জুলাই বিপ্লবের সূতিকাগার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা ও প্রতিরোধের এক অনন্য আখ্যান


১৫ জুলাই ২০২৬ ১৩:৫২

জাবের আব্দুল্লাহ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় : ঢাকার অদূরে সবুজে ঘেরা সাভারের প্রায় ৬৯৭.৫৬ একরের ক্যাম্পাসটি কেবল দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, বরং মুক্তবুদ্ধি চর্চা, উচ্চতর গবেষণা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন প্রতিরোধের এক জীবন্ত প্রতীক। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত স্বায়ত্তশাসিত এই বিদ্যাপীঠ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) তার নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের পাশাপাশি চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এক অদম্য ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে নতুন করে নজর কেড়েছে পুরো দেশের।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান : প্রতিরোধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ৩৬ দিনে (১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ও রণকৌশলগত কেন্দ্র। সারা দেশে যে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল, সেই নামটির প্রথম প্রস্তাবনা ও সূত্রপাত হয়েছিল জাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক আলোচনা থেকেই।
সূচনা পর্ব ও ‘বাংলা ব্লকেড’
৫ জুনের হাইকোর্টের রায়ের পর প্রথম দফায় বিক্ষোভ হলেও ১ জুলাই ক্যাম্পাস খোলার পর জাবিতে আন্দোলন পুরোদমে গতি পায়। ৪ জুলাই গঠিত হয় জাবির সমন্বয়ক কমিটি। ৭ জুলাই সারা দেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হলে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের আগেই বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে জাবি শিক্ষার্থীরা, যা ছিল দেশের প্রথম ব্লকেড। এরপর টানা কয়েকদিন পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে মহাসড়ক দখলে রাখে তারা। ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিতর্কিত মন্তব্যের পর ক্যাম্পাসে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
দেশের প্রথম ‘ছাত্রলীগমুক্ত’ ক্যাম্পাস
১৫ জুলাই বিকেলে কোটা সংস্কারের দাবিতে বের হওয়া শান্তিপূর্ণ মিছিলে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল বর্তমানে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক হলের সামনে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এতে শিক্ষক, নারী শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকসহ অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন।
বিচার ও নিরাপত্তার দাবিতে রাত ৯টায় শিক্ষার্থীরা ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। রাত ১২টার দিকে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক নূরুল আলমের বাসভবনে আশ্রয় নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর আবারও নৃশংস হামলা চালায় ছাত্রলীগ। পেট্রোলবোমা, ছররা গুলি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে অবরুদ্ধ শিক্ষার্থীরা যখন জীবনসংকটে, তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই লাইভ ভিডিও দেখে রাত ২টার দিকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা দলে দলে লাঠিসোঁটা হাতে হল থেকে বেরিয়ে আসেন।
শিক্ষার্থীদের সেই প্রবল ও ঐতিহাসিক প্রতিরোধের মুখে ১৫ জুলাই দিবাগত রাত ৩টার (১৬ জুলাই প্রথম প্রহর) মধ্যে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। এর মাধ্যমে সারা দেশের মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রথম ‘ছাত্রলীগমুক্ত’ ক্যাম্পাস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর প্রায় ১৩ ঘণ্টা পর পরদিন বিকাল ৪টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগমুক্ত হয়েছিল।
তৎকালীন সমন্বয়ক ও বর্তমানে জাকসু ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা ভিসির বাসভবনে আটকা পড়ে প্রাণঘাতী হামলার শিকার হলে রাত প্রায় ২টার দিকে সব হল থেকে শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে আসে। তারা তৎকালীন আওয়ামী সরকারের পোষা কুক্ষিগত শক্তি ও পুলিশকে দাঁতভাঙা জবাব দেয়। যার ফলে ক্যাম্পাস ছাত্রলীগমুক্ত হয়।’
‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
