অপরাধ দমনে দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রকে তৎপর হতে হবে
৬ আগস্ট ২০২৬ ১০:৪৫
॥ মাহবুবুল হক ॥
ঢাকা নাকি এখন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ শহর। যারা শহর বলে অভিধা দিয়েছেন, তারা আমাদের দেশের কেউ নন। তারা আন্তর্জাতিক ডাটাবেজ নামবিওর ‘ক্রাইম ইনডেক্স ২০২৬’-এ ইরান, পাকিস্তান ও ভারতের শহরকে পেছনে ফেলে তালিকার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী- যাকে আমরা মহানগর বলে তৃপ্তিবোধ করি। নামবিওর তথ্যানুসারে, ঢাকার অপরাধের সূচক বা ‘ক্রাইম ইনডেক্স স্কোর হচ্ছে ৬২.২’, যা এই অঞ্চলের অন্যান্য শহর থেকে বেশি। অতিরিক্ত জনঘনত্ব এবং আর্থসামাজিক পরিস্থিতির কারণে মানুষের মধ্যে ঢাকার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও অপরাধভীতি বেশি কাজ করে। তবে নামবিওর এই সূচকটি মূলত কোনো সরকারি অপরাধের খতিয়ান নয়, বরং ঐ শহরে বসবাসকারী বা ভ্রমণকারী সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তা উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। ঢাকার পরে রয়েছে ভারতের দুই শহর। রাজধানী দিল্লি ও গাজিয়াবাদ। স্কোর যথাক্রমে ৫৯.১৩ এবং ৫৮.৪৪। চতুর্থ স্থানে রয়েছে পাকিস্তানের বন্দর নগরী করাচি, স্কোর হচ্ছে ৫৭.৫৫। ৫৭.৩ স্কোর নিয়ে পঞ্চম স্থান অধিকার করেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের রাজধানী তেহরান। অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ শহর হিসেবে উঠে এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি। স্কোর হলো ১১.১। উল্লেখ্য, NUMBEO হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী-চালিত অনলাইন ডাটাবেজ বা তথ্যভাণ্ডার। এটি মূলত বিভিন্ন দেশ ও শহরের জীবনযাত্রার খরচ, আবাসন, অপরাধের হার, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশের গুণগতমান সম্পর্কিত তথ্য প্রদান করে থাকে।
আমরা জানি না, বিএনপি যখনই ক্ষমতায় আসীন হয়, তখনই বাংলাদেশ নেগেটিভ বিষয়ে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান, যেমনÑ সিপিডি, অর্থনীতি সমিতি, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি), সুজনসহ বিভিন্ন সোসাইটি প্রতিষ্ঠানসমূহ বিএনপিকে দুর্নীতিতে প্রথম গুড গভর্নেন্সে সর্বশেষ স্থানসহ বাংলাদেশকে কোনো কোনো বিষয়ে অর্থাৎ খারাপ বিষয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় এবং উত্তম বিষয়ে ৯৭ বা ৯৮তম স্থানে বসিয়ে দেয়। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলো বিএনপিকে কখনো বা বিএনপির সময়গুলোয় বাংলাদেশকে উচ্চতর পর্যায়ে নিতে চয়নি। এর ‘শানে নযুল’ আমাদের জানা নেই। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে ওআইসিসহ সৌদি আরব ও অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলার কিছু অর্থনীতিক ও সামগ্রিকভাবে উম্মাহের দিক থেকে কিছু উল্লেখযোগ্য ও তাৎপর্যমণ্ডিত কিছু পদক ও পুরস্কার অর্জনের বিরল সৌভাগ্য পেয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়ার আমলেও মধ্যম মানের কিছু পদক ও পুরস্কার প্রধানমন্ত্রীর অফিসে জাজ¦ল্যমান ছিল। কিন্তু এরপর এখন পর্যন্ত বিএনপির আমলে বাংলাদেশ ভালো করছে- এমন ছোট-খাটো পদক-পুরস্কার খবরও তো আমরা পাই না।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ‘আকাশ চুরি’ করেও আওয়ামী লীগ এখনো যে প্রশংসা পায়, বিএনপি ‘মেঘ চুরি করে তার চেয়েও বেশি দুর্নাম অর্জন করে মানুষের হৃদয় থেকে সম্মান ও মর্যাদা চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে।
