আরবদের হাতেই ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত্তি : ইসলামের কাছে ঋণী পর্তুগালে মুসলিমরা নির্যাতিত


৩০ জুলাই ২০২৬ ১০:০০

॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
পর্তুগালের মূল ভূখণ্ড আইবেরীয় উপদ্বীপের পশ্চিমের এক-ষষ্ঠাংশ এলাকাজুড়ে অবস্থিত। পর্তুগালের পশ্চিমে দৈর্ঘ্য বরাবর আটলান্টিক মহাসাগর, পূর্বে স্পেনীয় সীমান্ত। দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপের দেশটির সরকারি নাম ‘পর্তুগিজ রিপাবলিক’। পর্তুগাল দেশটি মোটামুটি আয়তাকৃতির। আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত স্বায়ত্তশাসিত মাদেইরা ও আজোরেস দ্বীপপুঞ্জকে গণনায় ধরে পর্তুগালের মোট আয়তন ৯২,৩৫৫ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরের ভূমি পর্বতময় ও সবুজে ঘেরা। এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং আবহাওয়া শীতল। এই অঞ্চলটি দোউরু নদীর উপত্যকা আঙুরক্ষেতের জন্য বিখ্যাত। পর্তুগাল ইউরোপের সবচেয়ে পশ্চিমী বিন্দু, কাবো দা রোকা, যা আটলান্টিক মহাসাগরের অত্যাশ্চর্য দৃশ্য দেখায়, যদিও দেশটি পোর্ট ওয়াইন, ভিনহো ভার্দে এবং ডরো ওয়াইনের জন্য কুপরিচিত। পর্তুগালের জনসংখ্যা ১০ মিলিয়নের বেশি। মোট জনসংখ্যার ০.৬৫ শতাংশ মুসলিম। তবে দেশটির গৌরবময় ইসলামের ইতিহাস থাকলেও বর্তমান মুসলিমরা নির্যাতিত।
মুসলিম ঐতিহ্য ধ্বংস : ৭১১ খ্রিস্টাব্দে উত্তর আফ্রিকা থেকে মুসলিম বাহিনী সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বর্তমান পর্তুগাল ও স্পেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয়, যা ইতিহাসে আন্দালুস নামে পরিচিত। স্পেনের কর্ডোভার গ্র্যান্ড মস্ক কিংবা গ্রানাডার আলহামরা প্রাসাদের মতো সোনালি যুগের দৃশ্যমান রাজকীয় স্থাপত্যের উদাহরণ পর্তুগালে মুসলিম-পরবর্তী শাসনগুলোর হিংসা-বিদ্বেষের কারণে তেমন টিকে নেই। তবে পাঁচ শতকের মুসলিম শাসন পর্তুগালের ভাষা, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রায় এখনো স্পষ্ট হয়ে আছে ইসলামী ঐতিহ্য। মুসলিমবিদ্বেষী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও ২০১৮ সালে লিসবনের সেন্ট্রাল মসজিদে মুসলিম কমিউনিটির বিশেষ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে পর্তুগিজ প্রেসিডেন্ট মার্সেলো রেবেলো ডি সুজা স্বীকার করতে বাধ্য হন, ইসলাম পর্তুগালের আত্মার অংশ। পর্তুগালের সমাজ ও সংস্কৃতিতে আরবরা যে গভীর অবদান রেখে গেছে, সে সম্পর্কে হয়তো আমরা সবসময় পুরোপুরি সচেতন নই। তবে এই প্রভাব অতীতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং এখনো এর তাৎপর্য অনস্বীকার্য।
মুসলিমদের দেশত্যাগে বাধ্য করা : স্পেনে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কিছুদিনের অর্থাৎ হিজরি প্রথম শতকের মধ্যেই বর্তমান পর্তুগালের প্রায় পুরোটা মুসলিম শাসনাধীন হয়। মুসলিম সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর পর্তুগালের মাটিতে প্রথম বিজয়ের পতাকা উত্তোলন করেন এবং তার ছেলে আবদুল আজিজ বিজয়কে পূর্ণতা প্রদান করেন। ১৪২৯ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগালে মুসলিম শাসনের অবসান হয়। মুসলিম শাসনের অবসান হলে পর্তুগালের মুসলিমদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। তারা আশ্রয় নেয় আফ্রিকা ও বলকান অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোয়। তবে গত শতকের নব্বইয়ের দশকের পর থেকে পর্তুগালের মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে। ১৯৯১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পর্তুগালে মাত্র পাঁচ হাজার মুসলিম বসবাস করত। ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে, সেখানে মুসলমানের সংখ্যা ৬৫ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশটিতে শিশুদের ইসলামী শিক্ষা প্রদানের জন্য রয়েছে মাদরাসা। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম ইসলামিয়া পর্তুগালের বৃহৎ ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যেখানে মুসলিম শিশুদের ইসলামী বিধিবিধান, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও আরবি ভাষা শেখানো হয়। এছাড়া আল-কলম, আন নুর ও আল ইসলাম নামে তিনটি মাসিক ও দ্বিমাসিক পত্রিকা প্রকাশ করে পর্তুগালের মুসলিমরা। পর্তুগালে মুসলিমরা সংঘবদ্ধ হতে শুরু করে গত শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে। তারা ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে নিজ দেশে ফিরে আসতে শুরু করে ১৯৬৮ সালে। স্থানীয় মুসলিম ও আরব শায়খদের অর্থায়নে ১৯৭৭ সালে লিসবনে কেন্দ্রীয় মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ১৯৮৫ সালে তার নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়। মুসলিম শাসন অবসানের ৫৫৬ বছর পর নির্মিত হয় প্রথম মসজিদ। পর্তুগালে বসবাসরত বেশিরভাগ মুসলিম মরক্কোর বংশোদ্ভূত। তাই পর্তুগালের মুসলিম সংস্কৃতি ও ধর্মীয় নেতৃত্বে তাদের প্রাধান্য দেখা যায়।
আরবদের হাতেই ইউরোপীয় রেনেসাঁর উত্থান : পর্তুগিজ জাতি ও পর্তুগাল রাষ্ট্র ইউরোপের প্রাচীনতম জাতি ও রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশটির মুসলিম শাসকগণ ১১৩৯ সালে যে সীমান্ত স্থাপন করেছিলেন তারপর মূল ভূখণ্ডের সীমানায় তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনও পশ্চিম ইউরোপের প্রাচীনতম শহর হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। যার ৩,০০০ বছরেরও বেশি উল্লেখযোগ্য ইতিহাস রয়েছে বলে জানা যায়। পর্তুগিজ ভাষা ৯টি দেশের সরকারি ভাষা। পর্তুগিজ লেখক ও কবি আদালবার্তো আলভেজ বলেন, ‘আল আন্দালুস ছিল মানবতার স্বর্ণযুগ।’ ইসলামী শাসনের স্বীকৃতি ও নিরাপত্তা করের বিনিময়ে খ্রিস্টান ও ইহুদিরা তাদের জীবন, সম্পদ ও সংস্কৃতির পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করত। ইসলামী শাসনের বড় অবদান ছিল বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সহিষ্ণুতা ও সংহতি গড়ে তোলা। তিনি দাবি করেন, আরবরা সমুদ্র বিজ্ঞানের উন্নয়ন না করলে পর্তুগিজরা বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ও সাম্রাজ্য বিস্তার করতে পারত না। তিনি বলেন, পর্তুগিজ অন্বেষক, ভাস্কো দা গামা এবং ফার্ডিনান্ড ম্যাগেলান অজানা সমুদ্রে নেভিগেট করে আফ্রিকা, এশিয়া এবং আমেরিকায় সমুদ্র পথ স্থাপন করেছিলেন। এই সামুদ্রিক দক্ষতা বিশ্বব্যাপী অন্বেষণ এবং বাণিজ্যের প্রাথমিক পর্যায়ে পর্তুগালের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল। আরবরা যদি জাহাজ চলাচলের বিজ্ঞান উন্নত না করত, তবে পর্তুগিজরা হয়তো বিশ্বখ্যাত নাবিকও হতে পারত না। ‘আইবেরিয়ান উপদ্বীপে (স্পেন ও পর্তুগালে) আরবদের অবদানের কারণে উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে এবং ইউরোপীয় রেনেসাঁর যে ভিত্তি, তা আরবদের হাত ধরেই তৈরি হয়েছে।’
