দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব : কূটনৈতিক সাফল্য
২২ জুলাই ২০২৬ ১৯:৫৬
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি দেশ কীভাবে চলবে, তা দেশের জনগণই ঠিক করবে। যদি এখানে প্রতিবেশীরা বারবার কথায় কথায় নাক গলায়, তবে স্বাধীনতার প্রতি হস্তক্ষেপের শামিল। আমরা গত ৫৫ বছরে দেখেছি, আমাদের কাজেকর্মে সর্বক্ষেত্রে ভারতীয় দাদাদের অতিরঞ্জিত হস্তক্ষেপ এবং তাদের একটি প্রদেশের মতো আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
শহীদ জিয়াউর রহমানের স্বাধীনচেতা কর্মসূচি ভারতের দাদাদের ভালো লাগেনি। কারণ তারা বারবার মনে করতে থাকে যে, তারা একটি মুসলিম দেশকে ভাগ করে দিয়েছে, তাদের মতো চালানোর জন্য। কিন্তু রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা তারা কখনোই স্বীকার করেনি। তাই শহীদ জিয়াউর রহমানকে মাত্র ১৩ দিনের মাথায় শেখ হাসিনাকে দেশে আসার পর দাদাদের অনুসারী সামরিক অফিসারদের দিয়ে হত্যা করা হয়। ৪৫ বছর পর হত্যার এক কুশীলব মেজর (অব.) মোজাফফরকে ঢাকা থেকে এরেস্ট করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে নিয়ে তার সাথে আর কে কে ছিল বের করার জন্য। আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্ত করে আসল ঘটনা বের করতে হবে। দেশের মানুষের অধিকার আছে মূল কালপ্রিটদের আইনের আওতায় এনে সঠিক বিচার করতে।
বিগত ৫৫ বছরে শেষ ১৬ বছর দাদাদের অত্যাচার ও দালালি বেড়ে যায়। শেখ হাসিনাকে অহরহ হস্তক্ষেপ করা ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। হাসিনার সময়ের আমলা ও সামরিক-বেসামরিক লোকদের দাদাদের প্রতি নরম করার জন্য মাঝেমধ্যেই পাশের দেশে নিয়ে মেয়েদের সাথে বিভিন্ন স্পর্শকাতর ছবি তুলে টাকার প্রলোভন দিয়ে তাদের কিনে নিয়ে বাংলাদেশকে করলগত করে রাখে।
দেশে সর্বক্ষেত্রে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা ক্ষেপতে থাকে। বৈষম্যবিরোধী কোটা আন্দোলনের মাধ্যমে আন্দোলন দিনে দিনে বাড়তে থাকে। অন্যদিকে স্বৈরাচার হাসিনা দেশে ইসলামী জনতাকে জঙ্গি বানাতে বিভিন্ন পন্থা নেয়। বিভিন্ন জায়গা থেকে চরিত্রবান লোকদের ধরে নিয়ে জেলখানায় দীর্ঘদিন আটকিয়ে রেখে দাড়ি-গোঁফ না কাটতে দিয়ে তাদের জঙ্গির চেহারায় রূপান্তরিত করে। যারা জেলে গেছেন, তাদের থেকে জানতে পারা যায় যে, এভাবে লোকদের জঙ্গি বানিয়ে পরে এক জায়গায় এনে সরাসরি যুদ্ধের ভান করিয়ে একদিকে ইসলামী লোকদের হত্যা করে; অন্যদিকে তাদের নিজস্ব মিডিয়া দিয়ে দেশে-বিদেশে প্রচার করে জঙ্গির বয়ান।
মহান আল্লাহ তায়ালার একটি গুণবাচক নাম হালিম অর্থাৎ ধৈর্যশীল। তাই বলে তিনি কাউকে ছেড়ে দেন না। স্বৈরাচার হাসিনা এত পাপ করেছিল যে, মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে শাস্তি দিয়েছেন। তাই দুপুরের খাওয়া বাদ দিয়েই হাসিনা তার দাদার দেশে চলে যায়। শুরু হয় দেশ গড়ার নতুন চিন্তাভাবনা। সেনাবাহিনীর একটি দলকে দিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা দেশের সব দল-মতের লোকদের ডেকে তাদের মতামত নেয় এবং শেষ পর্যন্ত ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি সরকার গঠন করে স্বৈরাচারের কর্মকাণ্ড তদন্ত করা, বিচার করা এবং একটি স্বচ্ছ নির্বাচন দিয়ে দেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ গড়ার ব্যবস্থা করে।
