বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঈদুল ফিতর উদযাপন এবং ঈদ সংস্কৃতি


১৭ মার্চ ২০২৬ ১১:২৯

॥ মুহাম্মদ নূরে আলম ॥
বিশ্বের মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর অনাবিল আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়। ‘ঈদ’ মুসলিম উম্মাহর জাতীয় উৎসব। ঈদুল ফিতরের দিন প্রতিটি মুসলমান নারী-পুরুষের জীবনে অশেষ তাৎপর্য ও মহিমায় অনন্য। ঈদুল ফিতর প্রতি বছর ধরণীতে এক অনন্য-বৈভব বিলাতে ফিরে আসে। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজানের সিয়াম-সাধনার শেষে শাওয়ালের এক ফালি উদিত চাঁদ নিয়ে আসে পরম আনন্দ ও খুশির ঈদের আগমনী বার্তা। ‘ফেস্টিভ্যাল অব ব্রেকিং দ্য ফাস্ট’ হিসেবে ঈদুল ফিতরকে আখ্যা দেয়া বিশ্বব্যাপী। পুরো বিশ্বই যেন ঈদের খুশি ও আনন্দে মেতে ওঠে। ঈদ মানেই স্বজন-বন্ধুর সঙ্গে খুশির মুহূর্ত ভাগাভাগি। সিয়াম পালনের দ্বারা রোজাদার যে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার সৌকর্য দ্বারা অভিষিক্ত হন, ইসলামের যে আত্মশুদ্ধি, সংযম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, দানশীলতা, উদারতা, ক্ষমা, মহানুভবতা, সাম্যবাদিতা ও মনুষ্যত্বের গুণাবলি দ্বারা বিকশিত হন, এর গতিধারার প্রবাহ অক্ষুণ্ন রাখার শপথ গ্রহণের দিন হিসেবে ঈদুল ফিতর সমাগত হয়। এদিন যে আনন্দধারা প্রবাহিত হয়, তা অফুরন্ত পুণ্যময়তা দ্বারা পরিপূর্ণ। শাওয়ালের চাঁদটি দেখামাত্র বেতার-টেলিভিশন ও পাড়া-মহল্লার মসজিদের মাইকে ঘোষিত হয় ঈদের আগমনী বার্তা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় উদযাপিত হয় মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর। তবে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনে হাজার হাজার মানুষ হতাহতের বিষয়টি সকল মুসলিমকে ব্যথিত করছে প্রতি বছর। দেশে দেশে ঈদগাহে খোলা আকাশের নিচে হাজারো মানুষ সমবেত হন। বেশিরভাগ মানুষের পরনে থাকে ঈদের নতুন জামা। মনে উৎসবের আমেজ। ঈদগাহে সমবেত হয়ে একসঙ্গে তারা নামাজ আদায় করেন। দেশ, জাতি ও সম্প্রদায়ের জন্য দোয়া করেন। ‘আল্লাহু আকবর’ বলে খোদার প্রশংসা করেন। নামাজের পর কোলাকুলি করেন।
মূলত আরবি বর্ষপঞ্জি চাঁদভিত্তিক হওয়ার কারণে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পাশাপাশি এশিয়া, আফ্রিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশেও সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে একই দিন ঈদুল ফিতর উদযাপন হয়। এর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের দেশগুলোও। তবে ঈদ পালনের কিন্তু একেক দেশে একেক রীতি। ঈদ উদযাপনের সেই ভিন্নতাই আজ জানবো। চলুন জেনে নেয়া যাক বিশ্বের কোন দেশে কীভাবে ঈদ উদযাপন হয়।
সৌদি আরব : ঈদের নামাজ আদায়, নতুন পোশাক, ঐতিহ্যবাহী খাবার, অসহায়দের সাহায্য আর প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে ঈদ উদযাপন করা হয় সৌদি আরবে। ঈদ উপলক্ষে দেশটিতে তিন দিন সরকারি ছুটি থাকে। ঈদকে কেন্দ্র করে বাড়িঘর সাজানো, ঈদ সেলামি, ভালো খাবার-দাবারের আয়োজন, অতিথি আপ্যায়নসহ নানা আয়োজন থাকে দেশটিতে। ঈদের নামাজ শেষে পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয় সৌদিবাসী। আমাদের দেশের সালামির মতো এ সময় প্রিয়জন; বিশেষ করে শিশুদের দেওয়া হয় অর্থ, খেলনা ও নতুন পোশাকের মতো বিভিন্ন উপহার। এমনকি অমুসলিমদের উপহার দিতেও তারা ভুলেন না। তবে তাদের উদযাপন সম্পূর্ণ হয় না উটের দৌড়, ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান, বাজি পোড়ানোসহ নানা ধরনের আয়োজন ছাড়া।