সর্বশেষ ঘৃণিত ঔপনিবেশিক দেশ : ঔপনিবেশিকতা কয়েক শতাব্দীজুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং আফ্রিকা, এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার অঞ্চলগুলি অন্তর্ভুক্ত করেছিল। ১৯৯৯ সালে চীনের কাছে পর্তুগাল তার শেষ উপনিবেশ ম্যাকাও হস্তান্তরের মাধ্যমে বিশ্বে ঘৃণিত ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সমাপ্তি হয়। যে তকমা সর্বশেষ দিন পর্যন্ত বহন করছিল পর্তুগাল। তবে ঘটনাটি পর্তুগালের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক রূপান্তরের সংকেত। এদিকে শুনতে অবাক লাগলেও ১৯ শতকের প্রথম দিকে ১৮০৮ থেকে ১৮২১ সাল পর্যন্ত পর্তুগাল দেশটির নিজের রাজধানী ছিল অন্যদেশে। পর্তুগিজ রাজপরিবার, ডম জোয়াও ষষ্ঠের নেতৃত্বে, ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে বসবাস করত। শহরটি প্রায় ১৩ বছর ধরে পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের কার্যত রাজধানী ছিল। এই ঐতিহাসিক স্থানান্তর নেপোলিয়নিক যুদ্ধের সময় ঘটেছিল যখন লিসবন নেপোলিয়নের বাহিনীর আক্রমণের হুমকির মুখে পড়েছিল। তখন তৎকালীন রাজা নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার জন্য বিদেশ থেকে দেশ পরিচালনা করতেন। অন্যদিকে পর্তুগাল এবং ইংল্যান্ডের মধ্যে জোট বিশ্বব্যাপী একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক সক্রিয় রাজনৈতিক এবং সামরিক জোট হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, যা মুসলিম শাসনামল ১৩৮৬ সালে উইন্ডসর চুক্তিতে স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। এই অংশীদারিত্ব ছয় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে। পারস্পরিক সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক দ্বারা চিহ্নিত এই জোট, দুই জাতির মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক প্রদর্শন করলেও সেটি বিশ্বমানবতার জন্য এবং যে মুসলিম শাসনামলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সেই মুসলিমদের জন্য কতটুকু কাজ করছে তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
১৭টি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থল-মুসলিম কৃতিত্ব : প্রতিটি জাতি সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্যের অনন্য দিকের জন্য গর্ববোধ করে। পর্তুগালও তার ১৭টি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থল নিয়ে গর্বিত। কিন্তু এই ঐতিহ্যবাহী স্থলের অধিকাংশ মুসলিম শাসনামলে আবিষ্কৃত বা নির্মিত। সুতরাং পর্তুগালে এতগুলো ঐতিহ্যের পেছনে রয়েছে মুসলিম শাসনের কৃতিত্ব। লিসবনের গর্ব ইউরোপের দীর্ঘতম সেতু ভাস্কো দা গামা। টেগাস নদীজুড়ে এই স্থাপত্য বিস্ময় ১৭ কিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত। এছাড়া ওপোর্টোর ঐতিহাসিক কেন্দ্র থেকে বেলেমের টাওয়ার পর্যন্ত এই স্থানগুলো বিভিন্ন ল্যান্ডস্কেপ, স্থাপত্য এবং ঐতিহ্য অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্বব্যাপী দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। পর্তুগালের ইউনেস্কো তালিকাভুক্ত সম্পদগুলো একটি সমৃদ্ধ এবং বহুমুখী ঐতিহ্য হিসেবে দেশটির বিশ্বব্যাপী খ্যাতিতে অবদান রাখে। তবে কৃতিত্ববান সেই মুসলিমদের উত্তরসূরিরা আজ দেশটিতে অবহেলিত।