দেশের কূটনৈতিক অবস্থা হবে সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারোর সাথে শত্রুতা নয়। আবার কারো সাথে অতিবন্ধুত্বও নয়। এ বিষয়টি ভারতের দাদাদের পছন্দ হয়নি। অন্যদিকে স্বৈরাচার হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে দুনিয়ায় ভারত খুব ভালো অবস্থায় নেই। ইতোমধ্যেই ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে তার দেশের জনগণ ফুঁসে উঠেছে। সংসদ ভবন দখল করে তার পদত্যাগের দাবি করছে। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশেও মোদী বিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল বিজয়ী হওয়ায় গোটা দুনিয়ায় তার পরিচিত থাকায় বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াবার পথে আসে। কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে একদিকে আমেরিকার ব্লক; অন্যদিকে চীনের আধিপত্য ভারতের প্রভাব কমানো নিয়ে দিনের পর দিন স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার চেষ্টা চালায়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চারটি ব্রিগেডের নামকরণ করা হয়েছে- চার খলিফার নামানুসারে। আবুবকর, ওমর, আলী ও ওসমান রা.-এর নামে। আরো প্রস্তাব করা হয়েছে- দুটি মহিলা ব্রিগেডের নাম হযরত আয়েশা (রা.) ও খাদিজা (রা.)-এর নামানুসারে। যা প্রশংসনীয় এবং স্বাধীন সার্বভৌমত্বের লক্ষণ।
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হয়ে যায়। নির্বাচনের পূর্বে শহর-বন্দর, হাট-ঘাট, লঞ্চ-স্টিমার, ট্রেন-বাসে সব জায়গায় বিরানব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে ইসলামী জোয়ার দেখা যায়। শুধু তাই না, জামায়াত-শিবিরের প্রতি ছাত্র-জনতা আগ্রহ বেড়ে যায়। গত জোট সরকারের সময় দুজন মন্ত্রী শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ৫ বছর ৩টি মন্ত্রণালয় দুর্নীতিমুক্ত অবস্থায় চালিয়ে দেখিয়ে গেছেন এ যুগেও দেশ দুর্নীতিমুক্তভাবে চালানো যায়। যদি দুর্নীতিমুক্ত লোক তৈরি করা যায়। অন্যদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এসেই ছাত্রদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে দেয়।
মহান আল্লাহ তায়ালা এখানেও তাঁর মোজেজা দেখিয়ে দেন। ডাকসুতে নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সমর্থিত প্যানেল জিতে যায়। এমনকি ছাত্রীদের রোকেয়া হলেও শিবির প্যানেল বিপুল ভোটে জিতে যায়। সরকার এবং যারা সরকারে যেকোনোভাবে যেতে চায়, তাদের মাথায় বাজ পড়ে। দেখতে দেখতে জাকসু, চাকসু, জকসু এবং রাকসু ছাত্রশিবির প্যানেল জিতে আসে। দেশে-বিদেশে ৯২% মুসলমানের দেশে ইসলাম বিজয়ের পূর্বাভাস দেখতে পায়। দেশি-বিদেশি গোয়েন্দারা চিন্তা করতে থাকে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জামায়াত সমর্থিত লোকেরা ভোটে জিতে আসবে। অন্যদিকে জনগণের ইচ্ছার বাইরে ভোটের সময় কোনো কারচুপির পদক্ষেপ নেয়া যাবে না। কারণ জামায়াত ভোটকেন্দ্র পাহারা দেবে। তবে ভোট হয়ে গেলেও ভোট গণনায় কারচুপি করতে হবে। জেতার ভোট হারের ভোটে গুণতে হবে আর ওপরের চাহিদা অনুযায়ী ভোট গণনার রেজাল্ট প্রচার করতে হবে, যা জামায়াতপন্থীরা বুঝে ওঠার আগেই রাতের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জামায়াতকে হারাতে হবে। যে কথা সেই কাজ- রাত ১২টার পর প্রচার মাধ্যমের হল দেওয়া শুরু হলো। ডিপস্টেটের নির্দেশনা অনুযায়ী। বিষয়টি উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান নিজেই বলে দিয়েছেন রাজসাক্ষী হিসেবে। জামায়াত মোট ১৬৮ সিটে এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত তালিকা দেখানো হলো শুধু ৬৮টি সিট জামায়াত পেয়েছে। এলাকায় এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তাড়াতাড়ি আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানকে জানানো হলো বিক্ষোভ থামান, না হলে গৃহযুদ্ধ লেগে যাবে। যেহেতু জামায়াত জোট দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পক্ষের শক্তি, তাই ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে নির্বাচনের ফল মেনে নেয়। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী হয়েও আমীরে জামায়াতের বাড়িতে গিয়ে হাজির হন এবং দেশের স্বার্থে সহযোগিতা চান। সবাই মিলেই আমরা দেশটাকে গড়তে চাই।
