মাওলানা ফরীদ উদ্দিন চৌধুরী : ইসলামী আন্দোলন ও জনকল্যাণের এক আলোকবর্তিকা
১৫ জুলাই ২০২৬ ১৩:৪৯
আবদুল বাছেত মিলন : সূরা মারইয়ামের ৯৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে, পরম দয়াময় আল্লাহ তাদের জন্য (মানুষের অন্তরে) ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন।’ পবিত্র কুরআনের এই শাশ্বত ও কালজয়ী বাণীর বাস্তব রূপ ছিলেন জননেতা অধ্যক্ষ মাওলানা ফরীদ উদ্দিন চৌধুরী (রহ.)। তিনি কেবল একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ বা সংসদ সদস্যই ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একাধারে বরেণ্য শিক্ষাবিদ, দূরদর্শী সফল উদ্যোক্তা এবং আপাদমস্তক একজন ‘দাঈ ইলাল্লাহ’। বিশেষ করে সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের মানুষের অধিকার আদায়, ইসলামী শিক্ষার বিস্তার এবং সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়নে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সুবাদে এই মহান কর্মবীরের অত্যন্ত সান্নিধ্যে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তার আকস্মিক বিদায়ের পর, হৃদয়ের মণিকোঠায় জমে থাকা কিছু অমূল্য মুহূর্ত ও ঐতিহাসিক সত্যকে ইতিহাসের পাতায় তুলে ধরা কর্তব্য বলে মনে করছি।
প্রথম দর্শনে আত্মিক টান : এক মোহনীয় বাগ্মী
মাওলানা ফরীদ উদ্দিন চৌধুরী (রহ.)-এর সাথে আমার প্রথম পরিচয়ের মুহূর্তটি ছিল এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। তৎকালীন সময়ে আঞ্জুমানে খেদমতে কুরআনের তাফসিরুল কুরআন মাহফিলে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। মঞ্চে যখন তিনি এসে দাঁড়ালেন এবং অত্যন্ত চমৎকার, প্রাঞ্জল ও সাবলীল ভাষায় কুরআন ও হাদিসের আলোকে আলোচনা শুরু করলেন, তখন পিনপত্তন নীরবতায় পুরো প্যান্ডেলের মানুষ আবিষ্ট হয়ে পড়েছিল। তার সেই তেজস্বী অথচ হৃদয়স্পর্শী বাচনভঙ্গি, যুক্তিপূর্ণ উপস্থাপন এবং গভীর জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য প্রথমবারেই আমার অন্তরে এক গভীর ভালোবাসার জন্ম দেয়; বলা চলে, আমি তার আদর্শের একনিষ্ঠ অনুরাগী হয়ে পড়ি। তার শুদ্ধ বাংলায় দেওয়া বক্তব্যগুলো শুনলে মনে হতো, যেন প্রখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মাহফিলের প্যান্ডেলে এক জান্নাতি পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তার সেই অনন্য দাওয়াতি চেতনা আমার জীবনের গতিপথ ও চিন্তাভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
সিলেট ও ৫-আসনে ঐতিহাসিক অবদান
সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে অধ্যক্ষ মাওলানা ফরীদ উদ্দিন চৌধুরী যে উন্নয়ন ও সততার নজির স্থাপন করে গেছেন, তা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ছিলেন এক বিশ্বস্ত ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
ইসলামী শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান
তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, একটি নৈতিকতাসম্পন্ন সমাজ গঠনে ইসলামী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যেই তিনি সিলেটের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দীনি বিদ্যাপীঠ শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল (স্নাতকোত্তর) মাদরাসা, পাঠানটুলার রেক্টর ও গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। এছাড়া কানাইঘাটের ঐতিহ্যবাহী ইউসুফিয়া ফাজিল মাদরাসাসহ জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য স্কুল, মাদরাসা ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা ও সংস্কারে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জনকল্যাণ