ফ্যাসিবাদী সরকার তো জাতীয় পার্টিকে যতটা মূল্যায়ন করেছে, তার ১ ভাগও বিএনপিকে মূল্যায়ন করেনি। মূল্যায়ন তো দূরের কথা, দলটিকে চিরতরে নির্মূল করার চেষ্টা করেছে। খালেদা জিয়াকে মেজরের বৌ ও বীরাঙ্গনা বলে বারবার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে। শহীদ জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক দূরের কথা, পাকিস্তানিদের গুপ্তচর, দালাল, রাজাকার ইত্যাদি বলে দলটিকে বাংলাদেশের চৌহদ্দি থেকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছে। এসব দেখেশুনে কিছুটা গড়িমসি করে হলেও আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক বিএনপিকে সহায়তা করার চেষ্টা করেছে।
যাই হোক, এসব কথা বলে আমরা আমাদের পাঠকদের বোঝাতে চাচ্ছি না যে, বিএনপি ক্ষমতায় এলেই কারণে-অকারণে আওয়ামী লীগের প্রেতাত্মারা বাংলাদেশকে অকার্যকর দেশ বলে আদাজল খেয়ে বিশ্বব্যাপী হইচই করতে থাকে। ফ্যাসিবাদী সরকার কোনোকালেও বিএনপিকে বিরোধীদল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি পার্লামেন্টে কখনো ভালোভাবে বসতেও দেয়নি। সে কারণে বিএনপিকে সবসময় রাস্তাতেই থাকতে হয়েছে। বিএনপি যেমন জামায়াতকে সাথে নিয়ে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ঐক্যজোট করেছে, ঠিক একইভাবে আওয়ামী লীগও জামায়াতে ইসলামীর সাথে ঐক্যজোট করেছে। এটা যদি রাজনৈতিক অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে চিরন্তন বিচার অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রধান দুই দলই একই অপরাধ করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ কখনো এই অপরাধ পরিষ্কারভাবে স্বীকার করেনি। নানাভাবে এই বিষয়টিকে গুম করার চেষ্টা করেছে।
স্মরণ করা যেতে পারে ৭১-এর দালাল-নির্মূল কমিটি যারাই করুক, বিএনপির আমলে বিষয়টি উচ্চকিত করা হয়। এরপর আওয়ামী আমলে বিষয়টি তুঙ্গে নেয়া হয়। এদিক থেকে দুটি দলই প্রমাণ করেছে যে, তারা ভারতপন্থী সেক্যুলার দল এবং ঐতিহাসিকভাবে একথা সত্য যে, এই প্রধান দুটি দলই জনগণকে মানসিকভাবে বিভক্ত ও বিভাজিত করেছে। এখনো যে বিভাজন আমরা লক্ষ করি, সেই বিভাজন ও অনৈক্য স্বাধীতার অব্যবহিত পর বাংলাদেশে বিরাজমান ছিল। বিজয় লাভ করার সাথে সাথে তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধার নামে যারা দেশে বিভিন্নভাবে লুটপাট করেছে, শেখ মুজিবুর রহমান সেই তাৎক্ষণিক বিষয়টিকে সামাল দিয়ে জাতিগত ঐক্যের চেষ্টা করেছিলেন। সেই বিষয়টি আমরা এখন যেন ভুলে গেছি। তিনি তো সাধারণ ক্ষমাই ঘোষণা করেছিলেন।
দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে তাদের সাথে অংশীদার করায় জামায়াতে ইসলামী তো বহুপূর্বেই দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃত ও সম্মানিত হয়েছে। এ বিষয়টিকে কি কোনোভাবে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে? ইতিহাসের চোখ কি একটা? যারাই জামায়াতে ইসলামীকে জাতির অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সময়গুলোয় ফুলের মালা দিয়ে বা নিজেদের বসা সিংহাসনগুলো ছেড়ে দিয়েছিল; পরবর্তীতে তারাই লোকদেখানো নির্মূল, নির্মূল বলে চিৎকার করেছে।
এই চিৎকারগুলো সবসময় তৈরি হয়ে এসেছে প্রতিবেশী দেশ থেকে। তবে এ কথা অবিসংবাদিত যে, দুটি দলের দুই প্রধান ব্যক্তি ‘লেন্দুপ দর্জি’ ছিলেন না। দুনিয়া থেকে তাদের চলে যাওয়ার পর তাদের দুটি দলই প্রতিবেশী দেশের অনুকম্পা গ্রহণের জন্য ‘লেন্দুপ দর্জি’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে জিতে গিয়েছিল, আওয়ামী লীগ। সে কারণে তারা দীর্ঘকাল ফ্যাসিবাদের ভূমিকায় বয়ান করার সুযোগ পেয়েছিল। খালেদা জিয়া ‘ভারতপন্থী’ ছিলেন না। কিন্তু সময়ে তার দলের প্রেসার গ্রুপ ভারতপন্থী ছিল। রুশপন্থীরা যে দলেই থাকুক, সবসময় তারা ভারতপন্থী ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে চীনপন্থী কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রীরা জাতীয়তাবাদের ধোঁয়া তুলে গোপনে রুশপন্থীদের সাথে হাত মিলিয়ে ভারতপন্থী হওয়ার ভূমিকা পালন করেছে। এসব ষড়যন্ত্র হয়েছে খালেদা জিয়ার আমলেই। তিনি টের পাননি, তা নয়। তিনি তার জীবনসঙ্গীর মতো অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে ডানপন্থী খুঁজছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় ততদিনে মুসলিম লীগসহ সকল ডানপন্থী স্বাভাবিকভাবে নির্মূল হয়ে যায়। অগত্যা জামায়াতে ইসলামী ছাড়া ‘ডানপন্থী’ হিসেবে অন্য কোনো দল বা গোষ্ঠীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া তিনি জামায়াত ও শিবিরকে যথেষ্ট প্রাধান্য দিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিএনপিতে জড়ো হওয়া পরিত্যক্ত ও ‘হ্যাট্রোজেনাস এলিমেন্টরা’ নগদ-নারায়ণের উদ্দেশ্যে বিষয়টি কোনোভাবেই মূল্যায়ন করতে পারেনি।
খালেদা জিয়ার অসুস্থ হওয়ার পর থেকে বিএনপির মূল ও কাণ্ড থাকে তারেক রহমানের হাতে। আর শাখা-প্রশাখা, পরগাছা, ফুল ও ফল থাকে অন্য স্টেকহোল্ডারদের হাতে। স্থায়ী কমিটির দিকে তাকালে বিষয়টি সহজভাবে অনুধাবন করা যায়। তারেক রহমানের সাথে স্থায়ী কমিটির যোগসাজশ ছিল সবসময় কম। ঠাণ্ডা। শীতল। ওয়ার্ম অবস্থা আমরা কম দেখেছি। বয়স ও আদর্শগত ভিন্নতা এই বিষয়টিকে ফারাক করে রেখেছে। তিনি এবার সরকারের মধ্যে সিনিয়রদের রেখেছেন। তবে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে।
যে মন্ত্রিসভা তিনি গঠন করেছেন, তাদের সাথে প্রধানমন্ত্রী স্ব-নিষ্ঠ সম্পর্ক আছে বলেও তো দেখা যায় না। দেশের আপামর জনসাধারণ তো বলছে, এক ব্যক্তি দেশ চালাচ্ছেন। তিনি হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (তারেক রহমানের গৃহশিক্ষক)। তরেক রহমান সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান। তিনি শিক্ষকের সামনে আগবাড়িয়ে চলবেন কী করে। একটা আদব-কায়দা তো আছে। দেশকে দুই ভাগে বিভক্ত করলে তো চলবে না। আদব-কায়দা মেনে চলতে হলে রাষ্ট্র ও দেশ স্থবির হয়ে যাবে। দলের তরুণদের