প্রতিরোধ আর অদম্য সাহসের অকল্পনীয় অধ্যায়
৩০ জুলাই ২০২৬ ১০:৩৭
স্টাফ রিপোর্টার : ২৫ থেকে ৩১ জুলাই ২০২৪ বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাভাবিক কোনো দিনছিল না। এদিনগুলো ছিল শোক, আতঙ্ক, প্রতিরোধ আর অদম্য সাহসের এক অকল্পনীয় অধ্যায়। রাজপথে তখন গুলির শব্দ থেমেনি, থামেনি গ্রেপ্তার অভিযান, নিখোঁজের আশঙ্কা, পরিবারের কান্না আর শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের অঙ্গীকার। একদিকে কারফিউ, যৌথবাহিনীর টহল, গণগ্রেপ্তার ও আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটকের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র আন্দোলন স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করছিল; অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও নাগরিক সমাজ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে নেমে এসেছিলেন রাজপথে। গুলি চালিয়ে শিক্ষার্থীদের হত্যার পর সরকারই ঘোষণা করে শোক দিবস। শিক্ষার্থীরা সেই শোক প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদে আরও সোচ্চার হন।
২৫ জুলাই ২০২৪
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রকাশ্য বৃহৎ কর্মসূচি কার্যত স্থগিত ছিল। কারণ সমন্বয়কদের অনেকেই আত্মগোপনে ছিলেন। অনেকে আটক অবস্থায় ছিলেন। অনলাইনে আন্দোলনের পুনর্গঠনের চেষ্টা চলতে থাকে এই দিন। এদিন সরকারের পক্ষ থেকে কারফিউ বহাল ছিল, যদিও কিছু সময়ের জন্য শিথিল করা হয়। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় টহল ও তল্লাশি চালায়। বিভিন্ন এলাকায় গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়ে বহু ছাত্র-জনতাকে গ্রেফতার করে। ঢাকায় ২২০৯ ও ১৭ জেলায় ১৯৭৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
এদিন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আটটি বার্তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হতাহতদের তালিকা তৈরি, হত্যা ও হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করা, বিশ্ববিদ্যালয় ও হল খুলে দেওয়ার চাপ তৈরি করা। এসব বার্তাসংবলিত একটি বিবৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদ। ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মো. নাহিদ ইসলামের বক্তব্য’ শিরোনামে বিবৃতিটি পোস্ট করা হয়।
২৬ জুলাই ২০২৪
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। আন্দোলনের নেতারা গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। এই দিন তিনজন সমন্বয়ককে তুলে নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করা হয়। তুলে নেওয়া ছাত্রনেতারা ছিলেন নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও আবু বাকের মজুমদার। রাজধানী ও জেলা শহরগুলোয় কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করা হয়। শিক্ষার্থীদের মিছিলে পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এদিনও যৌথবাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকে। এই দিন ঢাকায় ২৩৫৭ জন, গ্রেফতার করা হয়। টিআইবি শন্তিপূর্ণ আন্দোলনের পক্ষে বিবৃতি দেয়।
২৭ জুলাই ২০২৪
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের মুক্তির দাবিতে রাজপথে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন ঠেকাতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এদিন প্রধানত ছাত্র বিক্ষোভকারীদের লক্ষ করে ব্লক অভিযান অব্যাহত থাকে, ডিবি আরও দুইজন কোটা বিক্ষোভ সংগঠককে আটক করে। ১৪টি বিদেশি মিশন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অন্যায়ের জন্য তাদের জবাবদিহি করতে সরকারকে আহ্বান জানান। হাসিনা পঙ্গু হাসপাতাল পরিদর্শন করে বলেন, অর্থনীতিকে পঙ্গু করার জন্যই এই সহিংসতা চালানো হয়েছে। এদিন ২৫৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২৮ জুলাই ২০২৪
দেশব্যাপী অভিযান অব্যাহত ছিল, শুধু ঢাকা শহরেই ২০০টিরও বেশি মামলায় ২ লাখেরও বেশি মানুষকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মোবাইল ইন্টারনেট চালু হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ রাখা হয়। ডিবিপ্রধান হারুন অর রশিদের কার্যালয়ে তার সঙ্গে খাবার খাওয়ার পর, আগে আটক হওয়া ছয়জন সংগঠক একটি লিখিত বিবৃতি পাঠ করে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য করা হয়। বাইরে থাকা সংগঠকদের সমন্বয়করা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করে। এদিন সরকার প্রথমবারের মতো মৃতের সংখ্যা ঘোষণা করে, যা সংখ্যা ১৪৭ জন বলে জানায়।
২৯ জুলাই ২০২৪
কিছু জেলায় বিক্ষোভকারীরা আবারও রাস্তায় নামে, তারা পুলিশের বাধার সম্মুখীন হন এবং কয়েক ডজনকে আটক করা হয়। জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করল সরকার। ছয় কোটা সংগঠকের বিষয়টি সামলানোর জন্য, যার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সাথে খাবার খাওয়ার ছবি শেয়ার করায় ডিবিকে তিরস্কার করেন হাইকোর্ট।
৩০ জুলাই ২০২৪
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকরা মানবববন্ধন করেন। এদিন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সমাবেশ করেন, অভিভাবকরা শিশুদের মৃত্যুর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন, পুলিশ তাদের বাধা দেয়। প্রাণহানির জন্য সরকারকে দায়ী করেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। হাসিনা বলেন, বিচার বিভাগীয় তদন্তের জন্য সরকার ‘বিদেশি সাহায্য’ নেবে এবং পরদিন দেশব্যাপী শোক ঘোষণা করেন। এদিনও পুলিশের দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকে।
৩১ জুলাই ২০২৪
সরকারের ডাকা দেশব্যাপী শোক প্রত্যাখ্যান করে রাজধানীসহ অন্যান্য স্থানে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বিক্ষোভকারীরা। কোটা আন্দোলনের ছয় সংগঠক তখনো ডিবির হেফাজতে ছিলেন। বিশিষ্ট নাগরিকরা তদন্ত কমিটি গঠন করে জনগণের সমর্থন চেয়েছেন। ঢাকার সাথে অংশীদারিত্বের আলোচনা স্থগিত করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সহপাঠীদের পুলিশি হেফাজত ও জেল থেকে মুক্তি না দেওয়া হলে শত শত এইচএসসি শিক্ষার্থী পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেয়।