ঈদের নামাজ শেষে বাড়িতে বিশেষ খাবার রান্না হয়। তৈরি হয় ভেড়ার গোশত আর টমেটোর সমন্বয়ে তৈরি সুস্বাদু ঐতিহ্যবাহী খাবার মুগালগাল। আরও তৈরি করা হয় মসলাযুক্ত গোশতের সঙ্গে গম দিয়ে তৈরি জারেশ। সঙ্গে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী আরব দেশের মিষ্টি জাতীয় খাবার তো রয়েছেই। ঈদের দিন সৌদি মুসলিমরা অসহায় ও দুস্থদের সাহায্য করে থাকে। এটা দেশটির ঈদ উদযাপনের অংশ। মানুষের মাঝে উদারতার কোনো কমতি থাকে না এই দিনে। এদিন তারা বাজার থেকে বেশি পরিমাণে চাল কিনে আনে। আর তা বাড়ির প্রবেশ দরজার বাইরে রেখে দেয়। যেন অসহায় ও অভাবগ্রস্ত মানুষ তা নিয়ে প্রয়োজন মেটাতে পারে। এছাড়া এই দিনটিতে গরিবদের মধ্যে খাবার বিতরণও করা হয়। ঈদ উপলক্ষে এই দিনে অনেক দোকানি ক্রেতাদের জন্য বিশেষ ছাড়া দেন।
ইংল্যান্ড : যুক্তরাষ্ট্রে ঈদুল ফিতর মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। দেশটিতে এই উৎসব বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে উদযাপিত হয়। মুসলিমরা ঈদের নামাজ মসজিদ বা খোলা পার্কে আদায় করে এবং তারপর পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ উদযাপন করে। ইংল্যান্ডের বড় শহরগুলোয় ঈদের উন্মুক্ত উৎসব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনসহ প্রায় সব শহরগুলোর মসজিদ ছাড়াও পার্কে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ম্যানচেস্টার, লুটন, বার্মিংহাম, ওয়েলস, কার্ডিয়, লেইটন, কেন্টসহ বিশাল জনসমাগম হয় এই উপলক্ষে। এসব উৎসবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, খাবারের স্টল এবং শিশুদের জন্য নানা বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে।
আমেরিকা : আমেরিকান মুসলিমরা সাধারণত ‘কমিউনিটি সার্ভিস প্রকল্পে’ অংশগ্রহণ করেন। যেখানে তারা অসহায়দের সাহায্য করতে কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ঈদ উদযাপনগুলো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মিশ্রণ, যেখানে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান, সঙ্গীত শোনা এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার গ্রহণ করার রীতি পালন করা হয়। এই দিনে পুরুষরা কান্দর নামের সাদা পোশাক পরিধান করে মাথায় দেয় গাহফিহ নামের টুপি। নারীরা এই দিনে থাউব নামের বিশেষ পোশাক পরে থাকে।
ইন্দোনেশিয়া : ইন্দোনেশিয়ায় ঈদুল ফিতরকে ‘হারি রায়া ঈদুল ফিতর’ বলা হয়। উদযাপন শুরু হয় তাকবির পাঠের মাধ্যমে, যা ঈদের আগের রাত থেকে শুরু হয়। ঈদের সকালে বিশাল খোলা মাঠে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ শেষে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে ক্ষমা চাওয়া ও শুভেচ্ছা বিনিময় ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম ঐতিহ্য। জনসংখ্যার দিক দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের মতো এত আড়ম্বরপূর্ণভাবে সেখানে ঈদ উদযাপন হয় না। ঈদ বলতে আমরা যা বুঝি, ইন্দোনেশিয়ায় সেটির একশ ভাগের এক ভাগও নেই। ঈদ নিয়ে উচ্ছ্বাস, আবেগের দেখা মেলে না। লোকজন ব্যস্ত যে যার প্রাত্যহিক কাজে। আজ কি ঈদ? প্রশ্ন করলে অনেকে বুঝতেও পারেন না। বুঝিয়ে বলার পর কেউ কেউ হয়তো বললেন, ‘ইয়েস ইয়েস, টু ডে ঈদুল ফিতর।’ বাংলাদেশে যেমন ঈদ ব্যানার-ফেস্টুনের শুভেচ্ছায় রাস্তাঘাট ভরিয়ে ফেলা হয়, তবে ইন্দোনেশিয়ানরা এই সংস্কৃতি থেকে অনেক দূরে। দেশটিতে এই উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘মুদিক’, যার অর্থ নিজের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া। লাখো মানুষ ঈদের ছুটিতে শহর থেকে গ্রামে ফিরে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন। মুদিক এত গুরুত্বপূর্ণ যে, সরকার বিনামূল্যে গণপরিবহনের ব্যবস্থা করে। ইন্দোনেশিয়ার ঈদ শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি পরিবার ও ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
মিশর : অন্যান্য দেশের মতোই মিশরে ঈদুল ফিতর শুরু হয় ঈদের নামাজ পড়ার মাধ্যমে। এরপর পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের সঙ্গে যুবকদের দেখা করার নিয়ম আছে। এ সময় প্রবীণরা পরিবারের অল্পবয়সীদের একটি ছোট টোকেন বা সালামি দেয়। অনেক মিশরীয়রা ঈদ উদযাপনের জন্য সরকারি বিভিন্ন উদ্যান এবং চিড়িয়াখানায় পরিবারসহ ঘুরতে যান। গিজা চিড়িয়াখানা সবার জন্যই অন্যতম জনপ্রিয় এক স্থান। ঈদ উদযাপনে মিশরীয়দের ঐতিহ্যবাহী পদের নাম ‘কাহক’। এটি মূলত এক ধরনের বিস্কুট, যার ওপরে ছড়ানো থাকে পাউডার্ড সুগার বা চিনির মিহি গুঁড়া। এর ভেতরে থাকে বাদাম, ঘিসহ অনেক কিছু। এই বিস্কুট ছাড়া মিশরীয়দের ঈদ থেকে যায় অসম্পূর্ণ।
নিউজিল্যান্ড : নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে ঈদুল ফিতরের উৎসব শুরু হয় সকালের নামাজের মধ্য দিয়ে। তারপরে ইডেন পার্কে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাই অ্যানুয়াল ঈদ ডে’। সেখানে বিভিন্ন আয়োজন দেখতে একে একে ভিড় জমান নিউজিল্যান্ডবাসী। সেখানে বিভিন্ন কার্নিভালের আয়োজন করা হয়। সেখানে বিভিন্ন খাবারের দোকান বসে। সবাই আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে। অনেকটা সাংস্কৃতিক উৎসবের মতো উদযাপিত হয় নিউজল্যান্ডের ঈদুল ফিতর। এই বিশেষ অনুষ্ঠানে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য যেমন শিক্ষামূলক; তেমনি বিনোদনমূলক। এটি সর্বস্তরের মুসলিম দর্শকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।
সিঙ্গাপুর : সিঙ্গাপুরে ঈদ উদযাপিত হয় বেশ জাঁকজমকতার সঙ্গে। গিলং সেরাই এলাকায় ঈদুল ফিতরের দিন রঙিন আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে। গিলং সেরাইয়ের রাস্তাগুলো ঈদ উপলক্ষে সাজানো হয় বেশ ঘটা করে। ৫০টিরও বেশি আলোক এবং ভিজুয়াল ইনস্টলেশনের মাধ্যমে আলোকসজ্জা করা হয় সেখানে। গিলং সেরাইকে কেন্দ্র করেই সিঙ্গাপুরের ঈদুল ফিতরের উৎসব পরিপূর্ণতা পায়। সেখানেই সব মুসলিমরা ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে ভিড় জমায়। ১০০ এরও বেশি খাবারের দোকান বসে। যেখানে ঐতিহ্যবাহী মালয় খাবার পরিবেশন পাওয়া যায়। চোখ ও পেট ভরাতে সিঙ্গাপুরে একবার হলেও ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে পারেন।
