দেশে প্রতি চারজন যুবকের একজন বেকার


৩০ জুলাই ২০২৬ ১০:৩১

সোনার বাংলা রিপোর্ট : বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির অভিযাত্রায় সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো এর ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী উদ্যমী যুবসমাজ। কিন্তু সমস্যা এদের দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেই। বরং রাজনৈতিক নেতাদের একটি স্বার্থান্বেষী অংশ এবং অপরাধী চক্র এদের বিপথগামী করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, দেশের প্রতি চারজন যুবকের একজন বেকার এবং ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের প্রায় ৪০ শতাংশই শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা প্রশিক্ষণের বাইরে অবস্থান করছে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের মতে, সঠিক কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাবে এই বিপুল সম্ভাবনাময় যুবসম্পদ ক্রমেই ‘জনমিতিক বোঝায়’ পরিণত হতে চলেছে। বিশ্লেষকদের অভিমত হলো, এই বাস্তবতায় যুব বেকারত্ব কেবল অর্থনৈতিক সমস্যায়ই সীমাবদ্ধ নেই; এটি সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর এক গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো- মানসিক হতাশাজনিত সমস্যা ও আত্মহত্যার প্রবণতা; দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব তরুণদের মাঝে চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশার সৃষ্টি করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করেও যখন একজন তরুণ পরিবারের হাল ধরতে পারে না, তখন সমাজে ও পরিবারে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। এই মানসিক চাপ থেকে তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ও বিষণ্নতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
পারিবারিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা : বেকারত্বের কারণে পারিবারিক বন্ধনে টানাপড়েন শুরু হয়। বিবাহ বিচ্ছেদ, পারিবারিক কলহ এবং সামাজিক অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধির পেছনে একটি বড় অনুঘটক হলো আর্থিক অসচ্ছলতা ও কর্মসংস্থানের অভাব।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অপব্যবহার : বেকার তরুণদের একটি বিশাল অংশকে রাজনৈতিক সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে থাকে। স্থায়ী আয়ের উৎস না থাকায় অনেক তরুণ রাজনৈতিক মিছিল, সহিংসতা বা ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির অনুগামী হয়ে পড়ে।
এর কারণ যুবসমাজ যখন অনুধাবন করে যে তাদের মেধা ও শিক্ষার ন্যূনতম মূল্যায়ন রাষ্ট্রে হচ্ছে না, তখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি তাদের চরম অসন্তোষ তৈরি হয়। এটি নাগরিক অসন্তোষ, ছাত্র আন্দোলন এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলাকে উসকে দেয়।
সাংস্কৃতিক স্থবিরতা ও বিচ্ছিন্নতা : বেকারত্ব তরুণ সমাজকে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা (যেমন- খেলাধুলা, সাহিত্য, নাটক, সমাজসেবা) থেকে দূরে ঠেলে দেয়। কর্মহীনতা ও অর্থকষ্টের কারণে সংস্কৃতিচর্চার স্থান দখল করে একঘেঁয়েমি ও মাদকাসক্তি।
সামাজিক মেলবন্ধন কমে যাওয়ায় তরুণরা ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় করছে, যা অনেক সময় জুয়া, টিকটক/লাইকিভিত্তিক অপসংস্কৃতি এবং সাইবার অপরাধে রূপ নিচ্ছে।
অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি : ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা’- এই লোকোক্তির বাস্তবায়ন ঘটে বেকার যুবসমাজের ক্ষেত্রে। চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাং কালচারের মূল চালিকাশক্তি হলো বেকারত্ব।
ফলে দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভে কর্মহীন তরুণরা অনায়াসেই মাদক চোরাচালান বা অন্যান্য অবৈধ সিন্ডিকেটের জালে জড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের তাগিদে অবৈধ উপায়ে বিদেশ পাড়ি দিতে গিয়ে মানব পাচারের শিকার হচ্ছে অজস্র যুবশক্তি।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের এই অমিল এবং বেকারত্ব কাটাতে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা কারিগরি ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তারা মনে করেন, নৈতিক শিক্ষা মানুষকে দায়িত্বশীল করে এবং কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়। এর সাথে কারিগরি শিক্ষা যোগ হলে বেকারত্ব কমে যাবে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, আমাদের সাধারণ শিক্ষা ও সাধারণ ডিগ্রিধারীদের চাহিদা শ্রমবাজারে কমে যাচ্ছে। শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে শিক্ষার মানের চরম সমন্বয়হীনতা বিদ্যমান।
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর মনে করেন, শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কার এনে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক বা প্রধান ধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রথাগত ডিগ্রির বদলে ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় জোর দিতে হবে যেন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষেই একজন তরুণ স্বাবলম্বী হওয়ার ন্যূনতম দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান জোর দিয়ে থাকেন ‘দক্ষতাভিত্তিক রূপান্তর’ এর ওপর। তিনি মনে করেন, শুধু অভ্যন্তরীণ বাজার নয়, বৈদেশিক শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। ইংরেজি, আরবি, জাপানি ও কোরিয়ান ভাষায় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ এবং ডেটা এন্ট্রি, কোডিং, ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো আধুনিক ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোকে সরাসরি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে হবে। শিল্প খাতে যে ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে, সেই অনুযায়ী কারিকুলাম হালনাগাদ করতে হবে।
ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপ নিশ্চিত করে পড়াশোনা চলাকালীনই কর্মক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ওপর নির্ভর করে কোটি কোটি বেকারের কর্মসংস্থান সম্ভব নয়, তরুণদের ‘চাকরি প্রার্থী’ থেকে ‘চাকরি দাতা’ বা উদ্যোক্তায় রূপান্তর করতে হবে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন বিনা সুদে ব্যাংক ঋণ, স্টার্টআপ ফান্ড এবং কর ছাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
কৃষিপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্প খাতে উদ্যোগ গ্রহণে তরুণদের সরকারিভাবে প্রশাসনিক সহায়তা দেয়া আবশ্যক।
একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর মূল স্তম্ভ হলো তরুণ সমাজ। এই শক্তির দক্ষতা ও যোগ্যতা দেশের কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে, তা প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হওয়ার বদলে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বড় কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিতকরণে দক্ষতা উন্নয়ন, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।