দয়া করে নব্য ফ্যাসিবাদীদের এখনই থামান
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৬
॥ মাহবুবুল হক ॥
আলহামদুুলিল্লাহ। মহান আল্লাহর রহমতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার সম্পন্ন হয়েছে। কেমন হয়েছে, কীভাবে হয়েছে, কী ধরনের হওয়ার কথা ছিল, অবশেষে কী ধরনের হলো- এসব নিয়ে এ নিবন্ধ লেখার সময় আজ ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আলোচনা-পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ ইত্যাদি কম হয়নি, এখনো চলছে। আমরা সবাই জানি যে, ৯ দিনে, ৯০ দিনে বা ৯০ মাসে এ আলোচনা-সমালোচনা, এর ভালো দিক, মন্দ দিক, উত্তম দিক, অধম দিক বা নিকৃষ্ট দিক শেষ হবে না। যদি শুধু দেশময় আলোচনা হতো, তাহলে হয়তো আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এ আলোচনা চলতে পারত। কিন্তু এখন সবাই জানে যে, ‘যার বিয়ে তার খবর নাই, পাড়া-পড়শির ঘুম নাই’। তবে একেবারে খবর নাই বললে অসত্য কথা বলা হবে। বলা যায়, খবর ছিলা কিন্তু সব খবর ছিল না। হয়তো আসল খবর ছিল না।
এদিকে শুধু যে পাড়া-পড়শির ঘুম নাই- শুধু এটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে আজকাল আর হয় না। এখন সত্যি বললে বলতে হয়, দেশ-দেশান্তরের ঘুম নাই। পূর্বের শ্লোকটা একটু সংশোধন করা দরকার। সেটার জন্য আমরা যথেষ্ট নই। অনেক প্রাজ্ঞ, বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ লোককে এ কাজে লাগাতে হবে। তবে মূল থিমটা নিয়ে আমরা একটু হালকা আলাপ-আলোচনা করতে পারি। যেমন যাদের নির্বাচন, তাদের খুব বেশি তৎপরতা নেই। অথচ বিশ্বনেতাদের ঘুম নাই।
এখন বিশ্বের সবকিছুর মালিক ‘ডিপস্টেট’। ওরাই এখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। ‘নাকি’ শব্দটি এখানে উল্লেখ করলাম না। একসময় আমরা জানতাম, বিশ্বের শীর্ষ ২০০টি পরিবার ক্ষুদ্র-বৃহৎ সব স্টেট চালায়। পরে জানা গেল, সেই পরিবারগুলো ব্যবসায়িক পরিবার। পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর কথা পূর্বের মতো এখন আর আলোচনায় আসে না। ন্যাটো, জাতিসংঘ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, তাদের কথাও এখন আর সামনে আসে না। সবাই এখন মাত্র কয়েকজন ধনকুবেরের কথা ভালোভাবে জানে। আর জানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে। এর বিপরীত দিকে কারো অবস্থান নেই, এমনও তো নয়। রাশিয়াকে বাদ দিলে, চীনকে তো আর বাদ দেয়া যায় না। এখনকার বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ব, চুক্তি কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। সবকিছু ক্ষণস্থায়ী। আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়, সবকিছু ক্ষণভঙ্গুর। পূর্বে যেমন ছিল বন্ধুর বন্ধুও বন্ধু। শত্রুর শত্রুও বন্ধু। শত্রুর বন্ধুও শত্রু। বন্ধুর শত্রুও শত্রু। এসব মিল-অমিল নিয়ে এখন আর কেউ ভাবছে না। লেজুড়বৃত্তিটা এখন স্থায়ী নয়। যার যখন যেখানে সুবিধা, সেটাই করতে পারবে। ধারাবাহিকতা বা পরম্পরা বলতে এখন কিছু নেই। যেখানে যার সুবিধা, সেখানে সে নাক গলাতে পারবে। সবই নির্ঘণ্ট। নৈতিকতাশূন্য।