আইসল্যান্ড : আইসল্যান্ডবাসী ঈদের দিনও রোজা থাকেন। কারণ গ্রীষ্মের শুরুতে সূর্য স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য থাকায় মধ্যরাতে সূর্যাস্ত যায় সেখানে। আইসল্যান্ডে বসবাসরত মুসলমানরা প্রতিদিন ২২ ঘণ্টা রোজা রাখে। যদিও এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং বিষয়। তবে ইসলামিক নির্দেশনা অনুযায়ী, তারা নিকটতম দেশের সূর্যাস্তের সময়কালের ভিত্তিতে রোজা ভাঙেন। আইসল্যান্ডের রাজধানী রেকজাভাকের কয়েকটি মসজিদে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। মসজিদের আশপাশের এলাকাতেই অতিথিদের সমাগম ঘটে। সেখানেই তারা পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করেন। এ সময় তারা ইন্দোনেশিয়ান, মিশরীয় এবং এরিটরিয়ানে বিভিন্ন খাবার ও পানীয় খেয়ে থাকেন। শিশুরা নতুন পোশাক পরে ছোটাছুটি করে। এভাবেই আইসল্যান্ডবাসীরা ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন।
মরক্কো : অন্যান্য দেশের মতো মরক্কোয়ও সকালে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ঈদের নামাজ শেষে পারস্পরিক খোঁজখবর নেওয়া একটি সাধারণ রীতি। দেশটিতে ঈদে যে বিশেষ খাবার খাওয়া হয়, তার নাম ‘তাজিন’। ঐতিহ্যগতভাবে এই রান্নায় ব্যবহার করা হয় মাটির পাত্র, যেটার নাম তাজিন। আর ওই মাটির পাত্রের নামানুসারে রান্নার নামকরণও হয়েছে তাজিন। সাধারণত ভেড়া ও গরুর গোশত দিয়ে তৈরি করা হয় এই খাবারটি। তবে গোশতের সঙ্গে নানারকম সবজি ও মসলার মিশ্রণও থাকে এতে। এই খাবার দিয়েই বেশিরভাগ অতিথি আপ্যায়ন করেন তারা।
ইরান: ইরানে ঈদুল ফিতর উদযাপন মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য এবং আনন্দের উপলক্ষ্য। এ দিন দেশটির পরিবার এবং সম্প্রদায়গুলো মসজিদে বিশেষ প্রার্থনায় যোগ দেয়। শুভেচ্ছা বিনিময় করে। প্রিয়জনদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খায়। ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ও খাবারগুলো প্রস্তুত করা হয়। অপক্ষেকৃত সচ্ছলরা অভাবী ব্যক্তিদের খাবার দেন, সাহয্য দেন। এই দিনে পুরুষরা কান্দর নামের সাদা পোশাক পরিধান করে মাথায় দেয় গাহফিহ নামের টুপি। নারীরা এই দিনে থাউব নামের বিশেষ পোশাক পরে থাকে।
তুরস্ক : বাংলাদেশে ঈদের ছুটি ৫/৭ দিন। তবে তুরস্কে শুধু ঈদের দিনই ছুটি দেওয়া হয়। ঈদের দিনেও সরকারি অফিস ছাড়া প্রায় সবই খোলা থাকে। সাপ্তাহিক ছুটি শনি ও সোমবার। এই দিনগুলোয়ও শহর থাকে ব্যস্ত। কোনো কিছু নিয়ে উচ্ছ্বাস, আনন্দ প্রকাশে বাড়াবাড়ি নেই সেখানে। তুরস্কে ঈদুল ফিতরকে ‘শেকের বাইরামি’ বলা হয়। যার অর্থ ‘মিষ্টির উৎসব’। এই নামটি ঈদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য মিষ্টি খাবারের প্রচলনকে প্রতিফলিত করে।
তুরস্কের মানুষ ঈদ উদযাপন করেন সমুদ্রসৈকতে। তপ্ত রোদে সমুদ্রসৈকতে এসে ভিড় জমান সবাই। ঈদের ছুটি কাটাতে তুরস্কের বিভিন্ন সমুদ্রসৈকতে পরিবারসহ সময় কাটান তুর্কিবাসীরা। তুরস্কের জনসংখ্যার প্রায় ৯৮ শতাংশই ঈদুল ফিতরের ছুটিতে সেখানকার বিভিন্ন প্রদেশে ভ্রমণ করেন। এছাড়া অনেকে ঈদুল ফিতরের প্রথম দিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন তারা সমুদ্রে কাটান। এ সময় তারা মাছ ধরা, সাঁতার কাটাসহ এবং আনন্দ হুল্লোড়ে মেতে ওঠেন। বালুকাময় উপকূলে বসে সমুদ্রের ঢেউ দেখেই পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করে থাকেন তুর্কিবাসীরা। ঈদ মানে তাদের কাছে বিশ্রাম, আনন্দ, আবার বিশ্রাম!
