গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের বিদায় নিশ্চিত করা হবে
১৫ জুলাই ২০২৬ ১৩:৫৬
স্টাফ রিপোর্টার : বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বৈষম্য দূর করে বাংলাদেশের পচা রাজনীতিকে বিদায় জানিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়তে আমাদের সন্তানরা লড়াই করেছিল। সেই নতুন বাংলাদেশ গড়ার উদ্দেশ্যে গণভোট হয়েছে। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের বিদায় নিশ্চিত করা হবে। আমরা আজ এই শপথ নিলাম।
গণরায় বাস্তবায়ন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, সীমান্ত হত্যা ও পুশইন বন্ধ এবং জনদুর্ভোগ নিরসনের দাবিতে গত ১১ জুলাই শনিবার বিকেলে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে গণভোটের ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে রায় চেয়েও তা রক্ষা করেননি। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করার দাবি থেকে আমাদের সরিয়ে নিতে বিভিন্নভাবে বলা হচ্ছে। আমাদের পরিষ্কার কথা, আমরা জাতির সাথে বেঈমানি করব না। আমরা কথা দিচ্ছি, লড়াই আমরা করে যাবো, আমরা গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বাধ্য করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ। এর থেকে একচুলও আমরা সরব না।
তিনি আরও বলেন, তিস্তা এ অঞ্চলের মানুষের দুঃখ। তিস্তা নিয়ে বাজেটে দশ টাকারও কোনো বরাদ্দ নেই। আমরা আর কথার ফুলঝুরি শুনতে চাই না। তিস্তা নিয়ে আমরা বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চাই। সরকার যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে আগামীতে ১১ দলীয় ঐক্য ভোটে জয়লাভ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি পূরণ করবে, ইনশাআল্লাহ। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে, কোনো ধানাই-পানাই শুনতে চাই না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকায় সুরসুরি দিচ্ছে প্রতিবেশি দেশ ভারত। সরকার মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। আমরা জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতিবাদ করছি। বিজিবির সাথে সমানতালে জনগণ লড়াই করে যাচ্ছে। সংগ্রামী বীরদের আমরা অভিনন্দন জানাই। দুঃখজনক, সরকারের মুখ থেকে এখন পর্যন্ত একটি শব্দও আসেনি। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনগণের আকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন না। নিলে কী হয়, তা সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকে সবারই ছবক নেয়া উচিত।
আমীরে জামায়াত বলেন, আমরা নির্বাচনের আগে বলেছিলাম নির্বাচিত হলে রংপুর বিভাগকে কৃষির রাজধানী বানাবো। বর্তমান সরকারও সংসদে এ কথা বলছে। কৃষিভিত্তিক রাজধানী নিয়ে মহাপরিকল্পনা নিতে হবে। এ অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ আলু উৎপাদন হয়। আলু হিমাগারে রাখতে গেলে বস্তা প্রতি ৬০০ টাকা দিতে হয়। এটা জুলুম ও অন্যায়। এটা বন্ধ করতে হবে। ন্যায্য দামে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আলুসহ যেসব পণ্য উৎপাদন হয়, তারও ন্যায্যমূল্য কৃষকদের পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জনগণ চাঁদাবাজি করে না। দ্রব্যমূল্য নিয়ে জনগণ অস্থির। সরকারের মাথায় এগুলো ঢোকে না। কারণ যারা চাঁদাবাজিতে লিপ্ত, তারা জনগণের দুঃখ কেমনে বুঝবে?