পর্তুগালে বর্বর ড্রাগ বৈধ করায় নিন্দা : পর্তুগাল ২০০১ সালে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য মাদক দ্রব্যের দখল এবং ব্যবহার অপরাধমুক্ত করে একটি পদক্ষেপ নিয়েছিল। এই পদ্ধতি মাদক দ্রব্য অপব্যবহারকে অপরাধের পরিবর্তে একটি স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে যেটি সর্বমহলে নিন্দনীয়। মুসলিম নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন স্তরের মানবাধিকার কর্মিরা বিষয়টির জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যদিও মাদক দ্রব্যের ব্যবহার প্রযুক্তিগতভাবে বৈধ নয়, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ছোট পরিমাণের সাথে ধরা পড়া ব্যক্তিরা অপরাধমূলকের পরিবর্তে প্রশাসনিক শাস্তির মুখোমুখি হন। এই পদ্ধতি জনস্বাস্থ্য এবং ক্ষতি হ্রাসের ওপর জোর দিয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য হলেও সেটি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি।
মুসলিম আমলের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় : পর্তুগালে গর্বের সাথে বিশ্বব্যাপী প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি কোইম্ব্রা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। মুসলিম শাসনামলে ১২৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। কোইম্ব্রা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার জন্য একটি বিশিষ্ট কেন্দ্র হিসেবে অব্যাহত আছে, এটি পর্তুগালের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে অবদান রাখছে এবং বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করছে। পর্তুগালে মুসলিমদের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও মুসলিমরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আরবদের নিকট ঋণী পর্তুগিজরা : বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক আদালবার্তো আলভেজের মতে, আন্দালুস ছিল মানবসভ্যতার অনন্য উদাহরণ। সে সময় মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে সহাবস্থান করত, যার ফলে বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল অভূতপূর্ব উপায়ে। আলভেজ গত ৪৫ বছর ধরে পর্তুগালে মুসলিম শাসনের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি আন্দালুসীয় যুগের আরবি কবিতা পর্তুগিজ ভাষায় অনুবাদ করেছেন, যার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালে ইউনেস্কো তাকে শারজাহ পুরস্কারে ভূষিত করে। আলভেজ প্রায় ১০ বছর ধরে পর্তুগিজ ভাষায় ব্যবহৃত আরবি শব্দের একটি অভিধান তৈরিতে কাজ করেছেন। তিনি জানান, পর্তুগিজ ভাষায় প্রায় ১৯ হাজার শব্দ রয়েছে যা সরাসরি আরবি থেকে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ পর্তুগিজরা কোনো কিছুর আশা প্রকাশ করতে সাধারণত ওশলা শব্দটি ব্যবহার করে, যা মূলত আরবি ইনশাআল্লাহ শব্দের সরাসরি রূপান্তর। গবেষকদের মতে, কবিতা, ভাষা ও কার্পেট বুনন থেকে শুরু করে সংগীত, স্থাপত্য এবং বিজ্ঞানের বহু ক্ষেত্রে পর্তুগাল তার আরব তথা ইসলামী অতীতের কাছে ঋণী তবে মুসলমানরা আজ সেখানে উপেক্ষিত যেটি অনাকাক্সিক্ষত ।