ঈদের দিন তুরস্কের অন্যতম খাবার লোকুম। হরেক রঙের মিষ্টির টুকরো এই ‘লোকুম’ মূলত টার্কিশ ডিলাইট। বরফি আকৃতির বিশেষ এই মিষ্টি তুরস্কের সব ঘরেই ঈদের দিন তৈরি করা হয়। চিনি, স্টার্চ আর খেজুর, বাদামের মতো উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয় এই ডেজার্টটি। এই মিষ্টি তৈরিতে নানারকম রংও ব্যবহার করা হয়। শুধু ঈদ নয় তুরস্কের যেকোনোও উৎসব আয়োজনে এই মিষ্টি থাকে সবার ঘরে ঘরে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত : বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর তালিকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম থাকে বেশ ওপরে। এই দেশে ঈদের আয়োজন শুরু হয় পরিবারের সবাই মিলে নতুন জামা পরে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায়ের মাধ্যমে। এরপর যে যাঁর সাধ্যমতো দান করেন। সব শেষে ঈদের দিনের মজাদার খাবারের কথা তো নতুন করে বলার কিছু নেই! গোটা শহর সাজানো হয়। ফলে বিরাজ করে উৎসবের আবহ।
মালয়েশিয়া : ইন্দোনেশিয়ানদের সঙ্গে ভাষার কিছুটা মিল আছে বলেই বোধ হয় ঈদ উদযাপনও মিলে যায় মালয়েশিয়ার। এই দেশের মানুষও বাড়ি ফেরার যাত্রায় পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ কাটাতে অংশ নেয় ‘বালিক কামপুং’-এ। অর্থাৎ তারা বাড়ি ফেরে। এছাড়া ঈদের দিন সমাজের সব শ্রেণির মানুষের জন্য তাঁদের বাড়ির দরজা থাকে খোলা। যে কেউ ঈদ উদযাপনে অংশ নিতে পারে। তারা সবাই মিলে একসঙ্গে খায়। সেখানে দুটি পদ থাকতেই হবে। রাইস পুডিং বা কেটুপাট আর র‌্যানডাং বা গরুর গোশতের স্টু। মসজিদ ও রাস্তায় তাকবির ধ্বনি উচ্চারিত হয়। রাস্তাঘাটে মশাল, আতশবাজি করা হয়। তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার রেন্দাং, কেতুপাট, লেমাং রান্না করে। শহরে ঘরে ঘরে প্রচুর পরিমাণে খাবার রান্না করে প্রতিবেশী এমনকি অমুসলিমদেরই দাওয়াত দেওয়া হয়। খাওয়ার পর গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। চীন থেকে বাঁশি আমদানি করা হয়। এ বাঁশি খুব জোরে বাজে। সন্ধ্যায় বাজি উৎসব চলে।
নাইজেরিয়া : আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে নাইজেরিয়া অন্যতম। বেশ জমজমাটভাবেই এদেশে হয় ঈদ উদযাপন। গাড়ি, ঘোড়া, বাজনা নিয়ে ঈদের দিন একত্রে মিছিল করে রাস্তায়। এটাকে বলা হয় দরবার উৎসব। নাইজেরিয়ার সংস্কৃতি যে কতটা সমৃদ্ধ, সেটি তাদের এই উদযাপন না দেখলে ধারণা করা যাবে না।
ভারত : আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত হিন্দুপ্রধান দেশ হলেও সেখানে কিন্তু ঈদের উদ্যাপন থেমে থাকে না। ঈদ উপলক্ষে জায়গায় জায়গায় মেলা বসে। মানুষ তাদের পরিবার নিয়ে এই মেলায় ঘুরতে গিয়ে ঈদের দিনটা আনন্দমুখরভাবে কাটায়।