সংসদ সদস্য থাকাকালীন গ্রামীণ জনপদের রাস্তাঘাট, কালভার্ট-সেতু নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। সুরমা-কুশিয়ারা ডাইক বা নদী রক্ষা বাঁধ সংস্কারের মাধ্যমে এই অঞ্চলের কৃষকদের বন্যা ও ফসলি ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষায় তিনি জাতীয় সংসদে অত্যন্ত জোরালো ও কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন।
আধুনিক সিলেটের বাণিজ্যিক রূপকার
তিনি কেবল ধর্মীয় বা রাজনৈতিক গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং তাঁর আধুনিক ও দূরদর্শী চিন্তার এক বাস্তব স্মারক হলো সিলেটের প্রথম অত্যাধুনিক ও বহুতল শপিং কমপ্লেক্স ‘আল-হামরা শপিং সিটি’। তারই অনন্য প্রচেষ্টা, সাহস ও দিকনির্দেশনায় এই বৃহৎ বাণিজ্যিক কেন্দ্রটি গড়ে ওঠে, যা সিলেটের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
শেষ দেখা ও অন্তিম স্মৃতি
জীবনসায়াহ্নে এসেও ইসলামের কল্যাণ এবং মানুষের খোঁজখবর নেওয়ার ব্যাপারে তার যে ব্যাকুলতা ছিল, তা আমার জীবনের শেষ দেখায় গভীরভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছিল। প্রখ্যাত আলেম শায়েখ ইসহাক আল মাদানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ইন্তেকালের অল্প কিছুদিন পর হযরতের শেষ বিদায়ের সেই স্মৃতি বুকে নিয়েই অধ্যক্ষ ফরীদ উদ্দিন চৌধুরীর সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎ ঘটে। দিনটি সাধারণ হলেও, সেই স্মৃতিটি আজ আমার কাছে এক বিশাল আমানত। তিনি ব্যক্তিগতভাবে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার গুণগ্রাহী ছিলেন। নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ নিতে তিনি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কুদরত উল্লাহ জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব, প্রখ্যাত হোমিও চিকিৎসক হাফিজ মাওলানা মিফতাহ উদ্দীন আহমদ সাহেবের চেম্বারে এসেছিলেন।
সেদিন চেম্বারে তার সাথে আমার বেশকিছু সময় নানামুখী আলাপ হয়। বিদায় নিয়ে যখন তিনি চলে যাবেন, আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও পরম মমতায় তার হাতটি ধরে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেলাম। গাড়িতে ওঠার আগে তিনি আমার দিকে তাকালেন- সেই চিরচেনা স্নেহমাখা দৃষ্টি! তিনি আমার সন্তান ও পরিবারের জন্য অত্যন্ত আন্তরিকভাবে মহান আল্লাহর দরবারে খাস দোয়া করলেন।
গাড়িতে বসা অবস্থাতেই তার সাংগঠনিক ও দাওয়াতি চেতনার এক অপূর্ব বহিঃপ্রকাশ ঘটল। তিনি আমাকে লক্ষ করে দীনি প্রচারণার অন্যতম হাতিয়ার সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকার প্রচার সংখ্যা (সার্কুলেশন) বৃদ্ধির জন্য কিছু মূল্যবান পরামর্শ দিলেন। অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শ্রদ্ধেয় মো. তাসনীম আলম ভাইসহ অন্যান্য দায়িত্বশীলদের বিস্তারিত খোঁজখবর নিলেন। একই সাথে সিলেটে ‘তা’লীমুল কুরআন’ ফাউন্ডেশনের সার্বিক কার্যক্রম কেমন চলছে, তারও বিস্তারিত বিবরণ শুনলেন।
সব শেষে তিনি আমার হাতটি ধরে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে নিজের জন্য দোয়া চাইলেন এবং মৃদুস্বরে বললেন, তার জীবনে কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে আমি যেন তাকে ক্ষমা করে দিই। একজন সাবেক সংসদ সদস্য এবং প্রবীণ জননেতার এই আকাশসম বিনয় ও নম্রতা দেখে আমার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছিল।
অধ্যক্ষ মাওলানা ফরীদ উদ্দিন চৌধুরী (রহ.) আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া কর্ম, সততা, সমাজসংস্কার এবং আদর্শ আমাদের মাঝে চিরকাল বেঁচে থাকবে। রাজনীতি যে ভোগের বস্তু নয়, বরং ইবাদত ও সমাজসেবার এক মহান মাধ্যম- তিনি নিজের জীবন দিয়ে তা প্রমাণ করে গেছেন।
হে আল্লাহ! আপনার এই মুখলিস বান্দাকে, ইসলামী শিক্ষা ও আন্দোলনের এই মহান পথিকৃৎকে জান্নাতুল ফেরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমাদের তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দীনের পথে অবিচল থাকার তৌফিক দান করুন।