মোশাররফ হোসেন খান-এর কবিতা

লাশের বিদ্রোহ


১৫ জুলাই ২০২৬ ১৩:৪২

লাল চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের এক এক করে দিন চলে যায়
মাস চলে যায়
বছর চলে যায়-
তবুও এখনো কত লাশ পড়ে আছে হিমঘরে, শনাক্তহীন।
তবুও অপূর্ণ রয়ে গেছে শহীদদের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা।

বিপ্লবীরা ঘরে ফিরে গেছে।
তাদের অনেকেই ব্যস্ত এখন ক্রেডিটবাজিতে।
কেউবা ব্যস্ত সুনাম সুখ্যাতি বিত্ত বৈভব নিয়ে।
কেউবা ব্যস্ত আত্মপ্রতিষ্ঠায়।
কেউবা ব্যস্ত পদপদবি নিয়ে।
কেউবা ব্যস্ত রাজ-রাজড়ার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হতে।
অনেকেই আবার নতুন রাজনীতির খোয়াড়ে জাবর কাটছে।
আগামীর রাজাধিরাজ যেভাবেই হোক হতেই হবে।

লাল চব্বিশের অগ্নিঝরা জুলাই —-
বিপ্লবীদের ডাকে যারা এসেছিল মিছিলে
যারা ছিল বিপ্লবীদের সাথী
মিছিলে মিছিলে
উদ্ধ্যত হাতগুলো
নতহীন মাথাগুলো
এখনো শনাক্তহীন পড়ে আছে মর্গে
হিমঘরে
দিনের পর দিন
মাসের পর মাস
বছর পার হয়ে যায়
তারা পড়ে আছে হিমঘরে
শনাক্তহীন।
এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে শহীদদের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা।

হে বাংলাদেশ!
এক আবু সাঈদের লাশের ভার ধারণ করতে পারোনি,
এতো শনাক্তহীন লাশের ভার সইতে পারবে কেমন করে?

লজ্জা এবং আত্মগ্লানির চপেটাঘাত
সইতে না পেরে
আমি এখন নিজের ভেতরেই নিজেকে লুকিয়ে রেখেছি।
রাতে ঘুমাতে পারি না।
ঢুলু ঢুলু তন্দ্রার ভেতর আচমকা
শনাক্তহীন লাশগুলো ঢুকে পড়ে হৃদয় গভীরে
ঢুকে পড়ে অকস্মাৎ শত শত শহীদ
মস্তিষ্কে, শিরা-উপশিরায়।
তাদের আর্তবিদারী চিৎকার—-
‘আমাদের শনাক্ত করার দায়িত্ব কার?
কার?
আমাদের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা পূরণ করার দায়িত্ব কার?’

তাদের কোনো জবাব দিতে পারি না আমি।
ঘুমের ভেতর ঘামতে ঘামতে কেবল ছুটতে থাকি…
ছুটতে থাকি নদী সমুদ্র পাহাড় টপকে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল।

দিন যায়
মাস যায়
বছর পার হয়ে যায় …
রক্ত উৎসর্গকারী বিপ্লবীরা এখনো পড়ে আছে
মর্গে,
হিমঘরে, শনাক্তহীন।
এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে শহীদদের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা।

নতুন বাংলাদেশ কি ঈগলের ডানার ভয়ে এখন
চড়ুইয়ের বাসায় আশ্রয় নিতে চায়!
না, জানি না ।
কিছুই জানি না।

হে শনাক্তহীন ভাই-বন্ধুরা,
হে অগ্নিশ্বাসী পাঁজর উৎসর্গকারী বিপ্লবীরা!
আমাকে ক্ষমা করো,
ক্ষমা করো আমার অক্ষমতাকে।
তোমাদের যারা হিমঘরে রেখে
তোমাদের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষাকে অপূর্ণ রেখে
স্বপ্নরাজ্যে ঘুরছে,
নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে
রাজপ্রাসাদের স্বপ্ন দেখছে …
পারলে কবর ও হিমঘর থেকে আবার তোমরা নতুন মিছিলের আহ্বান করো তাদের বিরুদ্ধে।
তাদের স্বার্থপরতার জবাব দাও
বিক্ষোভে বিক্ষোভে
মিছিলে মিছিলে
উদ্ধ্যত বাহুতে
গগনবিদারী স্লোগানের স্লোগানে।

হে নতুন বাংলাদেশ!
এখনো কেন হিমঘরে পড়ে আছে এতো লাশ, শনাক্তহীনে?
এখনো কেন অপূর্ণ রয়ে গেছে শহীদদের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা?
জবাব দাও!
জবাব দাও !
জবাব দাও!

যদি জবাব দিতে না পারো
তাহলে আবারও প্রস্তুত হও—-
মিছিলে মিছিলে
বিক্ষোভে বিক্ষোভে
কেঁপে উঠবে রাজপথ
গোটা বাংলাদেশ
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল।
বিপ্লবের অগ্নিশিখায় ভস্মীভূত হবে
সকল মীরজাফর
বিশ্বাসঘাতক!

যাদের রক্তের বিনিময়ে পেয়েছ অবাধ স্বাধীনতার স্বাদ,
তারা থাকবে মর্গে
হিমঘরে
শনাক্তহীনে,
শহীদদের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা অপূর্ণ থেকে যাবে,
আর তোমরা থাকবে রাজপ্রাসাদে
ভোগবিলাসে! …
না!
সেটা হতে পারে না কখনো।

অপেক্ষা করো,
এই হিমঘর থেকেই শুরু হবে
শহীদদের সকল কবর থেকেই শুরু হবে
তরঙ্গবাহী আর একটি অগ্নিবিপ্লব!
শনাক্তহীন লাশের বিদ্রোহ!
শহীদদের বিদ্রোহ!
বিদ্রোহ
বিদ্রোহ
শত শহীদের লাশের বিদ্রোহ!

অনিবার্য একটি বিদ্রোহ ও বিপ্লবের পর নির্মিত হবে
মানবিক
নতুন এক
সবুজ বাংলাদেশ…!

ইনকিলাব জিন্দাবাদ।