গত নির্বাচনের সময় ট্রাম্প বলে বসলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনে যখন যে দেশ দরকার, সে দেশ আমরা দখলে নিয়ে নেব- কানাডা, ভেনেজুয়েলাসহ দক্ষিণের দেশগুলোর বিষয়েও আমরা হাত বাড়াবো। মাত্র কিছুদিন আগে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ট্রাম্প বন্দি করে নিয়ে এসেছেন। বন্দি করার সময় তার বডিগার্ডদের হত্যা করেছেন। যেখানে যেখানে প্রয়োজন ম্যাসাকার করেছেন। সারা দুনিয়ার মানুষ এর প্রতিবাদ করেছে, কিন্তু এর কোনো প্রতিকার এখনো নেয়া হয়নি। হবেও না হয়তো। বিষয়টি খুব নতুন, তাও নয়। জুনিয়র বুশ থেকেই এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশকে তারা তছনছ করে দিয়েছে। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন। এসব নিয়ে এখন আর আলোচনা করে লাভ নেই। এ বিশ্ব সবসময় দেখে এসেছে, জোর যার মুল্লুক তার। সভ্যতার কথা বলে চরম অসভ্যতার দিকে এ নশ্বর পৃথিবী দ্রুতবেগে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের জোর থাকলে আমরাও হয়তো জোরভুক্ত দেশের সাথী হতাম। হয়তো সেদিকেই আমরা ধীরে ধীরে গড়াচ্ছি।
আমরা মুসলিম। আমরা আশাবাদী এক জাতি। সমুদ্রে ঝড়-ঝঞ্ঝার ভেতরে ডুবতে ডুবতেও আমরা আশা করি, আমরা ইনশাআল্লাহ বেঁচে যাব। শেষ নিশ্বাসটুকু থাকা পর্যন্ত আমরা মহান আল্লাহর নেয়ামত ও রহমতের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখি। এ প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশে নতুন এক সরকার ক্ষমতার মসনদে আরোহন করেছে। একেবারে আনকোরা নতুন, তা কিন্তু বলা যাবে না। এর পেছনে দুটি বড় লেগাসি আছে। একটি হলো যৌবনের প্রতীক শহীদ জিয়াউর রহমানের ধারাবাহিকতা এবং মাতৃত্বের প্রতীক আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পরম্পরা। বাবা ছিলেন কর্মবীর প্রেসিডেন্ট। মা ছিলেন আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন গণতন্ত্রকামী। পূর্বের এ লেগাসি নিয়ে সন্তান হয়েছেন জাতির নতুন নেতা। তার যৌবনকাল নিয়ে আমরা ভাবছি না। সেসব আমরা ভুলে গেছি বা ভুলে যাবার চেষ্টা করেছি।
‘পাস্ট ইজ পাস্ট’ শত্রুদের অযাচিত আক্রমণে নিস্তব্ধ হওয়ার মুখে লেখাপড়ার জায়গায় বা জ্ঞানচর্চার স্থানে মহান আল্লাহ তাঁকে হিজরত করার সুযোগ দিয়েছিলেন। প্রাজ্ঞ ও বিজ্ঞ হওয়ার সমস্ত দ্বার খুলে দিয়েছিলেন। বিধ্বস্ত দেহ ও মনকে পুনরুজ্জীবিত করার আয়োজন করে দিয়েছিলেন। সেসব তিনি কতটুকু কাজে লাগিয়েছেন, আমরা জানি না। কোনো ধরনের কোনো অভাব তো ছিল না। পিছুটানও ছিল না। দেশ ও জাতি গঠনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেই তিনি নিজের মাতৃভূমিতে ফিরেছেন এবং জয় করেছেন- এটাই আমরা গোটা জাতি বিশ্বাস করি। কারণ ১৭ বছর তো কম কথা নয়।
আমরা গরিব, কিন্তু উত্তম চিন্তা করতে আমরা ভালোবাসি। এজন্য দুনিয়ার অনেক দেশ আমাদের ‘স্বপ্নবাজ’ দেশ বলে অভিহিত করে। রমাদান মুখে নিয়ে ক্ষমতায় বসেছেন। এটা প্রতীকী কোনো কিছু কিনা, আমরা জানি না। সাধারণত এমন ঘটনা আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়নি। সম্ভবত এ দেশের ইসলামপন্থীরা ভেবেছিল, এবার তারাই ক্ষমতায় আসবে। সে কারণে হয়তো ধর্মীয় আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন। তাদের আশা অমূলক ছিল না। ভ্রান্ত ছিল না। কিন্তু একদিকে ‘ডিপস্টেট’, অন্যদিকে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যে, মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম বান্দাদের ইচ্ছাকে তাঁর অভিপ্রায়ের মধ্যে স্থান দিতে চাননি। কারণ আমরা জানি না। মহান মালিক জানেন। দুনিয়াবি হিসাব-নিকাশে বিজয় যখন ছিল উচ্চকিত, ঠিক তখন সামান্য ব্যবধানে পরাজয় বরণ ও বহন করার মধ্যে মহান রবের কোনো শুভ ইচ্ছা নিশ্চয়ই আছে।
