দেশের স্বার্থে ঐক্যের বিকল্প নেই


২৯ জুলাই ২০২৬ ১৯:২৭

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর ঐক্যের মধ্যে থাক, বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ তাই ঐক্যেই আমাদের ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রে, আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তির একমাত্র পথ। বাংলাদেশে ৫৪ বছর পর স্বৈরাচার হাসিনা মাত্র ৩৬ দিনের ছাত্র-জনতার ঐক্যের আন্দোলনে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। মাত্র ২ দিন পূর্বে বড় দেশ ভারতে ৩৬ দিনের আন্দোলনে মোদি সরকার দাবি মানতে বাধ্য হয়ে পিছপা হয়েছে। এমন ঘটনা অহরহই আমরা দেখতে পাই। তাই এদিক-সেদিক না ঘুরে দেশের কল্যাণে দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে ঐক্যের পথেই দেশের উন্নয়ন সম্ভব। ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থের কথা একটু সেক্রিফাইস করে আসুন, আমরা দেশের চিন্তা করি।
২০ কোটি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে আমরা এক হই। শহীদ জিয়াউর রহমান দেশের ভার নিয়ে সবাইকে নিয়ে দেশ চালানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ডান-বাম সবাইকে নিয়ে চলার পথ তৈরিতে হাত দিয়েছিলেন। অল্প সময়ে তিনি সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে তাকে জীবন দিতে হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়াও সবাইকে নিয়ে দেশ চালাতে উদ্যোগী হয়েছিলেন এবং এ কাজে অগ্রসরও হয়েছিলেন। জামায়াতের ২ জন মন্ত্রীকে ৫ বছরে ৩টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন। জামায়াতের সাবেক আমীর শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ৫ বছরে ৩টি মন্ত্রণালয় অত্যন্ত দক্ষতা ও দুর্নীতিমুক্ত অবস্থায় চালিয়েছিলেন। আজ পর্যন্ত তাদের মন্ত্রণালয়ে কোনো দুর্নীতি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারপরও তাদের স্বৈরাচার হাসিনা ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়েছেন, যা দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য হাসিনার কপালে দুঃখ আর কলঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সবাইকে নিয়ে চলার মধ্যে দেশের ও দশের কল্যাণ।
অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যে ১৪০০ শহীদ, ৩০ হাজার লোকের পঙ্গুত্ব ও আহতের মাধ্যমে অর্জিত নতুন বাংলাদেশ এখন ভালোভাবে চলবেÑ এটাই জনগণের আশা। যেভাবেই হোক, একটা নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান শহীদ জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে। ১৭ বছর প্রবাস জীবন কাটিয়ে ৩৬ জুলাই বিপ্লবের ফসল হিসেবে তিনি দেশে আসতে সক্ষম হয়েছেন, যা ছাত্র-জনতার ঐক্যেই সম্ভব হয়েছিল। নির্বাচিত সরকারের প্রায় ৫ মাস অতিবাহিত হলো। মন্ত্রণালয়গুলো খুব একটা ভালো চলছে বলা যায় না। প্রায়ই অনভিজ্ঞ লোক মন্ত্রীর আসনে বসেছেন। দলীয় প্রভাবমুক্ত হতে তারা পারেননি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি, জেলা-উপজেলা সর্বক্ষেত্রে দলীয় ক্যাডার বাহিনীর লোকদের বসানোর ফলে তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে নির্বাচনে হেরেও দলীয় পরিচয়ে প্রশাসক নিয়োজিত হয়েছেন।
ছাত্র-জনতা আশা করেছিল, সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি স্বৈরাচার হাসিনার ফেলে যাওয়া প্রশাসনে বসবে এবং জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। এলাকায় উন্নয়ন হবে। আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন হবে। মানুষ শান্তিতে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে। দিনের শেষে রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারবে। না! পরিবেশ এমন হয়নি। মারামারি, খুনাখুনি লেগেই আছে। আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন হয়নি। এখনো স্বৈরাচারের দোসররা সব জায়গায় বসে আছে। ছুঁতানাতায় মানুষ হয়রানিতে ভুগছে। চাঁদাবাজি দখলবাজি, দুর্নীতির কোনো উন্নতি হয়নি। আমরা জনগণ এর প্রতিকার চাই।
