উদ্বোধনের রঙিন উৎসব থেকে স্পেনের বিশ্বজয়
২২ জুলাই ২০২৬ ২০:৫৫
স্পোর্টস ডেস্ক : বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর শেষ হলো নতুন ইতিহাস রচনা করে। তিন দেশের যৌথ আয়োজনে, ৪৮ দলের অংশগ্রহণে এবং ১০৪ ম্যাচের দীর্ঘ প্রতিযোগিতা শেষে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি উঠেছে স্পেনের হাতে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই মহাযজ্ঞে ছিল নতুন ফরম্যাট, অপ্রত্যাশিত অঘটন, আন্ডারডগদের দুর্দান্ত লড়াই, তারকাদের আলো ছড়ানো পারফরম্যান্স এবং শেষ পর্যন্ত এক শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল। নিউজার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরে স্পেন। ম্যাচের ১০৬তম মিনিটে জয়সূচক গোলটি করেন ফেরান তোরেস। এভাবেই পর্দা নামে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের। এদিকে স্পেন জয় পাওয়ায় বাংলাদেশের ব্রাজিল সমর্থকরা খুশি হলেও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মন খারাপ। ফাইনাল খেলার আগেই অনেক সমর্থকরা ধরেই নিয়েছিল যে তারাই জয়ী হবেন। কিন্তু ম্যাচ শেষে ভিন্ন ফলে অনেক সমর্থকই কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেননা দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে আর্জেন্টিনা সমর্থকরা গুরু-মহিষ জবাই করে ভূরিভোজেরও আয়োজন করেন। কিন্তু পছন্দের দল হেরে যাওয়া খেলা শেষে অনেক নিশ্চুপ হয়ে যান সমর্থকরা।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপ ছিল নানা দিক থেকে ব্যতিক্রমী। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেয় বিশ্বকাপে। নতুন ফরম্যাটে ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৪-এ। ফলে প্রতিযোগিতা যেমন দীর্ঘ হয়েছে, তেমনি বিশ্বের আরও বেশি দেশের জন্য বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকেই ফুটবল উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে তিন স্বাগতিক দেশে। আধুনিক স্টেডিয়াম, প্রযুক্তিনির্ভর আয়োজন, হাজারো স্বেচ্ছাসেবক এবং লাখো সমর্থকের উপস্থিতি বিশ্বকাপকে পরিণত করে বৈশ্বিক এক মিলনমেলায়। প্রতিটি ম্যাচে গ্যালারির উচ্ছ্বাস, ভিন্ন সংস্কৃতির সমর্থকদের অংশগ্রহণ এবং উৎসবমুখর পরিবেশ পুরো আসরকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
গ্রুপ পর্বে শক্তিশালী দলগুলো নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিলেও চমক দেখায় বেশ কয়েকটি তুলনামূলক কম আলোচিত দল। নতুন ফরম্যাটে প্রতিটি পয়েন্টের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। ফলে শুরু থেকেই দেখা যায় আক্রমণাত্মক ফুটবল, কৌশলগত লড়াই এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা। বড় দলগুলোর পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলোর লড়াকু মানসিকতা বিশ্বকাপকে করে তোলে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
নকআউট পর্বে পৌঁছানোর পর নাটকীয়তা আরও বেড়ে যায়। একের পর এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, অতিরিক্ত সময়, টাইব্রেকারের উত্তেজনা এবং অপ্রত্যাশিত ফলাফল ফুটবলপ্রেমীদের চোখ আটকে রাখে প্রতিটি ম্যাচে। এই পর্যায়ে স্পেন, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড নিজেদের ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে শেষ চারে জায়গা করে নেয়।
স্পেন টুর্নামেন্টজুড়েই ছিল সবচেয়ে গোছানো দলগুলোর একটি। বল দখল, দ্রুত পাসিং, শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং পরিকল্পিত আক্রমণের সমন্বয়ে তারা প্রতিপক্ষকে নিয়মিত চাপে রেখেছে। অন্যদিকে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা অভিজ্ঞতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে কার্যকর ফুটবল খেলে আবারও ফাইনালে পৌঁছে যায়।