সুখের কথা বিজয়ের মুখে পরাজয়কে এ দেশে ইসলামপন্থীরা শোকর ও সবরের সাথে মেনে নিয়ে ইতোমধ্যেই মানুষের মন জয় করে ফেলেছে। পরাজিত শক্তি এখন বিরোধীদল। তারা এখন পবিত্র রমাদানের সংযম অনুশীলনে ব্যস্ত। বড় দুটি কারণে ইসলামপন্থীরা এ সময় ধৈর্যধারণ করেছেন। তার একটি হলো- মাত্র তো নির্বাচন হলো। এখনই অধৈর্য বা অসহনশীল হওয়া উচিত হবে না। দ্বিতীয়টি হলো- কুরআন নাজিলের মাস ‘মাহে রমাদান’। মুসলিমদের জন্য এ মাসেই রয়েছে ‘লাইলাতুল কদর’। যে রাতটি হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রাত। তাছাড়া রয়েছে মহান আল্লাহকে রাজি-খুশি করার অভাবনীয় নানা উৎস। এসব উপঢৌকনকে তারা হেলায় হারাতে চান না। নির্বাচনের চেয়ে এ পবিত্র মাসের অনুশীলন তাদের কাছে কম কিছু নয়। তাই তারা আছেন তাদের মতো।
কিন্তু অন্যরা বসে নেই। তারা যে রমাদানকে কম গুরুত্ব দিচ্ছেন বা উপেক্ষা করছেন- এ নিম্ন শ্রেণির কথা দেশবাসী ভাবছে না। তবে তারা রমাদানকে কেন্দ্র করে নির্বাচনের ফলাফল ও চলমান রাজনীতিকে অবজ্ঞাও করছেন না। যে দলটির পুরনো নেতৃবর্গ বহু বছর ধরে বলে এসেছেন- ব্যক্তি থেকে দল বড়, দল থেকে দেশ বড়। সেই দল যখন নির্বাচনে যেভাবেই হোক বিজয় লাভ করল, তখন সংবাদপত্রে দলের নাম সমুজ্জ্বল না হয়ে তার কর্ণধারের নাম উচ্চকিত হলো। বলা হলো অমুক সরকারের যাত্রা শুরু। এটা কীসের ইঙ্গিত?
এ দেশের মানুষ রাজতন্ত্র চায়নি। চাইলে গণতন্ত্রের নামে ব্রিটেনের মতো রাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র পাস করার জন্য চাপ সৃষ্টি করত। ব্রিটেন পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের সাথে রাজতান্ত্রিক লেগাসিকে এখনো সমন্বিত রেখেছে। বাংলাদেশের মানুষ কখনো দেশের স্বাধীনতার স্থপতিকে রাজা বানাতে চায়নি। সেই একই কারণে পরিবারকেন্দ্রিক ক্ষমতাকেও তারা কখনো বাহ্বা জানায়নি। কারণে-অকারণে পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি বহমান হলেও এ দেশের মানুষ এ বিষয়টিকে কখনো ভালো চোখে দেখেনি। দুটি বড় দল নিজেদের দলকে সংহত করার জন্য বাধ্য হয়ে পরিবারতন্ত্রকে বাহন করেছে। কিন্তু প্রায় গত ১৭ বছর ধরে এ বিষয়ে বিভিন্ন দল ও দেশবাসী প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবারতন্ত্র পূর্বের মতোই বিরাজমান থাকল। এখনকার জন্য কিছুটা পজিটিভ মনে হলেও ভবিষ্যতের জন্য এ পরিবারতন্ত্রের বহমানতাকে বা পরম্পরাকে দেশবাসী পূর্বের মতো হজম করবে বলে মনে হয় না।
নির্বাচনের সময় এসব কথা অনেক উঠেছে। অবারিতভাবে শহরে-নগরে এ কথা উঠেছে যে, বাবা ও মায়ের ঐতিহাসিক অবদানের জন্য তাদের সন্তানকে আমরা এখন মেনে নিচ্ছি। বিজয়ী দলের ব্যক্তিরাও বলেছেন, সন্তানকে দেখে আমরা ভোট দিইনি। ভোট দিয়েছি সন্তানের বাবা-মায়ের গুণাবলিকে কেন্দ্র করে। যাহোক নির্বাচনের পূর্বে এবং নির্বাচনের পরে বিজয় অর্জনকারী নেতা দুটি উত্তম কাজ করেছেন। একটি হলো- তিনি বলেছেন, ‘আমাদের দল বিজয় লাভ করলে রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়ে আমরা রাসূল (সা.)-কে অনুসরণ করব। তিনি মদিনায় যে রাষ্ট্র গঠন করেছিলেন, সেই পদ্ধতি আমরা অনুশীলন করব।’ গোটা দেশবাসী এ বিষয়টিকে বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করেছে। এক ধরনের মূল্যায়ন হলো যদি এ নতুন নেতৃত্ব সত্যি সত্যি মদিনা রাষ্ট্র ও মদিনা সনদকে অনুসরণ করেন বা করতে পারেন, তাহলে সেটা হবে সোনায় সোহাগা।