সরকার গঠনের পর মনে হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবাইকে নিয়েই দেশ পরিচালনার পথ বেছে নেবেন। সরকারি দল ও বিরোধীদল আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই দেশের উন্নয়ন ও কল্যাণের পথে দেশ এগিয়ে যাবে। কথায় এক থাকলেও বাস্তবে দলীয় কায়দায়ই বিএনপি হাঁটছে।
ভূরাজনৈতিক কিছু পরিবর্তনে আমরা কিছু সুবিধা পেয়েছি, যা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। প্রতিবেশী দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলনের কারণে তারা নিজেরাই বেকায়দায় আছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের ফলে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নেয়ার পথ পরিষ্কার হওয়ার পথে। অন্যদিকে চীন মিয়ানমার বাংলাদেশ সংযোগ সড়কের ঘোষণা আমাদের জন্য কল্যাণকর হবে বলেই আশা করা যায়। কম খরচে দেশের পণ্য আমদানি-রফতানির সুযোগ সৃষ্টি হবে। তুলনামূলক কম খরচে আমাদের পণ্য অমদানি-রফতানি করা যাবে। আমাদের দেশের কৃষিজাত পণ্য চীনে রফতানি করতে পারলে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব হবে। তাই দেশের প্রশাসনে ঐক্য রাখতে পারলে সরকারি দল ও বিরোধীদল ঐক্যের মাধ্যমে চলতে পারলে দেশের উন্নয়ন ও কল্যাণের দিকেই অগ্রসর হবে, ইনশাআল্লাহ।
সরকারের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা ভারতীয় দালালরা ৩৬ জুলাইয়ের সনদ ও গণভোটের দলিল মানতে সরকারকে ভুল তথ্য দিয়ে কার্যকরী করতে বাধার সৃষ্টি করছে। ফলে সরকারি দল ও বিরোধীদলের মতের ঐক্যে ফাটল ধরার উপক্রম হয়েছে। সংসদে বিরোধীদল অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু জুলাই সনদের কার্যকারিতার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি দলের একাংশের ভূমিকার কারণে।
ছাত্র-জনতা কিন্তু বসে থাকবে না। তাদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া নতুন বাংলাদেশে কেউ আর ফাঁকি দিতে পারবে না। প্রত্যেকের ন্যায্য অধিকার তারা পেতেই চাইবে। তাই ছলচাতুরী করে সংস্কার, বিচার ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করতে না পারলে ছাত্র-জনতা কিন্তু বসে থাকবে না। ইতোমধ্যে বিরোধীদল সংসদের ভাষণে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আমরা জনগণের দাবি-দাওয়া সম্পর্কে সংসদে কথা বলব, সাথে সাথে রাজপথেও জনগণকে নিয়ে দাবি জানাবো।
ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে ১১ দলীয় জোটের বিশাল বিশাল সমাবেশ হয়েছে। জনগণ আবার এ জনসভাগুলোয় হাজির হয়ে জানান দিয়েছে আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি, থাকবো। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন আমরা দেখতে চাই। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি চাই, দুর্নীতিমক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত সমাজ চাই, ধর্ষণের বিচার চাই, জুলাই ছাত্র-জনতার বিরোধীদের বিচার চাই।
মানবতাবিরোধী আদালতের বিচার দ্রুত করতে হবে। হাসিনাসহ যাদের ইতোমধ্যেই ফাঁসির আদেশ হয়েছে, তাদের অতিসত্বর দেশে এনে বিচার কার্যকরী করতে হবে। অন্যদের বিচারকার্য দ্রুত তদন্ত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে যেন আর কোনো স্বৈরাচার মাথা গজাতে না পারে। বিচারের সাথে সাথে ব্যাংক লুটকারী, বিদেশে টাকা পাচারকারীদের দ্রুত বিচার করে টাকা ফেরত আনার কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাংক লুটেরা টাকা পাচারকারীরা অবৈধ টাকার বিনিময়ে বিচারকার্য বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।