সেমিফাইনালে স্পেন শক্তিশালী ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে। অন্য সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে। এতে ফুটবল বিশ্ব পায় বহুল প্রতীক্ষিত স্পেন-আর্জেন্টিনা মহারণ।
বাংলাদেশ সময় গত ১৯ জুলাই দিবাগত রাতে অনুষ্ঠিত ফাইনাল ছিল কৌশল, ধৈর্য এবং মানসিক শক্তির অসাধারণ প্রদর্শনী। ম্যাচের শুরু থেকেই স্পেন বলের দখলে আধিপত্য বিস্তার করলেও আর্জেন্টিনার রক্ষণ ছিল দুর্ভেদ্য। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে দলকে ম্যাচে রাখেন। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই গোল করতে পারেনি।
অতিরিক্ত সময়েও স্পেন আক্রমণের ধার অব্যাহত রাখে। অবশেষে ১০৬তম মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের তৈরি করা সুযোগ থেকে ফেরান তোরেস জোরালো শটে জালের দেখা পান। সেই একমাত্র গোলেই নির্ধারিত হয় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। শেষ পর্যন্ত ১-০ গোলের জয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি জিতে নেয় স্পেন।
এই জয় শুধু একটি শিরোপা অর্জন নয়, বরং একটি সুসংগঠিত ফুটবল দর্শনেরও স্বীকৃতি। পুরো টুর্নামেন্টে দলগত সমন্বয়, শৃঙ্খলা এবং কৌশলগত পরিপক্বতার যে ফুটবল স্পেন উপহার দিয়েছে, তারই পরিণতি বিশ্বকাপ ট্রফি।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার জন্য এই হার হতাশার হলেও পুরো টুর্নামেন্টে দলটির লড়াকু মানসিকতা প্রশংসিত হয়েছে। কঠিন নকআউট পথ পেরিয়ে ফাইনালে পৌঁছানো এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়া তাদের আরেকটি স্মরণীয় বিশ্বকাপ অভিযানের সাক্ষী হয়ে থাকবে।
এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল নতুন ৪৮ দলের ফরম্যাট। শুরুতে এ নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই পরিবর্তনের ফলে বিশ্ব ফুটবলে প্রতিযোগিতা আরও বিস্তৃত হয়েছে। নতুন নতুন দেশ নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ পেয়েছে এবং একাধিক ম্যাচে শক্তিশালী দলগুলোকে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছে।
মাঠের বাইরেও আলোচনায় ছিল প্রযুক্তির ব্যবহার। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ঠঅজ), আধুনিক ডেটা বিশ্লেষণ, উন্নত সম্প্রচার ব্যবস্থা এবং দর্শকবান্ধব আয়োজন বিশ্বকাপকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তিন দেশে অনুষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও আয়োজনে বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি, যা আয়োজকদের জন্য বড় সাফল্য।
বিশ্বকাপজুড়ে উঠে এসেছে নতুন প্রজন্মের বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান ফুটবলার। পাশাপাশি অভিজ্ঞ তারকারাও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের জন্য পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন। গোলরক্ষকদের অসাধারণ সেভ, রক্ষণভাগের আত্মত্যাগ এবং ফরোয়ার্ডদের নিখুঁত ফিনিশিং পুরো আসরকে করেছে উপভোগ্য।
এক মাসের এই ফুটবল উৎসব শেষ হলেও অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত রয়ে যাবে সমর্থকদের হৃদয়ে। নাটকীয় জয়, অপ্রত্যাশিত বিদায়, আবেগঘন উদযাপন, গ্যালারির উচ্ছ্বাস এবং কোটি মানুষের অনুভূতির সঙ্গে মিশে থাকবে ২০২৬ বিশ্বকাপ।
শেষ পর্যন্ত উদ্বোধনের বর্ণিল আয়োজন থেকে ফাইনালের শেষ বাঁশি পর্যন্ত ২০২৬ বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়Ñ এটি বিশ্বের কোটি মানুষের আবেগ, ঐক্য এবং আনন্দের ভাষা। আর সেই ইতিহাসের শেষ পাতায় এবার স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকল স্পেনের নাম।