আমাদের প্রথম স্বাধীনতা
৬ আগস্ট ২০২৬ ১১:০০
॥ মাহবুবুল হক ॥
বৃষ্টির জন্য আর পারা যায় না। আমিরা চিৎকার করছে। ঘরে একটা ছাতা নেই। দাদু ভাই খালি ছাতা কেনে আর সবাইকে দিয়ে দেয়। কেউ বাসা থেকে বের হলেই যার ছাতা সামনে পায়, তার ছাতা দিয়ে দেয়। আমাদের কথা একটুও ভাবে না। আজ আমাদের আসর আছে সকাল ১০টায়। ৬-৭ জন আসবে। মাসের শেষ, ঘরে কোনো নাশতা নেই। ইউসুফ বেকারিতে যাব আর আসবো অথবা আলাউদ্দিনকে পাঠাবো, কিন্তু ছাতা ছাড়া যাব কী করে। রুমের দু’পাশের মাঝখানের করিডোরে হাঁটছে আর বকবক করছে। হঠাৎ তার মনে পড়লো, তান্না তো আসবেই। ওকেই ফোন করে বলে দিই। তিনশত টাকার মধ্যে সামান্য কিছু গরম নাশতা নিয়ে আসবে। এদিকে দাদু ভাইয়ের রুমে দাদু ভাই ঘুমাচ্ছে। আর আরিজ ভাইয়ার রুমে ভাইয়াও নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। নাহ, আর আমি কাউকে ঘুমাতে দেব না। বৃষ্টির মধ্যে সবাই আরাম করে ঘুমাবে আর আমি আসরের জন্য এটা করবো, ওটা করবো। সব সমস্যা যেন আমার একার। হঠাৎ করে সে একটু রেগে গেল। তারপর আরিজ ভাইয়ার রুমের দরজায় ধাক্কাতে লাগলো। আরিজ অনেক হুড়মুড় করে দরজা খুললো।
আমিরা : কয়টা বাজে দেখেছ। আর তো মাত্র আধাঘণ্টা, এর মধ্যে ১০ জনকে ফোন করতে হবে। ১০ জনের জন্য নাশতা রেডি করতে হবে। তোমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। সব মাথাব্যথা আমার। এদিকে ঘরে একটা ছাতাও নেই।
আরিজ : চোখ বন্ধ করে হাই দিতে দিতে; আচ্ছা বাবা, অনেক হয়েছে, আমি এখনই সবাইকে ফোন করছি। তুমি বুবুমনিকে নিয়ে ট্রে সাজাও।
আমিরা : কী দিয়ে সাজাবো। ঘরে তো ঘোড়ার ডিমও নাই।
বলতে বলতে দাদু ভাইয়ের দরজা খুলে গেল।
দাদু ভাই : কী ব্যাপার তোমরা হইচই করছো কেন?
আমিরা : তাহলে কী করবো। পই পই করবো। ছাতাগুলো তো সব মানুষকে দিয়ে দাও। একটা ছাতাও তো রাখ না। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তোমাকে একটা বড় ছাতা দিয়েছিল। সেটাও তো খুঁজে খুঁজে পেলাম না। কাকে কখন সে আবার সেটা দিয়ে দিয়েছ, আল্লাহই জানে।
দাদু ভাই : ওটা তো কেয়ারটেকার জয়নালকে দিয়েছিলাম। মেরামত করার জন্য। সে তো আর ফেরত দিল না।
আরিজ : ছাতা নেই তো কী হয়েছে। এর জন্য সকাল থেকে বাড়িটা মাথায় তুলছো কেন? আমি তান্নাকে বলে দিচ্ছি। সে আসার সময় ইউসুফ বেকারি থেকে নাশতা নিয়ে আসবে।
আমিরা : হাততালি দিয়ে লাফাতে থাকে। কো-ইনসিডেন্স, কো-ইনসিডেন্স। আমিও তো একই কথা ভেবেছি। দেখো তো তোমার সাথে আমার কত মিল।
দাদু ভাই : ঠিক আছে তোমরা সব রেডি কর, আমিও রেডি হচ্ছি। বর্ষাকাল। বৃষ্টি-বাদলের মধ্যে দাদুরা আসতে পারবে কিনা?