আমীরে জামায়াত বলেন, সব দুর্নীতিবাজরা ইঞ্জিনিয়ারিং করে আমাদের হারিয়ে দিয়েছে। এ সুযোগ আর জনগণ তাদের দেবে না। আগামীতে ১১ দলীয় ঐক্য ন্যায় ইনসাফের ভিত্তিতে সরকার গঠন করতে পারলে চাঁদাবাজদের সহ্য করা হবে না, দুর্নীতিবাজদের ছেড়ে কথা বলা হবে না; স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী হলেও না। তাকেও বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
দেশের প্রতি হুমকি-ধমকির বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, দেশ আমাদের। এদেশের একটি বালুতেও কাউকে কর্তৃত্ব করতে দেবো না। যারা হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন, তাদের বাংলাদেশকে এভাবে মূল্যায়ন না করার আহ্বান জানান আমীরে জামায়াত। তিনি বলেন, জুলাইতে আমাদের শিশু-নারী-পুরুষ ও বয়স্করা ভূমিকা রেখেছে। আমাদের দেশের সকল মানুষ জীবন্ত শহীদ।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পুলিশের সবাই অপরাধী নয়। তবে জুলাইতে যারা অপরাধ করেছে তাদের বিচার ভুলিয়ে দেয়ার জন্য একদল উঠেপড়ে লেগেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা অপরাধ করেছে, শাপলা গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড, আয়নাঘর, গুমসহ সকল হত্যাকাণ্ড ও অপরাধের বিচার করতে হবে। তা করতে না পারলে ব্যর্থতার দায় নিয়ে সরকারকে ক্ষমতা ছাড়ার আহ্বান জানান তিনি। পরবর্তী সরকার এসে বিচার করবে বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন বিরোধীদলীয় নেতা। কোনো আধিপত্যবাদীর কাছে আমরা মাথা নত করব না।
আমীরে জামায়াত আরও বলেন, আমরা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ব। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের বিদায় নিশ্চিত করা হবে- আজ আমরা এই শপথ নিলাম। ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক। যুবকদের জেগে ওঠার আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান।
কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীরবিক্রম ভারতের উদ্দেশে বলেন, আপনাদের দাসী আপনাদের কাছে চলে গেছে। এখন তো দাসী এখানে নেই। আমরা আপনাদের দাসী নই। যদি বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক করতে চান, কাঁটাতারের বেড়া উঠিয়ে নিন। পুশইন বন্ধ করুন। আর কখনো বলবেন না, রংপুর দখল করে নেব। আপনারা যখনই বলবেন, ‘রংপুর দখল করব’, আমরাও বলব, ‘কলকাতা দখল করব।’ আগের দিন শেষ। এখন দাসীদের দৌরাত্ম্য বাংলাদেশে নেই। এই দাসীরা আর কখনো বাংলাদেশে আসতে পারবে না। আমাদের দেশে কেন প্রত্যেক দিন পুশইন করছেন? আমরা কেন ফারাক্কার পানি পাচ্ছি না? তিস্তায় পানি পাচ্ছি না? আমাদের যে অভিন্ন নদীগুলো আছে, সেগুলো থেকে পানি কেন আসছে না?
তিনি বলেন, আমরা আজকে এখানে কেন একত্রিত হয়েছি জনগণের ক্ষমতা জনগণকে ফিরিয়ে দিয়ে মানবতার বাংলাদেশ, সুশাসনের বাংলাদেশ এবং শান্তি-সুখের বাংলাদেশ গড়ে তোলা জন্য। যেখানে চাঁদাবাজি থাকবে না, অন্যায় থাকবে না, অবিচার থাকবে না। মানুষ নিজ নিজ কর্মকাণ্ড নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করবে। আমরা মানবতার বাংলাদেশ চাই।
নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে রংপুরে এসেছি। বিএনপির ইতিহাস প্রতারণার ইতিহাস। বিএনপি সকল গণঅভ্যুত্থানের সুবিধাভোী। বিএনপি যে জুলাই সনদের কারণে ক্ষমতায় এসেছে, সেই জুলাই সনদ ও গণতন্ত্রের সাথে প্রতারণা শুরু করেছে।
তিনি আরও বলেন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে হবে। পুশইন বন্ধ করতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশের জনগণ আপনাদের ক্ষমতায় থাকার ম্যান্ডেট দেবে না। দলের আদর্শবিরোধী কাজের সমালোচনা করে বিএনপির জাতীয়তাবাদী শব্দটি ফেলে দেয়ারও আহ্বান জানান তিনি। জুলাইয়ের শহীদরা আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে দেশের সংস্কারের জন্য।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা ফাঁসির দড়ি প্রস্তুত রেখেছি। তিনি দেশে আসলে তাকে ফাঁসির রশিতে ঝুলতে হবে বলেও উল্লেখ করেন এনসিপির আহ্বায়ক। দিল্লিকে স্পষ্ট মেসেজ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর মহানগর জামায়াতের আমীর মাওলানা এটিএম আযম খান, মহানগর সেক্রেটারি আনোয়ারুল হক কাজল, রংপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা এনামুল হক এবং রংপুর মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আল আমিন হাসানসহ ১১ দলীয় ঐক্যের স্থানীয় নেতাদের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমীর আল্লামা আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব মো. আখতার হোসেন এমপি, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল পরিচালক মাওলানা আবদুল হালিম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) জেনারেল সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মজলুম জননেতা মো. দেলোয়ার হোসেন।
এছাড়া রংপুর বিভাগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সসদ্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল এমপি, গোলাম রব্বানী এমপি, মাওলানা আব্দুস সাত্তার এমপি, আব্দুল করিম সরকার এমপি, ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী এমপি ও রায়হান সিরাজী এমপি। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মাওলানা মমতাজ উদ্দিনসহ রংপুর বিভাগের বিভিন্ন আসন থেকে জামায়াতের নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ, রংপুর বিভাগের জামায়াতের জেলা আমীরগণ, ১১ দলের জেলা ও মহানগর নেতাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কেন্দ্রীয়, বিভাগীয় ও স্থানীয় নেতারা।