নিকাব নিষিদ্ধে পার্লামেন্টে বিল পাস : পর্তুগালে অধিকাংশ উন্মুক্ত স্থান বা জনসমক্ষে ‘লিঙ্গভিত্তিক ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যে’ নিকাব পরা নিষিদ্ধ করতে পার্লামেন্টে একটি বিল পাস হয়েছে। অতি দক্ষিণপন্থী চেগা পার্টি এ বিল উত্থাপন করেছিল। মূলত মুসলিম নারীদের বোরকা ও নিকাবের ব্যবহার লক্ষ করে বিলটি পার্লামেন্টে তোলা হয়। ১৭ জুলাই ২০২৬ শুক্রবার পাস হওয়া বিলটিতে জনসমক্ষে নিকাব পরার জন্য ২০০ থেকে ৪ হাজার ইউরো জরিমানা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সেইসঙ্গে কাউকে তা পরতে বাধ্য করলে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। তবে উড়োজাহাজ, কূটনৈতিক প্রাঙ্গণ ও উপাসনালয়ে নিকাব পরা যাবে। পর্তুগালের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সাংবিধানিক বিষয়-সম্পর্কিত আইন পর্যালোচনার দায়িত্বে থাকা সংসদীয় কমিটিতে এখন বিলটি আলোচনার জন্য প্রস্তুত। পর্তুগালের প্রেসিডেন্ট মার্সেলো রেবেলো ডি সুজা বিলটিতে ভোটো দিতে পারেন কিংবা আরও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সাংবিধানিক আদালতে পাঠাতে পারেন। তবে বিলটি শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হলে পর্তুগালও ইউরোপের সেসব দেশের তালিকায় নাম লেখাবে, যারা জনসমক্ষে নিকাব পরার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। জানা যায় এখন পর্যন্ত ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে উন্মুক্ত স্থানে নিকাব পরা আংশিক বা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পার্লামেন্টের অধিবেশনে চেগা পার্টির নেতা আন্দ্রে ভেনচুরা যখন এ বিল উত্থাপন করেন, তখন বামপন্থী দলগুলোর কয়েকজন নারী আইনপ্রণেতা এর বিরোধিতা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মধ্য-দক্ষিণপন্থী জোটের সমর্থনে বিলটি পাস হয়। ‘আমরা পার্লামেন্টের নারী সদস্যদের, আপনাদের মেয়েদের, আমাদের মেয়েদের এই দেশে একদিন বোরকা পরার হাত থেকে রক্ষা করছি’, বলেন কট্টরপন্থী আন্দ্রে ভেনচুরা। এক্স পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমাদের গণতন্ত্রের জন্য এবং আমাদের মূল্যবোধ, পরিচয় ও নারীর অধিকার রক্ষার জন্য আজ ঐতিহাসিক একটি দিন।’
ক্ষমতাসীন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা আন্দ্রেয়া নেটো পার্লামেন্টে ভোটাভুটির আগে বলেন, এটা নারী ও পুরুষের সমতা নিয়ে বিতর্ক। কোনো নারীকে তাঁর মুখ ঢেকে রাখতে বাধ্য করা উচিত নয়। পার্লামেন্টে ১০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২টি ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল। এরা হলো পিপল-অ্যানিমেলস-নেচার পার্টি ও টুগেদার ফর দ্য পিপল পার্টি। দলগুলোর মতে, এ প্রস্তাব বৈষম্য উসকে দিয়েছে কারণ কাউকে মুখ খুলে রাখতে বাধ্য করাও নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
ইসলামবিদ্বেষ : দুঃখজনকভাবে ইউরোপের মূলধারার ইতিহাসে আরব ও মুসলিমদের অবদানকে অনেক ক্ষেত্রেই আড়ালে রাখা হয়েছে। লিসবন মসজিদের সামাজিক কমিটির সদস্য ফাওজিয়া ইব্রাহিমো বলেন, স্কুলের পাঠ্যবইগুলোয় যখন শিশুরা এই সময়কাল সম্পর্কে পড়ে, তখন তারা মূলত খ্রিস্টান ও মুসলিমদের মধ্যকার যুদ্ধ-বিগ্রহের কথাই বেশি জানতে পারে। সেখানে মুসলিমদের সবসময় শত্রু হিসেবে দেখিয়ে সমাজে ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানো হয়। অথচ সেই যুগের শিল্প, বিজ্ঞান এবং দীর্ঘদিনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আরও বেশি আলোচনা হওয়া উচিত ছিল। পঞ্চদশ শতকে খ্রিস্টান রাজারা আন্দালুসের শেষ মুসলিম ঘাঁটিগুলো জয় করার পর আইবেরিয়ান