সবাই যার যার মতো, যার যার রুমে চলে গেল।
১০টার মধ্যে সবাই সিটিং রুমে ঢুকে দেখে, নয়ন-চয়ন, তান্না-মান্না, সুবোধ-রোজারিও এসে বসে আছে। দাদু ভাই, আরিজ ও আমিরা ঢুকতেই সবাই দাঁড়িয়ে গেল। সালাম বিনিময় শুরু হয়ে গেল। তান্না একটা প্যাকেট আরিজের হাতে তুলে দিল।
আমিরা : ৬ জনের মধ্যে একজন মাত্র আমাদের জন্য নাশতা আনলো। বাকি ৫ জন কিছুই আনলো না। আরে বাবা ৫ জন যদি ৫টা চকলেট নিয়ে আসতা, তাহলে তো ভালো হতো।
তান্না : আরে আমি তো তোমাদের কথায় টাকা ধার করে নাশতা আনলাম। তাড়াতাড়ি আমার টাকাটা আগে দাও। খামাখা ওদের দোষ দিচ্ছ কেন? তোমরা ছাতার জন্য বাইরে যেতে পারছো না। আর এখন উল্টা কথা বলছো। দাও, দাও, টাকাটা দাও।
টাকাটা আমিরার হাতেই ছিলো। তান্নার হাতে টাকাটা দিয়ে প্যাকেটটা নিয়ে সে হাসতে হাসতে ডাইনিং টেবিলে চলে গেল।
দাদু ভাই : আস, আস। আমরা ঠিক সময় যেন আমাদের কাজটা শুরু করতে পারি, সেদিকে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। আবার জুমার আজান পড়লেই আমরা সাথে সাথে আমাদের কাজ যেন শেষ করতে পারি। শুধু মসজিদে সময়নিষ্ঠ হলে চলবে না। ২৪ ঘণ্টাই আমাদের সময়নিষ্ঠ হতে হবে।
আরিজ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বলে সে সূরা ফাতিহা পাঠ করে এবং সবার উদ্দেশে বলে আজ আমাদের দাদু ভাই নতুন একটা বিষয়ে কথা বলবেন, সেটা হলো ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা। দাদু ভাই কাছ থেকে আমি সামান্য যা শুনেছি, তা হলো ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতার আগেও আমরা একবার ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। সেই সম্পর্কে আজ তিনি বলবেন।
দাদু ভাই : তোমরা সবাই ভালো আছ তো (সবাই উচ্চকণ্ঠে বললো, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি)। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সম্পর্কে আমরা সবাই জানি, কিন্তু ১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্টে আমরা যে প্রথম স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, সে সম্পর্কে আমরা শুনেছি কিছুটা জেনেছি। কিন্তু যেসব ভাষা ভাষা। ভালো করে আমরা উপলব্ধি করতে পারিনি। অতীতের সেই উপলব্ধিটা আজ খুব সংক্ষেপে তোমাদের বলবো অর্থাৎ আমরা মানে তোমাদের দাদারা প্রথমবারের মতো যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল তা তোমাদের বাপ-চাচারা জানে, তোমরা জান না। না জানারই কথা। তবে একদম জান না, তা তো হতে পারে না। তোমাদের বাপ-চাচারা তোমাদের কিছু বলেননি বা স্কুলের শিক্ষকরা কিছু শোনাননি, তা তো হতে পারে না। যা হোক অতীতের পরাধীনতা, স্বাধীনতার সংগ্রাম ও স্বাধীনতা সম্পর্কে না জানলে আমরা সব সময় অস্পষ্ট থাকবো।