দেশে যে ইসলামের ঢেউ উঠেছে, সেই ঢেউয়ের সাথে নবতর নেতার একটা সামঞ্জস্য অবলোকন করা যাচ্ছে। তিনি এ ঢেউকে অবজ্ঞা বা উপেক্ষা করতে চাচ্ছেন না। অথবা করতে চাইলেও বাস্তবতার কারণে পেরে উঠছেন না। শুধু এ কথা বলে তিনি ক্ষান্ত হননি। মাঝে মাঝে ইসলামের সৌন্দর্যের কথা, উদারতার কথা, মহত্তের কথা বেশ উচ্চৈঃস্বরে বলেছেন। যদিও দেশে ফেরার পর তার হাবভাবে এটা কখনো মনে হয়নি তিনি ইসলামপন্থীদের উজ্জ্বল প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেছেন। বরং তিনি ও তার দল সেই পুরোনো বস্তা পচা রাজনৈতিক উপকরণ নিয়ে ‘ডিপস্টেট’ ও পার্শ্ববর্তী দেশের ধ্যান-ধারণাকে নিরঙ্কুশভাবে সমর্থন করেছেন। গত ১৮ মাস ধরে নির্বাচনের বিজয়ী দল গণঅভ্যুত্থান বা গণবিপ্লবকে অবজ্ঞা, অবহেলা ও উপেক্ষা করেছে। কখনো কখনো সেই অবজ্ঞা ও অবহেলা সীমাতিরিক্ত হয়েছে। কথাবার্তা উচ্চারণ বা সমাবেশে ভারতের উচ্চবর্ণ কর্তৃক নিম্নবর্ণের পতিত মানুষের প্রতি যে ঐতিহাসিক অবজ্ঞা ও ঘৃণা, তার সাথে তুল্য-মূল্যভাবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু সৌহার্দ্যরে বিষয় নির্বাচনের প্রাক্কালে নেতৃবৃন্দসহ; বিশেষ করে মূল নেতা ‘এনসিপি’র ক্যাটালিস্টদের প্রতি হঠাৎ করে বা বলতে গেলে অভাবিতভাবে নানা ইভেন্ট তৈরি করে অবজ্ঞা ও অবহেলার প্রায়শ্চিত্ত করেছেন বলে অনেকবার দৃশ্যমান হয়েছে। লোকে মুখ লুকিয়ে হেসেছে। দলের লোকেরাও হেসেছে। কারণ তারা প্রবাসী নেতার নির্দেশেই অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে নিম্নশ্রেণির ব্যবহার করেছে। কোনো বিবেকবান মানুষ বা ন্যায়পরায়ণ দল বা গোষ্ঠী এ ধরনের নিকৃষ্ট কাজ দলীয় স্বার্থের কারণে হলেও করতেন না। কিন্তু দেশবাসীর মাথায়, ঘাড়ে ও বুকে অনেক চাপ ছিল। অনেক বড় বড় বিষয়কে স্থগিত রেখে বা পাশ কাটিয়ে ঘোষিত সময় নির্বাচনটা হয়ে যাক- এ বিষয়ে এক দারুণ ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বড়াই-অহংকার করতে করতে দলীয় স্বার্থে তারা নির্বাচনের সময় বিনয়ের অবতার সেজেছে। তবুও দেশবাসী নির্বাচনের জন্য সবকিছু ভুলে যেভাবে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করেছে, তা সত্যি সত্যি অবর্ণনীয় বা অচিন্তনীয়। এর ইতিহাসকে কীভাবে বর্ণনা করবে, আমরা জানি না। তবে এটুকু বোঝা যায়, পূর্বের পতিত সরকার পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় গ্রহণ করার পর গত ১৮ মাসে আজকের বিজয়ী দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের হাতে যেভাবে অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হয়েছেন, তা ছিল হুবহু ফ্যাসিবাদী সরকার, সরকারি দল ও তাদের নেতাকর্মীর উলঙ্গ অপকর্মের মতো।