উপদ্বীপে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। সে সময় মুসলিম ও ইহুদিদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা অথবা দেশত্যাগে বাধ্য করা হলেও পর্তুগালের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে তো বটেই; এমনকি বর্তমান প্রজন্মের জিনগত গঠনেও এই মুসলিম-ইহুদি বংশোদ্ভূতদের গভীর সংযোগ রয়েছে। বিজ্ঞানীদের এক জেনেটিক গবেষণায় দেখা গেছে, আইবেরিয়ান উপদ্বীপের বর্তমান জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের শরীরে ইহুদি বা মুসলিম পূর্বপুরুষদের ডিএনএ রয়েছে। ২০১৫ সালে পর্তুগাল একটি আইন পাস করে, যার মাধ্যমে পঞ্চদশ শতকে দেশ থেকে বিতাড়িত ইহুদিদের বংশধরদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে সেই আইনে মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যদিও কায়রোর বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড ইমাম আহমাদ তায়েব এক সফরে এসে পর্তুগিজ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানÑ যেন ইহুদিদের মতো বিতাড়িত মুসলিমদের বংশধরদেরও এই নাগরিকত্বের সুযোগ দেওয়া হয়। পর্তুগালের আধুনিক যুগের সবচেয়ে বিখ্যাত কবি ফার্নান্দো পেসোয়া আজ থেকে ১০০ বছর আগেই তার লেখায় এই অবিচারের কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, আরবদের বিতাড়িত করে আমরা যে অপরাধ করেছি, আসুন তার প্রায়শ্চিত্ত করি; কারণ তারাই এই উপদ্বীপকে সভ্য করে তুলেছিল। পেসোয়ার বিভিন্ন লেখায় ইসলামী সভ্যতার প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা এবং আন্দালুসের প্রতি পর্তুগালের সাংস্কৃতিক ঋণের কথা বারবার উঠে এসেছে। পর্তুগালের ইতিহাসবিদদের একাংশও মনে করেন, মুসলিমরা কোনো বহিরাগত শত্রু ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন বর্তমান পর্তুগিজদেরই পূর্বপুরুষ এবং তাদের রেখে যাওয়া ইসলামী ঐতিহ্যই আজ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে এক সুতায় বেঁধে রেখেছে।
পর্তুগালের মুসলিমরা তাদের ওপর সকল ধরনের ইসলামবিদ্বেষ, বৈষম্য, নির্যাতন, আদর্শিক ও জাতিগত ঐতিহ্য ভুলে রমাদান এলে এক দস্তরখানায় ইফতার করে। তারাবির পর আত্মীয়-স্বজন ও আপনজনদের সঙ্গে দেখা করতে বের হয়। দেখে মনে হয়, তারা যেন এমন পারস্পরিক সাক্ষাতের জন্য রমাদানের অপেক্ষা করে। পর্তুগালের মুসলিমরা শতপ্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব আয়োজনে অংশগ্রহণ করে। তবে পর্তুগালের ইফতার মাহফিলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সেখানে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী ও সংস্কৃতির মানুষকে দাওয়াত দেওয়া হয়। যেন তারা ইসলাম ও মুসলিমদের সম্পর্কে জানতে পারে। লিসবনে অবস্থিত ইসলামিক সেন্টারে কেন্দ্রীয়ভাবে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এ সময় সেখানে দিনব্যাপী আলোচনাও হয়। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন মুসলিমদের ফিরিয়ে দিতে ইসলামের কাছে ঋণী পর্তুগালে মুসলিমদের ওপর যত ধরনের মানবাধিকারবিরোধী ইসলামবিদ্বেষ, বৈষম্য, অন্যায়, নির্যাতন হয় সবকিছুর বিরুদ্ধে সরকারকে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তথ্যসূত্র : আল-বাওয়াবা, সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্ট বুক ও উইকিপিডিয়া, দ্য নিউজ আরব।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com