ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বদলে দেবে কুড়িগ্রামের চিত্র


১০ জুন ২০২৬ ২১:৩২

আমানুর রহমান খোকন, কুড়িগ্রাম : অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা উত্তরের জনপদ কুড়িগ্রাম। হাড়ভাঙা পরিশ্রমে জীবিকা মেলে এ এলাকার মানুষের। তবে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের আশা জাগিয়েছিল ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি। কিন্তু দীর্ঘ আশায় বুক বাধলেও অর্থনৈতিক অঞ্চলটির কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। কুড়িগ্রামের কয়েক লাখ মানুষ স্বপ্ন দেখছে এই প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলটি কবে চালু হবে। তারা স্বপ্ন দেখছে অর্থনৈতিক অঞ্চলের উজ্জ্বল সম্ভাবনা ও সাফল্যের।
সীমান্তঘেঁষা জেলা কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট বড় ১৬টি নদনদী। নদীর এ কূল ভাঙে তো ও কূল গড়ে। ভাঙা গড়ার খেলায় এ জেলার মানুষের ভাগ্যে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। বর্ষা মৌসুমে বন্যা আর শুষ্ক মৌসুমে খড়া। যার ফলে দেশের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দরিদ্র জেলায় পরিণত হয় কুড়িগ্রাম। ৯টি উপজেলা, ৩টি পৌরসভা এবং সাড়ে ৪০০ চর ও দ্বীপ চর রয়েছে এই জেলায়।
কুড়িগ্রাম জেলা শহরের এক কিলোমিটারের কাছেই রয়েছে ধরলা নদী। কুড়িগ্রামবাসীর ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য ধরলা নদীর ভোগডাঙ্গা ও পাঁচগাছী ইউনিয়নের মাধবরাম চরে ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির যৌথ পরিকল্পনা গ্রহণ করে বাংলাদেশ ও ভুটান সরকার। যার প্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ১০ ও ১১ মার্চ ভুটানের রাজা-রানি বাংলাদেশ সফরে আসেন এবং কুড়িগ্রামের ধরলা নদীর মাধবরাম চর পরিদর্শন করে চলে যান। এরই মধ্যে মাধবরাম মৌজার ১৩৩ দশমিক ৯২ একর খাস জমি অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নিকট হস্তান্তর করেছে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন। এখানে আরও ব্যক্তি মালিকানার ৮০ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন। কিন্তু ভুটানের রাজা-রানির বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জায়গা পরিদর্শনের দীর্ঘসময় অতিবাহিত হলেও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত জায়গায়টি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যক্রম কবে শুরু করা হবে সেই ক্ষণ গুনছে জেলার ত্রিশ লাখ মানুষ।
ধরলা পাড়ের আলু চাষি ও ব্যবসায়ী আসাদুজ্জামান বাবু বলেন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে ব্যবসার প্রসার ঘটবে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
কুড়িগ্রাম মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মো. আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, আমরা অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল থাকায় অন্য জেলার তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছি। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে আমরা আর্থিকভাবে সচ্ছল হবো এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে যাবো।
স্কুল শিক্ষক মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, আমরা চাই দ্রুত ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হোক। এতে আমরা জেলাবাসী কৃষি ক্ষেত্রে অধিক লাভবান হবো।
কুড়িগ্রাম আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা নুর বখত বলেন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশে ফজলুল করিম (র.) মাদরাসা আছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে জেলার অনেক উন্নয়ন হবে।
কুড়িগ্রাম জেলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, এই জেলায় তেমন কোনো কল কারখানা নেই। প্রতি বছর অনেক মানুষ শ্রমিকের কাজ করতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে থাকে। ধরলার পাড়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি সকলের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কুড়িগ্রাম জেলার সাবেক আহ্বায়ক মো. আব্দুল আজিজ নাহিদ বলেন, জেলার উন্নয়ন হলে দেশের উন্নয়ন হবে। আমাদের জেলায় কোনো কর্মক্ষেত্র নেই। একটি টেক্সটাইল মিল দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আমরা তা চালু করার ব্যবস্থা নিয়েও তেমন কোনো ভালো ফল পাইনি। আমরা কুড়িগ্রামে মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য দ্রুত অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাস্তবায়ন চাই।
জাতীয় নাগরিক পার্টির জেলা আহ্বায়ক মো. মুকুল মিয়া বলেন, আমরা নতুন বাংলাদেশের সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে একাত্মতা ঘোষণা করি। যত তারাতাড়ি সম্ভব অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাস্তবায়ন চাই।
কুড়িগ্রাম জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক মো. আজিজুর রহমান স্বপন বলেন, ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জায়গা হস্তান্তর করা হয়েছে অনেক আগেই। ভুটানের রাজা জায়গা পরিদর্শন করছেন। এখন এর বাস্তবায়ন করা জরুরি। অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে জেলায় অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বৃদ্ধি পাবে আয় রোজকার।
কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলহাজ মো. সোহেল হোসেন কায়কোবাদ বলেন, আমরা জেলাবাসীর উন্নয়নের স্বার্থে ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের দ্রুত বাস্তবায়ন চাই। এখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে জেলা তথা দেশ উপকৃত হবে। সেই সাথে স্থলবন্দর ও নৌবন্দর দুটিও ভালো চলবে।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানান, বেজার নিকট জমি হস্তান্তর করা হয়েছে। পরবর্তী নিদের্শনার অপেক্ষায় আছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সকল কার্যক্রম। ধরলা নদীর মাধবরাম চরে ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে সবাই উপকৃত হবে।