১৬ জুলাই ক্যাম্পাস পরিণত হয় ২০ হাজার মানুষের জনসমুদ্রে। সাভারের আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এসে জাবির সাথে একাত্ম হন। ১৭ জুলাই জরুরি সিন্ডিকেট ডেকে হল খালি করার নির্দেশ দিলে শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। বিকেলে ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার শেল ও ছররা গুলি চালালে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। এরপর ১৮ জুলাই থেকে শুরু হয় ‘কমপ্লিট শাটডাউন’। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ও সংলগ্ন ইসলামনগর, গেরুয়া ও আমবাগান এলাকায় অবস্থান নিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যে অফলাইনে যোগাযোগ রক্ষা করে স্থানীয় জনতা, গার্মেন্টস শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে আন্দোলন টিকিয়ে রাখা হয়। ২৬ জুলাই সমন্বয়ক আরিফ সোহেলকে ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করলেও আব্দুর রশীদ জিতু, আলিফ মাহমুদ, হাসিব জামানদের নেতৃত্বে আন্দোলন চলতে থাকে।
অনন্য প্রতিবাদ : দেয়ালে দেয়ালে প্রতিরোধ
১ আগস্ট জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অভূতপূর্ব প্রতিবাদী গানের মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। একই দিনে এক ঐতিহাসিক ও সাহসী পদক্ষেপ নেন জাবির বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা। তিনি নিজ কার্যালয় থেকে শেখ হাসিনার ছবি নামিয়ে ফেলেন। পরবর্তীতে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে অধ্যাপক শামীমা সুলতানা বলেন, ‘আমার শিক্ষার্থীরা আমার সন্তানের মতো। যার হাতে আমার সন্তানের রক্ত, তার ছবি আমার দেয়ালে থাকতে পারে না। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছে, তিনি আর ওই পদে থাকার যোগ্য নন।’
৫ আগস্টের লংমার্চ ও চূড়ান্ত বিজয়
৫ আগস্ট ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে জাবি ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, স্থানীয় জনতা ও গার্মেন্টস শ্রমিকসহ প্রায় ২০ হাজার মানুষের একটি বিশাল মিছিল ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। সাভার এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে জাবির মিছিলে সংহতি জানাতে আসা আশুলিয়ার শ্রাবণ গাজী নামে এক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
পুলিশের বাধার মুখে শিক্ষার্থীরা শহীদ শ্রাবণের লাশ নিয়ে পুনরায় ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন এবং কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে তার জানাজা সম্পন্ন হয়। ওই দিনই বিকেলে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের খবর এলে পুরো ক্যাম্পাস ও সাভার এলাকা উল্লাসে মেতে ওঠে।
ইতিহাসের পাতায় জাবি অমলিন
জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা) নাহিদ ইসলাম জাবি ক্যাম্পাসে এসে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘আন্দোলনের সময় যখন আমরা মনোবল ও আশা হারিয়ে ফেলছিলাম, তখন জাহাঙ্গীরনগর আমাদের সাহস জুগিয়েছে।’
রক্তাক্ত ১৫ জুলাইয়ের ঘটনার তদন্ত শেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তীতে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে একাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং ২৮৯ শিক্ষার্থীকে বরখাস্ত ও বহিষ্কারের মাধ্যমে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। চব্বিশের এই গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানার্জনের স্থানই নয়, এটি সংকটে দেশের দিশারি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক দুর্ভেদ্য দুর্গ।
শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্রভূমি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় অন্যতম শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, কলা ও মানবিকের মতো নানা শাখায় এর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে। বর্তমানে জাবিতে ৩৬টি বিভাগ ও একাধিক বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট রয়েছে। কলা ও মানবিক, গাণিতিক ও পদার্থবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, বিজনেস স্টাডিজ এবং আইন অনুষদের অধীনে এখানে উচ্চতর শিক্ষা প্রদান করা হয়। ইনস্টিটিউটগুলোর মধ্যে আইবিএ-জাবি, আইআইটি এবং বঙ্গবন্ধু তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট অন্যতম।
গবেষণার আধুনিক দিগন্ত
এখানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে থিসিসের পাশাপাশি এম.ফিল ও পিএইচডি গবেষণার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণার জন্য রয়েছে অত্যাধুনিক ‘ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র’। এছাড়া স্থানিক তথ্য ও প্রযুক্তির জন্য ‘ইনস্টিটিউট অব রিমোট সেন্সিং অ্যান্ড জিআইএস’ এবং জীববিজ্ঞান অনুষদের অধীনে ‘ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’ ও ‘বাটারফ্লাই পার্ক’ অনন্য গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি বই এবং অফুরন্ত অনলাইন জার্নাল ব্রাউজিংয়ের সুবিধা রয়েছে। এখানকার লাল পদ্মের জলাশয়, অতিথি পাখি এবং উন্মুক্ত পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মননশীলতাকে সমৃদ্ধ করে।