বিষয়টি একটু খোলাসা করা দরকার। পতিত সরকার ও সরকারি দলের গডফাদারসহ নেতাকর্মীরা পলায়নের পর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দেশের শহর, নগর, বন্দরের যে লাখ লাখ চেয়ার শূন্য হলো, সেসব চেয়ার কিন্তু ১৮ মাস পর্যন্ত শূন্য ছিল না। ‘ডিপস্টেট’ এবং তাদের উপমহাদেশীয় এজেন্টের নানা ফপরদারি ও কৌশলে সেসব শূন্য চেয়ার রাতারাতি পূর্ণ হয়েছিল এখনকার বিজয়ী দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা। অবস্থা ও ব্যবস্থা এমন ছিল যে, রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করলেই হতো, নির্বাচনের তেমন কোনো প্রয়োজন ছিল না। সর্বোচ্চ স্তরে সামান্য কয়টি পদ ছাড়া সকল পদ পূর্ণ ছিল। কারণ ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সরকার উৎখাত হয়েছিল মাত্র ৭ মাসের ভেতর। বিপ্লবীদের দ্বারা একটি সরকার যদি গঠিত হতো এবং তারা যদি যে যেখানে আছে, তাদের অনুমোদন দিত, তাহলে আর ১৮ মাস ধরে নানা সমুদ্র পার হতে হতো না। অবশ্যই ইসলামপন্থীরা এতে দারুণভাবে বাধ সাধতো। যাহোক যা হয়নি, তা নিয়ে বেশি বেশি মাথা ঘামানোর দরকার কী।
দেশ-বিদেশের সকলেই জানেন, বিপ্লবীরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জীবনপণ লড়াই করলেও প্রায় ২ হাজার উজ্জ্বল তরুণ-শিক্ষার্থীরা শাহাদাত বরণ এবং প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী ও জনতা আহত হলেও ফ্যাসিবাদের অত্যাচার, নির্যাতন একদিনের জন্যও এদেশে থেমে থাকেনি। পুরো ১৮ মাস ধরে জ¦ালাও-পোড়াও, হতাহত, মামলা-মোকদ্দমা, জমিজমা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান দখল-বেদখল, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, রাহাজানি, নারী নির্যাতন, খুন-খারাবি, হানাহানি, অপমান-অপদস্থ, বেইজ্জতি করা কোনোটাই বাদ যায়নি। সব অপকর্ম সমানতালে চলেছে। এমনকি নির্বাচনের সময় অপর দলের মহিলা কর্মীরা যে হারে অপদস্থ হয়েছেন, তা ছিল তুলনাহীন।
এর বেশি এখন আমরা বলতে চাই না। আমরা শুধু চাই, দয়া করে ফ্যাসিবাদী তৎপরতা বন্ধ করুন। নিজেদের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের থামান। তাদের বোঝান। তাদের নিঃস্পৃহ করুন। তাদেরকে ভালোর দিকে ফিরে আসার জন্য যা যা করার দরকার, তাই করুন। হাজার হাজার মানুষকে শাস্তি দিতে হলেও তা থেকে দয়া করে পিছপা হবেন না। কথায় আছে ‘বাসর রাতে বিড়াল মারতে হয়’। অনুগ্রহ করে সমস্ত প্রি-কনসিভড আইডিয়া মাথা থেকে ছুড়ে ফেলে নিজেদের দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ভালো মানুষ করার ব্যাপকতর উদ্যোগ গ্রহণ করুন। ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের শত ফোঁড়েও’ কাজ হয় না।
পাকিস্তানের ইয়াহিয়া খান যখন নির্বাচনে জয়লাভ করার পরও ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন না, তখন বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ ইয়াহিয়া খানের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘যে গিরো তুমি লাগাইয়াছ, সেই গিরো তোমাকেই খুলিতে হইবে।’ ইয়াহিয়া খান এ পরামর্শ নির্মমভাবে অবজ্ঞা করেছেন। তার ফল আমরা সবাই জানি। বিজয়ী দলের সম্মানিত নেতা, আপনার প্রতি অনেক অনেক অভিনন্দন, শ্রদ্ধা, শুভেচ্ছা, ভালোবাসা এবং দোয়া। আপনি দেশবাসীর মুখের দিকে চেয়ে অনুগ্রহ করে এ রমাদানের মধ্যেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করুন। না হলে এর পরিণাম অনেক ভয়াবহ হবে।