টাকা পাচারকারীদের বড় দোসর সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিদায়ের ফলে ব্যাংক লুটেরাদের বড় হাতিয়ার মাঠে মারা গেছে। সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিরুদ্ধে মানবাধিকার আদালতে ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে ২টি মামলা হয়েছে। তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আমরা আশা করতে পারি। তাছাড়া সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিরুদ্ধে বেগম খালেদা জিয়ার মামলারও নথিতে পাওয়া যাবে অনেক তথ্য। ইসলামী ব্যাংকের টাকা লুটের ঘটনা ওপেন সিক্রেট। তাই তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে কালবিলম্ব না করে। এভাবে হাসিনার দোসরদের বিচারের আওতায় আনতে পারলে দেশের কল্যাণের সব কাজই এগিয়ে নেয়া যাবে।
মহান আল্লাহ আমাদের নেক কাজের বরকত অবশ্যই দেবেন, কোনো সন্দেহ নেই। হঠাৎ করেই সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষরের পর স্পিকারের ওপর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব অর্পণ ভালো লক্ষণ বলেই আমার ধারণা। ষড়যন্ত্রের বড় একটি ঘাট পার করল বাংলাদেশ। হাসিনার ষড়যন্ত্রের একটি বড় উপায় শেষ হয়ে গেল। পরিতাপের বিষয় হলো, এই সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে বিদায় দেয়ার জন্য ছাত্র-জনতা বঙ্গভবন ঘেরাও করেছিল। কিন্তু বিএনপি তাদের আন্দোলন সমর্থন করেনি। অনেকে বলে একটি প্রাণী আছে, যে পানি ঘোলা করে খায়। তারপরও বিএনপি শুভবুদ্ধির উদয় হোক, আমরা চাই। আমাদের আজকের বিষয় হলো ঐক্যে থাকা। শুধু দেশেই না, আন্তর্জাতিকভাবে বড় পরিতাপের বিষয়, ছোট একটি দেশ ইসরাইল ভূখণ্ডে মুসলমানদের অত্যাচার, জুলুম নির্যাতন করছে দীর্ঘকাল থেকে। কিন্তু ৫৭টি মুসলিম দেশ অথর্বের মতো শুধু দেখে যাচ্ছে। এবার মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে ইরানের সক্ষমতায় আমেরিকা-ইসরাইল টের পেয়েছে। আমেরিকার বিশ্ব মোড়লি এবার ধুলায় উড়ে গেছে। এখন আর মোড়লি কাজে আসছে না। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোকেও ইরান দেখিয়ে দিয়েছে আমেরিকা তোমাদের প্রভু হয়ে বাঁচাতে পারবে না। আল্লাহকে ইলাহ মেনে পরস্পরে ঐক্য সুদৃঢ়কর। তবেই তোমাদের মুক্তি। ৫৭টি দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকলে যে সম্পদ এদের হাতে আছে এবং জনশক্তি আছে, তাতে গোটা দুনিয়া শাসন করা মোটেই অসম্ভব নয়। আমরা মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের শুভবুদ্ধির প্রত্যাশা করি।
দেশের স্বার্থে ২০ কোটি মানুষের স্বার্থে সরকারি দল ও বিরোধীদলকে জনগণের কল্যাণে আসুন ন্যায়ের সাথে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার কাজে ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেশটাকে আমরা এগিয়ে নিই।
দেশের সম্পদ, মাটি, পানি, জনশক্তি, নদনদী, খালবিল, পাহাড়, সমুদ্র সবই আমাদের দেশের উন্নয়নের সহায়ক। শুধুমাত্র সৎ, যোগ্য লোকের নেতৃত্ব দরকার। আমরা যদি ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে কাজ না করে জনগণের স্বার্থে সরকারি ও বিরোধীদল এক সাথে একমতে কাজ করতে পারি তবে দেশের ৫৫ বছরের সব গ্লানি মুছে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে কোনো বাধা নেই। ভারতীয় দালালদের পাত্তা না দিয়ে তারেক রহমান তার বাবা-মায়ের নীতি অনুসরণ করে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ চালাতে পারলে, দেশ এগোতে কোনো অসুবিধা হবে না। আমরা ছাত্র-জনতা দেশের ভালো চাই। সরকারি দল ও বিরোধীদলের ঐক্যেই দেশ এগিয়ে যাকÑ এই আমাদের প্রত্যাশা। মহান আল্লাহ স্বৈরাচার হাসিনাকে বিতাড়িত করেছে। চুপ্পুকে বিতাড়িত করেছে। এখন শুধু ঐক্যবদ্ধ নীতি-নিয়মে দেশ চালাতে পারলে বাংলাদেশ একটি কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত হবে, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল :rnabi1954@gmail.com