বাংলা, বিহার ও ঊড়িষ্যা তথা তিনটি এলাকা নিয়ে একটি বড় রাজ্য ছিল। সে রাজ্যে নবাব ছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৭ সালে ২৩ জুন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও স্থানীয় বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্রে আমরা আমাদের স্বাধীনতা হারাই। স্বাধীতা হারানোর পর থেকে স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষগণ লড়াই শুরু করেন। তারা পরাধীনতাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। ১৯০ বছরের লাগাতার সংগ্রামের পর ১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট আমরা পুনরায় স্বাধীনতা লাভ করি। এই স্বাধীনতা লাভের একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য ছিল। ভারতের একটি অংশে আমরা স্বাধীনভাবে বসবাস করতাম। যেখানে বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ-জাতি-উপজাতি আদর্শ ও মতবাদের লোক জীবনযাপন করতো। এতে কিছু অসুবিধা হতো। আমাদে পূর্ব পুরুষরা চেয়েছিলেন ভারতের যেসব অঞ্চলে মুসলিমরা বসবাস করে, তাদের সবাইকে নিয়ে একটি মুসলিম দেশ গড়বেন। যারা এই বড় মুসলিম দেশ গড়ার বিষয়ে সর্বশেষ পর্বে কাজ করছিলেন, তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে ভারতের পূর্বাঞ্চলে একটি প্রদেশ ও পশ্চিমাঞ্চলে আর একটি প্রদেশ নিয়ে একটি মোটামুটি ছোট দেশ উপহার দিয়েছিল। অন্যান্য মুসলিম রাজ্য যেমন- কাশ্মীর, জুনাগড়, মানভেদর, হায়দরাবাদসহ আরও কিছু ছোট ছোট মুসলিম অঞ্চলকে পরাধীন রেখে ছিল। অর্থাৎ আমাদের পূর্বপুরুষরা যেভাবে একটি বড় মুসলিম দেশ চেয়েছিলেন, তারা সেভাবে পাননি। যেসব মুসলিম এলাকা স্বাধীন হলো না বা স্বাধীন মুসলিম দেশের সাথে সংযুক্ত হতে পারলো না, তারা এখনো পরাধীনতার দুঃখ বহন করে চলছে।
যে বিচ্ছিন্ন দু’প্রদেশ নিয়ে খণ্ডিত মুসলিম দেশ তৈরি করা হলো, তার নাম রাখা হলো পাকিস্তান। সবচেয়ে অবাক কাণ্ড কী যান, দুই প্রদেশের রাজধানীর মধ্যে ব্যবধান ছিল প্রায় ৩০০০ কিলোমিটার (বা ২০০০ মাইল)। তার মাঝে ছিল ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন সংস্কৃতির একটি বড় ও শক্তিশালী দেশ। সে দেশটি মুসলমানদের জন্য গঠিত ছোট এ দেশটিকেও মনে প্রাণে মেনে নিতে পারেননি।
তারা অখণ্ড ভারত চেয়েছিল, যেখানে শুধু বসবাস করবে সনাতন ধর্মের মানুষ। তারা সাময়িকভাবে আমাদের পূর্বপুরুষদের খণ্ডিত স্বাধীন দেশ মেনে নিয়েছিল। ভেবেছিল সময় ও সুযোগমতো তারা আমাদের স্বাধীন দেশকে দখল করে নেবে। আমাদের পূর্বপুরুষরা এসব জানতেন। স্বাধীন হলেও অনেক সমস্যা রয়ে যাচ্ছে। তবু তারা বিচ্ছিন্ন একটা দেশকে মনে প্রাণে স্বাধীন দেশ হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। এটাই ছিল আমাদের প্রথম স্বাধীনতা। এরপর দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জন করেছি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ।
আমিরা সবার পাশে পাশে আগেই নাশতা দিয়ে গিয়েছিল। অনেকেই নাশতা খেতে খেতে দাদু ভাইর গল্প শুনেছে। দাদু ভাইর গল্প শেষ হলে প্রশ্ন করার জন্য চয়ন, সুবোধ ও রোজারিও হাত তুলে। দাদুভাই বললেন, দাদু ভাইয়েরা আজ তো আর সময় নেই। আগামী সপ্তাহে আমি ইনশাআল্লাহ তোমাদের প্রশ্নের জবাব দেব।
জুমার নামাজের আজানের ধ্বনি ভেসে এলো। আরিজ সবাইকে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। কোলাকুলি ও হ্যান্ডসেক করে সবাই এক সাথে বেরিয়ে পরে।