বন্যার্তদের মাঝে জামায়াতের ত্রাণ বিতরণ

বন্যা-পাহাড় ধসে বিপর্যস্ত কক্সবাজার, ৩১ মৃত্যু


১৫ জুলাই ২০২৬ ১৩:৫৩

কক্সবাজার সংবাদদাতা : টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, বন্যা ও পাহাড় ধসের কারণে টানা আট দিন ধরে দুর্বিষহ জীবন পার করছেন কক্সবাজারের প্রায় তিন লাখ মানুষ। ঘটেছে প্রাণহানিও। জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে। সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, কৃষি ও জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এমন বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে জামায়াতসহ বিভিন্ন সংগঠন দুর্গতদের সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।
গত ৫ জুলাই রোববার থেকে ১৪ জুলাই মঙ্গলবার এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী জেলার বিভিন্ন স্থানে পানিতে ডুবে ও পাহাড় ধসে অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ১১ জুলাই শনিবার জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে পানি থাকলেও কিছু এলাকায় ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে। গত রোববার পুনরায় বৃষ্টি শুরু হলে আবার পানি বাড়তে থাকে। যার ফলে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো জলাবদ্ধ রয়েছে।
এদিকে টানা ভারী বর্ষণে পাহাড় ধস ও পানিতে ভেসে গিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কক্সবাজার শহরে পাহাড় ধসে এক নারী, পেকুয়া উপজেলায় ১৯ মাস বয়সী এক শিশু এবং রামু উপজেলায় পানিতে ভেসে নিরঞ্জন নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
সর্বশেষ গত ১২ জুলাই রোববার দুপুরে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে রসুলাবাদ এলাকার আবদুল মালেকের মেয়ে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২) মারা যায়। এ ঘটনায় তার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এর আগের দিন গত ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার বিকেলে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে মারা যায় স্থানীয় সুলতান আহমদের দুই বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ওয়াকিম। একই দিন সকালে বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকার আরিফুল ইসলামের তিন বছর বয়সী ছেলে পুষ্পর মৃত্যু হয়। এছাড়া ভোরে চকরিয়ার মছনিয়াকাটা এলাকায় পাহাড় ধসে বসতঘরের ওপর মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু হয়। এর বাইরে কক্সবাজার সদর, পেকুয়া এবং উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ আরও ২১ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, বন্যায় জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলা। এছাড়া কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও এখনো পানির নিচে রয়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম বলেন, বান্দরবান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানি কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চল থেকে পানি নামতে আরও সময় লাগবে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মাতামুহুরী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় এক লাখের বেশি মানুষ এখনো পানিবন্দি। ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্গত মানুষ অবস্থান করছেন। তাদের জন্য শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ মেরামত এবং পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদে রহমান জানান, সরকারি হিসেবে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজারে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। তাদের মধ্যে ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১৪ হাজার ৬১ জন। তবে স্থানীয় প্রশাসনের হিসাবে পানিবন্দি মানুষের প্রকৃত সংখ্যা প্রায় তিন লাখ।
তিনি জানান, দুর্গত মানুষের সহায়তায় সরকারিভাবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু রয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান বলেন, শুক্রবার রাত পর্যন্ত গত ছয় দিনে জেলায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিনও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন করে পাহাড় ধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর-৩ বহাল রয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান জানান, বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে। প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবীরা যৌথভাবে দুর্গত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া এবং ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিতে কাজ করছে।
বন্যার্তদের জামায়াতের ত্রাণ সহায়তা
বন্যাদুর্গতদের মাঝে ব্যাপক উপহারসামগ্রী নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির। কক্সবাজার জেলার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাদ্যসামগ্রী সহায়তা নিয়ে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও চট্টগ্রাম অঞ্চল পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহানের নেতৃত্বে কক্সবাজার জেলা জামায়াতের আমীর ও উখিয়া-টেকনাফ আসনের সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী মাওলানা নুর আহমেদ আনোয়ারী, কক্সবাজার শহর আমীর ও চকরিয়া-পেকুয়া আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আব্দুল্লাহ আল ফারুক, কক্সবাজার সদর আসনের সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ভিপি শহিদুল আলম বাহাদুর, কক্সবাজার জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আবু তালহার নেতৃত্বে নেতা কর্মীরা বন্যাদুর্গত মানুষের ঘরে ঘরে উপহার সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে। এছাড়া দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী-কুতুব দিয়া উপজেলায় পাহাড় ধস ও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত এলাকায় কক্সবাজার জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক আবু তাহের চৌধুরী ও শহর জামায়াতের সাংগঠনিক সেক্রেটারি কামরুল হাসানের নেতৃত্বে মহেশখালী উপজেলায় পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে নগদ অর্থ সহায়তা বিতরণ করেছেন। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ দেশের বাইরে থাকলেও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন এবং নেতাকর্মীদের দুর্গত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তার নির্দেশে মহেশখালী-কুতুবদিয়ায় জামায়াতের স্থানীয় নেতারা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে ব্যাপক ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করে যাচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন দুর্গত এলাকার মানুষের মাঝে ব্যাপক ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছেন।
গত ১২ জুলাই রোববার নতুন করে নির্মিত বাঁধ ভেঙে মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটায় জোয়ারের পানিতে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। এতে ধলঘাটার মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে বেড়িবাঁধ নির্মাণ না করলে ধলঘাটার মানুষ উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।