আস্থা ও বিশ্বাসের মর্মমূলে ফাটল ধরাচ্ছে গুজব, অপতথ্য
২৯ জুলাই ২০২৬ ২১:০৭
স্টাফ রিপোর্টার : রাতে ঘুমানোর আগে অনেকই ফেসবকু পেজে কিছুটা সময় দেন। এ সময় অনেক নতুন নতুন তথ্য ছড়ান কোনো কোনো অ্যাক্টিভিস্ট। এসব তথ্যের বেশিরভাগই অপতথ্য বা গুজব। কেউ কেউ ব্যস্ত থাকের সাইবার বুলিংয়ে। অথচ এই বুলিংকারী ও গুজববাজরা একবারও ভাবেন না যে- একটি ভুয়া স্ক্রিনশট, একটি বিকৃত ছবি, একটি বেনামি ফেসবুক আইডি কয়েক মিনিটের মধ্যেই একজন মানুষের বহু বছরের সুনাম প্রশ্নের মুখে পড়ে যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে দেশে গুজব ও সাইবার বুলিং এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি ব্যক্তিগত, সামাজিক; এমনকি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। অনেক সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী নিজেও জানেন না যে- তিনি আসলে কী শেয়ার দিচ্ছে, অপতথ্য লাইক বা শেয়ার দেওয়ার কারণে সমাজের কী ক্ষতি হতে পারে, এই আন্দাজও নেই অনেকের। ফলে ইচ্ছাকৃত এবং অনিচ্ছকৃত উভয়ভাবেই গুজব ছড়াচ্ছেন অনেকে।
একসময় গুজব ছড়াত মুখে মুখে। এখন একটি পোস্ট, একটি ভিডিও বা একটি সম্পাদিত ছবি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। একইসঙ্গে বাড়ছে সাইবার বুলিং- যেখানে কাউকে উদ্দেশ করে অপমান, হুমকি, কটূক্তি, ভুয়া তথ্য ছড়ানো কিংবা ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত করে সামাজিকভাবে হেয় করার ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সহজলভ্য হওয়ায় ভুয়া ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর তৈরি আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। ফলে গুজব ও অনলাইন হয়রানির ধরনও বদলে যাচ্ছে।
উদ্বেগ বাড়াচ্ছে পরিসংখ্যান : ইউনিসেফ বাংলাদেশের ২০২৫ সালের এক জরিপে প্রায় ২৯ হাজার তরুণ-তরুণী অংশ নেন। সেখানে প্রতি তিনজনের দুজন জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বড় মানসিক চাপের কারণ হলো ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তিকর তথ্য। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক উত্তরদাতা সাইবার বুলিং ও নেতিবাচক মন্তব্যকেও প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএনএফপির তথ্যানুযায়ী, দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নারীদের প্রায় ৮৯ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ভয়, সামাজিক লজ্জা ও হয়রানির আশঙ্কায় প্রায় ৭৫ শতাংশ ভুক্তভোগী অভিযোগই করেন না।
সাম্প্রতিক কিছু গুজব : বন্যার মতো দুর্যোগ, এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক গুজব ছড়িয়েছে। ১১ থেকে ১৭ জুলাই বাংলাদেশের পাঁচটি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান মোট ১৩৮টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৪টি ছিল বন্যা নিয়ে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে ছিল ২৫টি। তার বাইরে ২০টি প্রতিবেদন ছিল বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে। এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে মোট ৮৯টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যা মোট প্রতিবেদনের ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ গত সপ্তাহে প্রকাশিত প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ফ্যাক্ট চেকই ছিল এই তিনটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রিউমর স্ক্যানার প্রকাশ করেছে ৮৮টি। এছাড়া ফ্যাক্ট ওয়াচ ১৬টি, দ্য ডিসেন্ট ১৫টি, ডিসমিসল্যাব ১৩টি এবং বাংলা ফ্যাক্ট ৬টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
বন্যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি ছড়ানো অপতথ্যের একটি ছিল গর্ভের সন্তানকে বাঁচাতে এক গর্ভবতী নারী গাছের ডালে আশ্রয় নিয়েছেন। যাচাইয়ে দেখা যায়, এটি চট্টগ্রামের বন্যার নয়; বরং ২০২৪ সালে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে ভ্রমণের সময় ধারণ করা একটি ব্যক্তিগত ভিডিও।
বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ১৩, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও অন্যান্য বোর্ডে পরীক্ষা চলতে থাকে। এর মধ্যে ১৩ জুলাই প্রবল বর্ষণে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষার্থীরা দুর্ভোগে পড়েন। একই দিন পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নে ভুলের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি অডিও, যেখানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে পরীক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে মন্তব্য করতে শোনা যায়। ওই অডিওকে কেন্দ্র করে ১৪ জুলাই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নামেন। এটাকে ঘিরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, শিক্ষামন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, ছাত্রনেতা, সাংবাদিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নামে একাধিক ভুয়া মন্তব্যও ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপতথ্যের সূত্রপাত ব্যঙ্গাত্মক ফেসবুক পেজ থেকে, যা পরে সত্য দাবি হিসেবে বিভিন্ন পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। বিশ্বকাপ ফুটবলকেন্দ্রিক গুজবের মধ্যে বেশি ছড়িয়েছিল ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের একটি বক্তব্য। সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর তাঁকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘আমরা টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছি। আমি আশা করি, লিওনেল মেসি যেন তার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিততে পারে। আমি তার বড় একজন ভক্ত।’ যাচাইয়ে দেখা যায়, এমবাপ্পে এমন কোনো মন্তব্য করেননি। নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র ছাড়াই বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়।