নির্বাচন হয়েছে, প্রায় ৫ মাস চলছে। সরকারি দল আগের সরকারের কায়দায়ই দেশ চালাতে চাইছে। কিন্তু বিরোধীদল বা জামায়াত জোট উদ্যোগ নিয়ে সংসদের ভেতরে গঠনমূলক সমালোচনা করছে। আবার দেশবিরোধী পদক্ষেপের জোর বিরোধিতা করছে সংসদে এবং রাজপথে।
৩৬ জুলাই চলছে। জুলাইয়ের প্রথমদিন থেকেই ২৪-এর জুলাইয়ে প্রতিদিন কী ঘটেছিল সবই মিডিয়ায় এবং রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনও পালন করছে। তবে সরকারি দলের কিছু লোকের কথাবার্তায় মনে হয়, ছলচাতুরী করে জুলাই সনদ ও গণভোটের দাবি মেনে নিয়েছিল, এখন আর দরকার নেই। অনেক নেতার সাথেই আমাদের পরিচয় আছে। তাই জনগণের সাথে প্রতারণা করে লাভ নেই। ছাত্র-জনতা এখন অনেক সচেতন এবং ডিজিটাল যুগে কারো গোপন চাঁদাবাজি, দুর্নীতি কোনোটাই আর ফাঁকি দেয়া যাচ্ছে না। তাই সোজা পথে চললেই দলের লাভ, দেশের লাভ। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় মানা ছাড়া দেশ ভালোভাবে চালানো যাবে না।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কূটনৈতিক যোগাযোগে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। মালয়েশিয়া ও চীন সফর স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ, চীন, মিয়ানমার হয়ে করিডোর দেশের অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক অনুকূল। এদিকে সৌদি আরব থেকেও প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত দিয়েছে সৌদি রাষ্ট্রপ্রধান, আবার সৌদি যুবরাজও বাংলাদেশ সফরের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এ এক কূটনৈতিক বিজয়। সৌদির সাথে আমাদের রয়েছে আত্মার সম্পর্ক। কাবা ও মদিনা আমাদের আধ্যাত্মিক সম্পর্কের বিষয়। আবার সৌদিতে আমাদের অনেক লোক চাকরি করে। আরো কীভাবে এই সুযোগ কাজে লাগানো যায়, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। সৌদি আরবে আমাদের আমদানি ও রফতানিও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে আমেরিকায়। আবার প্রতিবেশী দেশের নতুন দূত এসেই অখণ্ড ভারতের আভাস দেওয়ায় জনগণ ভালোভাবে নেয়নি। সবই আমাদের কূটনীতির কথা। আমরা সবার সাথে বন্ধুত্ব চাই। কারো সাথে শত্রুতাও নয় আবার বেশি মাখামাখিও নয়। সবই হবে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের আলোকে। বর্তমানে আমাদের সেনাপ্রধান তুরস্কে সরকারি সফরে আছেন। তুরস্ক আমাদের দেশে ড্রোন কারখানা করার উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে তুরস্ক এখন মুসলিম দুনিয়ায় অঘোষিত নেতা প্রেসিডেন্ট এরদোগান। আমরা তার দীর্ঘায়ু এবং সুস্থতা কামনা করছি।
১১ দলের নেতারা কয়েকটি বিভাগে জনসভা করেছেন। জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দৃপ্ত শপথ নিয়েছে লাখো জনতার উপস্থিতিতে। সরকারি দল ও বিরোধীদলের প্রতি কায়মনে আবেদনÑ আর হানাহানি, বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা নয়। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে আমরা উভয়কেই ছাড় দিয়ে কথা বলব। শুধু খোঁচা দেয়ার জন্য নয়, ২০ কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন দেখতে চাই সংসদে এবং সংসদের বাইরে। আমাদের তরুণ জনসম্পদ কিন্তু অনেক সচেতন, নারীরাও সচেতন। বলা হতো ইসলাম নারীদের ঘরে আবদ্ধ করে রাখবে। কিন্তু এবারে সংসদে হিজাব পরা বা না পরা মুখ ঢেকে কীভাবে সংসদে ভূমিকা রাখা যায়, তার কিছু প্রমাণ হয়ে গেছে। সামনে আরো আছে। আল্লাহর শেষ নবীর সাথে যুদ্ধেও মহিলারা অংশগ্রহণ করে। তার প্রতিফলন আমাদের সংসদে যোগ্যতার সাথে মহিলারা ভূমিকা রাখছেন। দেশ সবার, তাই দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সাথে কোনো আপস নাই। ভয় পাবো শুধু মহান আল্লাহকেই। সাহায্য চাইবো শুধু আল্লাহর কাছে। তিনিই উত্তম সাহায্যকারী।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।