মধ্যে প্রাসঙ্গিকতার অভাব রয়েছে। তাদের সামনে রয়েছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের অভিজ্ঞতা। সেই নিকট অভিজ্ঞতা সামনে রেখেই তারা অগ্রসর হতে চায়। সে কারণে ছাত্র ও যুবদলকে নিয়ে চল্ চল্ চল্ করতেও তারেক জিয়ার ঐতিহাসিক দ্বিধা রয়েছে। এখন সমাধান ছিল একটি ‘জুলাই বিপ্লব’ সামনে রেখে শুধু দলে নয়- দেশে, জাতিতে ও রাষ্ট্রে সুদৃঢ় ঐক্য গড়ে তোলা। তাহলে ভাঙাচুরা বিএনপি শক্তিশালী হয়ে উঠে ভারতকে চ্যালেঞ্জ করতে পারতো।
কথামালা শুরু করেছিলাম ঢাকার অপরাধপ্রবণতার শীর্ষ স্থানে পৌঁছে যাওয়ার প্রেক্ষিতে। ‘ঢাকা’ মানেই তো বাংলাদেশ। অপরাধপ্রবণতার সূত্র কোথায়? সেই বিষয়টি আবিষ্কার করা। এর জন্য সূক্ষ্মতম কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই। আমাদের রাজনীতি যদি স্বাধীন ও সার্বভৌম হতো, তাহলে আমাদের নিজেদের অপরাধপ্রবণতা আমরা নিজেরা দমিয়ে ফেলতে পারতাম। সেই সুযোগ আমাদের নেই। যতদিন আমরা প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও সার্বভৌম না হবো, ততদিন অপরাধপ্রবণতার মূল শেকড় থাকবে প্রতিবেশী দেশে। প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিকপ্রবণতা, অর্থনৈতিক বিন্যাস, সামাজিক উত্থান-পতন, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বর্বরতা, সাংস্কৃতিক উল্লম্ফন, জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণতা এবং নির্বাচনকালীন হিংস্রতা আমাদের রাষ্ট্রকে টালমাটাল করে ফেলছে। আমাদের এখানকার চিহ্নিত অপরাধীদের আশ্রয় দেয়ার জন্য উত্তর ও পশ্চিম বর্ডারগুলোয় ফুলের মালা সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে ইন্ডিয়ার রাজনৈতিক খুনি-অপরাধীসহ সকল গডফাদার নিরাপদে নির্বিঘ্নে আমাদের দেশে এসে শুধু গোপনে আশ্রয় লাভ করছে না, বরং অপরাধসংশ্লিষ্ট বাঘা বাঘা ট্রেনিং সঞ্চারিত করছে। আমাদের নির্বাচনের সময় ইন্ডিয়ার প্রয়োজনে যারা এ দেশে এসেছিল, তারা শুধু নির্বাচনের কাজ সেরে চলে যায়নি। মডেল হিসেবে একটা চিরুনি অভিযান চালালে বিষয়টি আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে।
মুসলিম জনগোষ্ঠী অপরাধপ্রবণ জনগোষ্ঠী নয়। প্রতিবেশী দেশ ও সরকারের স্বার্থে পূর্বতন ফ্যাসিবাদী সরকার এখনো তাদের ফ্যাসিবাদী কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তারা সরকারি দল ও সরকারের লোকজন দ্বারা বিপুলভাবে সহযোগিতা পাচ্ছে। এদিকে বর্তমান সরকার কারাগার ও জেলখানা থেকে ছোট-বড় সন্ত্রাসীদের জামিনে মুক্তি দিয়েছে। যেটা দেয়া বা প্রদান করা খুব মানবিক ছিল কিনা, সেটা খতিয়ে দেখারও সময় পায়নি বর্তমান সরকারের দেশপ্রেমিক স্টেকহোলডাররা।
শুধু কী তাই, জুলাই বিপ্লবের পর থেকে এখন পর্যন্ত ‘সিরিয়াল অপরাধের যে সিলসিলা’ চলে আসছে এবং কারা মিলেমিশে কাজগুলো করছে, সেটা সর্বজনবিদিত। গত ইলেকশনের আগে-পরে ফ্যাসিবাদীদের সুরে অনেক বিএনপি নেতাই বলেছেন, বিএনপির ছেলেপেলেরা একদিকে সীমাহীন অত্যাচার, অবিচার, জুলুম, নির্যাতন, খুন, গুম, আয়নাঘর, ধরপাকড় ইত্যাদিতে নিষ্পেষিত হয়েছে। অপরদিকে তাদের আয়ের পথগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সাথে সাথে সংসারগুলো তছনছ হয়ে গেছে। তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্ষেত্রবিশেষে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ধার-করজে তারা এখন আকুণ্ঠ নিমজ্জিত। তাদের তো আমরা এখনো কিছু দিতে পারিনি। বাস্তব সে অবস্থায় তারা তো কিছু অন্যায়-অপরাধ-লুটপাট করবেই। এটা তো অস্বীকার করা যায় না। কেউ কেউ তো এমনো বলেছেন, তাদের তো আমরা এ বিষয়ে প্রশ্রয় দিচ্ছি। অর্থাৎ সরকারিভাবে না হলেও বেশকিছু বিএনপি প্রার্থী ও বিজয়ী এই ধরনের অপরাধপ্রবণ কথা বলায় এবং এর বিরুদ্ধে নির্বাচনের আগে ও পরে তাদের উচ্চতর নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ প্রকাশিত না হওয়ায় অপরাধের সিলসিলা জায়েজ হয়ে যায়।
আশা করা গিয়েছিল কিশোর গ্যাংসহ চিহ্নিত সকল স্থানীয় অপরাধী চক্রকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে সরকার শক্তভাবে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত অপরাধ বা অপরাধী দমনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তেমন কোনো উদ্যোগ নেননি। যেটা আমরা দেখেছি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে। তিনি সম্ভবত প্রতিদিন ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা দৌড়াদৌড়ি করতেন অপরাধ দমনের জন্য শাস্তি-পুরস্কারসহ যত ধরনের মানবিক পদ্ধতি আছে, সেসব তিনি অবারিতভাবে প্রয়োগ করেছেন। তিনি কতটা ‘সাকসেসফুল’ হয়েছে, সেটা ভবিতব্যই বলবে। তবে আমাদের দেখা মতো তার চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না। পুলিশ এখনো নড়েচড়ে বসেনি। তামাশা দেখছে। প্রশাসনও সিগারেট ফুঁকছে। নানারকম আশা ও উদ্দীপনায় সুখ-স্বপ্ন দেখছে। আমরা হলফ করে বলতে পারি- এই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এত বিষয় নিয়ে ব্যস্ত যে, তিনি এসব ছোট-খাটো বিষয় নিয়ে নাক গলাবার অবসর কখনো পাবেন না। সুতরাং অপরাধ দমন করার বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে ‘একনম্বর বিষয়ে’ পরিণত হয়েছে। সরকারকে; বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীকে বক্ষমান বিষয়টিকে গুরুতরভাবে ভাবতে হবে। দুটো পরামর্শ দেয়া যেতে পারে। এক. যেহেতু পুলিশ-আনসার এসব দেখার সুযোগ পাচ্ছে না, সুতরাং অন্তত এক বছরের জন্য সেনাবাহিনীর ওপর অপরাধ দমনের বিষয়টি ন্যস্ত করা যেতে পারে। দুই. সরকারি জোট ও বিরোধী জোট মিলে সম্মিলিতভাবে অপরাধ দমনের নৈতিক দায়িত্বটি গ্রহণ করতে পারে।
জুলাই বিপ্লবের পর বর্তমানের এ বিষয়টি আমাদের সামনে এসেছিল। আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম নির্বাচন পর্যন্ত বিপ্লবের স্টেকহোল্ডাররা প্রতি ইউনিয়নে অন্তত ৫ জনের নেতৃত্বে অপরাধ দমনের সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। যাদের অধীনে সংখ্যাহীন অনুরক্ত ও ভক্ত থাকবে, যারা অপরাধ দমনের সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তাদের আমরা বেতন ও ভাতা প্রদানে প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। কিন্তু বিএনপির উন্নাসিকতার কারণে বিপ্লবের কল্যাণময় কার্যকারিতা দেশবাসী উপভোগ করতে পারেনি। এখন গণভোটে ফিরে এসে সে কাজটি করুক।
লেখক : সাহিত্যিক সাংবাদিক ও সংগঠক।