সরকার গণভোটের রায় নিয়ে প্রতারণা আর উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈষম্য করছে – মিয়া গোলাম পরওয়ার


১৫ মে ২০২৬ ২১:৩৮

সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা : সরকার গণভোটের রায় নিয়ে যেমন প্রতারণা করছে, তেমনি উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য করছে। একইসাথে গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে জনমতকে দাবিয়ে রাখার অপচেষ্টাও চালাচ্ছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পারোয়ার এমন মন্তব্য করেছেন। গত শনিবার (৯ মে) সকাল সাড়ে ৮টায় সৈয়দপুর বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, প্রবাদ আছে যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। এখন তা বাস্তবে দেখছি। বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তাই ৭০ ভাগ জনমতকে উপেক্ষা করে প্রতারণায় মেতে উঠেছে।
তারা শুধু দেশবাসীর সাথেই প্রতারণা করছে না, বরং নিজের সাথেও করছেন। কারণ নির্বাচনের আগে তারা হ্যাঁ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং ভোটও দিয়েছেন। এখন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবেন বললেও গণভোটের রায় মানছেন না। এটাই মহা প্রতারণা। এভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।
জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, আমরা সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের বিরোধিতা বা আপত্তি করি না, বরং উৎসাহিত করি। কিন্তু উন্নয়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতা বা সরকার দলীয় এমপিকে প্রাধান্য দেওয়াকে গ্রহণযোগ্য মনে করি না, বরং, ন্যায্যতা ও সাম্যতার ভিত্তিতে উন্নয়ন করতে হবে।
সরকার এক্ষেত্রেও চরম বৈষম্য শুরু করেছে। বিএনপির নির্বাচিত তাই একটা এলাকায় একাধারে সিটি করপোরেশন, নতুন উপজেলা সৃষ্টি, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করা হচ্ছে। অথচ সার্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এসব উন্নয়ন ভিন্ন ভিন্ন স্থানে হওয়া উচিত।
সেই ধারাবাহিকতায় সৈয়দপুর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক করা সবচেয়ে যৌক্তিক। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এতে উত্তরাঞ্চলের আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে প্রকৃত উন্নয়ন সাধিত হবে, যা অবহেলিত বৃহত্তর রংপুর দিনাজপুর এলাকাকে সমৃদ্ধ করবে। এটাই এ অঞ্চলের জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি এবং অধিকারও বটে।
তিনি আরও বলেন, এমন জনদাবিগুলো উপেক্ষা করা কখনোই কল্যাণকর নয়। বিএনপি যেভাবে সব জনস্বার্থ নিয়ে ব্যাকপাস খেলছে তাতে উল্টো গোল খাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে, যা বিএনপিই শুধু নয় দেশের জন্যও ক্ষতিকর হিসেবে দেখা দেবে।
তারা ফ্যাসিস্ট আমলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতা নিয়ে আন্দোলন করলেও এখন সেই আত্মঘাতী ধারায় অনেক গণমাধ্যমকে কুক্ষিগত করে বেপরোয়াভাবে চাকরিচ্যুত করাসহ সংবাদ কর্মীদের নির্যাতন করা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা জনগণের পক্ষ নিয়ে সরকারের ভুল কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কাজ করছেন তাদের টার্গেট করে হেনস্তা করা হচ্ছে।
এর আগে তিনি ঢাকা থেকে ইউএস বাংলা এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে সৈয়দপুরে এসে পৌঁছান। তার সফর সঙ্গী হিসেবে এসেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা আবদুল হালিম, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি এডভোকেট আতিকুর রহমান ও সহ-সভাপতি গোলাম রব্বানী।
বিমানবন্দরে তাদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানান, নীলফামারী-৪ আসনের এমপি হাফেজ মাওলানা আব্দুল মুনতাকিম, নীলফামারী জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আন্তাজুল ইসলাম, জেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি মনিরুজ্জামান জুয়েল। পরে তারা পঞ্চগড়ের উদ্দেশে রওনা হন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সৈয়দপুর উপজেলা আমীর শফিকুল ইসলাম, সেক্রেটারি আলহাজ মাজহারুল ইসলাম, শহর আমীর শরফুদ্দিন খান, সেক্রেটারি মাওলানা ওয়াজেদ আলী, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সৈয়দপুর শহর সভাপতি আব্দুল মোমিনসহ শতাধিক নেতাকর্মী।
সরকার কর্তৃত্ববাদী একদলীয় পথে হাঁটছে
ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ কর্তৃত্ববাদী একদলীয় পথে হাঁটছে। একটি ইলেকটেড সরকার এসে সিলেক্টেড লোকদের দিয়ে স্থানীয় সরকার চালাচ্ছে। সেগুলো আবার দলীয় লোক, সব বিএনপির।