পাকিস্তান : আমরা যেমন সেমাই খেয়ে ঈদের সকাল শুরু করি, পাকিস্তানে তেমনি ঈদের সকাল শুরু হয় ‘শির খুরমা’ খেয়ে। এটাকে একধরনের সেমাই বলা চলে। মানুষ প্রতিবেশীদের বাড়িতে এই শির খুরমা নিয়ে ঈদের দিন বেড়াতে যায় বলে তাঁদের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক বজায় থাকে। পাকিস্তানে ঈদের খাবার পর্বের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিরিয়ানি, খির এবং শির খুরমা।
আফগানিস্তান : ঈদের দিনে আফগানরা অতিথিদের খেতে দেন ‘জালেবি’ নামের এক বিশেষ খাবার। আর ‘তখম জাঙ্গি’ আফগানদের ঈদ উদযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যেখানে পুরুষেরা ফাঁকা ময়দানে একত্রিত হয়ে একজন আরেকজনের দিক সিদ্ধ ডিম ছোড়ে।
অস্ট্রেলিয়া : পবিত্র রমজান মাস শেষে অস্ট্রেলিয়া এবং বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে ঈদুল ফিতর উদযাপন করেছে। তবে যেখানে অনেক মুসলমানরা যখন নামাজ ও ভোজের মাধ্যমে এই ঈদ উদযাপন করছেন, তখন আবার অনেকেই শুধুমাত্র টিকে থাকার জন্য লড়াই করছেন। অস্ট্রেলিয়ায় ৮ লাখের বেশি এবং বিশ্বব্যাপী ২ বিলিয়নেরও বেশি মুসলমানের জন্য ঈদুল ফিতর একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, যা সাধারণত নামাজ, ভোজ এবং দান-খয়রাতের মাধ্যমে পালিত হয়।
এছাড়া উত্তর ককেশাসের ইনগুশেটিয়া এবং চেচনিয়ার স্থানীয় মসজিদগুলোয় ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। চেচেন নেতা রমজান কাদিরভ নিজ গ্রামে ঈদের নামাজ আদায় করেন এবং রমজানে মুসলিমদের উদারতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এদিকে অনেক মুসলমানরা যুদ্ধ ও সংকটের মধ্যে ঈদ পালন করেছে। ঈদ জামাতে উৎসবমুখর পরিবেশে অংশগ্রহণ করে রাশিয়ান মুসলিমরা। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বুকাভুতে শত শত মানুষ একটি স্টেডিয়ামে ঈদুল ফিতর উদযাপন করে, যদিও অঞ্চলটি রুয়ান্ডা-সমর্থিত বিদ্রোহী বাহিনীর দখলে রয়েছে। পাশাপাশি কেনিয়া, সুদান, নেদারল্যান্ডস, ইউক্রেন, পর্তুগালের মুসলমানরাও আনন্দ উৎসবের মাধ্যমে ঈদ উদযাপন করে। গাজা, ফিলিস্তিনের মুসলমানরাও অবৈধ দখলদার ইসরাইল হামলায় বিধ্বস্ত মসজিদের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই ঈদের নামাজ আদায় করে এবং জেরুসালেম- ইসলামের তৃতীয় পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত আল-আকসা মসজিদে পরিবার নিয়ে ঈদ উদযাপন করে ফিলিস্তিনের মুসলমানরা।
তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া ও প্রথম আলো, নিউইয়র্ক টাইমস, আল-জাজিরা, বিবিসি, আনাদুলু, আরব নিউজ, মিডল ইস্ট আই।