্ত জুলাই
৬ আগস্ট ২০২৬ ১১:০১
॥ আব্দুস সাত্তার সুমন ॥
মা, আজও কি আমি স্কুলে যেতে পারব না?
রাফির প্রশ্ন শুনে মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে শুধু বললেন,
আজ একটু ঘরেই থাকি বাবা।
রাফি বুঝতে পারছিল না। গত কয়েকদিন ধরে তার স্কুল বন্ধ। বিকেলে মাঠে যাওয়া বন্ধ। সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করাও বন্ধ। চারদিকে কেমন এক অদ্ভুত নীরবতা।
তার ছোট্ট একটি ডায়েরি ছিল। প্রতিদিন সে একটি করে ছবি আঁকত। সেদিন সে আঁকল একটি লাল সূর্য, নিচে লিখল আজও সবাই হাসতে ভুলে গেছে।
দুপুরের দিকে পাশের বাসার দাদি এলেন। তার হাতে ছিল কিছু রুটি আর কলা।
যাদের দরকার, তাদের দিয়ে এসো।
রাফি অবাক হয়ে বলল, আমরা তো কাউকে চিনি না।
দাদি হেসে বললেন, বিপদের সময় পরিচয় লাগে না, মানুষ হলেই যথেষ্ট।
রাফি বাবার সঙ্গে বের হলো। রাস্তায় সে দেখল দোকানের শাটার নামানো, ফাঁকা মোড়, উদ্বিগ্ন মানুষের মুখ। কোথাও কেউ দ্রুত হাঁটছে, কোথাও কেউ একে অপরের খোঁজ নিচ্ছে।
একটি গলির মুখে দাঁড়িয়ে ছিল রাফিরই বয়সী একটি ছেলে। তার হাতে একটি ছেঁড়া স্কুলব্যাগ।
রাফি এগিয়ে গিয়ে বলল, তুমি কি স্কুলে যাও?
ছেলেটি মৃদু হেসে বলল, যেতাম। এখন আবার কবে যাব, জানি না।
দুজনের মধ্যে আর কোনো কথা হলো না। রাফি নিজের ব্যাগ থেকে রং পেন্সিলের ছোট্ট বাক্সটি বের করে তার হাতে দিল।
এটা রাখো। যখন সব ঠিক হবে, তখন আবার ছবি আঁকবে।
ছেলেটির চোখে চিকচিক করে উঠল আনন্দের জল।
সেদিন রাতে রাফি ডায়েরিতে লিখল, মানুষের মুখে হাসি ফিরিয়ে দেওয়াও এক ধরনের সাহস।
পরের দিন বৃষ্টি নামল। ছাদের কার্নিশ বেয়ে টুপটাপ পানি পড়ছে। রাফি জানালার কাঁচে আঙুল দিয়ে একটি সাদা কবুতর আঁকল।
মা জিজ্ঞেস করলেন, কবুতর কেন?
রাফি বলল,
কারণ ও যুদ্ধ করতে আসে না, শান্তির খবর নিয়ে আসে।
কয়েকদিন পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করল। স্কুল খুলল। রাফি প্রথম দিনই তার ডায়েরি নিয়ে গেল।
শিক্ষক বললেন, আজ সবাই বলবে, এই কয়েকদিনে কী শিখেছ?
কেউ বলল ধৈর্য, কেউ বলল সাহস, কেউ বলল পরিবারের মূল্য।
রাফি উঠে দাঁড়িয়ে তার ডায়েরিটি খুলল।
শেষ পাতায় বড় অক্ষরে লেখা, রক্তাক্ত জুলাই।
সবাই চুপ করে রইল।
শিক্ষক ধীরে জিজ্ঞেস করলেন, এই নাম কেন?
রাফি বলল, কারণ কিছু দিন মানুষের জীবনে এমন আসে, যখন কষ্টের রং খুব গাঢ় হয়ে যায়। কিন্তু আমি চাই, আমরা সেই কষ্টকে মনে রাখব ঘৃণা শেখার জন্য নয়; বরং যেন আর কখনো কোনো শিশুর ডায়েরিতে লাল রঙে ভয় আঁকতে না হয়।
ক্লাসের সবাই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে গেল।
শিক্ষক ব্ল্যাকবোর্ডে বড় করে লিখলেন, ইতিহাস আমাদের কাঁদায়, কিন্তু শিক্ষা দেয় ভবিষ্যৎকে আরও সুন্দর করে গড়তে।
সেদিন স্কুল ছুটির পর রাফি তার বন্ধুদের নিয়ে মাঠের পাশে একটি কৃষ্ণচূড়ার চারা রোপণ করল।
চারাটির পাশে একটি ছোট কাঠের ফলকে তারা লিখে রাখল, রক্তাক্ত জুলাই যেন স্মৃতি আমাদের বিভক্ত না করে, বরং সত্য, সহমর্মিতা ও শান্তির পথে একত্র হতে শেখায়।
বছর কেটে গেল। কৃষ্ণচূড়া গাছটি বড় হলো। প্রতি জুলাইয়ে নতুন শিশুরা তার ছায়ায় বসে গল্প শোনে। তারা শেখে সবচেয়ে বড় জয় কারও পরাজয়ে নয়; মানুষের প্রতি মানুষের মমতা, ন্যায়বোধ এবং শান্তির মধ্যেই ভবিষ্যতের প্রকৃত বিজয় লুকিয়ে থাকে।
মানিকদি, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, বাংলাদেশ।