তিনি বলেন, সবার আগে নাকি বাংলাদেশ! প্রধানমন্ত্রীকে আমরা বলেছি, বিএনপি ছাড়া বাংলাদেশে আর কোনো দল পাইলেন না? যতগুলো সিটি করপোরেশনে, জেলা পরিষদে প্রশাসক দিলেন সব কয়জন বিএনপির। দরকার কি ছিল, এর আগে যারা ছিলেন, তারাও তো প্রশাসকই ছিলেনÑ বলেন গোলাম পরওয়ার।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনি দিলে সরাসরি নির্বাচন দিয়ে দেন, এটা আপনাদের অধিকার। কিন্তু তারা নির্বাচন দিলেন না। সরকার এ সমস্ত আচরণের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রের পথে হাঁটছেন না, বরং একদলীয় কর্তৃত্ববাদী পথে হাঁটছেন। সেটা ধীরে ধীরে প্রমাণ দিয়েছে। আমরা এই পথ থেকে সরকারকে ফিরে আসার জন্য বলব।
গত ৯ মে শনিবার দুপুর ১২টায় ঠাকুরগাঁও শহরের মানব কল্যাণ পরিষদে ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াত আয়োজিত সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন জোটগতভাবে হবে কিনা? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, আট দল থেকে পরবর্তীতে তা হয়েছে এগারো দল। এটি মূলত নির্বাচনী ঐক্য। এখানে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। সুতরাং জোটের শরীক দলগুলো আলাদা আলাদাভাবে স্থানীয় নির্বাচনে তাদের প্রার্থী দেবে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অনেক জায়গায় ইতোমধ্যে প্রার্থীও ঘোষণা করেছে। ভবিষ্যতে যদি স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে জোটগত কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে তখন সেটা জানতে পারবেন।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জুলাই সনদ কার্যকর করার দাবি প্রসঙ্গে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব বায়স্তবায়ন করাসহ ৭০ ভাগ ভোটার গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়ে যে রায় দিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এবং আমাদের আন্দোলন পরিণত জায়গায় না যাওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ এবং সংসদ উভয় জায়গায়ই আন্দোলন চালিয়ে যাবো। প্রধানমন্ত্রী এবং আইনমন্ত্রী যে সংসদে উল্টা কথা বলছেন, তারাও হ্যাঁ -তে ভোট দিয়েছেন। হ্যাঁ -তে ভোট দেয়ার অর্থ হলো কোনো প্রকার নোট অব ডিসেন্ট ব্যতীত সমস্ত সংস্কারকে মেনে নেওয়া।
তিনি বলেন, জুলাই সনদের কথা দেখিয়ে উনারা বলেন যে অক্ষরে অক্ষরে মানবো, এটার মধ্যে ফাঁকি আছে। আট-দশটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উনারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন, মানবেন অর্থ হলো উনারা নোট অব ডিসেন্টসহ মানবেন। তাতে এদেশে সাংবিধানিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরিবর্তন হবে না। কর্তৃত্ববাদী শাসনই থেকে যাবে। আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করার। কিন্তু সরকার জুলাই সনদের কথা বললেও কখনো গণভোটের রায় নিয়ে কথা বলে না। তারা জুলাই সনদ আর গণভোট আলাদা করে ফেলেছে। কারণ জুলাই সনদে নোট অব ডিসেন্ট আছে, কিন্তু গণভোটে কোনো নোট অব ডিসেন্ট নেই।
তিনি আরও বলেন, আমরা কোনো জাতীয় সংকটকে জিইয়ে রাখতে চাই না। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কোনো সংকটকে আমরা ইস্যু হিসেবে তৈরি করতে চাই না। জামায়াতকে মোকাবিলা করার জন্য যখনই কোনো যুক্তি, নৈতিকতা, আদর্শ হারিয়ে গেছে, তখন সরকার দলের লোকেরা জাতির সামনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু, আমরা দেশের স্বার্থে, জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার স্বার্থে সরকারকে সহযোগিতা করব, যা আমাদের আমীরে জামায়াত ঘোষণা করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা জাতিকে বিভক্ত করতে চাই না। পৃথিবীর কোনো দেশে দেখবেন না যে, পঞ্চাশ, ষাট, আশি বা দশ, বিশ বছরের কোনো ইস্যু নিয়ে তারা দেশকে, জাতিকে ভিভক্ত করে। এখন সরকারের কিছু কিছু লোক ও মন্ত্রীরা, যারা পলিসি মেকার, তারা বলছেন আমরা আর কোনো ইস্যু নিয়ে দেশকে বিভক্ত করতে চাই না, ঐক্যবদ্ধ থাকতে চাই। এজন্য আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। সেই সাথে আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, আগামী ৭ জুন সংসদে বাজেট অধিবেশন শুরু হবে। আমাদের আমীরে জামায়াত ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির জন্য, বিদেশি ঋণমুক্ত হয়ে একটি উন্নয়নশীল দেশ গড়ার লক্ষ্যে যে বাজেট প্রস্তাবনা আসবে, তাতে সহযোগিতা করব। আমরা সে লক্ষ্যে প্রি-বাজেট ডিসকাসন করছি। সেই সাথে সরকারের ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দেয়া ও পরামর্শ দেয়ার লক্ষ্যে আমাদের বিরোধীদলের ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। শিগগিরই তা অফিসিয়ালি ঘোষণা করে দেশবাসীকে জানাবো হবে।
ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক বেলাল উদ্দিন প্রধানের সভাপতিত্বে ও জেলা সেক্রেটারি মোহাম্মদ আলমগীরের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল পরিচালক মাওলানা আব্দুল হালিম, সাবেক ঠাকুরগাঁও জেলা আমীর ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল টিম সদস্য মাওলা আব্দুল হাকিম, ঠাকুরগাঁও জেলা সহকারী সেক্রেটারি অধ্যক্ষ কফিল উদ্দিন আহাম্মদ, প্রচার সেক্রেটারি শাহজালাল জুয়েলসহ অন্য নেতারা।