বিএফআইইউর প্রতিবেদন

এস আলম গ্রুপ পাচার করেছে সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা


২২ জুলাই ২০২৬ ২০:৪১

শীর্ষনিউজ : আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের ব্যাংকিং খাতে সংঘটিত অন্যতম বড় আর্থিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে। এতে ‘এস গ্রুপ’ ছদ্মনামে প্রকাশিত একটি কেস স্টাডিতে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। পরে বিএফআইইউ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ‘এস গ্রুপ’ বলতে এস আলম গ্রুপকে বোঝানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে এস আলম গ্রুপ দেশের সাতটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর নিজেদের প্রভাব ব্যবহার করে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ ঋণ অনুমোদন করিয়ে ব্যাংকগুলোর অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচার করা হয়।
বিএফআইইউর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে নজিরবিহীন আর্থিক কেলেঙ্কারি। এতে ব্যাংকের তহবিলের অপব্যবহার, বন্ডের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের অপপ্রয়োগের মতো বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৭ ব্যাংক ও ১ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়, এস আলম গ্রুপের পরিবারের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে সাতটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে নিজেদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে কার্যত এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। এমনকি দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণও রাজনৈতিক প্রভাব ও একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় নেওয়া হয়েছিল বলে কেস স্টাডিতে দাবি করা হয়েছে।
এরপর পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগিয়ে অভ্যন্তরীণ নীতিমালা পরিবর্তন করা হয় এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই নিজেদের ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করা হয়।
ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বিতরণের অভিযোগ
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এস আলম গ্রুপ বিপুলসংখ্যক শেল বা ভুয়া কোম্পানি গঠন করে সেগুলোর নামে ঋণ গ্রহণ করে। মোট ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৯০ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের নামে, ৯৮ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে এবং বাকি ৩৭ হাজার কোটি টাকা অন্য বিভিন্ন উপায়ে উত্তোলন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, বিপুল অঙ্কের এসব ঋণের বিপরীতে যথাযথ জামানত রাখা হয়নি। ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পদের বাজারমূল্য ছিল মাত্র ৩২ হাজার কোটি টাকা, যা ঋণঝুঁকি মূল্যায়ন ও ব্যাংকিং তদারকির বড় ধরনের ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।
চার দেশে অর্থ পাচারের দাবি
বিএফআইইউর তথ্যানুযায়ী, ব্যাংক থেকে আত্মসাৎ করা অর্থ বিভিন্ন জটিল মানিলন্ডারিং কৌশলের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং হুন্ডি ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, পাচার করা অর্থের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সাইপ্রাস ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) বিভিন্ন সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি অফশোর আর্থিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী যোগাযোগও তৈরি করা হয়েছিল। বিএফআইইউ বলছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি একাধিক দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করায় পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠেছে।