জুলাই গণঅভ্যুত্থান

আন্দোলন দমাতে চালানো হয় নির্বিচারে গুলি, বহু হতাহতের ঘটনা গণগ্রেফতার


২২ জুলাই ২০২৬ ২১:১৭

স্টাফ রিপোর্টার : জুলাই গণঅভ্যুত্থান হঠাৎ করে হয়নি। ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকারের দীর্ঘদিনের খুন-গুম, অত্যাচার-নির্যাতনে মানুষের মধ্যে লালিত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশও ছিল। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, আন্দোলনে নেমে আসেন নারী-শিশু, বয়সের ভারে ঘরে আটকে রাখা যায়নি বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরও। যে যেভাবে পেরেছেন মাঠে নেমেছেন। যারা দেশে ছিলেন না, সেই প্রবাস জীবন থেকেও সামাজিকমাধ্যমে তরুণদের উৎসাহ জুগিয়েছেন। ফোন করে স্বজনদের বলেছেন রাজপথে নেমে আসতে। ফলে ২০২৪ সালের জুলাই গণমানুষের আন্দোলন রূপ নেয়। এই অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের রক্তাক্ত ও বেদনাবিধুর একটি অধ্যায়। ২০২৪ সালের ১৮ থেকে ২৪ জুলাই মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পরিণত হয়েছিল সংঘাতের কেন্দ্রে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে প্রতিদিনই নতুন নতুন বিক্ষোভ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। যেখানেই শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছেন, সেখানেই সাধারণ মানুষও তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। আবার কোথাও আন্দোলনের মিছিলে ঝরে গেছে তরুণ প্রাণ, অসংখ্য পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনকে। সেই রক্তাক্ত আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পতন ঘটে ফ্যাসিস্ট হাসিনার দেড় দশকের বেশি সময়ের স্বৈরশাসনের।
১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের শাহাদাতের পর আন্দোলনের গতিপথ পাল্টে যায়। ১৮ জুলাই ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি সারা দেশে পালিত হয়। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা, রংপুরসহ সব জেলা উপজেলায়। শিক্ষার্থীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এদিন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সংলগ্ন এলাকা, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব), আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবনে অগ্নিসংযোগ হয়। মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশন এলাকায় হামলার পর মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ওইদিন রাতে সারা দেশে মোবাইল ইন্টারনেট এবং পরে কার্যত ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে সরকার। এই দিনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তৎকালীন আওয়ামী লীগ-যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হামলায় ফারহান ফাইয়াজ (শিক্ষার্থী), দীপ্ত দে (মাদারীপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী) ও সিয়ামসহ (ব্যাটারির দোকানের কর্মচারী) ২৯ থেকে ৩২ জন আন্দোলনকারী প্রাণ হারান।
১৯ জুলাই আগের দিনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপী বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। ঢাকার উত্তরা, বাড্ডা, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ হয়। ভৈরব, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জেলায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট)-এর শিক্ষকরা প্রতিবাদ জানান। নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা ও অগ্নিসংযোগ হয়। রাত থেকে দেশব্যাপী কারফিউ জারি করা হয়।
সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলি ও আওয়ামী লীগের হামলায় এদিন প্রায় ৬০-৭৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সূত্রে এদিনের নিহতের সংখ্যা নিয়ে অমিল রয়েছে। ওইদিন নিহতের সংখ্যা নিয়ে দৈনিক সমকাল ৫৬ জনের কথা উল্লেখ করে ২০ জুলাইয়ের পত্রিকায়।
২০ জুলাই কারফিউ-এর মধ্যেও বিক্ষোভ হয়। সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন থাকে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সক্রিয় ছিলেন আন্দোলনকারীরা। এদিন ঢাকায় ১৬ জনসহ সারা দেশে ৩২ জনের প্রাণহানি ঘটে বলে দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকায় খবর প্রকাশ করে।
২০ থকে ২১ জুলাই বেশ কয়েকজন সমন্বয়ক ও জুলাই আন্দোলনের নেতাকে সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যান। সে সময় তাদের নির্যাতন করা হয়। পরে কাউকে কাউকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সে সময় তাদের আটকের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়নি। জানা গেছে, ২০ জুলাই দিবাগত রাতে নাহিদ ইসলামকে সাদা পোশাকধারীরা তুলে নিয়ে যায়। ২১ জুলাই পূর্বাচলে অচেতন অবস্থায় তাকে পাওয়া যায়। একই সময় আসিফ মাহমুদ সজিব ভুইয়াকে তুলে নেওয়া হয়। পরে হাতিরঝিল এলাকায় তাকে ফেলে যাওয়া হয়। একইদিন আবু বকর মজুমদারকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। নির্যাতনের পর তাকেও ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর তারা ঢাকার গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ২৬ জুলাই হাসপাতাল থেকে ডিবি পুলিশ তিন সমন্বয়ককে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে। ডিবির ভাষ্য ছিল, ‘নিরাপত্তার স্বার্থে’ তাদের নেওয়া হয়েছে।
২১ জুলাইও কারফিউ বহাল থাকে। সরকারি চাকরিতে কোটা পুনঃবহালে হাইকোর্টের রায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বাতিল করে দেয়। সরকারি চাকরিতে মাত্র ৭ শতাংশ কোটা রাখা হয়। কিন্তু এরপরও আন্দোলন থামেনি। সহযোদ্ধাদের হত্যার বিচারসহ নানা দাবিতে রাজপথে থাকেন আন্দোলনকারীরা। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে ছিলেন। দৈনিক সমকালের তথ্যানুযায়ী এদিন ঢাকার চারজন, নরসিংদী ও সাভারে ৫ জন এবং চিকিৎসাধীন ৫ জনের মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করে লিড নিউজ করে।
২২ জুলাই কারফিউ আংশিক (১ থেকে ৫) শিথিল করা হয়। সীমিত পরিসরে মানুষ বাইরে বের হতে শুরু করে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধই ছিল এদিন। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে সক্রিয় ছিলেন বিক্ষোভকারীরা। এদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি ও আওয়ামী লীগের হামলায় চারজন আন্দোলনকারীর প্রাণহানির খবর প্রকাশ করে দৈনিক পত্রিকাগুলো। এদিন গ্রেফতার করা হয় ছয় শতাধিক আন্দোলনকারীকে।
২৩ জুলাই নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি জোরদার থাকে। বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ ও গ্রেফতার অভিযান চলতে থাকে। ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল না। এদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে তীব্র আন্দোলন হয়। এদিন সরকারের তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংবাদ সম্মেলন করে জানান, শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দেওয়া হবে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা সরকারের এমন কথায় আস্থা রাখেনি। এদিন আন্দোলনের স্পটগুলোকে টার্গেট করে অভিযান চালিয়ে দুই হাজারেরও বেশি আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করা হয়। শুধু ঢাকায় গ্রেফতার করা হয় ছয় শতাধিক।
২৪ জুলাই কারফিউ ধাপে ধাপে শিথিল করা হয়। বহু এলাকায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো পরবর্তী কর্মসূচির প্রস্তুতি নিতে থাকে। এদিনও ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও সিলেটে ব্যাপক আন্দোলন হয়। এদিন নিখোঁজ তিন সমন্বয়কের সন্ধান মেলে। এরা হচ্ছেন আসিফ মাহমুদ, বাকের মজুমদার ও রাশিদুল ইসলাম মিল্লাত। এদিনও অনেককে গ্রেফতার করা হয়। ২৫ জুলাই সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চিকিৎসাধীন ৬৮৬ জনের মধ্যে ২৪১ জনের শরীরেই গুলি পাওয়া যায়।